আল্লাহ্’র একক সার্বভৌমত্ব ও দ্বীন প্রতিষ্ঠার দাওয়াত -ঈমানদারদের দায়িত্ব ও কর্তব্য

sovereignty1

লেখকের ভূমিকা
অভিশপ্ত শয়তানের কুমন্ত্রণা হতে আশ্রয় প্রার্থণা করে, দয়াময় পরম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু। যিনি জগতসমূহের একমাত্র রব্ব। আমরা সেই মহান রব্বের’ই শ্রেষ্ঠত্ব ও সার্বভৌমত্ব ঘোষণা করছি। তিনি মহাপরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়, মহাক্ষমাশীল, বিচার দিনের মালিক। আমরা তাঁরই প্রশংসা করি এবং তাঁরই নিকট সাহায্য চাই। আমরা তাঁর সমীপে অনুতপ্ত হয়ে তাওবা করি, তাঁরই নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করি যাবতীয় কুপ্রবৃত্তি ও দুষ্কৃতি থেকে। আমরা ঘোষণা করছি যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন রব্ব-সার্বভৌম মালিক, সার্বভৌম আইনদাতা-বিধানদাতা ও নিরংকুশ কর্তা নেই। আমরা সাক্ষ্য প্রদান করছি যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন হক্ব ইলাহ্-দাসত্ব, আইনের আনুগত্য ও উপাসনা পাওয়ার সত্তা নেই। তিনি একক, তাঁর কোন শরীক নেই। আমরা আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহ’র বান্দা ও তাঁর রাসূল-শর্তহীন আনুগত্য-অনুসরণ ও অনুকরণ পাওয়ার অধিকারী একমাত্র নেতা। আল্লাহ্ তাঁর উপর রহমত নাযিল করুন, আর তাঁর পরিবার-পরিজন, সহচর এবং যারা সৎ কাজে তাঁদের অনুসরণ করবে তাঁদের উপর অনুগ্রহ করুন। আমাদের পক্ষ থেকেও অগণিত সালাত ও সালাম মহামহিম হযরত রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর পরিবার-পরিজন, সহচর এবং তাঁর প্রদর্শিত সত্য পথের অনুসারীগণের প্রতি। অতঃপর বক্তব্য এই যে,
প্রাকৃতিক নিয়মেই আল্লাহর সার্বভৌমত্ব থাকার কথা সর্বোচ্চে প্রতিষ্ঠিত। স্বাভাবিকভাবেই পৃথিবীর শৃংখলা ও শাসনব্যবস্থার মূলনীতি হওয়ার কথা ‘ইসলাম’। হযরত রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই ‘ইসলাম’ প্রতিষ্ঠার কাজটি করার জন্য দুনিয়াতে এসেছিলেন আর দীর্ঘ সংগ্রাম ও সাধনার দ্বারা তা তিনি প্রতিষ্ঠাও করে গিয়েছিলেন। অন্ততঃ মুসলিম জাহানের শেষ খলীফা তুরস্কের দ্বিতীয় আবদুল হামীদের পতনের পূর্বক্ষণ পর্যন্ত বিশ্বব্যবস্থার নিয়ন্তা ছিল মুসলিম নেতৃত্ব তথা ‘ইসলাম’।
কিন্তু প্রায় আড়াই ’শ বছর ধরে চলে আসা স্থবিরতা আর শত বৎসরব্যাপী কঠিন বৈরী বাতাসে মুসলিম জাতি আজ ভীষণভাবে আক্রান্ত ও বিপর্যস্ত। এ অবস্থা মেনে নেয়া বা এর উপর তুষ্ট থাকা কোন মুসলিমের জন্য বৈধ নয়। বৈধ নয় ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও বৈশ্বিক জীবনে গায়রুল্লাহ্র (আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য কারো) সার্বভৌমত্ব ও কর্তৃত্ব স্বীকার করে নেয়া। বিশ্বব্যবস্থার নেতৃত্বে তাগুত (অনৈসলামিক শক্তি)কে বহাল রেখে এক মুহূর্তও স্বস্তিতে থাকা মুসলিমদের নীতি-বিরুদ্ধ কাজ। জীবন ও জগতের কোন নীতি-নির্ধারণী অঙ্গনই আল্লাহ্’র সার্বভৌমত্ব বিমুখ বা আল্লাহ্দ্রোহী শ্রেণীগোষ্ঠীর হাতে ছেড়ে রাখা কোন ঈমানদার মানুষের জন্য বৈধ নয়।
অতএব, ঈমানের দাবী অনুযায়ী তাদের উপর ফরয হচ্ছে আল্লাহ্’র জমীনে আল্লাহ্’র সার্বভৌমত্ব, আইন-বিধান ও কর্তৃত্ব তথা দ্বীন-ইসলাম প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আল্লাহ্’র নির্দেশিত এবং তাঁর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রদর্শিত পদ্ধতিতে মানবজাতিকে আহ্বান করা।
কিন্তু আজকে আমাদের দেশের অধিকাংশ পন্ডিত (Scholar) ব্যক্তিবর্গ ইসলামকে শান্তির ধর্ম, কল্যাণের ধর্ম, Complete Code of Life প্রভৃতি বিশেষণে বক্তৃতা, বিবৃতিতে উপস্থাপন করে থাকলেও তা প্রতিষ্ঠার জন্য বাস্তব কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেন না। তাই এ দেশে আল্লাহ্’র একক সার্বভৌমত্ব এবং দ্বীন প্রতিষ্ঠিত না হওয়ার পেছনে এই সকল পন্ডিতদের আচরণ অনেকাংশেই দায়ী। পৃথিবীব্যাপী ইসলাম বিরোধীদের নিকট এরা আবার মডারেট (Moderate) মুসলিম নামে পরিচিত। এই তথাকথিত মডারেট মুসলিমদের দ্বারা এনেসথেসিয়া (Anaesthesia) কৃত জনগণের ঈমান যেন আর জাগতে চায় না। এই ঈমান জাগিয়ে তোলার জন্যই এত কুরআন-সুন্নাহ্ ভিত্তিক লেখালেখি, সভা-সেমিনার, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ-প্রতিরোধ, জেল-জুলুম-নির্যাতন সহ্য করে যাওয়া সহ বিভিন্ন ঘটনা। তবুও আমরা কেন জানি একেবারে ঘুমিয়ে গেছি। তথাকথিত আলিমদের অন্ধ আনুগত্যই যেন সব থামিয়ে দিয়েছে। এ অবস্থার উত্তরণে আমাদের জন্য জরুরী ছিলো নিজ দায়িত্বে কুরআন ও হাদীস মাতৃভাষায় চর্চা করা। কিন্তু এ সম্পর্কে আমাদের উদাসীনতা ও গাফিলতির কারণে আজ ‘উলামায়ে ছু’দের উদ্দেশ্যমূলক অনুবাদ ও ব্যাখ্যা মাদরাসা সহ স্কুল-কলেজে শিক্ষা লাভ করা মানুষরা পড়ছে ও শুনছে এবং ঐ লেখা ও কথাকে মানদন্ড ধরছে। কেননা সে লেখা ও কথা প্রকাশিত এবং প্রচারিত হচ্ছে মানুষের পরিচিত কোন বিরাট প্রকাশনা সংস্থা ও মিডিয়ায় মাধ্যমে। দুঃখজনকভাবে যার শতভাগ শিকার ছিলাম আমি নিজেই। অনেক কষ্ট ও ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে এদের দ্বারা গড়া আমার মনন ছিন্ন করতে; বিভ্রান্তি থেকে বেরিয়ে প্রকৃত সত্যকে উদঘাটন করে তা মজবুত করে আঁকড়ে ধরতে। এজন্য নিজের অক্ষমতার কথা চিন্তা করে প্রায়শঃই হৃদয়ের গহীণে তীব্র ব্যথা অনুভূত হতো, হতো নীরব রক্তক্ষরণ। এই রক্তক্ষরণ আর হৃদয়ের ব্যথা থেকে উৎসরিত দায়িত্ববোধ থেকেই অধমের হাতে উঠে এসেছে কলম-দ্বীনের দাওয়াতের হাতিয়ার। যে হাতিয়ার মানুষের দেহ থেকে রক্ত ঝরায় না, ঝেড়ে ফেলে র্শিক আর কুফরের বিষ।
আদম শুমারীর হিসেব-নিকেষ বলছে আমাদের এই দেশ-বাংলাদেশ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্টদের দেশ অর্থাৎ দেশের অধিকাংশ মানুষ মুসলিম (১০০জনে প্রায় ৯০জন)। আমাদের স্র্রষ্টা প্রদত্ত আকল বা জ্ঞান বলছে কোন দেশ যদি মুসলিম প্রধান দেশ হয় তবে স্বাভাবিকভাবেই সে দেশে আল্লাহ্’র সার্বভৌমত্ব এবং দ্বীন রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে পরিপূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকার কথা। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আমাদের দেশের মুসলিম নামধারী শাসক আর শাসিতদের ঈমান ও দ্বীনের অবস্থা এতটাই নাজুক যে, নব্বই শতাংশ লোক মুসলিম দাবী করার পরও সমাজ বা রাষ্ট্রে আল্লাহ্’র সার্বভৌমত্ব এবং দ্বীন প্রতিষ্ঠিত নেই, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সালাত কায়েম নেই, যাকাত আদায় হচ্ছে না আর আদালতে পারিবারিক ও উত্তরাধিকার সম্পর্কিত মুসলিম আইনের আংশিক প্রয়োগ ব্যতীত সকল ক্ষেত্রে ইসলামী আইন-বিধান অনুপস্থিত। প্রকৃতপক্ষে নামধারী ৯০% মুসলিমের মধ্যে অধিকাংশই বুঝে-শুনে সঠিক জ্ঞানের ভিত্তিতে আল্লাহ্্কে একমাত্র রব্ব-সার্বভৌম মালিক, সার্বভৌম আইনদাতা-বিধানদাতা ও নিরংকুশ কর্তা ঘোষণা দিয়ে ঈমান এনে যে ঈমানদার হতে হয়, আর ব্যক্তিগত সালাত, সিয়াম, হজ্জ, যাকাত প্রভৃতি ইবাদাতের বাইরেও ইসলাম যে মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ্ প্রদত্ত কিয়ামত পর্যন্ত সমগ্র মানব জাতির জন্য ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে একটি চির আধুনিক যুক্তিগ্রাহ্য পরিপূর্ণ ও কল্যাণকর একমাত্র দ্বীন-জীবন ব্যবস্থা সে সম্পর্কে ন্যূনতম ধারণাই রাখেন না। সুতরাং যারা দ্বীন পরিপূর্ণরূপে প্রতিষ্ঠা করতে চান তাদের জন্য সর্বাত্মক দাওয়াতের বিকল্প নেই। অর্থাৎ অধিকাংশ মানুষের মধ্যে ঈমান, ইসলাম, তাওহীদ, র্শিক, রুবুবিয়্যাহ্, উলুহিয়্যাহ্ সম্পর্কে চেতনা জাগিয়ে তুলতে হবে। তাই অধিকাংশ মানুষের ঈমান ও চরিত্রের ইসলাহ্ (সংশোধন) ব্যতিরেখে বলপ্রয়োগে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে দ্বীন প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা বা চেষ্টা করাটা হবে পবিত্রতা অর্জন ব্যতীত সালাত আদায়ের শামিল। এরূপ প্রচেষ্টা দ্বীন প্রতিষ্ঠায় মানুষের মাঝে আবেগ সৃষ্টি করলেও বাস্তবে সংকট ডেকে আনা ব্যতীত ভিন্ন ফল দেয় না। উপরন্তু দ্বীন সম্পর্কে অজ্ঞ জনগণ দিনকে দিন ইসলাম বিরোধী হয়ে পড়ে এবং দ্বীন প্রতিষ্ঠার কর্মীদের সাথে সচেতন ভাবেই শত্র“তা প্রকাশের পাশাপাশি তাদের ঠেকাতে রাষ্ট্রযন্ত্রের সাথে একাট্টা হয়ে সর্বশক্তি নিয়োগ করে।
আজ মুসলিমদের মাঝে ইসলামের মৌলিক বিষয়সমূহের সাথে সংশ্লিষ্ট আল কুরআনে উল্লিখিত বিশেষ বিশেষ শব্দগুলোর অর্থ বিকৃত হয়ে, হালকা হয়ে তাদের চিন্তা-চেতনায় গোমরাহী ঢুকে পড়েছে। মুসলিমরূপী ইসলামিক নামধারী ইয়াহুদী-খৃষ্টান আলিমগণ যে শব্দগুলোর বিকৃত অর্থ, হালকা অর্থ মুসলিম সমাজে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিল এবং প্রায় সর্বক্ষেত্রে সফলও হয়েছে তন্মধ্যে ঈমান, ইসলাম, রব্ব, ইলাহ্, দ্বীন, তাগুত, জাহিলিয়্যাত শব্দগুলো উল্লেখযোগ্য। এই শব্দগুলোর সঠিক অর্থ যেন মুসলিমরা আদৌ জানতে না পারে এবং ইসলামকে মুসলিমরা যেন দ্বীন-জীবন ব্যবস্থার পরিবর্তে হিন্দু, বৌদ্ধ, খৃস্টান ও ইয়াহুদীদের ন্যায় নিছক অনুষ্ঠান সর্বস্ব ধর্ম মনে করে। অর্থাৎ হিন্দুরা যেমন মনে করে তাদের ধর্ম দেব-দেবীর পুজা-অর্চণার অনুষ্ঠান সর্বস্ব একটা ধর্ম, বৌদ্ধরা যেমন মনে করে মুখে অহিংসার বাণী প্রচার আর গৌতম বুদ্ধের মুর্তির সামনে জপ-তপ করলেই ধর্ম পালন হয়ে গেল, খৃষ্টান ও ইয়াহুদীরা যেমন মনে করে তাদের ধর্ম হচ্ছে চার্চ ও গীর্জার চার দেয়ালের মাঝে কৃত প্রার্থণা সর্বস্ব ধর্ম। ঠিক তেমনি মুসলিমরাও যেন তাদের দ্বীনকে সালাত, সিয়াম, হজ্জ, যাকাত সহ ঈদ, কুরবানীর ন্যায় বিশেষ বিশেষ দিনে কিছু আচার-অনুষ্ঠান পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ মনে করে।
খৃষ্টান ও ইয়াহুদীদের পথভ্রষ্ট হওয়ার মূলে যে আক্বীদাহ ছিলো তা আজ মুসলিম উম্মাহ্’র প্রায় প্রত্যেকটি ব্যক্তির মন-মগজে অনুপ্রবেশ করেছে। খৃষ্টান ও ইয়াহুদীদের সেই ধ্বংশাত্মক আক্বীদাহ্ হলো- মানুষের জীবন দু’টি অংশে বিভক্ত: (১) দ্বীনদারী বা ধর্মীয় অংশ এবং
(২) দুনিয়াদারী (পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনা) অংশ।
মানুষের এই ভ্রান্ত আক্বীদাহ’র সয়ংক্রিয় (Autometic) কর্মফল যা দাড়াচ্ছে তা হলো- মানুষের জীবন দুই রব্বের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে:
১. জীবনের দ্বীনদারী অংশ পরিচালিত হচ্ছে আল্লাহকে রব্ব (সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা, রক্ষাকর্তা, শৃংখলাবিধানকারী, পূর্ণতাদানকারী, হাশরের ময়দানে একত্রে জমাকারী) মেনে। আর
২. পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবন অর্থাৎ দুনিয়াদারী অংশ পরিচালিত হচ্ছে রাষ্ট্র প্রধান/শাসককে রব্ব (সার্বভৌমত্ব, আইন-বিধান ও কর্তৃত্বের মালিক) মেনে।
এই গোমরাহীপূর্ণ বিশ্বাস মুসলিমদের মধ্যে বদ্ধমূল করে দেয়ার উদ্দেশ্যে ইয়াহুদী ও খৃষ্টানরা তাদের পরিকল্পনা যথাযথভাবেই বাস্তবায়িত করে গেছে। আর আমাদের অজ্ঞতার কারণে নিজের অজান্তেই আমরা ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের আক্বীদাহ্’র উপর প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছি। বর্তমান বিশ্বের মুসলিম নামধারীরা কিভাবে ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের সূক্ষè চক্রান্তের অদৃশ্য জালে আটকা পড়ে ঈমান ও ইসলামের পরিবর্তে র্শিক ও কুফর নিয়ে দিনাতিপাত করছে তার একটি বাস্তব উদাহরণ পেশ করছিÑ কুরআন ও সুন্নাহ্ সম্পর্কে ন্যূনতম জ্ঞান রাখেন এরূপ সকলেই জানেন যে, প্রত্যেকটি শিশুই জন্ম নেয় তার প্রকৃত ও একমাত্র রব্ব আল্লাহ্’র মনোনীত দ্বীন-ইসলামের উপর। অতঃপর ঐ শিশুটির অভিভাবকের উপর ফরয হয়ে যায় জাগতিক জ্ঞান-বুদ্ধি হওয়ার পর শিশুটিকে ঈমান ও ইসলাম শিক্ষা দেয়া, যাতে সে বয়ঃপ্রাপ্ত হয়ে সঠিক জ্ঞানের ভিত্তিতে বুঝে-শুনে আল্লাহ্কেই একমাত্র রব্ব, ইসলামকেই একমাত্র দ্বীন-জীবন ব্যবস্থা আর আল্লাহ্’র সর্বশেষ নাবী ও রাসূল হযরত মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)কেই শর্তহীন অনুকরণ ও অনুসরণের মাধ্যমে একমাত্র আদর্শিক নেতা হিসেবে গ্রহণ করে প্রকৃত ঈমানদার মুসলিম হিসেবে আল্লাহ্’র নিকট পরিগনিত হতে পারে। কিন্তু মুসলিম দাবীদার প্রায় সকলের বদ্ধমূল ধারণা এই যে, তাদের সন্তান যেহেতু ঈমান নিয়ে মুসলিম পরিচয়ধারী বাবা-মায়ের ঔরসে জন্ম গ্রহণ করেছে সেহেতু নতুন করে এই সন্তানকে আর ঈমান বুঝানো বা গ্রহণ করানোর প্রয়োজন নাই। তাকে শুধু সালাত, সিয়াম, হজ্জ, যাকাত সহ বিশেষ কিছু ইবাদাত শিক্ষা দিলে এবং সে তা পালন করলেই ভাল ঈমানদার মুসলিম, আর না করলে তাকে সাধারণ ঈমানদার মুসলিম বলা হবে; কিন্তু মুশরিক বা বেঈমান কিছুতেই নয়! এমনকি পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে আল্লাহ্’র সার্বভৌমত্ব, আইন-বিধান ও কর্তৃত্ব না মানলেও কিংবা পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে আল্লাহ্’র সার্বভৌমত্ব তথা দ্বীন-ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হোক এটা না চাওয়া দুরে থাক এর বিরোধীতা করলেও সে ঈমানদার মুসলিম! আর এই দলিল প্রমানহীন ভ্রান্ত বিশ্বাসের বলে বলীয়ান হয়েই আজ ঈমানদার মুসলিম দাবীদাররা সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় আল্লাহ্’র পরিবর্তে মানুষের সার্বভৌমত্ব, আইন-বিধান ও কর্তৃত্ব মেনে নিয়ে মানুষকেই রব্বের আসনে বসিয়ে প্রকৃত রব্ব আল্লাহ্’র সাথে র্শিকে লিপ্ত হওয়ার পরও নিশ্চিন্তে সালাত, সিয়াম, হজ্জ, যাকাত, দান-সাদকা প্রভৃতি আমল করে যাচ্ছেন জান্নাত লাভের আশায়। অথচ মুসলিম মাত্রই তাদের জানা ফরয ছিল যে, “আল্লাহ্ তাঁর সাথে র্শিক করার গুনাহ মাফ করবেন না। র্শিক ছাড়া অন্যান্য যে সব গুনাহ রয়েছে সেগুলো যাকে ইচ্ছা মাফ করে দিবেন।” (সূরা নিসা ৪:৪৮)। এছাড়া সূরা যুমার-এর ৬৫ এবং সূরা আনআ’ম-এর ৮৮নং আয়াত অনুযায়ী র্শিক করার কারণে তাদের সকল আমলইতো আল্লাহ্ ধ্বংস করে দিবেন সুতরাং বাতিল আমল দ্বারা জান্নাত লাভের আশা করাটাই দুরাশা। তাই তাওহীদ ধ্বংশকারী এই র্শিকী আক্বীদাহ থেকে যদি আমরা মুসলিমরা আমাদের মন-মগজকে বিশুদ্ধ করে নিতে পারতাম, তাহলে আমরা মহান রব্ব আল্লাহ্ সুব্হানাহু ওয়া তা’য়ালার রহমত আশা করতে পারতাম।
কালের বিবর্তনে জ্ঞান-বিজ্ঞানে অগ্রসর ও সমৃদ্ধ হওয়ার কারণে মানুষ যতই উচ্চ মর্যাদা দাবী করুক না কেন, আল্লাহ্’র নিকট মানুষের সঠিক অবস্থান হচ্ছে, আল্লাহ্ আমাদের সার্বভৌম মালিক আর আমরা তাঁর দাস ও প্রতিনিধি। সুতরাং দুনিয়ার জীবনে সার্বভৌম মালিক আল্লাহ্’র খাঁটি দাস ও প্রতিনিধি হিসেবে দাসত্ব ও প্রতিনিধিত্ব করতে হলে শুধুমাত্র আমাদের ব্যক্তিগত ইবাদাতসমূহে নয়, আমাদের পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রীয় জীবনেও আল্লাহ্’র সার্বভৌমত্ব, হুকুম-বিধান প্রতিষ্ঠা করা জরুরী। এই জরুরতকে সর্বাগ্রে প্রাধান্য দিয়ে যারা দুনিয়ার বুকে এক আল্লাহ্’র সার্বভৌমত্ব এবং তাঁর মনোনীত ইনসাফভিত্তিক হুকুম-বিধান সম্বলিত পরিপূর্ণ ও কল্যাণকর একমাত্র জীবন ব্যবস্থা ইসলাম কায়েমের লক্ষ্যে আল্লাহ’কেই একমাত্র রব্ব-সার্বভৌম মালিক, সার্বভৌম আইনদাতা-বিধানদাতা ও নিরঙ্কুশ কর্তা মেনে ঈমানের উপর দৃঢ়-অটল থাকবে এবং এ লক্ষ্য অর্জনে আল্লাহ্, তাঁর রাসূল মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এবং মু’মিনদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করবে তারাই আল্লাহ্’র দলভূক্ত এবং বিজয় তাদের হবেই হবে, এটাই আল্লাহ্ পাকের ওয়াদা। কেননা আল্লাহ্ ঘোষণা করেছেন- “আর তোমরা নিরাশ হয়ো না এবং দুঃখ করো না, তোমরাই বিজয়ী হবে, যদি তোমরা ঈমানদার হয়ে থাকো” (সূরা আলে ইমরান ৩:১৩৯)। “আর যারা আল্লাহ্, তাঁর রাসূল এবং মু’মিনদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করে, তারাই আল্লাহ্’র দল এবং তারাই বিজয়ী” (সূরা মায়িদাহ ৫:৫৬)।
এরপরও শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণকারীরা আল্লাহ্’র জমীনে মিথ্যা সার্বভৌমত্বের দাবীদার সেজে শুধু মহান রব্ব আল্লাহ্’র ক্রোধই অর্জন করছে, এতে করে তাদের মাঝে ও জাহান্নামের মাঝে দূরত্ব ক্রমশঃ কমছে বৈ বাড়ছে না। সুতরাং যারা এখনও আল্লাহ্’র জমীনে মিথ্যা সার্বভৌমত্বের দাবীদারদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে এক আল্লাহ্’র সার্বভৌমত্ব গ্রহণ করে, তাঁর-ই মনোনীত একমাত্র দ্বীন-জীবন ব্যবস্থা ইসলাম প্রতিষ্ঠার কাজে আত্মনিয়োগ করেননি তারা সাধ্যানুযায়ী দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই মহৎ কাজে নিজেদেরকে সম্পৃক্ত করে জাহান্নাম থেকে ফিরে নিজেদের মূল বাড়ী, আসল বাড়ী জান্নাতে যাওয়ার পথ ধরবেন। নিজেদেরকে আর আবু জাহেল নয়, আবুল হাকাম হিসেবে আল্লাহর নিকট উপস্থাপন করবেন এবং এ আয়াতের উপরে আমল করবেন-
“তোমরা দ্বীন প্রতিষ্ঠা কর এবং এ ব্যাপারে পর¯পর দলাদলি-বিচ্ছিন্নতা করো না।” (সূরা শুরা ৪২:১৩)
আল্লাহ্ প্রদত্ত সীমাবদ্ধ জ্ঞান ও মেধা প্রয়োগ করে কুরআন ও সুন্নাহ চর্চা করে নিশ্চিত হয়েছি, মানুষ তার জীবনের সর্বক্ষেত্রেই আল্লাহ্’র দয়া ও রহমতের মুখাপেক্ষী। তাই সমস্ত শুকরিয়া মহান আল্লাহ্ রাব্বুল আ’লামীনের জন্যই; যার নেয়ামত ও অনুগ্রহেই যাবতীয় ভাল কাজ সুস¤পন্ন হয়ে থাকে। আল্লাহ্ রাব্বুল আ’লামীনের বিশেষ সাহায্যপ্রাপ্ত নাবী ও রাসূলগণ (আলাইহিস সালাম) ব্যতীত পৃথিবীতে আর কেউ ভুল-ভ্রান্তির ঊর্ধ্বে নয়। তাই ভূমিকার শেষে মহান মালিক আল্লাহ্’র দরবারে প্রার্থণা: “হে আমার রব্ব! আমার এ সামান্য খিদমতটুকু কবুল করুন এবং এ লেখাকে আমি সহ সকল পাঠকের পরকালীন নাজাতের ওছিলা বানিয়ে দিন। যে মহা উদ্দেশ্য নিয়ে আমাদের সৃষ্টি করেছেন আমরা যেন তা উপলব্ধি করে তদনুযায়ী আমল করতে পারি, খালেছ ভাবে আপনার দাসত্ব ও প্রতিনিধিত্ব করতে পারি সে তাওফীক দিন। লেখনির ভাষায় ইচ্ছাকৃতভাবে আপনার প্রদত্ত ইলমের কোন খিয়ানত আমি করিনি। যদি নিজের অক্ষমতার কারণে কোন ত্রুটি-বিচ্যুতি করে থাকি সে অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য আপনার সাহায্য চাই। সর্বোপরি আপনার দয়া চাই, আপনার পাকড়াও হতে পানাহ চাই। হে মহান রব্ব! আমাদের ওপর এমন বোঝা চাপিয়ে দিয়েন না, যা আপনি আমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর চাপিয়ে দিয়েছিলেন। হে আমাদের রব্ব! যে বোঝা বহন করার সামর্থ আমাদের নেই, তাও আমাদের ওপর চাপিয়ে দিয়েন না। আমাদের প্রতি কোমল হোন, আমাদের অপরাধ ক্ষমা করুন এবং আমাদের প্রতি করুণা করুন। কারণ নিঃসন্দেহে আপনিই আমাদের উত্তম অভিভাবক, উত্তম সাহায্যকারী, ইয়া রাব্বাল আ’লামীন।”
বিনয়াবনত
আবু যারীফ
মুহররম, ১৪৩৪ হিজরী, নভেম্বর, ২০১২ ঈসায়ী।

আল্লাহ্’র একক সার্বভৌমত্ব
ও দ্বীন প্রতিষ্ঠার দাওয়াত : ঈমানদারদের দায়িত্ব ও কর্তব্য

সার্বভৌমত্ব ও দ্বীন প্রতিষ্ঠার দাওয়াত সম্পর্কিত মূল আলোচনায় প্রবেশের পূর্বে এ শব্দ দু’টি সম্পর্কে পাঠকদেরকে অবহিত করা জরূরী মনে করছি এই কারণে যে, এতে লেখার মূল স্পিরিট বুঝতে তাদের জন্য সহজসাধ্য হবে।
সার্বভৌমত্ব (Sovereignty) : বর্তমান জ্ঞান, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উৎকর্ষতার যুগে সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় সার্বভৌমত্ব শব্দটি রাজনীতিবিদ সহ সচেতন জ্ঞানী ব্যক্তিদের মুখে হরহামেশাই শুনতে পাওয়া যায়। অতি গুরুত্বপূর্ণ এ শব্দটি তারা দেশ, জনগণ, বিচার বিভাগ ও সংসদ বা আইন সভার ক্ষেত্রে কথায় কথায় প্রয়োগ করে থাকেন। যেমন দেশের সার্বভৌমত্ব, জনগণের সার্বভৌমত্ব, সার্বভৌম সংসদ, সার্বভৌম বিচার বিভাগ প্রভৃতি। কিন্তু তাদের অনেকের সাথেই কথা বলে জেনেছি, সার্বভৌমত্ব শব্দটির প্রকৃত ব্যাখ্যা তারা নিজেরাই জানেন না। তবে এটি যে একটি সর্বোচ্চ ক্ষমতা বাচক শব্দ তা তাদের ধারণাতীত নয়। পশ্চিমা বিশ্বে সার্বভৌমত্ব শব্দটিকেSovereignty নামে অভিহিত করা হয়। যার উৎপত্তি ও সংগা সম্পর্কে ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে এভাবে: Sovereignty Derived from the Latin term superanus through the French term souveraineté. By “Sovereignty” in its largest sense is meant supreme, absolute, uncontrollable power, the absolute right to govern.
