রাসূলুল্লাহ্ (সা.) সম্পর্কিত আক্বীদাহ্

muhammad-sm-orb-300x300-shine-new-1-whitebgwithtext

রাসূলুল্লাহ্ মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কিত আক্বীদাহ্

কুরআনুল কারীমে রাসূল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে মহান আল্লাহ্ সুব্হানাহু ওয়া তায়ালা সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেনÑ

.রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মাছুম (নিষ্পাপ-নিষ্কলঙ্ক) ছিলেনশুধুমাত্র নবুওয়ত প্রাপ্তির পরে নয় বরং ভূমিষ্ঠ হওয়ার পরক্ষণ হতেই তিনি নিষ্পাপ ছিলেনযেহেতু তিনিই ছিলেন আল্লাহ্ পাক কর্তৃক প্রেরিত সর্বশেষ এবং সর্বশ্রেষ্ঠ নবী ও রাসূল সেহেতু আল্লাহ্ রাব্বুল ইযত তাঁর প্রিয় রাসূল মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জন্মক্ষণ হতে মৃত্যুর ঠিক পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত কিঞ্চিত সময়ের জন্যও কোনো গুনাহ্ কাজে জড়িত হতে দেননিতাঁর প্রতি আল্লাহ্ পাকের ইস (পাপমুক্ত অবস্থা) সংরক্ষণ মুহূর্তের জন্যেও হারিয়ে যায়নি বরং তা দৃঢ় হতে আরও অধিকতর দৃঢ় হয়েছেএজন্যই স্বয়ং আল্লাহ্ বারী তায়ালা কুরআনুল কারীমে বিভিন্ন আয়াতে উদাত্তভাবে ঘোষণা করছেনÑ

তোমাদের সঙ্গী [মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)] পথভ্রষ্ট হননি, এমনকি গোমরাহ্ও হননি (সূরা আন নাজম ৫৩: ২)

এবং নিঃসন্দেহে তাঁরা (অর্থাৎ নবী-রাসূলগণ) আমার নির্বাচিত সর্বোত্তম ব্যক্তিবর্গের অন্তর্ভুক্ত (সূরা সা৩৮: ৪৭)

আল্লাহ্ পাক আরও ঘোষণা করেনÑ

[হে মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)!] তোমার প্রতি আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহ না থাকলে তাদের একদল তোমাকে পথভ্রষ্ট করতে চাইত-ই; কিন্তু তারা নিজেদেরকে ব্যতীত আর কাউকেও পথভ্রষ্ট করতে সক্ষম হবে না এবং তোমার কোনোই অনিষ্ট সাধন করতে পারবে নাআল্লাহ্ আপনার প্রতি আসমানী কিতাব ও প্রজ্ঞা অবতীর্ণ করেছেন এবং আপনাকে এমন বিষয় শিক্ষা দিয়েছেন যা আপনি আগে জানতেন নাআপনার প্রতি আল্লাহ্ করুনা অসীম (সূরা আন নিসা :১১৩)

নিশ্চয়ই আমার প্রিয় বান্দাদের উপর শয়তানের কোনই অধিকার নেইআর কর্মবিধায়ক হিসেবে তোমার প্রতিপালকই যথেষ্ট (সূরা বনী ইসরাঈল ১৭:৬৫)

.রাসূলুল্লাহ্ হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) রক্ত-মাংসের দেহধারী মানুষ ছিলেন

হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ছিলেন রক্ত-মাংসের দেহধারী একজন মানুষতবে এ মত সম্পর্কে আজ অবধি যেমন বিভ্রান্তি ও বিতর্ক সৃষ্টি করা হচ্ছে, তাঁর নবুওয়ত প্রাপ্তির সময়ও তা তেমনই ছিলোশুধু পার্থক্য এতোটুকু যে, নবুওয়ত প্রাপ্তির সময় এ সম্পর্কে বিতর্ক সৃষ্টি ও বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়েছিলো কাফির, মুশরিক, ইয়াহুদী ও খৃষ্টানদের পক্ষ থেকে, আর আজ স্বয়ং উম্মতে মুহাম্মদীর মাঝেই কতিপয় দল এ নিয়ে বাড়াবাড়ি করে ফিত্না ছড়াচ্ছেরাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রতি এদের ধারণা সম্পর্কে আল্লাহ্ পাকের পক্ষ থেকে ইরশাদ হয়েছেÑ