আল্লাহ্’র মনোনীত দ্বীন-ইসলামে সার্বভৌমত্ব বা Sovereignty শব্দটির সংগা, অবস্থান, প্রয়োগ ও গুরুত্ব কিরূপ তা এবার সংক্ষেপে আলোচনা করা হচ্ছে:
মূলতঃ সার্বভৌমত্ব হচ্ছে- মানুষের জীবনের সকল দিক ও বিভাগসহ সমগ্র সৃষ্টি জগতের চূড়ান্ত মালিকানা এবং হুকুম, নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করার সর্বোচ্চ ক্ষমতা। সার্বভৌমত্ব যার, আইন-বিধান ও কর্তৃত্ব তাঁরই হয়। সার্বভৌম ক্ষমতার মালিকের আদেশ, নিষেধ ও ইচ্ছা-ই আইন। অর্থাৎ যিনি সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক তিনিই আইনদাতা-বিধানদাতা। আল্লাহ্’ই সার্বভৌম ক্ষমতার একমাত্র মালিক। কারণ সার্বভৌম ক্ষমতার মালিককে চিরন্তণ ও চিরস্থায়ী সত্ত্ব¡¡া হওয়া অপরিহার্য। মানুষ মাত্রই মরণশীল, তাই মানুষ কখনোই চিরন্তণ ও চিরস্থায়ী সত্ত্বা এবং কোন বিষয়ের চূড়ান্ত মালিকও নয়। সুতরাং সৃষ্টিগতভাবেই মানুষ সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক হওয়ার যোগ্যতা রাখেনা। সৃষ্টি জগতসমূহের সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহ্ রাব্বুল আ’লামীন ব্যতীত চিরন্তণ ও চিরস্থায়ী সত্ত্বা নাই বিধায় স্বাভাবিকভাবেই তিনি সার্বভৌম ক্ষমতার একমাত্র মালিক, বিশ্বজাহানের সর্বত্র সার্বভৌমত্ব একমাত্র তাঁরই। আর সার্বভৌমত্বের মালিক হওয়ার কারণে আল্লাহ্ রাব্বুল আ’লামীনই মানুষের জীবনের সকল দিক ও বিভাগ এবং সৃষ্টিজগতের সকলের জন্য একমাত্র আইনদাতা-বিধানদাতা, নিয়ন্ত্রনকর্তা এবং প্রতিপালক। অতএব মানুষের নয়! সার্বভৌমত্ব, আইন-বিধান ও নিরংকুশ কর্তৃত্ব একমাত্র আল্লাহ্’র-এটাই মহা সত্য।
সার্বভৌমত্বের কোন বিভাজন হয়না। বিভাজন হলে তা আর সার্বভৌম ক্ষমতা বলে গণ্য হবে না। এই বাস্তবতায় বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে মানবজাতি তাদের জীবনের ব্যবহারিক ও প্রায়োগিক ক্ষেত্রে সার্বভৌমত্ব শব্দটিকে যে অর্থে ব্যবহার করছে তা হলোÑ সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগের সর্বোচ্চ ও চূড়ান্ত ক্ষমতা। কাজেই, সার্বভৌমত্বে বিভাজন করে মানব জাতি শুধুমাত্র সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় সৃষ্টিকর্তাকে সার্বভৌম মালিক বাদ দিয়ে নিজেরা মিথ্যা সার্বভৌমত্ব দাবীর মাধ্যমে সমগ্র জাতিকে এর অধীনে বন্দী করে সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ্’র সাথে র্শিকে লিপ্ত করেছে।
সার্বভৌমত্ব বিষয়টি অবশ্যই ঈমানের সাথে সংশি্লষ্ট। ঈমানের মূল-ই হচ্ছে আল্লাহ্’র রুবুবিয়্যাতে তাওহীদ। আর রুবুবিয়্যাতে তাওহীদের অন্যতম গুণ-বৈশিষ্ট্য হচ্ছে আল্লাহ্’র একক সার্বভৌমত্ব। বিশ্বজাহানের একমাত্র রব্ব আল্লাহ্ রাব্বুল আ’লামীনের এ গুণ-বৈশিষ্ট্যকে অস্বীকার করা কুফরী, আর আল্লাহ পাকের সার্বভৌমত্ব মানার পাশাপাশি সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় মানুষের সার্বভৌমত্ব মানা (অর্থাৎ মানুষকে আইনদাতা-বিধানদাতা মানা বা মানুষকে আইন-বিধান প্রনয়ণের ক্ষমতা দান করা) র্শিক। দুনিয়াতে এই কুফর আর র্শিক না থাকলে কোন জুলুম-শোষণও থাকতো না। আর র্শিক সম্পর্কে আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীন ফরমান- “যদি তুমি র্শিক করো তাহলে তোমার সকল আমল বিনষ্ট হয়ে যাবে এবং তুমি হবে ক্ষতিগ্রস্থদের অন্তর্ভূক্ত” (সূরা যুমার ৩৯:৬৫)। চূড়ান্ত ঘোষণা দিয়ে আল্লাহ আরও ফরমান- “নিশ্চয়ই যারা আল্লাহর সাথে র্শিক করবে, আল্লাহ তাদের জন্য জান্নাতকে হারাম করে দিবেন; তাদের স্থান হবে জাহান্নামের আগুনে এবং এই জালিমরা কোন সাহায্য পাবে না” (সূরা মায়েদা ৫:৭২ শেষাংশ)। সুতরাং বুঝা গেলো যে, সমাজ ও রাষ্ট্রে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত না থাকাটাই মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় ক্ষতি বা মহাক্ষতি। আমাদেরকে আরেকটি কথা মনে রাখতে হবে যে, সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে আল্লাহ্র সার্বভৌমত্ব বহাল থাকলেই এবং আল্লাহ্কে সার্বভৌমত্বের একমাত্র মালিক স্বীকার করে একমাত্র নিরংকুশ আইনদাতা মানলেই ইসলামের অস্তিত্ব অক্ষুন্ন থাকে। আল্লাহ্র সার্বভৌমত্ব বজায় না থাকলে সেখানে ইসলামের অস্তিত্ব এক মুহুর্তও থাকতে পারে না। সুতরাং মানুষের নয়! সার্বভৌমত্ব, আইন-বিধান ও নিরংকুশ কর্তৃত্ব একমাত্র আল্লাহ্’র-এটাই মহা সত্য।
দ্বীন : দ্বীন আরবি শব্দ। দ্বীন মানে- আনুগত্য, আনুগত্যের বিধান, জীবন যাপন করার নিয়ম কানুন, জীবন ব্যবস্থা ও জীবন পদ্ধতি। আর আল্লাহ্ রাব্বুল আ’লামীনের নিকট গ্রহণযোগ্য এবং মনোনীত একমাত্র দ্বীন-জীবন বিধানের নাম ইসলাম। তাই,
-একমাত্র আল্লাহ্’র হুকুম মতো জীবন-যাপন করার নাম: ইসলাম।
-একমাত্র আল্লাহ্’র আইনের আনুগত্যের অধীনে জীবন যাপনের নাম: ইসলাম।
-আল্লাহ্কে একমাত্র রব্ব-সার্বভৌম মালিক, মনিব ও প্রভু মেনে নিয়ে তাঁর দাসত্বের অধীনে থেকে তাঁরই দাস-গোলাম হিসেবে নত ও বাধ্যগত জীবন যাপন করার নাম: ইসলাম।
-একমাত্র আল্লাহ্’র নিকট আÍসমর্পণ করে, তাঁরই নিকট সাহায্য ও আশ্রয় প্রার্থণা করে তাঁরই উপাসনা করার নাম: ইসলাম।
দ্বীন হিসেবে ইসলামকে গ্রহণ করাই হচ্ছে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের একমাত্র পথ। মহান আল্লাহ্ মানুষ সৃষ্টি করেছেন, তিনিই অত্যন্ত মেহেরবানী করে মানুষের জীবন যাপনের সঠিক পথ-দ্বীন দেখিয়ে দিয়েছেন। সে দ্বীনই হলো ইসলাম। এ জন্য দ্বীন-ইসলাম স¤পর্কে আল্লাহ্ তাঁর কিতাবে ফরমান-
“নিঃসন্দেহে আল্লাহ্’র নিকট গ্রহণযোগ্য দ্বীন হচ্ছে একমাত্র ইসলাম।” (সূরা আলে ইমরান ৩:১৯)
মহান আল্লাহ্ আরও ফরমান-
“আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার নিয়ামত স¤পূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম।” (সূরা মায়িদাহ ৫:৩)
এই জীবন বিধানকে মহান আল্লাহ্ তা’য়ালা আল কুরআনে দ্বীনে হক্ব হিসাবে আখ্যায়িত করেছেন। আবার এ দ্বীনে হক্ব শব্দটি দু’টি অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। একটি হচ্ছে অধিকার বা কর্তব্য আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে সত্য-সঠিক বা নির্ভুল। কুরআনে দ্বিতীয় অর্থটিকে অধিক গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। তাহলে দ্বীন শব্দটির পূর্ণ অর্থ দাঁড়ায়- সত্য, সঠিক ও নির্ভুল জীবন বিধান যাতে দাসত্ব, আইনের আনুগত্য ও উপাসনা একমাত্র আল্লাহ্’র।
পারিভাষিক অর্থে আদ্ দ্বীন বলতে বুঝায়, আল্লাহ প্রদত্ত ও রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রদর্শিত নির্ভুল জীবন বিধান যাতে আল্লাহকে ভয় করে, তাঁর প্রতি ভালবাসা রেখে এবং তাঁর কাছেই আশা ও আকাংখা নিয়ে মানুষের ব্যক্তিগত, সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় জীবনের সকল দিক ও বিভাগগুলোতে পরিপূর্ণভাবে তাঁর আদেশ-নিষেধ মেনে চলতে হয়। আর এই জীবন বিধান যারা গ্রহণ করে ও মেনে চলে তারাই হচ্ছে কুরআনের দৃষ্টিতে মুসলিম বা দ্বীন-ইসলামের অনুসারী।
আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীনের নিকট পছন্দনীয় ও গ্রহণযোগ্য একমাত্র দ্বীন-জীবন ব্যবস্থা হচ্ছে ইসলাম। কিন্তু কেউ ইচ্ছে করলে ইসলাম ব্যতীত ভিন্ন কোন জীবন ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে, তবে তা শয়তানী কর্ম হিসেবে বিবেচিত হবে এবং আল্লাহ’র নিকট তা কোন অবস্থাতেই গ্রহণযোগ্য নয় উপরন্তু মৃত্যু পরবর্তী আখিরাতের অনন্ত অসীম জীবনে সে হবে চরম ক্ষতির সম্মুখীন। এ সম্পর্কে হুশিয়ারী উচ্চারণ করে আল্লাহ ফরমান-
“যে ব্যক্তি ইসলাম ব্যতীত অন্য কোন দ্বীন-জীবন ব্যবস্থা গ্রহণ করতে চায়, তার সে ব্যবস্থা কস্মিণকালেও কবুল করা হবে না এবং আখিরাতে সে হবে ব্যর্থ ও ক্ষতিগ্রস্ত।” (সূরা আলে ইমরান ৩:৮৫)
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা পরিপূর্ণভাবে ইসলামের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাও এবং শয়তানের পদাংক অনুসরণ করো না। নিশ্চিতরূপে সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।” (সূরা আল বাকারাহ ২:২০৮)
সার্বভৌমত্ব ও দ্বীন সম্পর্কে এই মহাসত্য উপলব্ধি করার পরও যে সকল নামধারী আলিম আল্লাহ কে ভয় করার পরিবর্তে মানুষ কে ভয় করে চলে এবং দুনিয়ার জীবনে জান-মালের ক্ষতির আশংকায়, জেল-জুলম, কটুক্তি-অপমান, কষ্ট-যাতনা সহ্য করার ভয়ে মানুষের সার্বভৌমত্ব নামক চরম মিথ্যা এবং মানব রচিত ব্যবস্থার বিরুদ্ধাচরণ করেন না, এ সম্পর্কে জাতির মানুষকে সাবধান-সতর্ক করেন না, উপরন্তু হিকমতের কথা বলে তা জায়েয করার মতো দুঃসাহসী ফতোয়া দেন তাদের উদ্দেশ্যে আল্লাহ্ রাব্বুল আ’লামীন ফরমান-
‘‘মূলতঃ আল্লাহ্ তাঁর কিতাবে যে সমস্ত বিধান অবতীর্ণ করেছেন সেগুলো যারা গোপন করে এবং সামান্য পার্থিব স্বার্থের বেদীমূলে সেগুলো বিসর্জন দেয় তারা আসলে আগুন দিয়ে নিজেদের পেট ভর্তি করছে। কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাদের সাথে কথাই বলবেন না, তাদের পবিত্রতার ঘোষণাও দেবেন না এবং তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।” (সূরা আল বাকারাহ ২:১৭৪)
তো চলুন এবার “আল্লাহ্’র একক সার্বভৌমত্ব ও দ্বীন প্রতিষ্ঠার দাওয়াত : ঈমানদারদের দায়িত্ব ও কর্তব্য” এ বিষয়ে মূল আলোচনা শুরু করা যাক।
আল কুরআনে আল্লাহ্ পাক ফরমান-
“আর তোমরা আল্লাহর পথে চূড়ান্ত প্রচেষ্টা (জিহাদ) করো যেমন প্রচেষ্টা করলে তার হক্ব আদায় হয়। তিনি নিজের কাজের জন্য তোমাদেরকে বাছাই করে নিয়েছেন এবং দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের ওপর কোনো কঠোরতা আরোপ করেননি। তোমাদের পিতা ইবরাহীমের মিল্লাতের ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাও। তিনিই (আল্লাহ) তোমাদের নাম রেখেছেন “মুসলিম” পূর্বেও এবং (এই কুরআন) এর মধ্যেও; যাতে রাসূল তোমাদের জন্য সাক্ষ্যদাতা হন এবং তোমরা সাক্ষ্যদাতা হও মানব জাতির জন্য। সুতরাং তোমরা সালাত কায়েম করো, যাকাত দাও এবং আল্লাহ’কে দৃঢ়ভাবে ধারণ কর। তিনিই তোমাদের অভিভাবক, কত উত্তম অভিভাবক তিনি, কত উত্তম সাহায্যকারী তিনি!” (সূরা হাজ্জ ২২:৭৮)
আয়াতে কারীমার ভাষ্য অনুযায়ী মুসলিম এক উচ্চ মর্যাদাশীল জাতির নাম, যাদেরকে স্বয়ং আল্লাহ্ রাব্বুল আ’লামীন নামকরণ করেছেন এবং তাঁর নিজের কাজের জন্য বাছাই করে নিয়েছেন। আল্লাহ্ তা’আলা অন্য সকল জাতির উপর মুসলিমদের শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখার জন্য পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম সংবিধান আল কুরআন নাযিল করেছেন। আল্লাহ্ তা’আলা মুসলিমদেরকে আরও দান করেছেন ইসলাম নামক একমাত্র পরিপূর্ণ দ্বীন-জীবন ব্যবস্থা যাতে অন্য কোন দ্বীন হতে মুসলিমদের আদৌ কোন কিছু গ্রহণ করার প্রয়োজন না হয়। আল্লাহ্ তা’আলা মুসলিমদেরকে ঐক্যবদ্ধ থাকার জন্য ক্বিবলা হিসেবে নির্ধারণ করেছেন তাঁর প্রিয় ঘর কা’বা কে। আর আল্লাহর রাসূল হযরত মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর উম্মত কে ঐক্যবদ্ধ রাখার জন্য আযানের ন্যায় একটি উত্তম যিকির নির্বাচন করেছেন, যার মাধ্যমে মুসলিমগণ দিনে কমপক্ষে পাঁচ বার আল্লাহর বড়ত্ব, শ্রেষ্ঠত্ব ও সার্বভৌমত্ব ঘোষণা করে। সুতরাং যারা নিজেদেরকে ঈমানদার মুসলিম দাবী করেন তারা অবশ্যই আল্লাহ্’র কাজ করবেন। আর আল্লাহ্ তাঁর যে সকল কাজের জন্য ঈমানদারদেরকে মনোনীত করেছেন সে সম্পর্কে ফরমান-
“আর যেন তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল হয়, যারা কল্যাণের প্রতি আহবান করবে, ভাল কাজের আদেশ দেবে এবং মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করবে। আর তারাই সফলকাম।” (সূরা আলে ইমরান ৩:১০৪)
মহান আল্লাহ অন্যত্র আরও ফরমান-
“হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহ্’র সাহায্যকারী হয়ে যাও, যেমন ঈসা ইবনে-মরিয়ম তার শিষ্যবর্গকে বলেছিল, আল্লাহর পথে কে আমার সাহায্যকারী হবে? হাওয়ারীগণ (শিষ্যবর্গ) বলেছিল: আমরা আল্লাহ্’র পথে সাহায্যকারী। অতঃপর বনী-ইসরাঈলের একদল বিশ্বাস স্থাপন করল এবং একদল কাফের হয়ে গেল। যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছিল, আমি তাদেরকে তাদের শত্র“দের মোকাবেলায় শক্তি যোগালাম, ফলে তারা বিজয়ী হল।” (সূরা আস সাফ্ফ ৬১:১৪)
“তোমরাই শ্রেষ্ঠ জাতি, মানবজাতির (কল্যাণের) জন্য তোমাদের আবির্ভাব হয়েছে। তোমরা ন্যায় কাজে আদেশ এবং অন্যায় কাজে নিষেধ কর এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনো।” (সূরা আলে ইমরান ৩:১১০)
“তিনি তোমাদের জন্য দ্বীনের সেই সব নিয়ম-কানুন নির্ধারিত করেছেন যার নির্দেশ তিনি নূহকে দিয়েছিলেন এবং (হে মুহাম্মাদ) আর যা আমি আপনার কাছে ওহীর মাধ্যমে পাঠিয়েছি এবং যার নির্দেশ দিয়েছিলাম ইবরাহীম, মূসা এবং ঈসাকে, এ বলে যে, তোমরা দ্বীন প্রতিষ্ঠা কর এবং এ ব্যাপারে পর¯পর দলাদলি-বিচ্ছিন্নতা করো না। (হে মুহাম্মাদ) এই কথাটিই এসব মুশরিকের কাছে অত্যন্ত অপছন্দনীয় যার দিকে আপনি তাদেরকে আহবান জানাচ্ছেন। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা আপন করে নেন এবং তিনি তাদেরকেই নিজের কাছে আসার পথ দেখান যারা তাঁর প্রতি রুজু করে।” (সূরা শুরা ৪২:১৩)
আয়াতে কারীমাসমূহে আমরা দেখতে পাচ্ছি, আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার দাওয়াত দেওয়া, আল্লাহ্’র পথে সাহায্য করা, মানুষকে কল্যাণের পথে ডাকা, সৎ কাজের আদেশ দেয়া, অসৎ কাজের নিষেধ করা, নসিহত করা প্রভৃতি কাজই আল্লাহ পাকের নির্দেশিত কাজ। আর ঈমানদারগণ এই কাজ সমূহ সম্পাদন করবে ঐক্যবদ্ধ থেকে, কারণ এ ক্ষেত্রে পরস্পর বিবাদ, মতভেদ, দলাদলি-বিচ্ছিন্নতা করাকে আল্লাহ হারাম (নিষিদ্ধ) করে দিয়েছেন। আল্লাহ পাক ফরমান-
“আর আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করো এবং নিজেরা পরস্পর বিবাদে লিপ্ত হইও না। যদি তা কর, তবে তোমদের মধ্যে দুর্বলতা দেখা দিবে এবং তোমাদের প্রতিপত্তির দিন শেষ হয়ে যাবে। আর তোমরা ধৈর্য্যধারণ কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্য্যশীলদের সাথে রয়েছেন।” (সূরা আনফাল ৮:৪৬)
“সবাই তাঁর অভিমুখী হও এবং তাঁকে ভয় করো, সালাত কায়েম করো এবং এমন মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না, যারা নিজেদের দ্বীনে বিভেদ সৃষ্টি করেছে আর বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। প্রত্যেক দলই নিজ নিজ মতবাদ নিয়ে মশগুল হয়ে আছে।” (সূরা রুম ৩০:৩১,৩২)
“অবশ্যি তোমার রব্ব চাইলে সমগ্র মানব জাতিকে একই গোষ্ঠীভুক্ত করতে পারতেন, আর তারা বিভিন্ন ভাগে বিভক্ত হতো না। তোমার রব্ব যাদের উপর অনুগ্রহ করেছেন, তারা ব্যতীত সবাই চিরদিন মতভেদ করতেই থাকবে এবং এ জন্যই তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন। আর তোমার রব্বের কথাই পূর্ণ হয়ে গেছে যা তিনি বলেছিলেন- অবশ্যই আমি জাহান্নামকে জ্বিন ও মানুষ উভয়কে দিয়ে ভর্তি করব।” (সূরা হুদ ১১:১১৯)
তাহলে দেখা যাচ্ছে ঈমানদাররা পরস্পর কখনো এমন মতভেদ, দলাদলি, বা বিচ্ছিন্নতা করবে না যা তাদের একতাকে বিনষ্ট করে, ঐক্যবদ্ধ শক্তিকে দুর্বল, নিঃশেষ করে দেয়। তাদের মধ্যে ভাতৃত্বের বন্ধন যতো সুদৃঢ় হবে, দ্বীন কায়েমের পথ ততটাই সহজ, মসৃণ হবে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ ফরমান-
“হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় করো, যেমন ভয় করা উচিৎ। এবং অবশ্যই মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না। আর তোমরা সকলে আল্লাহ্’র রজ্জুকে সুদৃঢ় হস্তে ধারণ কর; পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না।” (সূরা আলে ইমরান ৩:১০২-১০৩)
আয়াতটিতে আল্লাহর রজ্জু বলতে তাঁর দ্বীনকে বুঝানো হয়েছে। আল্লাহর দ্বীনকে রজ্জুর সাথে তুলনা করার কারণ হচ্ছে, এই দ্বীন যারা গ্রহণ করে, দ্বীন তাদেরকে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক জুড়ে দেয় এবং সমস্ত দ্বীন গ্রহণকারীদেরকে পরস্পরের সাথে মিলিয়ে এক জামায়াত বদ্ধ করে। এতে দ্বীনের ভিত্তি মজবুত হয়। দ্বীন কায়েমের রাস্তায় চলা সহজ হয়। আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার দাওয়াত দেওয়া যে কতটা মর্যাদাপূর্ণ কাজ, সে সম্পর্কে আল্লাহ তা’আলা ফরমান-