যখন তাদের নিকট আসে সুস্পষ্ট পথ-নির্দেশ (হিদায়াত), তখন লোকদেরকে ঈমান আনা হতে বিরত রাখে তাদের এই উক্তিÑ আল্লাহ্ কি একজন মানুষকে রাসূল হিসেবে পাঠিয়েছেন? (সূরা বনী ইসরাঈল ১৭:৯৪)

তারা বলে, এ কেমন রাসূল যে আহার করে এবং হাটে-বাজারে যাতায়াত করে; তাঁর নিকট কোনো ফেরেশতা কেন অবতীর্ণ হলো না, যে তাঁর সঙ্গে সতর্ককারীরূপে থাকতো? (সূরা আল ফুরকান ২৫:৭)

রাসূল মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর মানুষ হওয়া সম্পর্কে প্রশ্ন উত্থাপনকারীদের অজ্ঞতা ও ভ্রান্তি নিরসন কল্পে কালামে পাকের অন্যত্র মহান আল্লাহ্ দৃঢ়তার সাথে ঘোষণা করেনÑ

[হে মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)!] বলো, আমার প্রতিপালক পবিত্র মহানআমিতো হচ্ছি কেবল একজন মানুষ, একজন রাসূল (সূরা বনী ইসরাঈল ১৭:৯৩)

বলো, আমিতো তোমাদের মতো একজন মানুষ-ই; আমার প্রতি শুধু ওহী নাযিল হয় যে, তোমাদের ইলাহ্ একমাত্র ইলাহ্ (সূরা আল কাহ্ফ ১৮:১১০)

আল্লাহ্ পাক আরও ঘোষণা করেনÑ

বলো, আমিতো তোমাদের মতো একজন মানুষ; শুধু আমার প্রতি ওহী নাযিল হয় যে, তোমার ইলাহ্ই একমাত্র ইলাহ্। (সূরা হা-মীম-আসসাজদা/ফুসসিলাত৪১:৬)

লোকদের নিকট এটা কি বিস্ময়ের ব্যাপার যে, আমি তাদের মধ্য হতে একজন মানুষের নিকট ওহী প্রেরণ করেছি এই মর্মে যে, তুমি মানুষকে সতর্ক কর এবং মুমিনদেরকে সুসংবাদ দাও যে, তাদের জন্য তাদের প্রতিপালকের নিকট আছে উচ্চ মর্যাদা! কাফিররা বলে, এতো এক সুস্পষ্ট জাদুকর (সূরা ইউনুস ১০:২)

আমাদের মনে রাখতে হবে, সৃষ্টির উপাদানের উপর ভিত্তি করে কোন ব্যক্তির মর্যাদা নির্ণয় করা সরাসরি কুরআন ও হাদীছ বিরোধী কথাকারণ মহান আল্লাহ বলেই দিয়েছেনঃ. নিশ্চয় আল্লাহর নিকট তোমাদের মধ্যে ঐব্যক্তি বেশি সম্মানিত যে তোমাদের মধ্যে সর্বধিক তাক্বওয়াশীল পরহেযগার”। (সূরা হুজুরাত ৪৯:১৩)

নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ হে মানব মণ্ডলি! নিশ্চয় তোমাদের প্রতিপালক এক, সাবধান! কোন আরবীর আজমীর (অনারব) উপর, কোন আজমীর আরবীর উপর প্রাধান্য নেইঅনুরূপভাবে কোন লাল বর্ণের ব্যক্তির কালো ব্যক্তির উপর, কোন কালো ব্যক্তির লাল বর্ণের ব্যক্তির উপর প্রাধান্য নেইপ্রাধান্য একমাত্র তাকওয়া পরহেযগারিতার ভিত্তিতে হবেনিশ্চয় আল্লাহর নিকট তোমাদের মধ্যে ঐ ব্যক্তি বেশি সম্মানিত যে তোমাদের মধ্যে সর্বধিক তাক্বওয়াশীল-পরহেযগার (আহমাদ প্রভৃতি, হাদীছ ছহীহদ্রঃ শাইখ আলবানীর গায়াতুল মারাম, পৃঃ১৯০, হা/৩১৩)