“সেই ব্যক্তির কথা অপেক্ষা উত্তম কথা আর কার হতে পারে, যে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দেয়, সৎকর্ম করে এবং ঘোষণা করে- আমি একজন মুসলিম।” (সূরা হা-মীম আস সাজদাহ ৪১:৩৩)
সুতরাং, এ কথাও স্পষ্ট হয়ে গেল যে, দুনিয়ার মানুষকে এক আল্লাহ’র সার্বভৌমত্বের অধীনে ফিরে আসার দাওয়াত দেওয়াই হল একজন মুসলিমের জন্য সবচেয়ে উত্তম কাজ এবং তার জীবনের সর্বোত্তম মিশন।
আল্লাহ পথভ্রষ্ট মানব জাতিকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে আসার জন্যে যুগে যুগে নাবী ও রাসূল পাঠিয়েছেন। এ সম্পর্কে আল্লাহ পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেছেন-
“তিনিই সেই সত্তা যিনি তাঁর রাসূলকে প্রেরণ করেছেন সত্য পথ ও সত্য দ্বীন সহকারে যাতে তিনি একে সকল দ্বীনের উপর বিজয়ী করতে পারেন, যদিও মুশরিকরা তা অপছন্দ করে।” (সূরা আত-তাওবাহ ৯:৩৩, আস সাফ্ফ ৬১:৯)
অর্থাৎ আল্লাহ যুগে যুগে নাবী ও রাসূল পাঠিয়েছেন তাঁর দ্বীনকে সকল বাতিল দ্বীনের বিপরীতে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য কিন্তু বাতিলপন্থীরা, র্শিককারীরা তা পছন্দ করেনি। অনুরূপভাবে নাবী ও রাসূলগণের অনুপস্থিতিতে তাঁদের দাওয়াতের ধারাবাহিকতায় আজকে যখন আল্লাহর মনোনীত একমাত্র দ্বীন ইসলামকে একটি রাজনৈতিক তথা সমাজ ও রাস্ট্র পরিচালনার ব্যবস্থা হিসেবে উম্মাহর সম্মুখে উপস্থাপন করা হয় এবং আল্লাহকেই একমাত্র রব্ব মেনে একমাত্র তাঁরই সার্বভৌমত্ত্ব প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয় তখনও একটি বিশেষ শ্রেণী-গোষ্ঠী দাওয়াতদাতাদের বিরোধীতা সহ তাদের উপর দমন-নিপীড়ন-নির্যাতন শুরু করে দেয়। এই বিশেষ শ্রেণী-গোষ্ঠীর লোক কারা এবং কেন, কিভাবে তারা এক আল্লাহর সার্বভৌমত্ত্ব প্রতিষ্ঠার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে তা কুরআন স্পষ্টভাবে আমাদেরকে জানিয়ে দিয়েছে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ ফরমান-
“কখনো এমন ঘটেনি যে, কোনো জনপদে আমরা একজন সতর্ককারী পাঠিয়েছি আর সেই জনপদের সমৃদ্ধশালী লোকেরা একথা বলেনি যে, তোমরা যে পয়গাম নিয়ে এসেছো আমরা তা মানি না।” (সূরা সাবা ৩৪:৩৪)
(বিস্তারিত জানতে সূরা আরাফ ৭:৬০,৬৬,৭৫,৮৮,৯০, সূরা বনি-ইসরাইল ১৭:১৬, সূরা আল-মু’মিনুন ২৩:২৪,৩৩-৩৮,৪৬,৪৭, সূরা যুখরুফ ৪৩:২৩, সূরা হুদ ১১:২৫-৩৪ ইত্যাদি)
যেমন আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীন নাবী মূসা (আলাইহিস সালাম)কে মিশরের শাসক ফিরাউনের নিকট পাঠিয়ে ছিলেন যা কুরআন বর্ণনা করেছে এভাবে-
(আল্লাহ নির্দেশ দিলেন, হে মূসা! তুমি) “ফিরাউনের কাছে যাও, সে তাগুত হয়ে গেছে। তাকে জিজ্ঞেস করো, তুমি কি পবিত্রতা অবলম্বন করতে ইচ্ছুক? এবং আমি কি তোমাকে তোমার রব্ব-এর দিকে পথ দেখাবো, যেন (এর ফলে) তুমি তাঁকে ভয় করতে থাকো?” (সূরা নাযিয়াত ৭৯:১৭-১৯)
“এখন তুমি ফিরাউনের নিকট যাও। সে তাগুত হয়ে গেছে।” (সূরা ত্ব-হা ২০:২৪)
“(হে মূসা ও হারুন!) তোমরা উভয়ে ফিরাউনের কাছে যাও সে তাগুত হয়ে গেছে।” (সূরা ত্ব-হা ২০:৪৩)
আমরা দেখতে পাচ্ছি আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীন মিশরের শাসক ফিরাউনের নিকট তাঁর নাবী মূসা (আলাইহিস সালাম)কে পাঠানোর প্রধান কারণ হচ্ছে ফিরাউন তাগুত হয়ে গিয়েছিল অর্থাৎ সে আল্লাহ পাক কর্তৃক নির্ধারিত শরীয়তের সীমা লংঘন করেছিলো। অতঃপর আল্লাহ পাকের নির্দেশে মূসা (আলাইহিস সালাম) তাওহীদের দাওয়াত নিয়ে ফিরাউনের নিকট গেলেন যার বর্ণনা কুরআনে এসেছে এভাবে-
“মূসা বললো, হে ফিরাউন! আমি বিশ্বজাহানের রব্বের নিকট থেকে প্রেরীত রাসূল। আমার দায়িত্বই হচ্ছে, আল্লাহর নামে সত্য ছাড়া আর কিছুই বলবো না। আমি তোমাদের রব্বের পক্ষ থেকে নিযুক্তির সুস্পষ্ট প্রমাণসহ এসেছি। কাজেই তুমি বনী ইসরাঈলকে আমার সাথে পাঠিয়ে দাও।” (সূরা আরাফ ৭:১০৪-১০৫)
“তারপর মূসা ও হারুনকে আমি তাঁদের (পূর্ববর্তী নবীগণের) পরে আমার নিদর্শনসহ ফিরাউন ও তার সরদারদের কাছে পাঠাই। কিন্তু তারা নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের অহংকারে মত্ত হয় এবং তারা ছিল অপরাধী সম্প্রদায়।” (সূরা ইউনূস ১০:৭৫)
“অতঃপর আমি মূসা ও তার ভাই হারুনকে আমার নিদর্শনাবলী (মু’জিজা) ও সুস্পষ্ট প্রমাণ সহকারে ফিরাউন ও তার রাজ পরিষদদের কাছে পাঠালাম। কিন্তু তারা অহংকার করলো এবং তারা ছিল বড়ই আস্ফালনকারী।” (সূরা মু’মিনুন ২৩:৪৫-৪৬)
আয়াতসমূহ বলছে, আল্লাহ পাকের পক্ষ থেকে আদিষ্ট হয়ে মূসা (আলাইহিস সালাম) যখন ফিরাউনের নিকট আল্লাহকেই একমাত্র রব্ব-সার্বভৌম আইনদাতা-বিধানদাতা ও নিরংকুশ কর্তা হিসেবে মেনে নেয়ার দাওয়াত দিলেন তখন ফিরাউন তা প্রত্যাখ্যান করলো আর নিজ অহমিকা বজায় রাখার জন্য মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর সাথে অহেতুক তর্কে লিপ্ত হলো। যা কুরআনের সূরা আশ্-শুয়ারা’র ২৩-২৯নং আয়াতে বর্ণিত হয়েছে এভাবে-
-ফিরাউন জিজ্ঞেস করলো: “এই রাব্বুল আলামীন (বিশ্ব-জাহানের রব্ব) আবার কে?”
-মূসা জবাব দিল, “তিনি আসমান ও জমিনের রব্ব আর সে সব জিনিসেরও তিনি রব্ব, যা কিছু আসমান ও জমিনের মধ্যে রয়েছে, যদি তোমরা নিশ্চিত বিশ্বাস স্থাপনকারী হও।”
-ফিরাউন তার আশপাশের লোকদেরকে বললো, “তোমরা শুনছো তো?!”
-মূসা বললো, “তিনি তোমাদের রব্ব এবং তোমাদের সে বাপ-দাদাদেরও রব্ব যারা চলে গিয়েছে।”
-ফিরাউন (উপস্থিত লোকদেরকে) বললো, “তোমাদের নিকট প্রেরিত তোমাদের এ রাসূল সাহেবটি তো দেখছি বদ্ধ পাগল।”
-মূসা বললো, “পূর্ব ও পশ্চিম আর যা কিছু এ দু’য়ের মধ্যে রয়েছে সব কিছুরই রব্ব তিনি, যদি তোমাদের কোন জ্ঞান-বুদ্ধি থেকে থাকে।”
-ফিরাউন বললো, “যদি তুমি আমাকে ছাড়া অন্য কাউকে ইলাহ হিসেবে মেনে নাও, তবে আমি অবশ্যই তোমাকে কারাগারে নিক্ষেপ করবো।”
ফিরাঊন মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর সাথে বিতর্কে টিকতে না পেরে তার পূর্বের দাবী থেকে কিছুটা সরে আসলো এবং চতুরতার আশ্রয় নিয়ে নিজ সভাসদ ও দেশবাসীর উদ্দেশ্যে এক ভাষণ দিলো। কুরআনের ভাষায়-
“সে (দেশবাসী) সকলকে সমবেত করলো এবং ভাষণ দিলো, অতঃপর সে বললো, আমিই তোমাদের সবচেয়ে বড় রব্ব।” (সূরা নাযিয়াত ৭৯:২৩-২৪)
ফিরাউন আরও বললো-
“ফিরাউন বলল, হে পরিষদবর্গ! আমি ছাড়া তোমাদের অন্য কোন ইলাহ আছে বলে আমার জানা নাই।” (সূরা কাসাস ২৮:৩৮)
এবার মূসা (আলাইহিস সালাম) ফিরাঊনের ইলাহ দাবীর প্রতি বিভ্রান্ত জাতির লোকদের উদ্দেশ্যে বললেন-
“এরপর মূসা বললো- আমি কি আল্লাহকে বাদ দিয়ে তোমাদের জন্য অন্য কোন ইলাহ-দাসত্ব, আইনের আনুগত্য ও উপাসনা পাওয়ার অধিকারী স্বত্ত্বা খুঁজবো? অথচ তিনি আল্লাহই, যিনি তোমাদেরকে সারা দুনিয়ার সমস্ত জাতি গোষ্ঠির ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন।” (সূরা আরাফ ৭:১৪০)
কিন্তু এতো নসিহতের পরও ফিরাউন ও তার সভাসদরা মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর “আল্লাহই একমাত্র রব্ব-সার্বভৌম আইনদাতা-বিধানদাতা ও নিরংকুশ কর্তা ও আল্লাহই একমাত্র ইলাহ-দাসত্ব, আইনের আনুগত্য ও উপাসনা পাওয়ার অধিকারী স্বত্ত্বা” এ হক্বের দাওয়াত কবুল করেনি। উপরন্তু ফিরাউন মূসা (আলাইহিস সালাম)-কে তাঁর অনুসারীগণ সহ হত্যা করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল যা কুরআনে বর্ণিত হয়েছে এভাবে-
“একদিন ফিরাউন তার সভাসদদের বললো, আমাকে ছাড়ো, আমি মূসাকে হত্যা করবো। ডাকুক সে তার রব্বকে! আমার আশংকা হয়, সে তোমাদের আইন ও রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে বদলে দেবে কিংবা দেশে বিপর্যয় সৃষ্টি করবে। মূসা বললো, যেসব অহংকারী বিচার দিনের প্রতি ঈমান রাখে না, তাদের প্রত্যেকের মুকাবিলায় আমি আমার ও তোমাদের রব্বের আশ্রয় গ্রহণ করেছি। এই সময় ফেরাঊনের দরবারের এক মু’মিন ব্যক্তি- যে তার ঈমান গোপন রেখেছিলো- বলে উঠলো, তোমরা কি একজন ব্যক্তিকে শুধু এ কারণে হত্যা করবে যে, সে বলে- রাব্বিআল্লাহ (আল্লাহই আমার একমাত্র রব্ব)? অথচ সে তোমাদের রব্বের পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে সুস্পষ্ট দলীল-প্রমাণাদি নিয়ে আগমন করেছে? যদি সে মিথ্যাবাদী হয়, তবে তার মিথ্যাবাদিতার দায়-দায়িত্ব তার উপরই বর্তাবে, আর যদি সে সত্যবাদী হয়, তবে সে যেসব ভয়ানক শাস্তির কথা বলছে, তার কিছু না কিছু তো অবশ্যই তোমাদের উপর আপতিত হবে। নিশ্চয় আল্লাহ সীমালংঘনকারী ও মিথ্যাবাদীকে হিদায়াত দান করেন না।” (সূরা গাফির/মু’মিন ৪০:২৬-২৮)
উল্লিখিত আয়াতসমূহ হতে আমরা স্পষ্ট জানতে পারলাম, হযরত মূসা (আলাইহিস সালাম) আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কর্তৃক আদিষ্ট হয়ে ফিরাউনের নিকট আল্লাহ্’র হিদায়াত বাণী পৌঁছানোর পর ফিরাউন ও মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর মধ্যে কী কথপোকথন হয়েছিল। আয়াতসমূহ হতে এ বিষয়টিও স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে যে, আজকের নামধারী জন্মসূত্রে মুসলিম দাবীদারদের মতো প্রাচীন যুগেও “রব্ব” ও “ইলাহ” শব্দদ্বয়ের ধারণা কেবলমাত্র কিছু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান এবং অতিপ্রাকৃতিক বিষয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। অর্থাৎ পূজা-অর্চণা, সালাত-সিয়াম-হজ্জ-যাকাত প্রভৃতি উপাসনা লাভের অধিকারী স্বত্ত্বা হিসেবে আল্লাহ ইলাহ আর অতি প্রাকৃতিক প্রাধান্য ও কর্তৃত্বের ক্ষেত্রে যেমন, সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা, রিযিকদাতা, আসমান-যমীনের অধিপতি প্রভৃতি অর্থে আল্লাহ রব্ব এটি মেনে নিতে কম-বেশী সকলেই একমত। কিন্তু আল্লাহর ন্যায় দুনিয়ার জীবনে দৃশ্যমান নয় এমন অদৃশ্য রব্ব ও ইলাহ আইনগত ও রাজনৈতিক দিক দিয়ে প্রাধান্য বিস্তার করবে আর পার্থিব বিষয়াদিতে তাঁর ইচ্ছামত যে কোন হুকুম-বিধান দিবে আর তাঁর সামনে সমাজের ক্ষমতাবান-প্রভাবশালীরা সহ সকল মানুষকে মাথা নত করতে হবে, এ কথা পৃথিবীর মিথ্যা সার্বভৌমত্বের দাবীদার শাসনকর্তা ও তাদের সাঙ্গ-পাঙ্গরা আগেও কখনো মেনে নেয়নি এবং আজো মেনে নিতে প্রস্তুত নয়। তারা সব সময় একথা বলে এসেছে যে, “দুনিয়ার জীবনে চলার ক্ষেত্রে যে কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যাপারে আমরা পূর্ণ স্বাধীন। শুধু আল্লাহ কেন, কোন উপাস্যেরই আমাদের রাজনীতিতে ও আইনে হস্তক্ষেপ করার কোন অধিকার ও সুযোগ নেই।” প্রকৃতপক্ষে এই শির্ক ও কুফরীমূলক বিশ্বাসের শৃংখল হতে মানুষকে মুক্ত করার মিশন নিয়েই সকল নাবী-রাসূলগণ আগমণ করেছিলেন। আর পার্থিব রাষ্ট্র ও সাম্রাজ্যসমূহের শাসকদের সাথে নাবী-রাসূল ও তাঁদের অনুসারী সংস্কারকদের সংঘাতের মূল কারণও ছিলো এটি।
এখন আমাদের সামনে জানার বিষয় হচ্ছে, ফিরাউন তাহলে নিজকে রব্ব ও ইলাহ দাবী করার মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে কী প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিল? আমরা দেখতে পাচ্ছি সূরা নাযিয়াত-এর আয়াতটিতে ফিরাঊন নিজেকে সবচেয়ে বড় রব্ব দাবী করলেও সূরা কাসাস-এর আয়াতে নিজেকে ইলাহ হিসেবে দাবী করেছে। আয়াতে কারীমাসমূহের বিশ্লেষণে যাওয়ার পূর্বে রব্ব ও ইলাহ শব্দদ্বয়ের যে সকল অর্থ পাওয়া যায় তা উল্লেখ করে নিতে চাই। রব্ব শব্দের যে সকল অর্থ পাওয়া যায় তা হলো- সৃষ্টিকর্তা, মালিক, ক্রমোন্নতি বিধায়ক, প্রভু, প্রতিপালক, পালনকর্তা, রক্ষাকর্তা, শৃংখলা বিধানকারী, পূর্ণতাদানকারী, হাশরের ময়দানে একত্রে জমাকারী, সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক, বিবর্তক, বিধানদাতা, নিরংকুশ কর্তা। (দেখুন: তাফসীরে ইবনে কাছীর ১ম খন্ড, সূরা আল ফাতিহা, আল্লামা আশরাফ আলী থানবী (রহমাতুল্লাহি আলাইহি) কৃত মুনাজাতে মকবুল, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ কর্তৃক প্রকাশিত আল কুরআনুল করীম, সূরা আল ফাতিহার টীকা, লিসানুল আরব ৩য় খন্ড, ৫৪৫ পৃষ্ঠা, মিছবাহুল লুগাত ২৭২ পৃষ্ঠা, সূরা আল বাক্বারাহ ২:২১-২২, সূরা মু’মিন ৪০:৬২-৬৮, সূরা আরাফ ৭:৪, সূরা যুমার ৩৯:৫-৬, সূরা ফাতির ৩৬:১১-১৪, সূরা শুয়ারা ২৬:৭৭-৮২ ইত্যাদি)
আর ইলাহ্ শব্দের যে সকল অর্থ পাওয়া যায় তা হলো- দাসত্ব পাওয়ার অধিকারী সত্ত্বা, নিজ আইনের আনুগত্য পাওয়ার অধিকারী সত্ত্বা ও উপাসনা পাওয়ার অধিকারী সত্ত্বা বা উপাস্য। (বিস্তারিত জানতে দেখুন: মা’রিফুল কুরআন, সংক্ষিপ্ত, পৃ.১২৪৪)
সূরা নাযিয়াত-এর আয়াতটিতে ফিরাউন নিজেকে সবচেয়ে বড় রব্ব দাবী করেছে এর মানে এই নয় যে, সে নিজেকে সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা, রক্ষাকর্তা, শৃঙ্খলা বিধানকারী, পূর্ণতাদানকারী, হাশরের ময়দানে একত্রে জমাকারী হিসেবে দাবী করেছে অথবা সে আল্লাহর অস্তিত্ত্বে (Existence of ALLAH) বিশ্বাস করতো না অথবা সে লোকদেরকে আল্লাহ’র অস্তিত্বে বিশ্বাস করতে নিষেধ করেছে। তার দাবী যদি এমন হতো তবে তার অনুগতরাই সর্বপ্রথম তাকে মস্তিষ্ক বিকৃত বলে বিদ্রোহ করতো। আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীন সরাসরি কুরআনের মাধ্যমেই আমাদেরকে স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছেন যে, ফিরাউনের দাবী ছিল সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে সার্বভৌমত্বের দাবী। তাও আবার সারা পৃথিবীতে নয়, তার দাবী ছিল কেবল মিশরের শাসন ক্ষমতার উপর নিরংকুশ আধিপত্যের দাবী। তার দাবী ছিলো মিশরের সাধারণ জনগণের জন্য তার ইচ্ছানুযায়ী যেমন খুশী তেমন আইন-কানুন ও মূল্যবোধ নির্ধারনের ক্ষমতার দাবী। প্রমাণ হিসাবে দেখুন কুরআন কী বলেছে-
“একদিন ফিরাউন তার জাতির উদ্দেশ্যে (এক) ভাষণ দিলো। সে বললো, হে জনগণ! মিশরের সার্বভৌমত্ব (বাদশাহী) কি আমার জন্য নির্দিষ্ট নয়? আর এই নদ-নদীগুলো কি আমার (রাজত্বের) অধীনেই প্রবাহিত হচ্ছে না? তোমরা কি তা দেখতে পাও না?” (সূরা যুখরুফ ৪৩:৫১)
অতএব ফিরাউনের সবচেয়ে বড় রব্ব দাবীর অর্থ হচ্ছে, সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা, রক্ষাকর্তা, রিযিকদাতা, শৃঙ্খলা বিধানকারী, পূর্ণতাদানকারী, হাশরের ময়দানে একত্রে জমাকারী হিসেবে নয়, শুধুমাত্র তার মিশর রাজ্যের সার্বভৌমত্ব, আইন-বিধান ও কর্তৃত্বের মালিক হিসেবে সে রব্ব। আর সার্বভৌমত্ব, আইন-বিধান ও কর্তৃত্বের মালিক হিসেবে রব্ব দাবী করার কারণে কোনটি হালাল, কোনটি হারাম এটি নির্ধারণ করার অধিকারও একমাত্র তার।
সূরা কাসাস-এর আয়াতে ফিরাউন নিজেকে ইলাহ হিসেবে দাবী করেছে। এ দাবীর মাধ্যমে সে কি তাকে পূঁজা-উপাসনা করার জন্য লোকদেরকে আহ্বান করেছিল? না, কুরআন বলছে তার দাবী এমন ছিলো না! বরং সে নিজেও জাহান্নামের ভয়াবহ আযাব থেকে মুক্তি পেয়ে জান্নাত লাভের আশায় বিভিন্ন দেব-দেবীর পূঁজা-পার্বনে অংশ নিতো। কুরআন থেকেই এর প্রমাণ দেখে নিন-
“ফিরাউনের জাতির নেতারা (ফিরাউনকে) বললো, আপনি কি মূসা ও তার লোকজনকে রাজ্যে অশান্তি সৃষ্টির জন্য এমনভাবে খোলা ছেড়ে দিবেন? আর তারা আপনাকে ও আপনার ইলাহ্দের এভাবে বর্জন করে চলবে?” (সূরা আরাফ ৭: ১২৭)।
আয়াতটি সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করছে যে, ফিরাউনেরও অনেক ধরনের ইলাহ্, মা’বুদ বা উপাস্য ছিলো। তাহলে ফিরাউনের ইলাহ দাবী বলতে আসলে কী বুঝায় কিংবা ইলাহ হিসেবে সে কী দাবী করেছিলো? মূলতঃ ফিরাউন যেহেতু ইতিপূর্বে রব্ব দাবীর মাধ্যমে নিজেকে সার্বভৌমত্ব, আইন-বিধান ও নিরংকুশ কর্তৃত্বের মালিক দাবী করেছিল সেহেতু সে দাবীর বাস্তবায়নে তারই দাসত্ব ও আইনের আনুগত্য করার মাধ্যমে তাকে ইলাহ (দাসত্ব ও আইনের আনুগত্য পাওয়ার অধিকারী সত্ত্বা) মানার আহ্বানও সে জাতিকে জানিয়েছিলো। অর্থাৎ সার্বভৌমত্ব, আইন-বিধান ও নিরংকুশ কর্তৃত্ব যার মেনে নেয়া হয় দাসত্ব, আইনের আনুগত্য এবং উপাসনাও তারই হয়। এ থেকে বুঝা গেলো যিনি রব্ব (সার্বভৌমত্ব, আইন-বিধান ও নিরংকুশ কর্তৃত্বের মালিক) তিনি স্বয়ংক্রিয়ভাবেই ইলাহ (দাসত্ব, আইনের আনুগত্য ও উপাসনা পাওয়ার অধিকারী সত্ত্বা)। সুতরাং যিনি রব্ব নন কিংবা রব্ব হওয়ার যোগ্যতা রাখেন না তিনি ইলাহও হতে পারবেন না। কারণ যিনি হুকুম-বিধান দেয়ার সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী নন তার আইন-বিধান হতেই পারে না, আর আইন-বিধানই যেক্ষেত্রে অনুপস্থিত সেখানে তা মানা কিংবা না মানার প্রশ্নতো অবান্তর। সরল ভাষায় যিনি আইন-বিধান প্রণয়নের ক্ষেত্রে, হুকুম প্রদানের ক্ষেত্রে সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী-মালিক তিনিই রব্ব। আর যার সার্বভৌমত্বকে স্বীকৃতি দেয়া হয়, যার আইন-বিধানের আনুগত্য ও দাসত্ব করা হয় তিনিই ইলাহ। তাহলে আমরা এ কথা বলতেই পারি, ‘যিনি রব্ব তিনিই ইলাহ, যিনি রব্ব ইবাদাত-উপাসনাও তারই’। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীন ফরমান-
“তিনিই আল্লাহ, তোমাদের রব্ব, সার্বভৌমত্ব তাঁরই, তিনি ব্যতীত কোন ইলাহ নেই।” (সূরা যুমার ৩৯:৬)
“তিনি আল্লাহ, তোমাদের রব্ব, সকল কিছুর স্রষ্টা, তিনি ব্যতীত কোন ইলাহ নেই। সুতরাং তোমরা কোন দিকে বিভ্রান্ত হচ্ছো ?” (সূরা মু’মিন ৪০:৬২)
“নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার রব্ব এবং তোমাদেরও রব্ব। কাজেই তোমরা তাঁর ইবাদাত কর, এটাই হলো সরল-সঠিক পথ।” (সূরা আলে ইমরান ৩:৫১, সূরা মারইয়াম ১৯:৩৬, সূরা যুখরুফ ৪৩:৬৪)
আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের ইরশাদকৃত উল্লিখিত আয়াত সমূহের মাধ্যমে এ কথা প্রমাণিত হয়ে গেল যে, যিনি রব্ব তিনিই ইলাহ; সকল প্রকার দাসত্ব, আনুগত্য ও উপাসনা তাঁরই জন্য নির্দিষ্ট। অর্থাৎ যিনি রব্ব নন, তিনি ইলাহও নন; কারো দাসত্ব, আনুগত্য ও উপাসনা তার প্রাপ্য নয়।
সুতরাং উপরোক্ত বিশ্লেষণের পরিপ্রেক্ষিতে আমরা বুঝতে পারলাম যে, ফিরাঊন মিশর রাজ্যের সার্বভৌম আইনদাতা-বিধানদাতা ও নিরংকুশ কর্তা হিসেবে তাকে রব্ব এবং তারই দাসত্ব, তারই আইনের আনুগত্য করার মাধ্যমে তাকে ইলাহ মেনে নেয়ার আহ্বান জাতির মানুষকে জানিয়েছিল। এবং তার এ দাবী প্রতিষ্ঠিত করার জন্য জাতির মানুষের উপর বিভিন্ন জুলুম-নির্যাতনও চালিয়েছিল। আর এ আলোচনা থেকে এ কথাও দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট হয়ে গেল যে, উল্লিখিত অর্থে ফিরাউন নিজেকে রব্ব ও ইলাহ দাবী করার কারণেই আল্লাহ পাক ফিরাউনকে তাগুত বলেছিলেন।
আল্লাহ পাক কুরআনে হযরত ইবরাহীম খলীলুল্লাহ (আলাইহিস সালাম) ও ইরাকের তদকালীন বাদশাহ নমরূদের ঘটনা আমাদের সম্মুখে বর্ণনা করেন এভাবে-
“তুমি কি সেই ব্যক্তির অবস্থা সম্পর্কে চিন্তা করোনি, যে ইবরাহীমের সাথে তর্ক করেছিল, তর্ক করেছিল এই কথা নিয়ে যে, ইবরাহীমের রব্ব কে? এবং তর্ক এ জন্য করেছিল যে, আল্লাহ তাকে রাষ্ট্রক্ষমতা দান করেছিলেন। যখন ইবরাহীম বললো- যার হাতে জীবন ও মৃত্যু তিনিই আমার রব্ব। জবাবে সে বললো- জীবন ও মৃত্যু আমার হাতে। ইবরাহীম বললো- তাই যদি সত্য হয়ে থাকে তাহলে, আল্লাহ পূর্ব দিক থেকে সূর্য উদিত করেন, দেখি তুমি তাকে পশ্চিম দিক থেকে উঠাও। একথা শুনে সেই সত্য অস্বীকারকারী হতবুদ্ধি হয়ে গেলো কিন্তু আল্লাহ জালিমদেরকে সঠিক পথ দেখান না।” (সূরা বাকারা ২:২৫৮)
আয়াতে কারীমায় উল্লিখিত সেই ব্যক্তিটি হচ্ছে নমরূদ। হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামের স্বদেশভূমি ইরাকের বাদশাহ ছিল এই নমরূদ। হযরত ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) যখন প্রকাশ্যে শিরকের বিরোধিতা ও তাওহীদের প্রচার শুরু করেন এবং মন্দিরে প্রবেশ করে প্রতিমাগুলো ভেঙে ফেলেন তখন তাঁর বিরুদ্ধে বাদশাহর নিকট অভিযোগ করা হয়। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)কে বাদশাহ নমরূদের দরবারে উপস্থিত করা হলে, ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-এর সাথে বাদশাহ নমরূদের যে বিতর্কালাপ হয় তাই এখানে উল্লেখিত হয়েছে। বিতর্কের বিষয় ছিল ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) কাকে নিজের রব্ব বলে মানেন। আর এ বিতর্কটি সৃষ্টি হবার কারণ ছিল এই যে, বিতর্ককারী ব্যক্তি নমরূদকে আল্লাহ রাষ্ট্র ক্ষমতা দান করেছিলেন।
তাহলে দেখা যাচ্ছে নমরূদ যদি রাষ্ট্র ক্ষমতার অধিকারী না হতো, তবে সে ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) কাকে রব্ব মানে তা নিয়ে তার কোন মাথা ব্যথা বা দুশ্চিন্তা হতো না। এ থেকে ধারণা করা যায় তৎকালীন সময়ে রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিতরা নিজেদেরকে রব্ব মনে করতো। আর জনসাধারণও তাদের শাসকদেরকে রব্ব হিসেবে মান্য করতো। লক্ষ্যণীয় বিষয় হচ্ছে, যারা রাষ্ট্র ক্ষমতার অধিকারী তারা ব্যতীত অন্য কেউ কিন্তু নিজেদেরকে রব্ব দাবী করেনি আর জনসাধারণও তাদের মতো সাধারণ মানুষকে রব্ব হিসেবে মেনে নেয়নি। সাধারণত একটি সমাজ বা রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য তিনটি মৌলিক উপাদান প্রয়োজন হয়: ১.সার্বভৌমত্ব ২.আইন-বিধান ৩.কর্তৃত্ব বা নেতৃত্ব। তাহলে এ বিষয়টি বুঝতে নিশ্চয়ই কারো সমস্যা হওয়ার কথা নয় যে, তৎকালীন একজন রাষ্ট্র প্রধানের হাতে সার্বভৌম ক্ষমতা (The supreme, absolute, uncontrollable power, the absolute right to govern) কুক্ষিগত থাকার কারণে তিনিই মনগড়া আইন-বিধান দিতেন এবং তা বাস্তবায়নের জন্য নিরংকুশ কর্তৃত্ব (Supreme Authority) প্রয়োগ করতেন। মূলতঃ এ কারণেই জনসাধারণ এই রাষ্ট্র প্রধানেকে রব্ব মানতো।
নমরূদ আল্লাহর অস্তিত্ব স্বীকার কিংবা অস্বীকার যা-ই করুক না কেন সে কিন্তু নিজেকে আসমান ও জমীনের সৃষ্টিকর্তা বা পরিচালক বলে দাবী করেনি। সে কিন্তু একথাও বলেনি যে, বিশ্ব-জগতের সমস্ত জাতি-গোষ্ঠীর ওপর তার নিরংকুশ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। বরং তার দাবী ছিল, “আমি এই ইরাক দেশ এবং এর অধিবাসীদের সার্বভৌম মালিক। আমার মুখের কথাই এ দেশের আইন। আমার ওপর আর কারো কর্তৃত্ব নেই। ইরাকের কোন অধিবাসী যদি এসব দিক দিয়ে আমাকে রব্ব হিসেবে মেনে না নেয় কিংবা আমাকে বাদ দিয়ে অন্য কাউকে রব্ব হিসেবে গ্রহণ করে, তবে বিদ্রোহী ও বিশ্বাসঘাতক হিসেবে তাকে ভয়ংকর এক শাস্তির সম্মুখীন করা হবে।”
আয়াতে কারীমায় স্পষ্ট প্রকাশিত হয়েছে যে, ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) ইরাকবাসীর ন্যায় নমরূদকে তাঁর রব্ব মানেন নি। উপরন্তু মহান আল্লাহ পাকই যে তাঁর একমাত্র রব্ব তাও উল্লেখিত হয়েছে। ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-এর নিকট থেকে এমন প্রকাশ্য বিদ্রোহাত্মক ও বিদ্রুপাত্মক জবাব শোনার পর এই তাগুত বাদশাহর নির্দেশে তাঁকে বন্দী করা হয়। দশদিন তিনি কারাগারে অবস্থান করেন। অতঃপর বাদশাহ তার সভাসদদের পরামর্শক্রমে তাকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এবং সিদ্ধান্ত কার্যকর করার উদ্দেশ্যে তাঁকে আগুনে নিক্ষেপও করে। যদিও আল্লাহ পাকের বিশেষ রহমত ও ইচ্ছায় বাদশাহ নমরূদের সেই উদ্দেশ্য কার্যকরী হয়নি।
তাহলে দেখা যাচ্ছে বাদশাহ নমরূদও অন্যান্য তাগুতী শক্তির ন্যায় ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম)-এর র্শিকমুক্ত তাওহীদের দাওয়াত কবুল করেনি বরং মৃত্যুদন্ড দিয়ে তাঁর দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করেছে।
শুধু ইতিহাস নয়, কুরআনের বহু স্থানে এরূপ কথা বলা হয়েছে যে, নাবী ও রাসূলগণের দাওয়াতকে সবার আগে রুখে দাঁড়িয়েছিলো সমাজের সচ্ছল শ্রেণী, অত্যধিক সহায় স¤পদের মালিক, যারা ক্ষমতা ও কর্তৃত্ত্বের অধিকারী ছিল।
আল্লাহর নাবী হযরত নূহ (আলাইহিস সালাম) এর দাওয়াত সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে-
“আমরা নূহকে তার সময়কার লোকদের প্রতি প্রেরণ করেছি। সে বললো- হে আমার সম্প্রদায়ের লোকেরা! তোমরা আল্লাহর ইবাদাত কর, তিনি ছাড়া তোমাদের আর কোন ইলাহ নেই, আমি তোমাদের জন্য একটি ভয়াবহ দিনের আজাবের আশংকা করছি। জবাবে তার সম্প্রদায়ের সরদাররা বললো- আমরা তো দেখছি যে, তুমি সুস্পষ্ট গোমরাহীতে লিপ্ত রয়েছ।” (সুরা আরাফ ৭:৫৯-৬০)
নূহ (আলাইহিস সালাম) তার জাতিকে আল্লাহকে একমাত্র ইলাহ হিসেবে মেনে নেয়ার দাওয়াত দিলে তার জাতির প্রধানেরা তার বিরোধীতা করে এবং তাকে পথভ্রষ্ট বলে দাবী করে। অথচ কুরআনুল কারীমের এ স্থানে ও অন্যান্য স্থানে হযরত নূহ ও তাঁর সম্প্রদায়ের যে অবস্থা বর্ণনা করা হয়েছে তা থেকে একথা সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, এ সম্প্রদায়টি আল্লাহর অস্তিত্ব (Existence of ALLAH) অস্বীকার করতো না, তাঁর সম্পর্কে নিরেট অজ্ঞও ছিল না এবং তাঁর ইবাদাত করতেও তারা অস্বীকার করতো না। তাহলে প্রশ্ন দেখা দেয়, ইলাহ বলতে তারা কী বুঝেছিলো এবং কেন তারা এর বিরোধিতা করেছিল? আল্লাহকে একমাত্র ইলাহ হিসেবে মেনে নিলে তাদের সমস্যাটা কোথায় ছিলো? নূহ (আলাইহিস সালাম)-এর সম্প্রদায় কর্তৃক তাঁর দাওয়াতের বিরোধীতার মূল কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে যা পাওয়া যায় তা হলো- তার সম্প্রদায় জানতো ইলাহ হচ্ছে সেই স্বত্ত্বার নাম যার দাসত্ব, আইনের আনুগত্য ও উপাসনা করা হয়। সুতরাং নূহ (আলাইহিস সালাম)-এর কথামতো আল্লাহকেই যদি একমাত্র ইলাহ হিসেবে মেনে নিতে হয় তবে তো দাসত্ব, আইনের আনুগত্য আর উপাসনাও একমাত্র আল্লাহর মেনে নিতে হবে, ফলশ্র“তিতে সম্প্রদায়ের ক্ষমতাবান সরদার-শাসকগোষ্ঠীর নিজস্ব মনগড়া হুকুম, আইন-বিধান বাস্তবায়নের কোন সুযোগই থাকবে না। তাহলে বুঝা যাচ্ছে, প্রকৃতপক্ষে নূহ (আলাইহিস সালাম)-এর সম্প্রদায় যে গোমরাহীতে লিপ্ত ছিল তা হলো শিরক। অর্থাৎ তারা আল্লাহর সার্বভৌম কর্তৃত্ব সহ তাঁর সত্ত্বা ও গুণাবলীতেও শরীক করতো এবং উপাসনা লাভের অধিকারে গায়রুল্লাহকেও হিস্যাদার মনে করতো। আর এ মৌলিক গোমরাহী থেকেই জাতির মানুষেরা নিজস্ব মনগড়া মা’বুদকে আল্লাহর সার্বভৌম কর্তৃত্বের অংশীদার গণ্য করতো এবং তাদের প্রতিনিধিত্ব করার জন্য জাতির মধ্যে একটি বিশেষ শ্রেণীর জন্ম হয়। এ শ্রেণীটি সমস্ত ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কর্তৃত্বের একচ্ছত্র মালিক হয়ে বসে। জাতির মাঝে শ্রেণী বৈশম্য সৃষ্টি করে তাদেরকে উচ্চ শ্রেণী ও নিম্ন শ্রেণীতে বিভক্ত করে। সমাজ জীবন জুলুম ও বিপর্যয়ে ভরপুর করে তোলে। নৈতিক উচ্ছৃংখলতা, চারিত্রিক নৈরাজ্য ও পাপাচারের মাধ্যমে মানবতার মূলে কুঠারাঘাত করে। এ অবস্থার পরিবর্তন করার জন্যই হযরত নূহ আলাইহিস সালাম জাতির মানুষকে আল্লাহকেই একমাত্র ইলাহ-দাসত্ব, আইনের আনুগত্য ও উপাসনা পাওয়ার সত্ত্বা হিসেবে গ্রহণ করে নেওয়ার মাধ্যমে আল্লাহর সার্বভৌম কর্তৃত্ব সহ তাঁর সত্তা, গুনাবলী ও উপাসনায় শিরক মুক্ত হওয়ার জন্য অত্যন্ত সবর, সহিষ্ণুতা ও বুদ্ধিমত্তার সাথে দীর্ঘকাল দাওয়াতী প্রচেষ্টা ও সংগ্রাম চালান।
আল্লাহর আরেক নাবী হযরত শোয়াইব (আলাইহিস সালাম) এর দাওয়াত সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে-
“আর মাদাইয়ানবাসীর প্রতি আমরা তাদের ভাই শোয়াইবকে পাঠিয়েছি। সে বলল: হে আমার জাতির লোকেরা! তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো, তিনি ছাড়া তোমাদের আর কোন ইলাহ নেই। তোমাদের নিকট তোমাদের রব্বের সুস্পষ্ট দলিল এসে পৌঁছেছে। কাজেই ওজন ও পরিমাপ পূর্ণ মাত্রায় করো, লোকদেরকে তাদের পণ্যদ্রব্যে ক্ষতিগ্রস্ত করে দিওনা এবং জমীনে ফাসাদ সৃষ্টি করো না, যখন এর সংশোধন ও সংস্কার সম্পূর্ণ হয়েছে। এরই মধ্যে রয়েছে তোমাদের কল্যান, যদি তোমরা বাস্তবিকই মু’মিন হয়ে থাকো।” (সূরা আরাফ ৭:৮৫)
আয়াতে কারীমার শেষাংশ দ্বারা স্পষ্ট বুঝা যায় যে মাদাইয়ানবাসী নিজেদেরকে ঈমানদার বলে দাবি করতো। তারা আসলে ছিল গোমরাহ ও বিকৃত বিশ্বাসের মুসলিম। বিশ্বাসগত ও চারিত্রিক বিপর্যয়ে লিপ্ত থাকলেও তারা কেবল ঈমানের দাবীই করতো না বরং এ জন্য তাদের গর্বও ছিল। তাই হযরত শোআইব (আলাইহিস সালাম) বলেন, যদি তোমরা বাস্তবিকই মুমিন হও, তাহলে তোমাদের এ বিশ্বাসও থাকা উচিত যে, সততা ও বিশ্বস্ততার মধ্যেই কল্যাণ নিহিত এবং যেসব দুনিয়া পূজারী লোক আল্লাহ ও আখিরাতকে স্বীকার করে না তোমাদের ভাল-মন্দের মানদণ্ড তাদের থেকে আলাদা হওয়া উচিত। অর্থাৎ তোমাদেরকে এক আল্লাহ’কেই ইলাহ-দাসত্ব, আইনের আনুগত্য ও উপাসনা পাওয়ার সত্ত্বা হিসেবে হিসাবে গ্রহণ করতে হবে, তাঁর উলুহিয়্যাতে কারও অংশ স্থাপন করা যাবে না। এবং আল্লাহকে ইলাহ-দাসত্ব, আইনের আনুগত্য ও উপাসনা পাওয়ার সত্ত্বা হিসেবে মেনে নেয়ার পর তোমাদের সামাজিক-রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক কর্মকান্ড এ বিশ্বাসের আলোকে তার প্রদত্ত শরীয়াহ মোতাবেক হতে হবে, তোমাদের নিজস্ব মনগড়া কোন ব্যবস্থা দ্বারা নয়।
অনুরুপভাবে হযরত হূদ (আলাইহিস সালাম) ও হযরত সালিহ (আলাইহিস সালাম)-কেও বিশ্বজগতের রব্ব-সার্বভৌম আইনদাতা-বিধানদাতা ও নিরংকুশ কর্তৃত্বের মালিক আল্লাহ’কে একমাত্র ইলাহ্-দাসত্ব, আইনের আনুগত্য ও উপাসনা পাওয়ার সত্ত্বা হিসেবে মেনে নেওয়ার দাওয়াত দেওয়ার জন্য আল্লাহ্ তাদের নিজ কওমের মধ্যে পাঠিয়েছিলেন। আল্লাহ ফরমান-
“আর আ’দ (সম্প্র্রদায়)-এর নিকট আমি তাদের ভাই হূদ’কে পাঠালাম। সে বললো: হে আমার স্বজাতীয় ভাইয়েরা! আল্লাহর ইবাদাত করো, তিনি ছাড়া তোমাদের আর কোন ইলাহ-দাসত্ব, আইনের আনুগত্য ও উপাসনা পাওয়ার সত্ত্বা নাই। তোমরা নিছক মিথ্যা উদ্ভাবনকারী।” (সূরা হুদ ১১:৫০)
“আর সামুদ জাতির প্রতি তাদের ভাই সালিহ’কে প্রেরণ করলাম; তিনি বললেন: হে আমার জাতি। আল্লাহর ইবাদাত কর, তিনি ছাড়া তোমাদের কোন ইলাহ-দাসত্ব, আইনের আনুগত্য ও উপাসনা পাওয়ার সত্ত্বা নাই। তিনিই তোমাদেরকে যমীন হতে সৃষ্টি করেছেন, তন্মধ্যে তোমাদেরকে বসতি দান করেছেন। অতএব; তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর অতঃপর তাঁরই দিকে ফিরে এসো। নিশ্চয়ই আমার রব্ব একান্ত নিকটবর্তী, ডাকে সাড়া দানকারী।” (সূরা হুদ ১১:৬১)
আল্লাহ্’র একক সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার দাওয়াতের ধারাবাহিকতায় মানব জাতির মাঝে সর্বশেষ নাবী ও রাসূল হিসেবে আল্লাহ প্রেরণ করলেন মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে। আল্লাহ্’র রাসূল মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ছিলেন সত্য ও ন্যায়ের মূর্ত প্রতীক। ক্ষমা, উদারতা, বদান্যতাসহ যাবতীয় মহৎ গুণের অধিকারী ছিলেন তিনি। রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহ পাকের নির্দেশে যে সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার দাওয়াত নিয়ে এসেছেন, তা মানুষের মধ্যে পৌঁছানোর জন্য তিনি যে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন, দুনিয়াতে এ পরিশ্রমের চেয়ে অধিক মূল্যবান পরিশ্রম আর কিছুই হতে পারে না। এ রাহে তিনি যে ত্যাগ ও কুরবানি পেশ করেছেন এর চেয়ে মূল্যবান ত্যাগ ও কুরবানি আর কোন কিছুই হতে পারে না। আল্লাহ তা’আলা এ দাওয়াতী মিশনে কৃত পরিশ্রম, ত্যাগ ও কুরবানির যে মূল্য ও পুরস্কার নির্ধারণ করেছেন, আর কোন কিছুতেই তিনি এত বেশি মূল্য ও পুরস্কার নির্ধারণ করেননি। মহান আল্লাহ্ পাক তাঁর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’কে সু®পষ্ট সত্য পথ নির্দেশনাসহ প্রেরণ করেছিলেন এমন একটি যুগ সন্ধিক্ষণে, যখন বিশ্ববাসী তাদের বিশ্বাস ও আচরণসহ জীবনের সর্ব ক্ষেত্রে একমাত্র প্রকৃত রব্ব ‘আল্লাহ্’কে ভুলে জাহিলিয়্যাতের গভীর অজ্ঞতা ও পথভ্রষ্টতায় নিমজ্জিত ছিল। পৃথিবীর ইতিহাসে পৃথিবীবাসীগণ এর চেয়ে খারাপ ও অন্ধকারাচ্ছন্ন সময় কখনোই অতিক্রম করেনি। তা সত্ত্বেও তিনি তার ঐকান্তিক প্রচেষ্টা, অক্লান্ত পরিশ্রম ও একমাত্র আল্লাহমুখী আপোষহীন সংগ্রামের মাধ্যমে জাহিলিয়্যাতের এ অন্ধকারকে এক সোনালী আলোয় উদ্ভাসিত করেন।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে সমাজে আল্লাহর নাবী ও রাসূল হিসেবে প্রেরীত হয়েছিলেন সে সমাজের লোকজন অতি প্রাকৃতিক ক্ষেত্রে আল্লাহ্কে রব্ব মানতো এবং এটা সর্বান্তঃকরণে বিশ্বাসও করতো যে, সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা, রিযিকদাতা, আসমান-জমিনের অধিপতি, জীবন-মৃত্যুর মালিক, দৃষ্টিশক্তি-শ্রবণশক্তির মালিক হিসেবে আল্লাহই একমাত্র রব্ব। যেমন আল কুরআনে আল্লাহ বলেছেন-