এ জন্যই তো আযরের মত মূর্তী পুজারী মুশরিক ব্যক্তির ঔরষজাত সন্তান হযরত ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) অন্যতম শ্রেষ্ঠ নবী, শুধু কি তাই মহান আল্লাহর খলীল তথা অন্তরঙ্গ বন্ধুও বটে, তার মিল্লাতের অনুসরন করার নির্দেশ আমাদের নবীকেও করা হয়েছেপক্ষান্তরে নূহ নবীর মত একজন সম্মানিত ব্যক্তির ঔরষজাত সন্তান কাফের হওয়ার জন্য নিকৃষ্ট ব্যক্তিবীর্য থেকে মানুষ সৃষ্টি হলেও মানুষই বীর্য অপেক্ষা উত্তমএমনকি তুলনা করাটাও অনর্থকআদী পিতা আদম (আলাইহিস সালাম) মাটির তৈরী হলেও মাটির থেকে তিনি সন্দেহাতীতভাবে উত্তম, এমনকি তুলনা করাটাও বাহুল্য কাজ..আবু লাহাব সম্মানিত কুরাইশ বংশের হয়েও অতি নিকৃষ্ট কাফের, যার শানে আল্লাহ সূরা মাসাদ (লাহাব) নাযিল করেছেনমহান আল্লাহ এই সূরায় বলেনদয়াময়, পরম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরুআবু লাহাবের দুটি হাত ধ্বংস হোক, সে নিজেও ধ্বংস হোকতার সম্পদ, ও যা সে উপার্জন করেছে -কোনই কাজে আসেনিসে অচিরেই লেলিহান অগ্নিতে প্রবেশ করবেএবং তার স্ত্রীও-যে ইন্ধন বহন করে, তার গলদেশে খর্জুরের রশি নিয়ে{সূরা আল মাসাদ/লাহাব}(এ থেকেই অকাট্যভাবে প্রতীয়মান হয় যে, মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব তার জন্মের উপাদানের উপর ভিত্তিশীল নয়বরং এই শ্রেষ্ঠত্ব এবং সম্মান তাক্বওয়ার ভিত্তিতে হয়ে থাকেকাজেই নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নূর থেকে সৃষ্টি না হয়ে মাটি থেকে সৃষ্টি হওয়া তাঁর জন্য মোটেও মানহানিকর বিষয় নয় যেমনটি অসংখ্য বিদআতী তাই ধারণা করে বসেছেবরং নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মাটির তৈরী হয়েও সৃষ্টির সেরা ব্যক্তিত্ব, সর্বাধিক মুত্তাক্বী-পরহেযগারসমস্ত সৃষ্টি কুলের সর্দার, বীকুল শিরোমণী, আল্লাহর খালীল-অন্তরঙ্গ বন্ধুআল্লাহর অনুমতি সাপেক্ষে হাশরের মাঠে মহান শাফাআতের অধিকারী, হাওযে কাউছারের অধিকারী, সর্ব প্রথম জান্নাতে প্রবেশকারীমাক্বামে মাহমূদের অধিকারী, হমাতুল লিল আলামীন, শাফিঊল লিল মুযনিবীনএসব বিষয়ে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের মাঝে কোনই দ্বিমত নেইইহাই ছাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈনে ইযাম, আইম্মায়ে মুজতাহিদীনের বিশ্বাসযুগ পরম্পরায় এই বিশ্বাসই করে আসছেন সকল সুন্নী মুসলিম

সৃষ্টির উপাদানের ভিত্তিতে ব্যক্তি শ্রেষ্ঠত্ব অজর্ন করে এটা ইবলীস শয়তানের ধারণা ও দাবী মাত্রএই অলিক ধারণার ভিত্তিতেই সে আগুনের তৈরী বলে মাটির তৈরী আদমকে সিজদাহ করতে অস্বীকার করে ছিলঅথচ আল্লাহ অন্যান্য ফেরেশতাদের সাথে তাকেও আদমকে সিজদা করার নির্দেশ করে ছিলেনতার উচিত ছিল আদমকে সেজদা করা কিন্তু সে তা না করে নিজ সৃষ্টির উপাদানের খোড়া যুক্তি দেখিয়ে নিজেকে উত্তম ও হযরত আদম (আলাইহিসালাম)কে অধম মনে করে আদমকে সিজদা করা থেকে বিরত হয়ে ছিল