“জিজ্ঞাসা কর, এই পৃথিবী এবং এর মধ্যে যারা আছে তারা কার? তারা নিশ্চয়ই বলবে আল্লাহর। বলো, তবুও কি তোমরা শিক্ষা গ্রহণ করবে না? জিজ্ঞাসা কর, কে সপ্ত আকাশ এবং মহা আরশের অধিপতি? তারা বলবে আল্লাহ্। বলো, তবুও কি তোমরা ভয় করবে না? জিজ্ঞাসা কর, যদি তোমরা জেনে থাকো সকল কিছুর কর্তৃত্ব কার হাতে? আর কে তিনি যিনি আশ্রয় দান করেন এবং যার উপরে আশ্রয়দাতা নেই? তারা নিশ্চয়ই বলবে এ বিষয়টিতো আল্লাহর জন্যই নির্ধারিত। বলো, তবুও তোমরা বিভ্রান্ত হচ্ছো কোথা থেকে?” (সূরা মু’মিনুন ২৩:৮৪-৮৯)
‘‘তাদেরকে জিজ্ঞেস করো, কে তোমাদের আকাশ ও পৃথিবী থেকে রিযিক দেয়? কে তাদের দৃষ্টি শক্তি এবং শ্রবণ শক্তির মালিক? কে জীবিতকে মৃত আর মৃতকে জীবিত করেন? কে চালাচ্ছে এই বিশ্ব ব্যবস্থাপনা? তারা নিশ্চয়ই বলবে, আল্লাহ্। অতঃপর বলো, তবুও কি তোমরা (সত্যের বিরোধী পথে চলার ব্যাপারে) সতর্ক হচ্ছো না? সেই আল্লাহ্ই তো তোমাদের প্রকৃত রব্ব। কাজেই সত্যের পরে গোমরাহী ও বিভ্রান্তি ছাড়া আর কী বাকি আছে? সুতরাং তোমরা কোনদিকে চালিত হচ্ছো? (সূরা ইউনূছ: ১০:৩১-৩২)
অর্থাৎ কুরআনে আল্লাহ পাক বলছেন, মক্কার কাফির-মুশরিকরা সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা, রিযিকদাতা, আসমান-জমিনের অধিপতি, জীবন-মৃত্যুর মালিক, দৃষ্টিশক্তি-শ্রবণশক্তির মালিক হিসেবে আল্লাহই যে একমাত্র রব্ব একথা মানতো। অথচ এই জাতির মাঝেই সমগ্র মাখলুকের জন্য আল্লাহ তাঁর রাসূল হিসেবে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে প্রেরণ করলেন এবং তাঁকে নির্দেশ দিলেনÑ “হে চাদর গায়ে শয়নকারী! ওঠো! অতঃপর (জাতির মানুষকে) সাবধান-সতর্ক করো এবং তোমার রব্বের শ্রেষ্ঠত্ব (সার্বভৌমত্ব) ঘোষণা কর।” (সূরা আল মুদ্দাস্সির ৭৪:১-৩)।
অর্থাৎ “হে আমার প্রিয় রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম), তুমি চাদর জড়িয়ে শুয়ে আছো কেন! তোমার উপরে তো একটি মহত কাজের গুরুদায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে। এ দায়িত্ব পালন করার জন্য তোমাকে অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে উঠে দাঁড়াতে হবে। অজ্ঞ ও মূর্খ লোকেরা এ পৃথিবীতে যাদের মিথ্যা সার্বভৌম ক্ষমতার দাসত্ব করছে তাদের সবাইকে অস্বীকার করবে এবং গোটা পৃথিবীর সামনে ঈমানদীপ্ত কণ্ঠে একথা ঘোষণা করবে যে, এ বিশ্ব জাহানে একমাত্র আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কোন শ্রেষ্ঠত্ব ও সার্বভৌমত্ব নেই। সুতরাং তুমি আল্লাহর বড়ত্ব, শ্রেষ্ঠত্ব ও সার্বভৌমত্ব ঘোষণার মাধ্যমেই কাজ শুরু করো।” হযরত নূহ আলাইহিস সালামকে নবুওয়াতের পদমর্যাদায় অভিষিক্ত করার সময় আল্লাহ্র পক্ষ থেকে যে ধরনের আদেশ দেয়া হয়েছিল এটাও মূলতঃ সেই ধরনেরই আদেশ। হযরত নূহ আলাইহিস সালামকে আল্লাহ্ বলেছিলেন: “তোমার নিজের কওমের লোকদের ওপর এক ভীষণ কষ্টদায়ক আযাব আসার পূর্বেই তাদের সাবধান করে দাও।” (সূরা নূহ ৭১:১)
এখানে আরো একটি সূক্ষ্ম বিষয় আছে যা ভালভাবে বুঝে নেয়া দরকার। এ আয়াতসমূহের মাধ্যমেই প্রথমবারের মতো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে রিসালাতের বিরাট গুরুদায়িত্ব পালনের জন্য তৎপর হতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। একথা তো স্পষ্ট যে, যে সমাজ ও পরিবেশে তাঁকে এ উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য নিয়ে কাজ করার জন্য তৎপর হওয়ার নির্দেশ দেয়া হচ্ছিল তা ছিল র্শিক ও কুফরের কেন্দ্রভূমি বা লীলাক্ষেত্র। সাধারণ আরবদের ন্যায় সেখানকার অধিবাসীরা যে কেবল মুশরিক ছিল, তা নয়; বরং মক্কা সে সময় গোটা আরবের মুশরিকদের সবচেয়ে বড় তীর্থক্ষেত্রের মর্যাদা লাভ করেছিল। আর কুরাইশরা ছিল তার ঘনিষ্ঠতম প্রতিবেশী, সেবায়ত ও পুরোহিত। এমন একটি জায়গায় কোন ব্যক্তির পক্ষে শিরকের বিরুদ্ধে এককভাবে তাওহীদের পতাকা উত্তোলন করা জীবনের ঝুঁকি গ্রহণ করার শামিল। তাই “ওঠো এবং সাবধান-সতর্ক করো” বলার পরপরই “তোমার রব্বের শ্রেষ্ঠত্ব-সার্বভৌমত্ব ঘোষণা করো” বলার অর্থই হলো যেসব বড় বড় তাগুত তোমার এ দাওয়াতের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে মনে হয়, তাদের মোটেই পরোয়া করো না। বরং স্পষ্ট ভাষায় বলে দাও, যারা আমার এ দাওয়াত ও আন্দোলনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে আমার রব্ব তাদের সবার চেয়ে অনেক বড়। মূলতঃ আল্লাহ্’র বড়ত্ব, শ্রেষ্ঠত্ব ও সার্বভৌমত্বের নকশা যে ব্যক্তির হৃদয়-মনে খোদিত সে আল্লাহর জন্য একাই গোটা দুনিয়ার বিরুদ্ধে লড়াই করতে সামন্যতম দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ও সংকীর্ণতা অনুভব করবে না।
আল্লাহ্’র পক্ষ থেকে নির্দেশ পাওয়ার পর আল্লাহ্’র রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও বিশ্ববাসীর উদ্দেশ্যে দাওয়াত দিলেন- “…তোমরা তোমাদের রব্বের প্রতি ঈমান আনো।” (সূরা আলে ইমরান : ১৯৩ এর অংশ)
অর্থাৎ হে লোক সকল! যে আল্লাহ্কে তোমরা সৃষ্টিকর্তা, রিযিকদাতা, আসমান-জমিনের অধিপতি, জীবন-মৃত্যুর মালিক, দৃষ্টিশক্তি-শ্রবণশক্তির মালিক হিসেবে রব্ব মানছো সেই আল্লাহ্কেই একমাত্র রব্ব-সার্বভৌম আইনদাতা-বিধানদাতা ও নিরংকুশ কর্তা হিসেবে মেনে ঈমান আনো। কারণ একদিকে আল্লাহ্’র অস্তিত্ত্বে বিশ্বাস করা, সৃষ্টিকর্তা, জীবন-মৃত্যুর মালিক, রিযিকদাতা, প্রতিপালক হিসেবে আল্লাহকে রব্ব বিশ্বাস করা অপর দিকে আল্লাহর পরিবর্তে কিংবা আল্লাহর পাশাপাশি নিজকে সার্বভৌম আইনদাতা-বিধানদাতা ও নিরংকুশ কর্তা হিসেবে দাবী করা কিংবা অন্য দাবীদারকে সমর্থন করা হচ্ছে মহান আল্লাহ পাকের রুবুবিয়্যাতে সুস্পষ্ট শিরক। অর্থাৎ বিশ্ব-জাহানের সমস্ত জিনিসের রব্ব-সার্বভৌম আইনদাতা-বিধানদাতা ও নিরংকুশ কর্তা হচ্ছেন আল্লাহ, কাজেই অন্য কেউ কেমন করে সার্বভৌমত্বের মালিক হতে পারে, আইনদাতা-বিধানদাতা হতে পারে? হলে সেও তো রব্ব হয়ে গেল! সৃষ্টিকর্তা, রিযিকদাতা, আসমান-জমিনের অধিপতি, জীবন-মৃত্যুর মালিক, দৃষ্টিশক্তি-শ্রবণশক্তির মালিক প্রভৃতি অতি প্রাকৃতিক ক্ষেত্রে আল্লাহকে রব্ব মানলে আর স্বাধীন জীবনে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় সার্বভৌমত্ব, আইন-বিধান ও কর্তৃত্বের মালিক হিসেবে মানুষকে রব্ব গ্রহণ করলে আল্লাহ্’র রুবুবিয়্যাতে তাওহীদ তো থাকছেই না উপরন্তু রুবুবিয়্যাতে শিরক প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। এ সাধারণ কথাটা কি তোমাদের বুঝে আসছে না? সমস্ত-বিশ্ব-জাহান আল্লাহ্’র সার্বভৌম ব্যবস্থার অধীনে চলছে এবং বিশ্ব-জাহানের একটি অংশ হিসেবে আমাদের নিজের অস্তিত্বও সে ব্যবস্থার অনুসারী। কিন্তু নিজের চেতনাসঞ্জাত ও নিজস্ব ক্ষমতা ইখতিয়ারের আওতাধীন জীবনের জন্য আমরা ভিন্ন রব্বের সন্ধান করবো, এটা কেমন করে যুক্তিসংগত হতে পারে! সুতরাং সমগ্র সৃষ্টি জগতের প্রাকৃতিক ও স্বাভাবিক অবস্থার বিরুদ্ধাচরণ করে তোমরা কতদিন আর বিভ্রান্ত হয়ে ধ্বংসের পথে চলতে থাকবে?
আল্লাহ্’র রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওহী প্রাপ্তির প্রাক্কালে সমাজের যে সকল লোকজন কখনোই তাঁর কোন কাজের বিরোধিতা করেনি, এক আল্লাহর সার্বভৌমত্বের দাওয়াত পাবার পর তারাই সর্বপ্রথম তাঁর বিরুদ্ধাচরনে লেগে গেল। কারণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দাওয়াত ছিল, তাদের পুরনো অভ্যাস, অন্ধানুকরণ ও জাহিলিয়্যাতের রীতিনীতির স¤পূর্ণ পরিপন্থী। ফলে তারা এ দাওয়াতকে অংকুরে গুটিয়ে দেয়ার জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করে। কিন্তু রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সকল প্রকার বিরোধিতা ও ক্ষতির হমকিতে কোন প্রকার কর্ণপাত করেননি, বিচলিত কিংবা দুর্বল হননি। তিনি তাঁর উপর অর্পিত রিসালাতের গুরু দায়িত্ব অত্যন্ত সাহসিকতা ও প্রত্যয়ের সাথে চালিয়ে যেতে থাকেন। কারণ, তিনি-তো আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরীত একজন রাসূল; যদি সারা পৃথিবীও তাঁর বিরোধিতা করে এবং তাকে প্রতিহত করার ঘোষণা দেয়, তাহলেও আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁকে যে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে, তা পালন করাই হল তাঁর একমাত্র কাজ। সারা দুনিয়ার সমগ্র মানুষও যদি একত্র হয়ে তার বিরোধিতা করে, তারপরও কোন ক্রমেই তিনি তা থেকে এক চুল পরিমাণও পিছু হটতে পারেন না।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীনের পক্ষ হতে অনুমতি প্রাপ্ত হয়ে প্রকাশ্যে মানুষকে আল্লাহ্’র সার্বভৌমত্বের দিকে দাওয়াত দিতে থাকেন। ব্যক্তি ও সামগ্রিক পর্যায়ে মানুষকে এক আল্লাহর সার্বভৌমত্বের দিকে বিরামহীনভাবে আহ্বান করতে থাকেন। কোন প্রকার বাধা-বিপত্তি তাঁকে তার দাওয়াত থেকে দমিয়ে কিংবা ফিরিয়ে রাখতে পারেনি। কোন বিরোধিতাকারীর বিরোধিতা, কোন যালিমের যুলুম তাঁর দাওয়াতের চলন্ত মিশনের গতিরোধ কিংবা বিঘ্ন ঘটাতে পারেনি। তাঁকে দাওয়াত হতে বিরত রাখার জন্য কাফিরদের হাজারো চেষ্টা ও কৌশল কোন কাজে আসেনি। কোন মজলিশ হোক কিংবা মাহফিল, সব জায়গায় মানুষকে তিনি এক আল্লাহ্’র সার্বভৌমত্ব মেনে নেওয়ার দাওয়াত দিতে থাকেন। এ ছাড়াও বিভিন্ন মৌসুমে তিনি লোকদেরকে এক আল্লাহর দিকে আহ্বান করতেই থাকেন। বিশেষ করে হজের মৌসুমে যখন লোকেরা বাইতুল্লাহর (কা’বা) উদ্দেশ্যে একত্রিত হতো, তখন তিনি এ সময়টাকে দাওয়াতের জন্য গণীমত মনে করতেন। এ সময়ে যার সাথে দেখা হত, তাকেই তিনি আল্লাহর সার্বভৌমত্বের দিকে আহ্বান করতেন; চাই সে গোলাম হোক বা স্বাধীন, দুর্বল হোক বা সবল, ধনী হোক বা গরীব তার নিকট সবাই সমান; কারো প্রতি তিনি কোন প্রকার বৈষম্য প্রদর্শন করতেন না। তিনি সবাইকে তার দাওয়াতের আওতায় নিয়ে আসতেন এবং আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যেতেন।
আল্লাহর দ্বীনের দাওয়াতের জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রচেষ্টায় কোন প্রকার ঘাটতি ছিল না। তিনি অবিরাম দাওয়াতী মিশন চালিয়ে যান এবং প্রতিদিনই নতুন নতুন কৌশল ও হিকমত অবলম্বন করেন। কিন্তু তাঁর দাওয়াতী মিশনের গতি থামিয়ে দেওয়ার জন্য কাফির-মুশরিকদের শত বিরোধীতা, প্রতিরোধ, জুলুম-নিপীড়ন সত্ত্বেও একটি কথা স্পষ্ট যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দ্বীন প্রতিষ্ঠার পূর্বে কখনোই কাউকে প্রকাশ্যে বা গোপনে হত্যা কিংবা কারো প্রতি প্রতিশোধ নেওয়ার নির্দেশ দেননি। ঈমান-ইসলামের বিরোধিতাকারী হিসেবে সে যত বড় দুশমনই হোক না কেন, তাকে তিনি নিজে বা তার সাহাবীদের কেউ গোপনে হত্যা বা আঘাত করেনি। অথচ তখন গোপনে হত্যা করাটা ছিল সবচেয়ে সহজ কাজ; কেউ ইচ্ছা করলেই তা করতে পারতো। তা সত্ত্বেও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোন কাফির বা ইসলামের দুশমনকে গোপনে হত্যা করে, তার উপর পরিচালিত জুলুম ও নির্যাতনের হাত থেকে রেহাই পেতে চাননি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যদি ইশারা করতেন, তাহলে এ কাজটি করার জন্য জানবাজ সাহাবীর অভাব ছিল না। তিনি সাহাবীদেরকে বড় বড় কাফির-মুশরিক নেতা ও ইসলামের দুশমনদের গোপনে হত্যা করার নির্দেশ দিলে, তারা তা বাস্তবায়ন করে দেখিয়ে দিত। যেমন, ওলীদ ইবনে মুগীরা আল মাখযুমী, আস ইবনে ওয়ায়েল আসসাহমী, আবু জাহেল আমর ইবনে হিশাম, আবু লাহাব, আব্দুল উজ্জা ইবনে আব্দুল মুত্তালেব, নজর ইবনে হারেস, উকবা ইবনে আবু মুয়িত, উবাই ইবনে খলফ ও উমাইয়া ইবনে খলফ প্রমুখরা সবাই ইসলামের ঘোর বিরোধী ও বড় শত্রু ছিল। এরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে অবর্ণনীয় ও সীমাহীন কষ্ট দিত। তারপরও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এদের কাউকে বা এরা ছাড়াও ইসলামের অন্য কোন দুশমনকে গোপনে হত্যা করেননি এবং হত্যার নির্দেশ দেননি। কারণ, দ্বীন প্রতিষ্ঠার পূর্বে এ ধরনের কাজ ইসলামের অগ্রযাত্রার জন্য ক্ষতিকর। আর আল্লাহর পক্ষ হতেও তাঁর নাবীকে এ ধরনের গোপনীয় কোন কিছু করার নির্দেশ দেয়া হয়নি। কারণ, তিনি-তো আহকামুল হাকিমীন- মহা জ্ঞানী ও সর্বজ্ঞ; তিনি যাবতীয় কর্মের বিদারক ও পরিণতি সম্পর্কে সম্যক অবগত। সুতরাং যারা জিহাদের নামে এ ধরনের কাজ করে দ্বীন প্রতিষ্ঠা করবেন বলে ধারণা করছেন তাদের কর্মফল আজ আমরা সমগ্র দুনিয়া ব্যাপী বেশ ভালোভাবেই প্রত্যক্ষ করছি। দ্বীন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক ফলাফল আশা করা, আল্লাহর সাহায্যের প্রতি পরিপূর্ণ নির্ভরশীল না হয়ে বা আত্মসমর্পণ না করে মানুষের নুসরাহ’র (সমর্থণ) প্রতি অতি মাত্রায় ঝুঁকে পড়া কিংবা কুরআন-সুন্নাহ বিবর্জিত ব্যক্তিগত মতাদর্শ অনুসরণ করার কারণে ইসলামের দুশমনরা বিশেষ করে যারা ইসলামকে নির্মূল করতে চায়, তাদের চক্রান্ত-ষড়যন্ত্রের বিপরীতে আমরা মুসলিমরা আজ বড় অসহায় আর হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ছি।
একটি কথা মনে রাখতে হবে, জমিনের উপর ও আসমানের নিচে যত দা‘ঈ আছে, তাদের সবাইকে কিয়ামত পর্যন্ত ঐ পথেরই অনুসরণ করতে হবে, যে পথ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের জন্য তার হিজরতের পূর্বে ও পরে দেখিয়ে গেছেন। সুতরাং, মনে রাখতে হবে, বিশুদ্ধ দাওয়াতের পদ্ধতি হল, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শিক্ষা ও আদর্শকে আঁকড়িয়ে ধরা, তার আখলাক ও চরিত্রের অনুসরণ করা; তিনি যেভাবে দাওয়াতের কাজ করেছেন, সেভাবে দাওয়াতি কাজকে আঞ্জাম দেয়া।
কুরাইশ প্রতিনিধিদের প্রস্তাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অসম্মতি এবং আল্লাহর দ্বীনের দাওয়াতের উপর তার অটুট ও অবিচল নীতি কুরাইশদের হতাশা বৃদ্ধি করে। কুরাইশরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তার দাওয়াতি কার্যক্রম হতে কোন ভাবেই বিরত রাখতে পারছিল না। তাদের জুলুম, নির্যাতন ও নির্মম অত্যাচার কোনটাই কাজে আসতে ছিল না। নিরুপায় হয়ে তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে থামানো ও দমিয়ে রাখার আরেকটি নতুন কৌশল অবলম্বন করল; যে কৌশলের মূল থিম (Theme) হল, তারা রাসূলকে একদিকে প্রলোভন দিবে অপরদিকে ভয় দেখাবে। অর্থাৎ ভয় ও প্রলোভন উভয়টিকে একত্রিত করে তাঁকে প্রভাবিত করতে চেষ্টা করবে। একদিকে তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পার্থিব জগতের যত চাহিদা আছে তার সব কিছুই দিতে প্রস্তুত আর অপরদিকে তাঁর চাচা আবু তালিব-যিনি তাকে দেখা-শোনা ও সাহায্য সহযোগিতা করেন, তাকে সতর্ক করবে, যাতে তিনি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এক আল্লাহর সার্বভৌমত্ব, আইন-বিধান ও নিরংকুশ কর্তৃত্বের দাওয়াত হতে বিরত রাখে। (আল বিদায়া ওয়ান-নিহায়া ৩ খন্ড, মুহাম্মাদ আল গাযালী রহ. এর সীরাত গ্রন্থ পৃ: ১১২)
কৌশল অনুযায়ী কুরাইশ নেতারা আবু তালিবের নিকট উপস্থিত হয়ে বলল, হে আবু তালিব! তুমি বয়সে আমাদের জ্যৈষ্ঠ, আমাদের মধ্যে তোমার যথেষ্ট ইজ্জত ও সম্মান রয়েছে। তুমিতো জানো, আমরা তোমার ভাতিজাকে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব, আইন-বিধান ও নিরংকুশ কর্তৃত্ব ও তাওহীদের দাওয়াত দেয়া হতে বিরত থাকতে বার বার বলছি, কিন্তু সে আমাদের কথায় কোন প্রকার কর্ণপাত করেনি এবং এ দাওয়াত দেয়া হতে বিরত থাকেনি। আমরা আল্লাহর শপথ করে বলছি, আমরা তাঁর এ অবস্থার উপর আর বেশিদিন ধৈর্য্য ধারণ করতে পারছি না। সে আমাদের বাপ-দাদাদের সমালোচনা করে, আমাদের উপাস্যদের উপহাস করে এবং আমাদের চিন্তা-চেতনার উপর কুঠারাঘাত করে। তুমি হয়তো তাকে বিরত রাখবে অন্যথায় তার সাথে ও তোমার সাথে আমরা যুদ্ধে অবতীর্ণ হব; হয় তোমরা ধ্বংস হবে অথবা আমরা ধ্বংস হব।
আবু তালিবের নিকট কুরাইশদের এ ধরনের কঠিন হুমকি, স্বগোত্রীয় লোকদের বিরোধিতা ও তাদের সাথে স¤পর্কের টানা-পোড়ন, একটি দুঃশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়াল। তাই নিরুপায় হয়ে আবু তালিব রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে ডেকে পাঠালেন এবং বললেন, হে ভাতিজা! কুরাইশ গোত্রের লোকেরা আমার নিকট এসেছিল, তারা আমাকে এসব কথা বলেছে, আমি আমার ও তোমার উভয়ের বিষয়ে আশংকা করছি। তুমি আমার উপর এমন কোন দায়িত্ব চাপাবে না, যা বহন করতে আমি বা তুমি অক্ষম। সুতরাং তোমার যে কথা তারা অপছন্দ করে তা বলা হতে তুমি নিজেকে বিরত রাখ!
কুরাইশদের হুমকি-ধমকি ও বিরোধীতার পরিপ্রেক্ষিতে আবু তালিবের এ প্রস্তাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোন প্রকার ভ্রুক্ষেপ না করে তাঁর দাওয়াতের উপর অটল ও অবিচল রইলেন। যারা তাঁর সমালোচনা ও বিরোধিতা করল তাদের বিরোধিতা ও সমালোচনাকে তিনি কোন প্রকার ভয় করলেন না। কারণ, তিনি জানেন, তিনি সত্যের উপর আছেন, আল্লাহ তা’আলা অবশ্যই তার দ্বীনকে বিজয় করবেন এবং তাঁর বাণীকে সমুন্নত রাখবেন।
মুসলিমদের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাওয়া, তাদের প্রকাশ্যে ইসলামের ঘোষণা দেয়া ও মুশরিকদের বিরোধীতার কোন প্রকার তোয়াক্কা না করা, তাদের অন্তরে ভীতির সঞ্চার করল ও রীতিমত তারা আতংকিত হয়ে পড়ল। কোন প্রকার উপায় না দেখে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট কুরাইশরা তাদের নেতাদের আবারো পাঠালেন, যাতে তারা তাকে এমন কিছু পার্থিব বিষয়ে লোভ দেখায়, যেগুলোর প্রতি প্রলুব্ধ হয়ে, সে আল্লাহর দ্বীনের দাওয়াত দেয়া ছেড়ে দেয়। তারা ঠিক করল, যদি মুহাম্মাদ তাদের প্রস্তাবে রাজি হয়, তাহলে তাকে দুনিয়াবি ও পার্থিব জগতের অসংখ্য অগণিত সুযোগ-সুবিধা দেবে। তার যত প্রকার চাহিদা আছে তা সবই তারা পূরণ করবে।
তাদের চিন্তা চেতনা অনুযায়ী একদিন কুরাইশ নেতা উতবা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দরবারে এসে তাঁর নিকট বসল এবং বলল, হে আমার ভাতিজা! তুমি আমাদের মধ্যে কতটুকু আদর ও সম্মানের তা তোমার অজানা নয়, তোমার বংশ মর্যাদার কোন তুলনা হয় না। কিন্তু তুমি গোত্রের লোকদের নিকট এমন একটি বিষয় উপস্থাপন করছ, যা তাদের ঐক্যে ফাটল ধরিয়েছে, চিন্তা চেতনায় আঘাত হানছে, দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্নকে তুমি ভষ্মিভূত করে দিয়েছ। এ ছাড়াও তুমি তাদের রব্ব ও ইলাহকে কটাক্ষ করছো এবং তাদের বাপ-দাদাদের রীতিনীতিকে অস্বীকার করছো। তাই তাদের পক্ষ থেকে আমি তোমার নিকট কিছু প্রস্তাব নিয়ে এসেছি তুমি মনোযোগ দিয়ে শোন এবং গভীরভাবে চিন্তা করে দেখ, হয়তো বিষয়গুলো তোমার নিকট ভালো লাগবে এবং তুমি তার কিছু হলেও গ্রহণ করবে। তার কথা শুনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে আবুল ওয়ালিদ! তুমি তোমার কথা বল, আমি তোমার কথা শুনবো! তখন সে বলল, হে ভাতিজা! যদি তোমার এ দাওয়াতের দ্বারা ধন-সম্পদ উপার্জন করা উদ্দেশ্য হয়ে থাকে, তাহলে তুমি বল, আমরা তোমার চাহিদা অনুযায়ী ধন-সম্পদ তোমার জন্য একত্র করব। ফলে তুমি আমাদের মধ্যে সবচেয়ে অধিক সম্পদের অধিকারী হবে। আর যদি তুমি আমাদের নেতৃত্ব দিতে চাও, তাহলে আমরা তোমাকে আমাদের নেতা নির্বাচিত করব এবং আমরা তোমাদের নেতৃত্বকে মেনে নেব। আমরা তোমার সিদ্ধান্ত ছাড়া কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করব না। তুমি আমাদের যখন যা করতে বল, আমরা তাই করব এবং তোমার অনুগত হয়ে চলব। আর যদি তুমি আমাদের রাজত্ব চাও, তাতেও আমরা রাজি। আমরা তোমাকে আমাদের রাজা বানিয়ে দেব। আর তুমি যা করছ ও বলছ, তা যদি কোন রোগের কারণে হয়, তবে আমরা তোমার জন্য ভাল কবিরাজ বা ডাক্তারের সন্ধান করব এবং তোমার যত ধরনের চিকিৎসা প্রয়োজন তার সবই আমরা করব। তোমার চিকিৎসার জন্য যত টাকা প্রয়োজন আমরা খরচ করব। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উতবার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনেন। তারপর যখন উতবা তার কথা শেষ করল, তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে আবুল ওয়ালিদ! তুমি কি তোমার কথা শেষ করেছ? বলল, হ্যাঁ। তাহলে এবার তুমি আমার থেকে কিছু কথা মনোযোগ দিয়ে শোন। আমি কোন রাজত্ব চাই না, ধন-সম্পদ চাই না এবং ইজ্জত সম্মান লাভের প্রতি আমার কোন অভিলাষ নাই। আল্লাহ তা’আলা আমাকে এগুলো সবই দিয়েছেন; যার ফলে আমি ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার পচা-গন্ধ জিনিষের প্রতি হাত বাড়ানো থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র। কারণ, আমি আমার মহান রব্ব আল্লাহর পক্ষ থেকে দেয়া দায়িত্ব পালনে একনিষ্ঠ। (আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া ৩য় খন্ড ইত্যাদি)
এক আল্লাহর দ্বীন, এক আল্লাহর সার্বভৌমত্বের দাওয়াত হতে সরে আসার জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’কে যখন কাফির, মুশরিকদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন ধরনের প্রস্তাব দেয়া হচ্ছিল তখন মহান আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীনও ঐ সকল প্রস্তাবের জবাবে তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উদ্দেশ্যে ফরমান-
“(হে মুহাম্মাদ!) বলো, আমার রব্ব নিশ্চিতভাবেই আমাকে সোজা পথ দেখিয়ে দিয়েছেন! একদম সঠিক নির্ভুল দ্বীন, যার মধ্যে কোন বত্র“তা নেই, ইবরাহীমের পদ্ধতি, যাকে সে ঐকান্তিক নিষ্ঠার সাথে গ্রহণ করেছিল এবং সে মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিল না। বলো, আমার সালাত, আমার ইবাদাতের সমস্ত অনুষ্ঠান, আমার জীবন ও আমার মরণ সব কিছু সারা জাহানের রব্ব আল্লাহর জন্য, যাঁর কোন শরীক নেই। আমি এর জন্যই আদিষ্ট হয়েছি এবং আত্মসমর্পণকারীদের মধ্যে আমিই হলাম সর্বপ্রথম। (হে মুহাম্মাদ!) তুমি জিজ্ঞেস করো, আমি কি আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্য কোন রব্বের সন্ধান করবো? অথচ তিনিই হচ্ছেন সকল কিছুর মালিক? প্রত্যেক ব্যক্তিই স্বীয় কৃতকর্মের জন্য দায়ী হবে, কেউ কারো বোঝা বহন করবে না, পরিশেষে তোমাদের সবাইকে তোমাদের রব্বের নিকট প্রত্যাবর্তন করতে হবে। সে সময় তোমারা যে বিষয়ে মতবিরোধ করেছিলে তার প্রকৃত স্বরূপ তিনি তোমাদের সামনে উন্মুক্ত করে দেবেন। তিনিই তোমাদেরকে দুনিয়ার প্রতিনিধি করেছেন এবং যা কিছু তোমাদের দিয়েছেন তাতে তোমাদের পরীক্ষার উদ্দেশ্যে তোমাদের কাউকে অন্যের ওপর অধিক মর্যাদা দান করেছেন। নিঃসন্দেহে তোমার রব্ব শাস্তি দেবার ব্যাপারে অতি তৎপর এবং তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল ও করুণাময়।” (সূরা আন’আম ৬:১৬১-১৬৫)
আল্লাহ আরও ফরমান-
“এবং যাদেরকে আমি গ্রন্থ দিয়েছি, তারা আপনার প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে, তজ্জন্যে আনন্দিত হয় এবং কোন কোন দল এর কোন কোন অংশ অস্বীকার করে। বলুন, আমিতো আল্লাহরই ইবাদাত করতে এবং তাঁর সাথে কোন শরীক না করতে আদিষ্ট হয়েছি। আমি তাঁর দিকেই দাওয়াত দেই এবং তাঁর কাছেই আমার প্রত্যাবর্তন।” (সূরা আর রা’দ ১৩:৩৬)
কুরাইশ নেতা উতবার নিকট থেকে রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জবাব শোনার পর মুশরিকরা সিদ্ধান্ত নিলো যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সহচর মুসলিমদের’কে কষ্ট দেয়ার ক্ষেত্রে যা যা করা দরকার আমরা তাই করব। কাফিরদের নতুন সিদ্ধান্ত জানার পর রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নবোদ্যমে প্রকাশ্যে ঈমান ও ইসলামের দাওয়াত দেয়া এবং জাহিলিয়্যাতের বিরুদ্ধে সংগ্রাম আরম্ভ করলেন। এতে করে মক্কাবাসীদের ক্রোধের আর অন্ত রইল না। তারা ক্ষোভে ফেটে পড়লেন। ঈমানদার মুসলিমরা তাদের নিকট একটি নিকৃষ্ট ও অপরাধী জাতিতে পরিণত হলো। তারা বুঝতে পারল যে, তাদের পায়ের নিচ থেকে ধীরে ধীরে মাটি সরে যাচ্ছে। নিরাপত্তা বেষ্টিত হারাম এলাকায় তাদের ধন-সম্পদ, ইজ্জত-সম্মান ও জীবনের নিরাপত্তা হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়ছে। ফলে তারা ঈমানদার মুসলিমদের সাথে ঠাট্টা বিদ্রুপ, তাদের উপর মিথ্যারোপ, ইসলামের সম্পর্কে সন্দেহ সংশয় সৃষ্টি, মিথ্যা অপবাদ দেয়াসহ হাজারো ষড়যন্ত্র শুরু করে। নাযিলকৃত ওহী সম্পর্কে বিভিন্ন ধরনের কটূক্তি (যেমন- ওহী হল পূর্বেকার লোকদের বানানো ও বানোয়াট কাহিনী) করে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পাগল, যাদুকর, মিথ্যুক, গণক ইত্যাদি বলে, তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের অপপ্রচার চালায়। কিন্তু এত কিছুর পরও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিন্দু পরিমাণও পিছপা হননি; তিনি ধৈর্য ধারণ করেন এবং আল্লাহর পক্ষ হতে দ্বীনের বিষয়ে তাকে সাহায্য করা হবে এ আশায় কাজ চালিয়ে যান। মুশরিকরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপর এমন এমন অমানবিক নির্যাতন চালাতে আরম্ভ করে, যা অনেক সময় একজন সাধারণ মুসলমানের উপরও চালাত না। (ইমাম গাযালী রাহিমাহুল্লাহ এর ফিকহুস সীরাহ: পৃ.১০৬, আর রাহীকুল মাখতুম পৃ.৮০, ৮২ ইত্যাদি)
উরওয়া ইবনে যুবাইর রাযিআল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস রাযিআল্লাহু আনহু কে জিজ্ঞেস করি, মুশরিকরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে সবচেয়ে খারাপ যে ব্যবহার করে, তুমি তার বিবরণ আমাকে দাও! তিনি বলেন, একদিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কা’বা গৃহের পাশে সালাত আদায় করছিল ঠিক ঐ মুহূর্তে উকবা ইবনে আবি মুয়াইত এসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর গলা চেপে ধরল এবং কাপড় দিয়ে তার গলা পেঁচালো। তারপর খুব জোরে তার গলা চেপে টানাটানি করে তাকে মেরে ফেলতে চেষ্টা করে। এ অবস্থা দেখে আবু বকর (রাযিআল্লাহু আনহু) দৌড়ে এসে তার দিকে অগ্রসর হল এবং তার ঘাড়ে ধাক্কা দিয়ে তাকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে দূরে সরাল। তারপর বলল, “তোমরা এমন একজন লোককে হত্যা করবে যে বলে আল্লাহ্-ই আমার একমাত্র রব্ব (রব্বিআল্লাহ্)! অথচ সে তোমাদের রব্বের পক্ষ হতে স্পষ্ট প্রমাণাদি নিয়েই তোমাদের নিকট এসেছে”। (সূরা গাফির/মু’মিন ৪০:২৮)
কাফিরদের অমানুষিক নির্যাতনে অতিষ্ট হয়ে সাহাবীরা যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দরবারে এসে কাফিরদের থেকে আল্লাহ কেন এখনো প্রতিশোধ নিচ্ছেন না, কেন তাদেরকে আযাব-গযব দিচ্ছেন না, আর আল্লাহ’র পথে দাওয়াত দানকারীদের উপরই এত জুলুম নির্যাতন কেন, আপনি কি আমাদের জন্য আল্লাহর নিকট সাহায্য প্রার্থনা করবেন না? এমন বিভিন্ন অনুযোগের জবাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
”তোমাদের পূর্বের উম্মতদের অবস্থা ছিল, তাদের একজন লোককে ধরে আনা হত, তারপর জমিনে তার জন্য গর্ত খনন করা হত এবং তাতে তাকে নিক্ষেপ করতো। তারপর তার জন্য করাত আনা হতো, আর সে করাত দ্বারা তার মাথাকে দ্বি-খণ্ডিত করে তাকে হত্যা করা হতো। আবার কোন কোন সময় কাউকে কাউকে লোহার চিরুনি দিয়ে আঁচড় দিয়ে তার হাড় থেকে মাংস ও চামড়া তুলে নিয়ে আলাদা করা হতো। এত বড় নির্যাতন সহ্য করা সত্ত্বেও তাদেরকে আল্লাহর দ্বীন থেকে এক চুল পরিমাণও এদিক সেদিক করতে পারত না। (রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন) আমি আল্লাহর শপথ করে বলছি, আল্লাহ্ তা’আলা অবশ্যই এ দ্বীনকে পরিপূর্ণ করবেন। এমনকি একজন সফরকারী সুনায়া থেকে হাজরা-মওত পর্যন্ত নিরাপদে ভ্রমণ করবে, সে তার নিরাপত্তার জন্য একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে ভয় করবে না। তবে তোমরা হলে এমন জাতি, যারা তাড়াহুড়াকে পছন্দ কর।” (খাব্বাব ইবনে আরত রাযিআল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, বুখারী, হা/৩৬১২)।
রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সম্মানীত সহচরদের বিরুদ্ধে সকল ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হওয়ার পর কাফিররা আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তাঁর সকল অনুসারী সহ শিয়াবে আবু তালিব-এ দীর্ঘ তিন বছর অবরোধ করে রাখলো এবং এ বন্দীদশা হতে মুক্তির পর তাঁদেরকে হত্যার পরিকল্পনা করলো, এমনকি রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে হত্যার উদ্দেশ্যে তাঁর বাড়ী ঘেরাও করলো। অবশেষে অবর্ণনীয় অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে আল্লাহ পাকের নির্দেশে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর অনুসারীগণ মাতৃভূমি মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করতে বাধ্য হলেন কিন্তু দাওয়াত ত্যাগ করলেন না। কুরআনের ভাষায়-
“যাদেরকে তাদের ঘর-বাড়ী থেকে অন্যায়ভাবে বের করে দেয়া হয়েছে শুধু এই কারণে যে, তারা বলেছিল- রাব্বুনাল্লাহ্ (আল্লাহ্ই আমাদের একমাত্র রব্ব)।…। আল্লাহ্ নিশ্চয়ই তাদেরকে সাহায্য করবেন, যারা আল্লাহ্কে সাহায্য করে। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ পরাক্রমশালী শক্তিধর।” (সূরা আল-হাজ্জ ২২:৪০)
তাহলে দেখা যাচ্ছে, রাব্বুনাল্লাহ্’র জন্য অর্থাৎ একমাত্র আল্লাহর সার্বভৌমত্বের জন্য ঘর-বাড়ী, মাতৃভূমি ত্যাগ করা যায় কিন্তু রাব্বুনাল্লাহ্ ত্যাগ করা যায় না। এ এমন এক কালিমা যা গ্রহণ করলে কোন সৃষ্টির সার্বভৌমত্ব, আইন-বিধান ও কর্তৃত্ব বলে কিছু থাকে না, থাকে শুধু এক আল্লাহ্’র সার্বভৌমত্ব, আইন-বিধান ও নিরংকুশ কর্তৃত্ত্ব।
বিভিন্ন সময়ের ফিরাউন, নমরূদরূপী শাসক এবং সমাজের প্রভাব-প্রতিপত্তিশালী নেতৃত্ব, কর্তৃত্ত্বের অধিকারী ক্ষমতাশালী লোকেরা একদিকে যেমন আল্লাহ’কে রব্ব ও ইলাহ স্বীকার করতো অপরদিকে তেমনি নিজেরাই নিজেদের খেয়াল খুশিমত সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য নিজে বা মানুষকে সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক দাবী করে সেই অবৈধ ক্ষমতাবলে আইন-বিধান প্রনয়ণ করতো। আর নিজেদের খেয়াল খুশিমত সেই আইন-বিধান দ্বারা রাষ্ট্রের সকল কর্মকান্ড পরিচালনা করতো। পৃথিবীব্যাপী আজকের সকল শাসকগোষ্ঠীও নিজেদের ইচ্ছেমত নিজেরাই আইন-বিধান প্রনয়ণ করছে এবং তা বাস্তবায়নের জন্য অবৈধ-মিথ্যা সার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগ করছে। সুতরাং সে সময়ের ফিরাঊন-নমরূদ এবং আজকের যুগের শাসকদের মধ্যে মৌলিক কোনো পার্থক্য নেই, ফিরাঊন নিজের জন্য যে অর্থে রব্ব ও ইলাহ শব্দ ব্যবহার করেছিল, আজকের যুগের শাসকগোষ্ঠীও সে একই অর্থে সার্বভৌমত্ব (Sovereignty) পরিভাষা ব্যবহার করছে, এতে এমন কী পার্থক্য সৃষ্টি হয়!
সুতরাং যারা নিজেদেরকে মুসলিম মনে করেন কিংবা ঈমানদার মুসলিম দাবী করেন তারা বর্তমান নব্য নমরূদ-ফিরাঊনদের আইনদাতা-বিধানধাতা শাসক হিসেবে মেনে নিলে তা হবে তাদেরকে রব্ব ও ইলাহ্ হিসেবে মেনে নেয়া অর্থাৎ ঈমান ও ইসলামের কালিমার দাওয়াতকে অস্বীকার করা। আর এটিই হল আল্লাহ্’র রুবুবিয়্যাত ও উলূহিয়্যাতে র্শিক। বর্তমান সময়ের মুসলিম দাবীদারগণের সিংহভাগই ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ইসলাম বিরোধী পুঁজিবাদী, গণতান্ত্রিক, সমাজতান্ত্রিক, রাজতান্ত্রিক, জাতিয়তাবাদী এবং ধর্মনিরপেক্ষতার ধ্বজাধারী নব্য নমরূদ-ফিরাঊনদের মেনে নিয়ে এই মারাত্মক শির্কের মধ্যে ডুবে আছে।আল-কুরআনে আল্লাহ্ পাকের ঘোষণা অনুযায়ী ফিরাঊনকে যদি শুধুমাত্র আইনদাতা-বিধানদাতা ও সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক হিসেবে মেনে নিলে তাকে আল্লাহ্’র পাশাপাশি রব্ব ও ইলাহ্ মানা হয়, তাহলে আজকের পুঁজিবাদী, গণতন্ত্রী, সমাজতন্ত্রী, রাজতন্ত্রী, জাতিয়তাবাদী, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী তথা সকল প্রকার মানব রচিত সংবিধানের ধারক-বাহক শাসকবর্গকে মেনে নেয়ার কারণে তাদেরকেও রব্ব ও ইলাহ্ মানা হচ্ছে, যা একমাত্র প্রকৃত রব্ব আল্লাহ্’র রুবুবিয়্যাত ও উলূহিয়্যাতে শির্ক, চরম অবাধ্যতা, ক্ষমার অযোগ্য মহা-অপরাধ। অর্থাৎ সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় বর্তমান বিশ্বের মানুষ সার্বভৌম ক্ষমতার একমাত্র মালিক সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ্ প্রদত্ত একমাত্র জীবন ব্যবস্থা ‘ইসলাম’ পরিত্যাগ করার কারণে একদিকে আল্লাহকে সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক, আইনদাতা- বিধানদাতা ও নিরংকুশ কর্তৃত্বের মালিক অমান্য করে আল্লাহর সাথে চরম বিদ্রোহ ও চরম অবাধ্যতা করছে এবং অন্যদিকে সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় “গণতন্ত্র, রাজতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, একনায়কতন্ত্র, সামরিকতন্ত্র” ইত্যাদি মানব রচিত ব্যবস্থা গ্রহণ করে মানুষকে সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক, আইনদাতা-বিধানদাতা ও কর্তৃত্বের মালিক মানার মাধ্যমে আল্লাহ্’র সমকক্ষ গণ্য করে র্শিকে লিপ্ত হয়েছে। অর্থাৎ সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে মানুষ আল্লাহকে ‘রব্ব’ ও ‘ইলাহ্’ বাদ দিয়ে মানুষকেই এক্ষেত্রে ‘রব্ব’ ও ‘ইলাহ্’ মানছে। যা সকল শির্কের বড় শির্ক ও সবচেয়ে বড় কুফর। সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর সাথে কুফর ও শির্ক করার পরিণতি সম্পর্কে আল কুরআনে আল্লাহ্ ফরমান- “যদি তুমি শির্ক করো, তবে তোমার সকল আমল বিনষ্ট হয়ে যাবে এবং তুমি ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে” (সূরা আয যুমার:৬৫)। সূরা মায়েদার ৭২নং আয়াতের শেষাংশে আল্লাহ্ আরও ফরমান- “নিশ্চয়ই যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে র্শিক করবে, আল্লাহ্ তার উপর (তার জন্য) জান্নাত হারাম করে দিবেন, আর তার স্থায়ী ঠিকানা হবে (জাহান্নামের) আগুনে এবং জালিমদের জন্য কোন সাহায্যকারী নেই।” সূরা ‘মুলক’এর ৬নং আয়াতে আল্লাহ্ বলেন- “আর যারা আপন ‘রব্ব’এর সাথে কুফরী করে তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের আযাব, আর এটা হচ্ছে অত্যন্ত মন্দ ঠিকানা।”