মহান আল্লাহ সূরা আরাফে তার ঘটনাটি এইভাবে উদ্ধৃত করেছেনঃ আর আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি, এর পর আকার-অবয়ব তৈরী করেছিঅতঃপর আমি ফেরেশতাদেরকে বলেছি-আদমকে সেজদা কর, তখন সবাই সেজদা করেছে, কিন্তু ইবলীস সে সেজদাকারীদের অন্তর্ভূক্ত ছিল নাআল্লাহ বললেন: আমি যখন নির্দেশ দিয়েছি, তখন তোকে কিসে সেজদা করতে বারণ করল? সে বলল: আমি তার চাইতে শ্রেষ্ঠআপনি আমাকে আগুন দ্বারা সৃষ্টি করেছেন, আর তাকে সৃষ্টি করেছেন মাটি দ্বারাবললেনঃ তুই এখান থেকে নেমে যাএখানে অহঙ্কার করার অধিকার তোর নাইঅতএব তুই বের হয়ে যানিশ্চয় তুই হীনতমদের অন্তর্ভূক্ত (সূরাআল আরাফ:১১-১৩)

(অতএব যারা সৃষ্টির উপাদানের ভিত্তিতে ব্যক্তির শ্রেষ্ঠত্ব সাব্যস্ত করার পক্ষপাতি তাদের উপর্যুক্ত আয়াতগুলি থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত, চিন্তা করা উচিত যুক্তিটি কোন ভদ্রলোকের? নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)কে নূরের তৈরী গণ্য করা হলে তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ হবে, আর মাটির তৈরী গণ্য করলে সেই শ্রেষ্ঠত্ব বিলুপ্ত হবে, তাতে তার মানহানী হবে মর্মের যুক্তিটি শয়তানের যুক্তির সাথে মিলে কিনা চিন্তা-ভাবনা করার উদাত্ত আহ্বান রইল

নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)কে নূরের তৈরী জ্ঞান করাবা এই বিশ্বাস ধারণ করাএসব প্রকৃতই জাল এবং বাতিল হাদীসের উপর নির্ভরশীল ভিত্তিহীন কথা (দ্রঃ ছহীহাহ, ১/৮২০, ৪৫৮ নং হাদীছের অধীন আলোচনা দ্রষ্টব্য)নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মাটির তৈরী এই বিষয়ে অতীতে ছালাফে ছালেহীনের মাঝে কোনই বিতর্ক ছিল নাএখনও যারা প্রকৃত আলেম তারাও এই মর্মে ঐক্যমত যে নবী (সাল্লাল্লাহু আআইহি ওয়া সাল্লাম) মাটির তৈরী মানুষ ছিলেন, তিনি অন্যান্য সকল মানুষের মত পিতা-মাতার মাধ্যমে পৃথিবীতে এসেছেনতারা এটাও বিশ্বাস করেন যে, মানুষ মাটির তৈরী, ফেরেস্তা নূরের এবং জ্বিনজাত আগুনের তৈরী যেমনটি স্বয়ং নাবী (সাল্লাল্লাহু আআইহি ওয়া সাল্লাম)বলেছেন (মুসলিম, যুহদ ও রাক্বায়িক্ব অধ্যায়, হা/৫৩৪) কারণ এই মর্মে কুরআন ও হাদীসের বাণী একেবারে স্পষ্টএর পরও বিদআতে যাদের আপাদমস্তক নিমজ্জিত,তারা নবী (সাল্লাল্লাহু আআইহি ওয়া সাল্লাম)এর বিষয়ে বিতর্ক উঠায়তারা বলতে চায়, নাবী (সাল্লাল্লাহু আআইহি ওয়া সাল্লাম) মাটির তৈরী নন, বরং তিনি নূরের তৈরী, তার ছায়া ছিল না..ইত্যাদি ইত্যাদিতাই আমরা বিষয়টির ফায়ছালা সরাসরি কুরআন ও নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর হাদীছ থেকে নিব

কারণ মহান আল্লাহ বলেনহে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর, রাসূলের আনুগত্য কর, এবং তাদের কর যারা তোমাদের (ধর্মীয় বা রাষ্ট্রীয় বিষয়ে) নেতৃত্ব দাকারী, আর যদি তোমরা কোন বিষয়ে বিতর্ক কর, তবে বিষয়টিকে আল্লাহ এবং তদীয় রাসূলের দিকে ফিরিয়ে দাও, ইহাই উত্তম এবং ব্যাখ্যার দিক দিয়ে সর্বোৎকৃষ্ট (নিসা:৫৯)

মাটি থেকে নাবী মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর সৃষ্টি হওয়ার প্রমাণ:

ক) কুরআন থেকে:

আমার নিকট আশ্চর্য লাগে যে বিদআতীরা কেমন করে মহান আল্লাহর দ্ব্যর্থহীন বাণীকে অস্বীকার করে বলে যেনাবী (সাল্লাল্লাহু আআইহি ওয়াসাল্লাম) মাটির তৈরী নন, বরং নূরের তৈরীকারণ মহান আল্লাহ একাধিক স্থানে বলেছেন যে নবী (সাল্লাল্লাহু আআইহি ওয়া সাল্লাম) সৃষ্টিগত দিক থেকে بشر তথা আমাদের মতই একজন মানুষযেমন:

১.সূরা কাহাফে মহান আল্লাহ রশাদ করেন(হে রাসূল!) আপনি বলে দিন, আমি তো তোমাদেরই মত এক জন মানুষ, আমার নিকট এই মর্মে ওহী করা হয় যে, তোমাদের উপাস্য এক ও একক, অতএব যে নিজ প্রতিপালকের দিদার লাভের আশাবাদী সে যেন সৎকর্ম করে এবং নিজ প্রতিপালকের ইবাদতে অন্য কাউকে শরীক না করে (সূরা আল কাহাফ ১৮:১১০)

২.       অন্যত্র মহান আল্লাহ বলেন: আপনি বলুন আমি আমার প্রতিপালকের পবিত্রতা বর্ণনা করছিএকজন মানব, একজন রাসূল বৈ আমি কে? (সূরা বনী ইসরাইল ১৭:৯৩)

৩.       তিনি আরো বলেন:নিশ্চয় আল্লাহ মুমিনদের বড় উপকার করেছেন, যেহেতু তাদেরই মধ্য থেকে একজনকে রাসূল হিসাবে পাঠিয়েছেন যিনি তাদের নিকট তাঁর আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করেন, তাদেরকে পরিশুদ্ধ করেন, এবং তাদেরকে কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দান করেন, যদিও তারা ইতোপূর্বে স্পষ্ট গুমরাহীতে নিমজ্জিত ছিল। (সূরাহ আলে ইমরান:১৬৪)

৪.       তিনি আরো বলেন: তোমাদের নিকট আগমন করেছে, তোমাদেরই মধ্যকার এমন একজন রাসূল, যার কাছে তোমাদের ক্ষতিকর বিষয় অতি কষ্টদায়ক মনে হয়, যিনি হচ্ছেন তোমাদের খুবই হিতাকাঙ্খী, মুমিনদের প্রতি বড়ই স্নেহশীল, করুনাপরায়ণ। (সূরা তাওবা:১২৮)

৫.       তিনি আরো বলেন: এ লোকদের জন্যে এটা কী বিস্ময়কর হয়েছে যে, আমি তাদের মধ্য হতে একজনের নিকট অহী প্রেরণ করেছি এই মর্মে যে, তুমি লোকদেরকে ভয় প্রদর্শন কর এবং যারা ঈমান এনেছে তাদরকে এই সুসংবাদ দাও যে, তারা তাদের প্রতিপালকের নিকট (পূর্ণ মর্যাদা) লাভ করবে, কাফেররা বলতে লাগলো যে, এই ব্যক্তি তো নিঃসন্দেহে প্রকাশ্য যাদুকর। (সূরা ইউনুস ১০:২)

৬.       তিনি আরো বলেন: তিনিই নিরক্ষরদের মধ্য থেকে একজন রাসূল প্রেরণ করেছেন তাদের নিকট, যিনি তাদের কাছে পাঠ করেন তাঁর আয়াতসমূহ, তাদেরকে পবিত্র করেন এবং শিক্ষা দেন কিতাব ও হিকমত, যদিও তারা ইতোপূর্বে ¯পষ্ট গোমরাহীতে লিপ্ত ছিল। (সূরা-আল জুমুআহ ৬২:২)

৭.       আল্লাহ আরো বলেন: আমি তোমাদের মধ্য হতে এরূপ রাসূল প্রেরণ করেছি যে, তোমাদের নিকট আমার নিদর্শনাবলী পাঠ করে ও তোমাদেরকে পবিত্র করে এবং তোমাদেরকে গ্রন্থ ও বিজ্ঞান শিক্ষা দেয়, আর তোমরা যা অবগত ছিলে না তা শিক্ষা দান করেন। (সূরা বাকারা :৫১)