সুতরাং নিজ জীবনের কল্যাণকামী ব্যক্তি মাত্রই চাইবেন তিনি যেন মৃত্যু পরবর্তী জীবনে মহান রব্ব আল্লাহ্’র রোষানলে না পড়েন। এজন্য দুনিয়াতে শান্তি ও কল্যাণ এবং আখিরাতে জাহান্নামের অকল্পনীয় আযাব থেকে মুক্তিকামী মানুষের সর্বপ্রথম কাজ হবে সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় মানুষের সার্বভৌমত্ব, আইন-বিধান ও কর্তৃত্ব অমান্য ও পরিত্যাগ করে সার্বভৌমত্ব, আইন-বিধান ও নিরংকুশ কর্তৃত্ব একমাত্র আল্লাহ্’র গ্রহণ করে তাঁরই রাসূল হযরত মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর অনুসরণ ও অনুকরণে জীবন গঠন এবং সমাজ ও রাষ্ট্রে আল্লাহ্’র একক সার্বভৌমত্ব ও দ্বীন-ইসলাম প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নিজেদের অর্থ ও সময় ব্যয়ের মাধ্যমে চূড়ান্ত চেষ্টা করা। এটাই আল্লাহ্’র ক্ষমা ও জান্নাত লাভের উপায়; এটাই দুনিয়াতে শান্তি ও কল্যাণ এবং আখিরাতে জাহান্নাম থেকে মুক্তির একমাত্র পথ।
আল্লাহর একক সার্বভৌমত্ব ও দ্বীন প্রতিষ্ঠার পদ্ধতি
সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় আল্লাহর একক সার্বভৌমত্ব এবং ইসলামের আইন-বিধান প্রতিষ্ঠায় ঈমানদারগণের রাষ্ট্রীয় শাসন ক্ষমতা লাভ একান্ত প্রয়োজন। আর তাই আল্লাহ তাঁর সর্বশেষ নাবী ও রাসূল হযরত মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে আল্লাহ্’র একক সার্বভৌমত্ব এবং সত্য দ্বীন-ইসলাম প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব দিয়ে প্রেরণ করার পর, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সে দায়িত্ব যেভাবে পালন করেছেন, যে পদ্ধতিতে পালন করেছেন, আজকের যুগের দা‘ঈ-ইলাল্লাহদের সে ভাবেই পালন করতে হবে। তিনি ঈমানের দাওয়াত, ইসলামের দাওয়াত যে ভাবে, যে শব্দ দ্বারা দিয়েছেন আমাদেরকে সে ভাবেই দিতে হবে। তিনি তাঁর উপস্থাপিত দাওয়াতে ঈমান ও ইসলামকে যেভাবে আন্তরিক উপলব্ধি, বিশ্বাস, আক্বীদাহ এবং সালাত, সিয়াম ও হজ্জের ন্যায় আধ্যাত্বিক আমলের সাথে সাথে একটি পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক জীবন ব্যবস্থা হিসেবেও তুলে ধরেছিলেন আমাদের উপস্থাপনায়ও ঈমান ও ইসলামকে তদরূপ তুলে ধরতে হবে। আল্লাহ্’র রাসূল হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর দাওয়াতে কুরাইশদের বলতেন-
“তোমরা আমার একটি কথা যদি মেনে নাও, তাহলে আরব ও আযম (অনারব) তোমাদের করতলগত হবে। আমি তোমাদের সামনে এমন একটি কালিমা পেশ করছি তা যদি তোমরা গ্রহণ করো, তাহলে তোমরা সমগ্র আরব ও আযম জয় করে ফেলবে এবং অনারবরা তোমাদেরকে জিঝিয়া দিবে।” (সিরাতে ইবনে হিশাম, তাফসীর ইবনে কাসীর, আর রাহীকুল মাখতুম পৃ.১৫৬, তাওহীদ পাবলিকেশন্স)
মুসলিমদেরকে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে আল্লাহর একক সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ রাখার জন্য আল্লাহ্ একটি ব্যবস্থা প্রদান করেছেন যার নাম খিলাফত। খিলাফত হচ্ছে ইসলামের রাজনৈতিক ব্যবস্থার নাম, খিলাফতের শাসন ব্যবস্থা বিশ্বের অন্য সকল শাসন ব্যবস্থা সমূহের ভিত্তি, চিন্তা, ধারণা, গঠন, কাঠামো, আইন, সংবিধান সহ সকল দিক ও বিভাগ থেকে পৃথক ও স্বতন্ত্র। ইসলামের খিলাফত ব্যবস্থা আল্লাহ প্রদত্ত একটি স্বতন্ত্র শাসন ব্যবস্থা যা কোন ক্রমেই রাজতান্ত্রিক, সাম্রাজ্যবাদী, ফেডারেল, প্রজাতান্ত্রিক কিংবা গণতান্ত্রিক নয়। খিলাফত প্রসংগে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীন বলেন-
“আর সেই সময়ের কথাও একটু স্মরণ করে দেখ, যখন তোমাদের রব্ব ফেরেশতাদেরকে বলেছিলেন, “আমি পৃথিবীতে একজন খলীফা নিযুক্ত করতে যাচ্ছি।” (সূরা আল বাকারা ২:৩০)
এ আয়াতে খলীফা দ্বারা বুঝানো হচ্ছে- “মহান রব্ব আল্লাহর সার্বভৌম ক্ষমতার প্রতিনিধি হওয়া”। এ অর্থ অনুযায়ী সকল আদম সন্তান খিলাফতের দায়িত্ব প্রাপ্ত।
আল্লাহ পাক অন্যত্র বলেন-
“(আমি তাকে বললাম) হে দাউদ! আমি তোমাকে পৃথিবীতে খলিফা নিযুক্ত করেছি, কাজেই তুমি জনগণের মধ্যে সত্য সহকারে শাসন কর্তৃত্ব পরিচালনা করো এবং প্রবৃত্তির কামনার অনুসরণ করো না, কারণ তা তোমাকে আল্লাহ্’র পথ থেকে বিপথগামী করবে যারা আল্লাহ্’র পথ থেকে বিপথগামী হয় অবশ্যই তাদের জন্য রয়েছে কঠোর শাস্তি, যেহেতু তারা বিচার দিবসকে ভুলে গেছে।” (সূরা সোয়াদ ৩৮:২৬)
আয়াতটিতে খলীফা দ্বারা বুঝানো হচ্ছে এমন এক শাসককে যিনি রাষ্ট্র পরিচালনায় মহান রব্ব আল্লাহর সার্বভৌমত্ব, আইন-বিধান ও নিরংকুশ কর্তৃত্ব মেনে নিয়ে তাঁর প্রদত্ত শরীয়াতের বিধান মোতাবেক তার প্রতিনিধিত্বের যথাযথ হক্ব আদায় করেন।
আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীন তাঁর জমীনে তাঁর মনোনীত একমাত্র দ্বীন-জীবন ব্যবস্থা ইসলাম প্রতিষ্ঠা করা ও প্রতিষ্ঠিত রাখার লক্ষ্যে বান্দাদের মধ্য হতে কাদেরকে খিলাফতের দায়িত্ব প্রদান করবেন সে সম্পর্কে অন্যত্র ফরমান-
‘‘তোমাদের মধ্য থেকে যারা ঈমান আনবে ও সৎ কাজ করবে, আল্লাহ তাদেরকে ওয়াদা দিয়েছেন যে, তাদেরকে অবশ্যই পৃথিবীতে খিলাফত (রাষ্ট্রক্ষমতা বা শাসনকর্তৃত্ব) দান করবেন যেমন তিনি খিলাফত (রাষ্ট্রক্ষমতা বা শাসনকর্তৃত্ব) দান করেছিলেন তাদের পূর্বে অতিক্রান্ত লোকদেরকে এবং তাদের জন্য মজবুত ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত করে দিবেন তাদের দ্বীনকে, যা তিনি তাদের জন্য পছন্দ করেছেন এবং তাদের (বর্তমান) ভয়-ভীতির অবস্থাকে নিরাপত্তায় পরিবর্তিত করে দেবেন। তারা শুধু আমার ইবাদাত করবে এবং আমার সাথে কাউকে শরীক করবে না। আর যারা এরপর কুফরী করবে তারাই ফাসেক।’’ (সূরা আন নূর ২৪:৫৫)
খিলাফত প্রসংগে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
“তোমাদের মধ্যে নবুওয়ত ততক্ষণ পর্যন্ত বর্তমান থাকবে যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ্ চাহেন। এরপর আল্লাহ তার সমাপ্তি ঘটাবেন। তারপর প্রতিষ্ঠিত হবে নবুয়তের আদলে খিলাফত (খিলাফত আলা মিনহাজিন নুবুওওয়াহ) এবং তা ততক্ষণ বর্তমান থাকবে যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ্ চাইবেন। অতঃপর তিনি তারও সমাপ্তি ঘটাবেন। তারপর আসবে যন্ত্রণাদায়ক বংশের শাসন, তা ততক্ষণ পর্যন্ত বর্তমান থাকবে যতক্ষণ আল্লাহ ইচ্ছা করবেন। এক সময় আল্লাহর ইচ্ছায় এরও অবসান ঘটবে। তারপর প্রতষ্ঠিত হবে জবরদস্তিমূলক জুলুমের শাসন এবং তা তোমাদের উপর ততক্ষণ পর্যন্ত বর্তমান থাকবে যতক্ষণ আল্লাহ ইচ্ছা করবেন। অতঃপর তিনি তা অপসারণ করবেন তারপর পুনঃরায় আবার দুনিয়ার যমীনে খিলাফত আলা মিনহাজিন নুবুওওয়াহ (নবুওয়তের আদলে খিলাফত) প্রতিষ্ঠিত হবে।” (মুসনাদে আহমাদ, বায়হাকী, খাছায়েছুল কুবরা ইত্যাদি)
হাদীসটিতে “খিলাফত আলা মিনহাজিন নুবুওওয়াহ” দু’বার প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে। প্রথম খিলাফত হযরত রাসূলে পাক (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ওফাতের পর এবং দ্বিতীয় খিলাফত মুসলমানদের চরম অবনতির পর।
নবুওয়ত, খিলাফতে রাশেদা, যন্ত্রণদায়ক বংশের শাসন সবই শেষ হয়ে গেছে। বর্তমান সময়ে আমরা শাসন ব্যবস্থার যে ধাপে বা কালে (চবৎরড়ফ) অবস্থান করছি তা হল জুলুমের শাসন। খিলাফতে রাশেদা বলতে আমরা প্রথম চার খলিফার সময় কালকে বুঝে থাকি। যন্ত্রণাদায়ক বংশের শাসন বলতে বুঝানো হয় খিলাফতের সেই সময় কাল যখন জোর পূর্বক বাইয়াত গ্রহণ করা হতো এবং উত্তরাধিকার সূত্রে বাইয়াত হস্তান্তর করা হতো। এক কথায় বাইয়াত ব্যবস্থার অপব্যবহার ও শরীয়তের অপব্যবহারকে বুঝানো হয়েছে। জুলুমের শাসন বলতে সেই শাসন কালকে বুঝানো হয়েছে যখন ইসলামী শাসন ব্যবস্থা বিদ্যমান ছিল কিন্তু শাসকগণ শরীয়তের অপপ্রয়োগ করে জনগণের উপর অত্যাচার করতো এবং বর্তমান সময়ের শাসন ব্যবস্থা যেখানে মুসলিম নামধারী শাসকগণ কুফুরী ব্যবস্থা দ্বারা মুসলমানদেরকে শাসন করছে। হাদিসের শেষে মুসলিম উম্মাহকে সুসংবাদ দেয়া হয়েছে এই বলে যে, জুলুমের শাসনের অবসান ঘটবে এবং পুনঃরায় নবুওয়তের আদলে খিলাফত ফিরে আসবে।
আল্লাহ্’র ওয়াদার উপর পরিপূর্ণ আস্থা রেখে ঈমানদারগণের প্রস্তুতি গ্রহণ একান্ত জরুরী। কারণ আজকে আমাদের সম্মুখে আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীনের যে দ্বীন বিদ্যমান তার নাম হচ্ছে ইসলাম। আর আল্লাহ এ দ্বীনকে সকল প্রকার বিধি-বিধান ও নিয়া’মত সহকারে পরিপূর্ণ করে দিয়েছেন। শুধুমাত্র আমাদের অজ্ঞতা ও দায়িত্বহীনতার কারণেই এ দ্বীন প্রতিষ্ঠিত নেই। সুতরাং আজ মুসলিম উম্মাহর সর্ব প্রথম এবং সর্ব প্রধান কাজ হচ্ছে আল্লাহকে একমাত্র রব্ব-সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক, সার্বভৌম আইনদাতা-বিধানদাতা ও নিরংকুশ কর্তা-মেনে নিয়ে রাব্বুনাল্লাহু ঘোষণা দিয়ে পরিপূর্ণ ঈমানদার হয়ে যাওয়া এবং এ ঈমানের উপর দৃঢ়-অটল থাকা। আর এই ঈমানের ভিত্তিতে আমলে সালেহ্ করার মাধ্যমে ব্যক্তি পর্যায়ে নিজ নিজ পরিবারের মধ্যে পরিপূর্ণরূপে দ্বীন প্রতিষ্ঠার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা। অতঃপর ইসলামী শরীয়াহ রাষ্ট্র ব্যবস্থায় প্রতিষ্ঠিত করার তথা খিলাফত ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সকল প্রকার তাগুতের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে আল্লাহ্’র একক সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে জাতির মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার দাওয়াত দেওয়া। কেননা আল্লাহ্ রাব্বুল আ’লামীন সন্তুষ্ট হয়ে তাদের মাঝেই খিলাফত ফিরিয়ে দিবেন যারা ঈমান ও আমলে সালেহ’র গুণে গুণান্বিত হয়ে নিজেদের ব্যক্তি পর্যায়ে দ্বীনকে খালেছভাবে গ্রহণ করবেন।
তবে ব্যক্তিগত বুঝের ভিত্তিতে অনেক মুসলিম ভাই বলে থাকেন,“আগে নিজের দেহে ইসলাম কায়েম করুন, তখন আপনা-আপনি দেশে ইসলাম কায়েম হয়ে যাবে” কিংবা “সারা বাংলাদেশে দ্বীন কায়েম হলেও আমার কোন লাভ হবে না যদি আমার সাড়ে তিন হাত শরীরে (পোষাক-পরিচ্ছদে) দ্বীন কায়েম না হয়, আমার নিজ পরিবারে দ্বীন কায়েম না হয়” কিংবা “যারা সালাতেই সুন্নাহ্’র অনুসরণ করেন না, তারা আবার কিসের ইসলাম কায়েম করবে?” (অর্থাৎ যারা সালাতে রফে ইয়াদাইন ও জোরে আমীন ইত্যাদি সুন্নাহ পালন করেন না, তারা আবার কি ইসলাম কায়েম করবে?)।
“নিজের দেহে ইসলাম কায়েম বা সাড়ে তিন হাত শরীরে দ্বীন কায়েম” প্রসঙ্গে আমার বক্তব্য হলো- এর দ্বারা যদি দাড়ি, টুপি, জুব্বা, পাগড়ী প্রভৃতি বুঝিয়ে থাকেন তবে বলবো: দাড়ি, টুপি অবশ্যই একজন মুসলিম পুরুষের সার্বক্ষণিক সুন্নাহ্ হওয়া উচিত তাই বলে যার দাড়ি, টুপি নাই সে মুসলিম নয় এমনটিতো নয়! আর জুব্বা, পাগড়ী পড়লেই দ্বীনদার ঈমানদার মুসলিম নচেৎ নয় এমনটিও তো নয়! এছাড়া এটাই একমাত্র ইসলামী পোষাক তা কোনক্রমেই সহীহ সুন্নাহ দ্বারা সাব্যস্ত নয়। অপরদিকে প্যান্ট-শার্ট যেহেতু পৃথিবীর কোন দেশেই ধর্মীয় পোষাক হিসেবে স্বীকৃত নয়, তাই প্যান্ট-শার্টের কারণে কোন মুসলিমকে অবজ্ঞা বা হেয় করাটা নিতান্তই প্রচলিত জাহেলী রীতি। তাই যে পোষাক ইসলামী মূলনীতিকে (সতর ঢাকা, শরীরের কাঠামো বুঝা না যাওয়া, এমন স্বচ্ছ না হওয়া যার দ্বারা শরীর দেখা যায়, বিপরীত লিঙ্গের পোষাক না হওয়া, বিপরীত লিঙ্গকে আকৃষ্ট করে এমন না হওয়া, অমুসলিদের ধর্মীয় পোষাক বা তার সাদৃশ্য না হওয়া, অহংকার প্রকাশ পায় এমন না হওয়া) লঙ্ঘন করে না তার ব্যাপারে এভাবে বাড়াবাড়ি না করলেই কি নয়! অথচ আল্লাহ্ পাকের নিকট পছন্দ হচ্ছে “লিবাসুত্ তাক্ওয়া”-তাক্ওয়ার পোষাক-যে পোষাক পরিধানে আল্লাহ্’র প্রতি ভয় জন্মে এবং অন্তরে অহংকারের পরিবর্তে কোমলতা জন্ম নেয়। সর্বোপরি ঈমান ও ইসলামের দাওয়াত দাতার দাড়ি-টুপি, জুব্বা-পাগড়ী প্রভৃতি আমলী বিষয়কে অতি গুরুত্ব দিয়ে দাওয়াত প্রত্যাখানের হিলা বাহানা কোন হিদায়াতকামী মানুষের কাম্য নয়। অথচ বাস্তবতা বলছে দুনিয়াবী জীবনে বিশেষ সুবিধা ভোগের মানসে দাড়ি-টুপি, জুব্বা-পাগড়ী’র অপব্যবহারের কারণে আজ আর কোন মুসলিমের দ্বীনদারীর মাপকাঠি হিসেবে এসব আর তেমন মুখ্য বিষয় নয়। তবে আমি নিজ শরীরে দ্বীন কায়েম বলতে বুঝি: ইসলামী মূলনীতিকে লঙ্ঘণ করেনা এমন পোষাক পরিধান করা এবং নিজ ক্বালব ও নফ্স কে সর্বাবস্থায় র্শিক ও কুফরীর নাপাক সংস্পর্শ থেকে দূরে রাখা। নিজ পরিবারে পনিপূর্ণ দ্বীন কায়েম প্রসঙ্গে বলতে হয়: পরিবারে দ্বীন কায়েমের যথাযথ চেষ্টা করার পর, তারা ঈমান না আনলে ঐ মুসলিম দায়ী হবেন না এবং এর জন্য তাঁকে লজ্জা দেওয়া বা ভৎসণা করা যাবে না যদি তিনি সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালিয়ে থাকেন। দেখুন অনেক নাবী-ই তাঁদের পিতা, স্ত্রী, সন্তান কিংবা কোন কোন নিকটতম আত্মীয়কেও সত্য দ্বীনে দাখিল করাতে পারেন নি; কারণ হিদায়াত সম্পূর্ণ আল্লাহ্’র হাতে। এরপরও যদি তারা এর দ্বারা এটা বুঝাতে চান যে, কারও পরিবারের সবাই ভালোভাবে দ্বীনে আসার আগ পর্যন্ত তার জন্য সমাজে দ্বীনের দাওয়াত তথা দ্বীনকে বিজয়ী করার চেষ্টা করা উচিত নয়, তবে তা বাতিল। কারণ রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে তাঁর চাচা আবু তালিব সহ আরো অনেক নিকটাত্মীয় ইসলাম গ্রহণ করার আগেই সমাজের লোকদেরকে ঈমান ও ইসলামের দাওয়াত পৌছিয়েছেন এবং দ্বীনকে অন্যান্য বাতিল দ্বীনের উপর বিজয়ী করার জন্য সমাজে কাজ শুরু করেছেন।
আর সালাতের প্রসঙ্গে বলতে হয়- এসব মুসলিম ভাইগণ অন্যান্য ব্যাপারে ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহিমাহুল্লাহু), ইমাম ইবনুল কায়্যিম (রহিমাহুল্লাহু) প্রমুখ ইমামের মতামত উল্লেখ করলেও সালাতের এসব সুন্নাহ’র ব্যাপারে তাঁদের মতামত উল্লেখ করতে কিংবা অনুসরণ করতে ভুলে যান। আর রফে ইয়াদাইন, জোরে আমীণ বলাকে ঈমান ও ইসলামের মানদণ্ড মনে করতে শুরু করেন। এসব সুন্নাহ’র ব্যাপারে ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহিমাহুল্লাহু) বলেছেন: “এ বিষয়ে আমাদের নীতি, আর এটাই বিশুদ্ধতম নীতি এই যে, ইবাদাতের পদ্ধতির বিষয়ে (যেসব ক্ষেত্রে মতভেদ রয়েছে তাতে) যে পদ্ধতি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য আছার রয়েছে তা মাকরূহ হবে না; বরং তা হবে শরীয়াহ সম্মত। সালাতুল খওফের বিভিন্ন পদ্ধতি, আযানের দুই নিয়ম: তারজীযুক্ত বা তারজীবিহীন, ইকামতের দুই নিয়ম: বাক্যগুলো দুইবার করে বলা কিংবা একবার করে, তাশাহহুদ, ছানা, আউযু এর বিভিন্ন পাঠ, কুরআনের বিভিন্ন কিরাআত, এই সবগুলো এই নীতিরই অন্তর্ভূক্ত। এভাবে ঈদের সালাতের অতিরিক্ত তাকবীর-সংখ্যা (ছয় তাকবীর বা বারো তাকবীর), জানাযার সালাতের বিভিন্ন নিয়ম, সাহু সিজদার বিভিন্ন নিয়ম, রুকুর পরে বা পূর্বে কুনুত পাঠ, ওয়া সহ অথবা ওয়া ছাড়া রাব্বানা লাকাল হামদ, এই সবগুলোই শরীয়াতসম্মত। কোনো পদ্ধতি কখনো উত্তম হতে পারে কিন্তু অন্যটি কখনো মাকরূহ নয়।” (মাজমূউল ফাতাওয়া ইবনে তাইমিয়া ২৪/২৪২-২৪৩ আরো দেখুন : আল-ফাতাওয়া আল কুবরা ১/১৪০)
সুতরাং মূলকথা হলো- “আমরা যদি নিজেদের চিন্তা, চেতনা, বিশ্বাস ও ঘোষণায় পরিপূর্ণ ঈমানদার হতে পারি, অতঃপর নিজেদেরকে ভালো, আদর্শ ঈমানদার মুসলিম হিসেবে গড়ে তুলতে পারি, ঈমান ও চরিত্রের বিপ্লবের মাধ্যমে নিজেদেরকে সংশোধন করতে পারি, ঈমানের ভিত্তিতে আমালে সালেহ্কারী হতে পারি, তাহলে আল্লাহ্’র ইচ্ছায় একদিন আমরা খিলাফাহ/শাসন ক্ষমতা লাভ করবো-ই”। যার দলীল (সূরা আন্ নুর ২৪:৫৫) ইতিপূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে। এই আয়াতটি একটি আম (সাধারণ) আয়াত যেখানে ঈমানদার ও আমালে সালেহ্কারীদের জন্য আল্লাহ্’র ওয়াদার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে কোন পদ্ধতিতে খিলাফাহ্ কায়েম করার চেষ্টা করতে হবে কিংবা কোন পদ্ধতিতে দ্বীন বিজয়ী হবে তা স্পষ্ট করে এই আয়াতে উল্লেখ হয়নি। তাছাড়া সঠিকভাবে “ঈমান আনা” আর “আমালে সালেহ করা” বলতে কি বুঝনো হয়েছে সেটা অবশ্য বুঝার প্রয়োজন আছে। ঈমান আনা বলতে মূলতঃ র্শিক মুক্ত হয়ে আল্লাহ্’কেই একমাত্র রব্ব- সার্বভৌমত্ব, আইন-বিধান ও কর্তৃত্বের মালিক মেনে আল্লাহ্’র একত্ববাদে ঈমান আনা বুঝায়, ঈমানের দাবী তথা ইসলামের সকল শর্তগুলি পূরণ করা বুঝায়, ঈমান বিনষ্টকারী কাজগুলি থেকে বেঁচে থেকে ঈমানের উপর মৃত্যু বরণ করা বুঝায় যা শুধু খিলাফত লাভের শর্ত নয় বরং সেটা মুসলিম থাকারও শর্ত। আয়াতে উল্লেখিত আমালে সালেহ্-এর মধ্যে জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহও অন্তর্ভুক্ত। নুসরাহ্ অন্বেষণ করাও এর অন্তর্ভুক্ত। এমনকি কলমের মাধ্যমে কিংবা বক্তৃতার মাধ্যমে জিহাদও এই আমালে সালেহ্-এর অন্তর্ভুক্ত হবে। তবে হারাম, শির্ক ও কুফরের ছোঁয়া সম্বলিত মানুষের সার্বভৌমত্বের অধীনে গণতান্ত্রিক নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে জয় লাভের পর সংসদ সদস্য হয়ে, মন্ত্রী হয়ে সূরা মায়েদার ৫:৪৪ নম্বর আয়াতকে ভুলে গিয়ে কুরআন ও সুন্নাহ্’র হুকুমের বিরুদ্ধে গিয়ে স্বচ্ছল ও বিত্তবান হওয়ার পরও রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বেতন-ভাতা নেয়া, দ্বীন কায়েমের কথা বলে শুল্কমুক্ত গাড়ী, সরকারী ফ্ল্যাট, প্লট, বাড়ীর মালিক বনে যাওয়া, তাগুতী আইনে মন্ত্রনালয় পরিচালনা করে ইসলামকে বিজয়ী করার চেষ্টা করা কোনক্রমেই আমালে সালেহ-এর অংশ হিসেবে গণ্য হবে না।
সুতরাং সকল প্রকার ব্যক্তিগত ইখতেলাফকে নিজের মাঝে সীমাবদ্ধ রেখে আমাদের নিজেদের ব্যক্তি জীবনকে র্শিক, কুফর থেকে বাঁচিয়ে, স্বীয় নফ্সের তাড়নাকে প্রাধান্য না দিয়ে সুন্নাহ্ মোতাবিক গঠন করতে উদ্যমী হতে হবে এবং স্ত্রী, পুত্র, কন্যা, বাবা, মা, ভাই, বোন সহ নিজ অধীনস্ত ও নিকটজনের মাঝে মহান রব্বের দাসত্ব, আইনের আনুগত্য ও উপাসনা এবং রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সুন্নাহ’র দাওয়াত পৌঁছানের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ আন্তরিকতার পরিচয় দিতে হবে। কারণ যিনি নিজ পরিবার ও সমাজে আল্লাহ্’র একক সার্বভৌমত্ব, আইন-বিধান ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে উদাসীন তিনি কিভাবে বৃহৎ পরিসরে দ্বীন কায়েমে ভূমিকা রাখবেন?