এখানে মহান আল্লাহ বলেই দিয়েছেন যেনাবী (সাল্লাল্লাহু আআইহি ওয়া সাল্লাম) ঐসব লোকদেরই একজন, তিনি তাদের বাইরের কোন লোক ননকাজেই ঐসব লোক যদি নূরের তৈরী হন, তাহলে নাবী (সাল্লাল্লাহু আআইহি ওয়া সাল্লাম)ও নূরের তৈরী হবেন, আর যদি তারা নূরের তৈরী না হন তবে তিনিও নূরের তৈরী হবেন না এটাইতো স্বাভাবিকআসলে বিদআতীরা কুরআন ও ছহীহ হাদীছ আয়ত্ব করতে এবং এর সঠিক ব্যাখ্যা অনুধাবন করা থেকে চির ব্যর্থ, তাই তারা নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সম্পর্কে কুরআন ও হাদীছ বিরোধী কথা বলে যেনাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মাটির তৈরী নন, বরং তিনি নূরের তৈরীঅথচ এভাবে তারা নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)কে অধিক সম্মান দিতে গিয়ে আরো তাঁকে খাটো করে দিয়েছেকারণ নূরের তৈরী ফেরেশতার উপর আল্লাহ মাটির তৈরী হযরত আদম (আলাইহিস সালাম)কে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেনতাদেরকে দিয়ে আদমের সিজদা করিয়ে নিয়েছেন। (দ্রঃ সূরা আল বাকারাহ:৩৪, সূরা আল আরাফ:১১) তাহলে কার শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত হল? নূরের তৈরী ফেরেশতাদের নাকি মাটির তৈরী আদম (আলাইহিস সাল্লাম)এর? অবশ্যই মাটির তৈরী আদম (আলাইহিস সালাম) এর শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত হলতবে আমরা তর্কের খাতিরে এটা বললেও আমাদের বিশ্বাস, আদম (আলাইহিস সালাম) ফেরেশতাদের উপর শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে ছিলেন তাঁর ইলমের মাধ্যমেআর এটা একমাত্র আল্লাহর অনুগ্রহেই হয়ে ছিলতিনিই আদমের প্রতি অনুগ্রহ করে ফেরেশতাদের চেয়ে তাকে বেশা ইলম দান করে ছিলেন

আমি বিশ্বের সকল বিদআতীকে বলতে চাই, এক লক্ষ চব্বিশ হাজার নাবী ও রাসূল (অনেকে বলেন: নাবী ও রাসূলদের সর্ব মোট সংখ্যা হল: এক লক্ষ চব্বিশ হাজার, মতান্তরে দুই লক্ষ চব্বিশ হাজারএভাবে বলে থাকেন, এটা প্রমাণ করে তারা ঐমর্মে নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর কোন হাদীছ অবগত হন নিমুসনাদ আহমাদ, ছহীহ ইবনু ইব্বান প্রভৃতিতে নবী ও রাসূলদের সর্ব মোট সংখ্যা একলক্ষ চব্বিশ হাজার বলা হয়েছে, আরো বলা হয়েছে তাদের মধ্যে রাসূলদের সংখ্যা সর্ব মোট ৩১৫ জন দ্রঃ মুসনাদ আহমাদ ৫/১৭৯, হা/২১৫৯২প্রভৃতি হাদীছ ছহীহ, সিলসিলাতুল আহাদীছ আছ ছহীহাহ ) এর মধ্যে শুধু নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কিভাবে নূরের তৈরী হলেন? যদি তাঁকে নূরের তৈরী না বলায় তার মান খাটো করা হয়, তবে বাকী এক লক্ষ তেইশ হাজার নয়শো নিরানব্বই জন নাবী রাসূলকে মাটির তৈরী বলে কি তাদের মান খাটো করা হয় না? নাকি তারাও নূরের তৈরী? কৈ কোন বিদআতীকে তো বলতে শুনি না যে নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর মত বাকী সমস্ত নাবী, রাসূলগণও নূরের তৈরী! বরং তারা এমনটি শুধু নাবী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর ক্ষেত্রেই বলে থাকেসুতরাং বাকী সমস্ত নাবীকে মাটির তৈরী বলায় যেমন তাদের মানহানী হয় না, তদ্রুপ আমাদের নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)কেও মাটির তৈরী বলায় তার মানহানী হবে নাতবে কেন বিষয়টি নিয়ে এত বাড়াবাড়ি?