ইতিপূর্বেই আমরা উল্লেখ করেছি, আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীনের সন্তুষ্টি অর্জন তথা ক্ষমা ও জান্নাত লাভের লক্ষ্যে নিজেদের অর্থ ও সময় ব্যয়ের মাধ্যমে সকল মানুষের কল্যাণে সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় আল্লাহ্’র একক সার্বভৌমত্ব ও দ্বীন-ইসলাম প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা করাই ঈমানদারগণের ঈমানের সর্বোচ্চ দাবী এবং মূল দায়িত্ব ও কর্তব্য। আর সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় আল্লাহ্’র একক সার্বভৌমত্ব ও দ্বীন তথা ইসলামের আইন-বিধান প্রতিষ্ঠা করতে হলে ঈমানদারগণের রাষ্ট্রীয় শাসন ক্ষমতা (খিলাফত) লাভ একান্ত প্রয়োজন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে- আল্লাহ্’র একক সার্বভৌমত্ব ও দ্বীন প্রতিষ্ঠায় ঈমানদারগণের রাষ্ট্রক্ষমতা বা খিলাফত লাভের সঠিক পদ্ধতি কোনটি? কারণ ইসলামের নামে বিভিন্ন ব্যক্তি ও দল বিভিন্ন পদ্ধতি আবিস্কার করে সে পদ্ধতির মাধ্যমে ঈমানদারগণের রাষ্ট্রীয় শাসন ক্ষমতা লাভ তথা খিলাফত ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে যাচ্ছে। তাই আল্লাহ্’র একক সার্বভৌমত্ব ও দ্বীন প্রতিষ্ঠায় ঈমানদারগণের রাষ্ট্রক্ষমতা বা খিলাফত লাভের সহীহ্ পদ্ধতি সম্পর্কে পাঠকদের অবগত করাটা লেখক হিসেবে ঈমানী দায়িত্ব মনে করছি। কুরআন ও সহীহ্ হাদীস দ্বারা এ কথা প্রমাণীত সত্য যে, বর্তমানে দুনিয়াতে হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আগমনের মধ্য দিয়ে নবুওয়তের দরজা কিয়ামতের পূর্ব পর্যন্ত বন্ধ হয়ে গেছে। তিনিই হচ্ছেন আল্লাহ প্রেরীত সর্বশেষ নাবী ও রাসূল। সুতরাং নাবী ও রাসূলগণের অনুপস্থিতিতে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার এ দাওয়াতের দায়িত্ব এখন উম্মতের উপরই বর্তায় এবং এ উম্মতকেই আল্লাহর একক সার্বভৌমত্ব ও দ্বীন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মহান আল্লাহ’কে রব্ব হিসেবে ভুলে যাওয়া মানুষকে তার প্রকৃত রব্ব আল্লাহ্’র সাথে স¤পর্ক স্থাপন করাতে হবে। অন্ধকার থেকে মানুষকে বের করে আলোর দিকে টেনে আনতে হবে। আল্লাহ্’র একক সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার দাওয়াতের এ কঠিন ও উচ্চ মর্যাদাশীল কর্মকে এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে কিয়ামত অবধি নাবী ও রাসূলগণের শূন্যতা এ উম্মতকেই পূরণ করতে হবে। আর মনে রাখতে হবে, আল্লাহ্’র একক সার্বভৌমত্বের প্রতি দাওয়াতের জন্য একমাত্র আদর্শ ও ইমাম হলো, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। তিনি যেভাবে মানুষকে আল্লাহ্’র একক সার্বভৌমত্বের প্রতি দাওয়াত দিয়েছিলেন, তার হুবহু অনুসরণই হল দাওয়াতি ময়দানে সফলতার চাবিকাঠি। তিনি মানুষকে মহান রব্ব আল্লাহ্’র সাথে স¤পর্ক স্থাপন, আল্লাহর জমীনে আল্লাহ্’র একক সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা ও দ্বীন কায়েমের লক্ষ্যে যেসব হিকমত, কৌশল, প্রজ্ঞা, মেধা, বুদ্ধি ও পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন, তা-ই হল এ উম্মতের দা‘ঈ, আলেম ও জ্ঞানীদের জন্য একমাত্র আদর্শ। কারণ যারা আল্লাহর জমীনে আল্লাহ্’র মনোনীত একমাত্র দ্বীন ইসলাম প্রতিষ্ঠা করা ও প্রতিষ্ঠিত রাখার লক্ষ্যে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রদর্শিত পথ ও পদ্ধতি অনুসরণ করবে না তারা কখনোই সফলতা অর্জন করতে পারবে না। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ ফরমান-
“তোমাদের জন্য আল্লাহ্’র রাসূলের মধ্যে রয়েছে একটি উত্তম আদর্শ; এমন প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য যে আল্লাহ্ ও আখিরাতের প্রতি বিশ্বাস রাখে এবং আল্লাহ্কে বেশী বেশী করে স্মরণ করে।” (সূরা আল্ আহযাব ৩৩:২১)
“যে ব্যক্তি তার নিকট সত্য-সঠিক পথ প্রকাশিত হওয়ার পর রাসূলের বিরুদ্ধাচারণ করবে এবং ঈমানদানদের অনুসৃত পথ-পদ্ধতির পরিবর্তে ভিন্ন পথ-পদ্ধতির অনুসরণ করে, আমি তাকে ঐ দিকেই পরিচালিত করবো যে দিক সে ধাবিত হয়েছে এবং তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবো। গন্তব্যস্থল হিসেবে যা খুবই নিকৃষ্টতম।” (সূরা আন নিসা ৪:১১৫)
আমরা স্পষ্ট করে বলতে চাচ্ছি, যারা ক্বিতাল বা সশস্ত্র সংগ্রাম, বোমাবাজি কিংবা সেনা ক্যু’র মাধ্যমে খিলাফত প্রতিষ্ঠা করতে চাচ্ছেন, আবার যারা ‘গণতন্ত্র’এর অধীনে নির্বাচন করে রাষ্ট্রীয় শাসন ক্ষমতা লাভের বৃথা চেষ্টা করে যাচ্ছেন তারা স্পষ্টতঃই বিভ্রান্তিতে আছেন। ভুল নেতৃত্ব কিংবা কুরআন ও সুন্নাহ্’র যথাযথ দলিল হাতে না আসার কারণে তারা হয়তো জানেনই না যে, এসবের কোনটিই ঈমানদারগণের রাষ্ট্রীয় শাসন ক্ষমতা লাভের পদ্ধতি নয়। তবে আল্লাহ্ রাব্বুল আ’লামীন মনোনীত দ্বীন-ইসলাম সমাজ ও রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠার জন্য যেসকল আলেম সশস্ত্র জিহাদ বা ক্বিতালের কথা বলে থাকেন তারা দলিল হিসেবে কিছু সহীহ হাদীসের উদ্ধৃতি দিয়ে থাকেন। যেমন সহীহ বুখারীতে বর্ণিত আবু বছীর (রাযিআল্লাহু আনহু) এর ঘটনা। যেখানে হুদাইবিয়ার সন্ধির পর সন্ধির একটি ধারা অনুযায়ী মক্কা থেকে হিজরত করে আসা মুসলিমদেরকে মদীনা থেকে মক্কায় ফেরত দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। হুদাইবিয়ার সন্ধির পর আবু বছীর (রাযিআল্লাহু আনহু) মদীনাতে হিজরত করেন। এ সংবাদ পেয়ে কাফিরদের পক্ষ থেকে দু’জন দূত তাকে নিতে আসলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে তাদের হাতে তুলে দেন। পথিমধ্যে যুল হুলায়ফা নামক স্থানে তিনি তাদের একজনকে হত্যা করেন এবং আবার মদীনাতে ফিরে আসেন। তাঁকে দেখে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, কি আশ্চর্য! এ তো যুদ্ধ বাধিয়ে দিতে সক্ষম। যদি এর সাথে কেউ থাকতো! এ কথা শুনে আবু বছীর (রাযিআল্লাহু আনহু) বুঝতে পারেন যে, তাকে আবার মুশরিকদের হাতে তুলে দেওয়া হবে। তাই তিনি বের হয়ে পড়েন এবং সিফাল বাহর নামক এলাকাতে অবস্থান নেন। পরবর্তীতে মক্কা থেকে হিজরত করে মুসলিমরা একের পর এক এসে আবু বছীর (রাযিআল্লাহু আনহু) এর সাথে মিলিত হতে থাকেন। মক্কার মুশরিকদের কোনো ব্যবসায়ী কাফেলা ঐ এলাকা দিয়ে ফিরছে এমন সংবাদ পাওয়া মাত্র তারা তাদের উপর হামলা করে তাদের হত্যা করতেন এবং গণীমতের মাল সংগ্রহ করে তদ্বারা জীবনধারণ করতেন। এ সংকট থেকে উদ্ধার পেতে পরবর্তীতে মক্কার কুরাইশরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট পত্র লিখে সন্ধির উক্ত শর্তটি বতিল করার অনুরোধ জানায়। (সহীহ বুখারী)। এই হাদীসটিতে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হয়, যথা- আমীর বা খলীফা অনুপস্থিত থাকলে বা তাঁর সাথে যোগাযোগ সম্ভব না হলে স্থানীয়ভাবে সামর্থানুযায়ী শত্রুদের নির্যাতনের জবাব দেয়া যায়। কেননা আবু বছীর বা অন্য যেসব সাহাবা উক্ত স্থানে একত্রিত হয়েছিলেন তাদের কেউই খলীফা ছিলেন না। আবার তারা মদীনা রাষ্ট্রের অনুগত নাগরিকও ছিলেন না। তারা যা করেছেন সে বিষয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের নির্দেশও দেন নি। এসকল সাহাবাদের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা বা নিয়ন্ত্রিত ভূখন্ডও ছিল না। এসব বিষয় স্পষ্ট প্রমাণ করে যে, কোন মজলুম মু’মিন যদি তার উপর কৃত জুলুমের প্রতিবাদস্বরূপ সামর্থানুযায়ী প্রতিরোধ করতে পারে এজন্য সে ভূখণ্ডে খিলাফত প্রতিষ্ঠিত থাকতে হবে এটা শর্ত নয়। এর দলিল হলো, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট যখন এ খবর পৌঁছেছিল, তখন কিন্তু তিনি এর নিন্দা করেননি। বরং উৎসাহ্ দিয়ে বলেছিলেন, “যদি এর সাথে কেউ থাকতো!”
এ হাদীস দ্বারা আত্মরক্ষার্থে জিহাদ করার অনুমোদন আছে তা প্রমাণীত হলেও দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য সশস্ত্র জিহাদের সম্পর্ক প্রমাণীত হয় না। কারণ সংশ্লিষ্ট সাহাবীরা যা করেছিলেন তা দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য ছিল না; বরং তা অনন্যোপায় হয়ে আত্মরক্ষার্থে ছিল।
অপর এক হাদীসে হযরত উবাদা ইবনে সামিত (রাযিআল্লাহু আনহু) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের নিকট হতে অঙ্গিকার নিয়েছিলেন যে, আমরা ক্ষমতাশীনদের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হবো না, যতক্ষণ না তারা স্পষ্ট কুফরীতে লিপ্ত হয়, যে বিষয়ে আমাদের নিকট আল্লাহ্’র পক্ষ হতে প্রমান বিদ্যমান আছে। (মুত্তাফাকুন আলাইহি)
এই হাদীসের মূল ভাষ্য হলো ক্ষমতাশীন খলীফা বা বাদশাহ্ যদি কুফরীতে লিপ্ত হয় তবে তখনি তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা ওয়জিব হবে। যা ইসলাম প্রতিষ্ঠা হওয়ার পরবর্তী আমল।
সহীহ হাদীস দ্বারা এ কথা প্রমাণিত যে, জিহাদ জারি থাকবে কিয়ামতের পূর্ব পর্যন্ত । তবে পৃথিবীতে কোথাও পূর্ণাঙ্গভাবে আল্লাহ্’র সার্বভৌমত্ব ও দ্বীন-ইসলাম প্রতিষ্ঠিত না থাকা অবস্থায় আল্লাহ্’র সার্বভৌমত্ব ও দ্বীন-ইসলাম প্রতিষ্ঠা করার জন্য সশস্ত্র জিহাদ বা ক্বিতাল করার কোনরূপ নির্দেশ আল্লাহ্’র কিতাব আল-কুরআন এবং রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সহীহ্ হাদীসে নেই সুতরাং এটি সংগত কারণেই বাতিল পদ্ধতি।
আবার নূসরাহ্’র নামে সেনাবাহিনীর সদস্যদের দ্বারা ক্যু’র মাধ্যমে জোরপূর্বক ঈমানদারগণের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা লাভের ধারণাটিও নব্য জাহিলিয়্যাত ছাড়া ভিন্ন কিছু নয়। কারণ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দানের ব্যাপারে আল্লাহ্’র চূড়ান্ত ওয়াদা থাকা সত্ত্বেও যারা আল্লাহ্’র ওয়াদার উপর ভরসা না করে কেবলমাত্র মানুষের নূসরাহ্’র মুখাপেক্ষী হয়, আল্লাহ্ তাদের উপর থেকে স্বীয় জিম্মাদারী তুলে নিয়ে তাদেরকে তাদের নিজ শক্তি-সামর্থের উপর ছেড়ে দেন, ফলে আল্লাহ্’র গায়েবী মদদ বা বিশেষ সাহায্য তাদের জন্য বন্ধ হয়ে যায়। পরিণতিতে আপাতদৃষ্টিতে তাদের কর্মকান্ড ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য উপযোগী ও বাস্তবসম্মত মনে হলেও বাস্তবে সংকট ডেকে আনা ব্যতীত ভিন্ন ফল দেয় না। উপরন্তু দ্বীন সম্পর্কে অজ্ঞ জনগণ তাদের আচরণে দিনকে দিন ইসলাম বিরোধী হয়ে পড়ে এবং দ্বীন প্রতিষ্ঠার কর্মীদের সাথে সচেতন ভাবেই শত্রুতা প্রকাশের পাশাপাশি তাদের ঠেকাতে রাষ্ট্রযন্ত্রের সাথে একাট্টা হয়ে সর্বশক্তি নিয়োগ করে।
বাকী রইলো গণতন্ত্রের নির্বাচন, এক্ষেত্রে বলতে চাই, গণতন্ত্র সহ সকল প্রকার মানব রচিত ব্যবস্থার অধীনে কেউ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে চাইলে তাকে আল্লাহ্র সার্বভৌমত্বের পরিবর্তে মানুষের সার্বভৌমত্ব মেনেই অংশগ্রহণ করতে হয়, যা সুস্পষ্ট র্শিক ও কুফ্র বিধায়; এটা কোনভাবেই ঈমানদারগণের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা (খিলাফত) লাভ তথা আল্লাহ্’র একক সার্বভৌমত্ব ও দ্বীন-ইসলাম প্রতিষ্ঠার পথ ও পদ্ধতি নয়। এর বাস্তব দলিল হিসেবে নব্বই দশকের পর মিশর, তিউনিশিয়া, মরক্কো ও তুরস্কে নিজস্ব ইজতেহাদের ভিত্তিতে মানব রচিত ব্যবস্থার অধীনে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী ইসলামী দলসমূহের পরিণতি উল্লেখ করা যায়। উল্লিখিত দেশসমূহে ইসলামী দলগুলো মানব রচিত ব্যবস্থার অধীনে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে জনগণের ভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন লাভ করার মাধ্যমে সরকার গঠন করে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পরও ইসলামের আইন-বিধান সমাজ ও রাষ্ট পরিচালনায় প্রতিষ্ঠা করতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে।
সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় আল্লাহ্’র একক সার্বভৌমত্ব এবং দ্বীন-‘ইসলাম’ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ঈমানদারগণের রাষ্ট্রীয় শাসন ক্ষমতা লাভের জন্য আল্লাহ্র রাসূল হযরত মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রদর্শিত একমাত্র পদ্ধতি হচ্ছে- ঈমান ও ইসলাম কবুলকারী ব্যক্তি/ব্যক্তিবর্গ অবশিষ্ট লোকদেরকে দাওয়াত দিবে, প্রথমতঃ “হে লোকসকল! আপনারা ‘সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় সার্বভৌমত্ব, আইন-বিধান ও কর্তৃত্ব মানুষের’ এই মহামিথ্যা ত্যাগ (অস্বীকার ও অমান্য) করুন এবং সমাজ ও রাষ্ট্রসহ জীবনের সকল দিক ও বিভাগে ‘সার্বভৌমত্ব, আইন-বিধান ও নিরংকৃশ কর্তৃত্ব একমাত্র আল্লাহ্’র’ এই মহাসত্য মেনে নিন, গ্রহণ করুন ও রব্বুনাল্লাহু ঘোষণা দিন। দ্বিতীয়তঃ হে লোকসকল! আপনারা এই বিশ্বজোড়া যত মানব রচিত সংবিধান আছে সেসব সংবিধানের আনুগত্য অস্বীকার করুন এবং দাসত্ব, আইনের আনুগত্য ও উপাসনা একমাত্র আল্লাহ্’র করার অঙ্গীকার করুন আর সাক্ষ্য দিন- আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্। তৃতীয়তঃ হে লোকসকল! মানুষের তৈরী সংবিধান ও আইন-বিধানের ভিত্তিতে যারা নেতা-নেতৃ বা সরকার, তাদের আনুগত্য অস্বীকার করুন এবং শর্তহীন আনুগত্য-অনুসরণ ও অনুকরণ একমাত্র আল্লাহ্’র রাসূল হযরত মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর করার অঙ্গীকার করুন আর সাক্ষ্য দিন- আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ্। এই তিনটি বিষয়ের দাওয়াতের পরিপ্রেক্ষিতে মানুষের সার্বভৌমত্ব এবং মানব রচিত ব্যবস্থা ও মানব রচিত ব্যবস্থার ধারক-বাহক নেতৃত্বের আনুগত্যের বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে একমাত্র আল্লাহ্র সার্বভৌমত্বের প্রতি ঈমান গ্রহণ এবং তাঁরই প্রদত্ত ব্যবস্থার আইন-বিধান পালনের অঙ্গীকারের মাধ্যমে যারা দাওয়াত কবুল করবে, তাদেরকে নিয়ে সহীহ্ আমীরের নেতৃত্বে “ইসলামী সমাজ” গঠন আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে। এই দাওয়াতের পরিপ্রেক্ষিতে মানব রচিত ব্যবস্থার ধারক-বাহক বাতিল নেতৃত্বের পক্ষ হতে আগত সকল প্রকার যুলুম-নির্যাতন ও বিরোধিতার মোকাবিলা করার দায়িত্ব মহান আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীনের নিকট ছেড়ে দিয়ে উত্তম ধৈর্য্য ও ক্ষমার নীতিতে অটল থাকতে হবে। উপরন্তু বিরোধীতাকারীদের আচরণে রাগ না করে, পাল্টা গালি না দিয়ে, পাল্টা আঘাত না করে তাদের হিদায়াতের জন্য মহান রব্বের দরবারে বেশী বেশী দু’আ করতে হবে। এরই এক পর্যায়ে ঈমানদারদের জন্য ঈমানের চূড়ান্ত পরীক্ষা আসবে। অর্থাৎ মানব রচিত ব্যবস্থার ধারক-বাহক নেতৃত্ব যখন দেখবে ঈমানদারগণের দাওয়াতের কারণে তাদের জাহিলি সমাজের ঐক্য বিনষ্ট হয়ে ভেঙ্গে যাচ্ছে এবং ইসলামী সমাজ গড়ছে তখন তারা এ দাওয়াত বন্ধের জন্য ঈমানদারদেরকে নিশ্চিহ্ন ও স্তব্ধ করে দেয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। হতে পারে তা জেল-যুলুম থেকে শুরু করে মৃত্যুদন্ড পর্যন্ত। জাহিলিয়্যাতের পক্ষ থেকে আসা ঈমানের এ সর্বোচ্চ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারলে আল্লাহ্ নিজেই তাঁর বিশেষ সাহায্যে মানব রচিত ব্যবস্থার ধারক-বাহক নেতৃত্ব তথা জাহিলিয়্যাতের পতন ঘটিয়ে ঈমানদার সৎকর্মশীলদেরকে রাষ্ট্রীয় শাসন ক্ষমতা দান করবেন। আর তখনি ঈমানদারগণ সমাজ ও রাষ্ট্রে আল্লাহ্’র একক সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা ও দ্বীন-ইসলামের আইন-বিধান চালু করবেন। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ্ রাব্বুল আ’লামীন তাঁর কিতাব আল-কুরআনে সূরা আন্ নূর’এর ৫৫ নং আয়াতে সুস্পষ্ট পথনির্দেশ দিয়েছেন।
সুতরাং সকল ধর্মের লোকদের জন্য যার যার ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালনের সুযোগ রেখে আল্লাহ্র রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রদর্শিত পদ্ধতিতে সমাজ ও রাষ্ট্রে আল্লাহ্’র একক সার্বভৌমত্ব এবং ‘ইসলাম’ প্রতিষ্ঠিত হলেই দুর্নীতি, সন্ত্রাস, উগ্রতা, জঙ্গিতৎপরতা ও নৈরাজসহ সকল অপতৎপরতা নির্মূল হয়ে মানুষের জীবনে শান্তি ও কল্যাণ ফিরে আসবে, সুশাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে এবং সকল মানুষের সকল অধিকার আদায় ও সংরক্ষণ হবে।

শেষ করার আগে…
যে মুসলিমকে দেখে কাইসারের কিসরা ধ্বসে যেত, যে মুসলিমকে দেখে হিরাক্লিয়াসের তখত কেঁপে উঠত, যে মুসলিমকে দেখে মহাবীর রুস্তমের হৃদকম্পন শুরু হয়ে যেত, যে মুসলিমের নাম শুনলেই কিং রিচার্ড বাক্রুদ্ধ হয়ে যেতেন, যে মুসলিমের নাম শুনে রাজা লক্ষণ সেন, গৌড় গোবিন্দরা পেছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে বাঁচতেন!
আজ সেই মুসলমান গণতন্ত্রী, সমাজতন্ত্রী, রাজতন্ত্রী, জাতিয়তাবাদী, মডারেট মুসলিম হবার আশায় দিন-রাত ব্যস্ত! গবেষণায় ব্যস্ত! কত কিতাব-ইনা তারা পড়ে! কেবল কুরআনের হিদায়াত-নসিহতটুকু পড়ার সময়ই হয় না! অথচ আল কুরআনে মহান রব্ব আল্লাহ্ বার বার তাদেরকে ডেকে বলছেন- ফা আইনা তাজহাবুন? (লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে কোথায় ছুটছ তোমরা?) ইন হুয়া ইল্লা জিকরুল্লিল আ’লামিন (সারা বিশ্ববাসীর পড়ার বিষয়তো এটাই, আল কুরআন) ফামান শ্বা’আ মিনকুম আঈঁয়াসত্বক্বিম (তোমাদের মধ্যে যারা লক্ষ্যভ্রষ্ঠতা থেকে রক্ষা পেয়ে অবিচল থাকতে চায়, তাদের জন্যই এটা)। মহান রব্ব আল্লাহ্ ঈমানদারদের উদ্দেশ্যে আরও বলছেনÑ “ওহে ঈমানদারগণ! তোমাদের জীবনের কল্যাণে আল্লাহ্ ও রাসূলের ডাকে সাড়া দাও আর জেনে রাখো যে, আল্লাহ মানুষের এবং তার অন্তরের মাঝে অন্তরায় হয়ে যান। নিঃসন্দেহে তোমরা সবাই তাঁরই নিকট সমবেত হবে।” (সূরা আনফাল ৮:২৪)
মহান রব্ব আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের ডাকে সাড়া দিবে সে মুসলিমরা আজ কোথায়? যাদের একমাত্র গাইডবুক হবে আল কুরআন। যাদেরকে আল কুরআনের প্রতিটি হরফই পথ দেখিয়ে দিবে, কি করতে হবে, কখন করতে হবে, এর জন্য তাঁকে কোন যোগ্যতা অর্জন করতে হবে, কিভাবে অর্জন করতে হবে! কেউ কি নেই এই আল কুরআনকে আঁকড়ে ধরবেন ঈমানদার মুসলিম হিসেবে? যার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব হবে এক আল্লাহ্’র সার্বভৌমত্ব!
স্বয়ং আল্লাহ্ রাব্বুল আ’লামীন যে জাতির নাম মুসলিম রাখলেন এবং অন্য সকল জাতির উপর মুসলিমদের শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখার জন্য তাদেরকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম সংবিধান আল কুরআন প্রদান করলেন এবং ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবন পরিচালনার জন্য ইসলাম নামক একটি পরিপূর্ণ দ্বীন-জীবন ব্যবস্থাও প্রদান করলেন তারাই আজ বর্তমান পৃথিবীতে সবচেয়ে নিগৃহীত এবং অসহায় জাতি কেন? আজ পৃথিবীতে যদি একজন হিন্দু অত্যাচারিত হয় তবে তার পক্ষে কথা বলার জন্য একটি রাষ্ট্র আছে, যদি একজন বৌদ্ধ অত্যাচারিত হয় তবে তার পক্ষে কথা বলার জন্য একাধিক রাষ্ট্র আছে, যদি একজন খ্রিস্টান অত্যাচারিত হয় তবে তার পক্ষে কথা বলার জন্য একাধিক রাষ্ট্র আছে, যদি একজন ইয়াহুদী অত্যাচারিত হয় তবে তার পক্ষে কথা বলার জন্য একাধিক রাষ্ট্র আছে, এমনকি জংগলে বসবাসকারী লুপ্তপ্রায় বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতি-গোষ্ঠীর একজনও যদি অত্যাচারিত হয় তবে তাদের পক্ষেও বিভিন্ন মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো সোচ্চার হয়ে উঠে। বর্তমান পৃথিবীতে নাকি দেড়শ’ কোটি মুসলমানের বসবাস, আর তাদের সেনাবাহিনীর সদস্য সংখ্যা নাকি সত্তুর লক্ষ, অথচ আজকে মায়ানমার, আফগানিস্তান, ইরাক, ফিলিস্তিন, কাশ্মীর সহ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে যখন পাইকারী হারে মুসলিমদেরকে হত্যা, জুলুম-নির্যাতন চলছে তখন তাদের পক্ষে কথা বলার, তাদের পাঁশে দাঁড়াবার, তাদের পক্ষে প্রতিশোধ নেওয়ার একটি রাষ্ট্রও খুঁজে পাওয়া যায় না। তবে কি যারা নিহত, নির্যাতিত হচ্ছে তারা মুসলিম না? নাকি আমাদের ঈমানে, মুসলমানিত্বে কোন সমস্যা আছে? অথচ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “এক মুসলমান আরেক মুসলমানের ভাই” (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত), “মুসলমানরা একটি দেহের ন্যায়, এর কোন অঙ্গে ব্যথা পেলে সে ব্যথা সারা শরীরে অনুভূত হয়” (মুসলিম, মিশকাত)।
এ ধরনের সকল জিজ্ঞাসার জবাব হচ্ছে- মুসলিমদেরকে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে আল্লাহ্’র একক সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ রাখার জন্য আল্লাহ্ একটি ব্যবস্থা প্রদান করেছেন যার নাম খিলাফত। এই খিলাফত ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত না থাকার কারণেই মুসলিমরা পরস্পর ছিন্ন-বিছিন্ন হয়ে ক্ষুুদ্র ক্ষুুদ্র রাষ্ট্রে বিভক্ত হয়ে অসহায় নখ-দন্তহীন বাঘের ন্যায় নাম সর্বস্ব জাতিতে পরিণত হয়েছে। ফলে এ ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন জাতির মানুষকে দলছুট মেষের ন্যায় সহজেই হিংস্র পশুরূপী কাফির-মুশরিকদের শিকারে পরিণত হতে হচ্ছে। সুতরাং স্বাভাবিকভাবেই এ কথা বুঝা যাচ্ছে যে, মুসলিমরা যদি তাদের হৃত গৌরব পুনরুদ্ধার করতে চায়, আবারও বিশ্ববাসীর মাঝে নিজেদেরকে সম্মানের আসনে আসীন করতে চায় তবে আল্লাহ্’র একক সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হয়ে খিলাফত ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার বিকল্প নেই।
পরিশেষে নিজ জীবন ও মানবতার কল্যাণকামী সকল মানুষের প্রতি দরদ ভরা মন নিয়ে আন্তরিক আবেদনÑ আসুন সকল প্রকার দুর্নীতি, সন্ত্রাস, উগ্রতা, জঙ্গীতৎপরতা ও বোমাবাজির বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান নিয়ে জাতির সকল মানুষের কল্যাণে আল-কুরআন ও সুন্নাহ’র আলোকে জাতির মানুষকে সাবধান সতর্ক করে ঈমানী দায়িত্ব পালন করি এবং আল্লাহ্’র রাসূল হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রদর্শিত শান্তিপূর্ণ কর্মসূচীর মাধ্যমে নিজ সময় ও অর্থ কুরবানীর মাধ্যমে আল্লাহ্’র জমীনে তথা সমাজ ও রাষ্ট্রে আল্লাহ্’র একক সার্বভৌমত্ব এবং তাঁর মনোনীত ও গ্রহণযোগ্য একমাত্র দ্বীন-‘ইসলাম’ প্রতিষ্ঠার চূড়ান্ত প্রচেষ্টা চালিয়ে যাই। নিজে বাঁচি! জাতিকে বাঁচাই! সার্বভৌম ক্ষমতার একমাত্র মালিক আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীনই আমাদের একমাত্র সহায় ও সাহায্যকারী, আমরা তাঁর উপর পূর্ণ ভরসা করছি। আমীন!

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s