এমনকি অনেক মূর্খ বিদআতী নাবীকে যারা মাটির তৈরী মানুষ বলে তাদের সকলকে কাফের ফাতওয়া মেরে দেয়! একজন মুসলিম দাবীদারকে কাফের বলা কী এতই সহজ? না, কখনই নয়, বরং এই বিষয়টি অতীব জটিল এবং সুকঠিনকারণ একজন মুসলিম ব্যক্তিকে কাফির ফাওয়া দেওয়ার অর্থই হল: সে জীবিত অবস্থায় থাকলে তার সাথে তার স্ত্রীর সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যাবেনিজ মুসলিম সন্তানসন্ততির উপর তার অবিভাবকত্ব চলবে নাসে মৃত্যু বরণ করলে তাকে গোসল দেওয়া যাবে না, কাফন পরানো যাবে না, তার জানাযা ছালাত আদায় করা যাবে নাতার জন্য মাগফিরাতের দুআ করা যাবে না, মুসলিমদের কবরস্থানে তাকে দাফন করা যাবে নাতার কোন মুসলিম আত্মীয় স্বজন তার মীরাছ পাবে না, বরং তার সমুদয় ধন-সম্পদ সরকারী বায়তুল মালে জমা হয়ে যাবেপরকালে সে জাহান্নামে চিরস্থায়ীভাবে বসবাস করবে…প্রভৃতিআর যদি সে প্রকৃত অর্থে কাফের না হয় তবে কাফের ফাতওয়া দাতা আল্লাহর উপর মিথ্যারোপকারী বলে গণ্য হবে ফলে সে সর্বাধিক যালিমে পরিণত হবেআর তার একমাত্র বাসস্থান হবে জাহান্নাম (দ্রঃ সূরা আরাফ)এবং তাকে অন্যায়ভাবে কাফের বলার জন্য নিজেই কাফিরে পরিণত হবে (বুখারী প্রভৃতি)এ থেকেই প্রতীয়মান হয় বিষয়টি কত জটিল এবং সুকঠিনএজন্যই বড় বড় ওলামায়েদ্বীন মুসলিম ব্যক্তিকে সহজে কাফের বলেন না,বরং সে ক্ষেত্রে বহু সতর্কতা অবলম্বন করে থাকেন) তাদের এই মূর্খামীদুষ্ট ফাওয়া অনুযায়ী সালাফে ছালেহীনের সকলই কাফের গণ্য হবেকারণ তারা সৃষ্টি গত দিক থেকে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে মাটির তৈরী মানুষই মনে করতেনতাঁরা আদৌ তাঁকে নূরের তৈরী গণ্য করতেন না

.রাসূলুল্লাহ্ মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উম্মী ছিলেন

রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জাগতিক বস্তুগত ধ্যান-ধারণাসমৃদ্ধ শিক্ষাগ্রহণ ও অক্ষর জ্ঞান হতে সম্পূর্ণ মুক্ত ছিলেনকিন্তু উম্মীয়াৎ সাধারণ মানুষের জন্য ত্রটির ও অমর্যাদার কারণ হলেও রাসূলুলল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জন্য তা ছিলো বিশেষ গুণস্বরূপকারণ, উম্মী হয়েও তিনি ধারণ করেছিলেন আল-কুরআনের ন্যায় এক বিশাল জ্ঞান-ভাণ্ডার সম্বলিত আসমানী কিতাব; উম্মী হয়েও তিনি ছিলেন পৃথিবীর সকল শিক্ষকের শিক্ষকএ ছাড়াও উম্মীয়াৎ ছিলো নাবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর জন্য আল্লাহ্ পাক প্রদত্ত এক সার্বক্ষণিক মুজিযা ও হিকমতস্বরূপযারা উম্মী নবী মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর অনুসরণ করবে তারাই সফলকামএ সম্পর্কে আল্লাহ্ পাক বলেনÑ

যারা অনুসরণ করে বার্তাবাহক উম্মী নাবীর, যাঁর সম্পর্কে তারা তাওরাত, ঈঞ্জীল এবং যা তাদের নিকট রয়েছে তাতে লেখা দেখতে পায়… আর তারাই সফলকাম (সূরা আল আরাফ :১৫৭)

রাসূলুল্লাহ্ উম্মীয়াৎ সম্পর্কে আল্লাহ্ পাক আরও ইরশাদ করেনÑ

হে নবী! আপনি (কুরআন নাযিল হওয়ার) পূর্বে কোনো কিতাব পড়েননি, নিজ হাত দ্বারা কোনো কিছু লিখেনওনিকেননা যদি আপনি তা করতেন তবে বাতিলপন্থীরা সন্দেহে পড়ে যেতো (সূরা আল আনকাবুত ২৯:৪৮)

.হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হচ্ছেন দুনিয়ার বুকে আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন কর্তৃক প্রেরিত সর্বশেষ নাবী ও রাসূল

হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর পরে নতুন কোনো নাবী ও রাসূল দুনিয়ার বুকে আগমন করবেন নাএমনকি কাদিয়ানী সম্প্রদায়ের বিকৃত মস্তিষ্কপ্রসূত তথাকথিত জিল্লি নবী, বুরুজী নবী, উম্মতী নবী, শরিয়তবিহীন নবী প্রভৃতি নিত্য-নতুন শব্দ ও ফর্মুলা উপস্থাপন করেও নতুন নবুওয়তের সন্ধান পাওয়া যাবে নাএ প্রসঙ্গে স্বয়ং আল্লাহ্ পাক সাক্ষ্য দিচ্ছেনÑ

মুহাম্মদ তোমাদের মধ্যে কোনো পুরুষের পিতা নন; বরং সে আল্লাহ্রাসূল এবং সর্বশেষ নবীআল্লাহ্ সর্ববিষয়ে সর্বজ্ঞ (সূরা আল আহযা৩৩:৪০)

বী মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর ওফাতের নিকটবর্তী সময়ে আরাফাত ময়দানে মুসলিম মিল্লাতের এক বৃহৎ সমাবেশে দ্বীন ইসলাম, ইসলামী শরীয়াহ্, ধর্মীয় আকীদাহ্ ও হুকুম-আহ্কাম সম্পর্কিত এক আবেগপূর্ণ ভাষণ দেননবীজীর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ভাষণের এক পর্যায়ে আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীনের নিকট হতে দ্বীন ইসলামকে পরিপূর্ণ করে দেয়া সংক্রান্ত ওহী নাযিল হলোমহান আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীনের পক্ষ হতে ঘোষিত হলোÑ

তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে মৃত জীব, রক্ত, শুকরের মাংস, যেসব জন্তু আল্লাহ্ ছাড়া অন্যের নামে উৎসর্গ করা হয়, যা কণ্ঠরোধে মারা যায়, যা আঘাত লেগে মারা যায়, যা উচ্চস্থান থেকে পতনের ফলে মারা যায়, যা শিং এর আঘাতে মারা যায়, যাকে হিংস্র জন্তু ভক্ষণ করেছে কিন্তু যাকে তোমরা যবেহ করেছযে পশু যজ্ঞবেদীতে যবেহ (বলি দান) করা হয় এবং যা ভাগ্য নির্ধারক শর (তীর) দ্বরা বন্টন করা হয়এসব গোনাহর কাজআজ কাফিররা তোমাদের দ্বীন থেকে নিরাশ হয়ে গেছেঅতএব তাদেরকে ভয় করো না বরং আমাকে ভয় করআজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম এবং তোমাদের উপর আমার নেয়ামত পূর্ণ করে দিলাম আর দ্বীন (জীবন ব্যবস্থা, ধর্ম) হিসেবে ইসলামকে তোমাদের জন্য মনোনীত করলামঅতএব যে ব্যক্তি তীব্র ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়ে; কিন্তু কোন গোনাহর প্রতি প্রবণতা না থাকে, তবে নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তায়ালা ক্ষমাশীল (সূরা আল মায়িদাহ্ :৩)

যেহেতু আল্লাহ্ পাক নাবী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর মাধ্যমে দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিলেন সেহেতু তাঁর পরে আর কোন নাবী কিংবা রাসূল আগমনের কোন আবশ্যকতাও নেইসুতরাং মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সর্বশেষ নাবী ও রাসূলখতমে নবুওয়তের এই আকীদাহ্ প্রতিটি মুসলমানের জন্যই অনস্বীকার্যখতমে নবুওয়তের এই আকীদাহকে অস্বীকার করলে কিংবা এ আকীদার প্রতি কোনো মুসলমান সন্দেহ পোষণ করলে কিংবা এ আকীদাহ্ অস্বীকারকারীকে মুসলিমগণ্য করলে কিংবা এ আকীদাহ্ অস্বীকারকারীকে কাফির গণ্য না করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ঈমানদার হিসেবে গণ্য হবেন নাআল্লাহ্ পাক তাঁর ওহীর দরজা কিয়ামত পর্যন্ত বন্ধ করে দিয়েছেনএরপরও যদি কেউ দাবী করে যে তাঁর নিকট ওহী নাযিল হয় তবে তার সম্পর্কে আল্লাহ্ পাক ফরমানÑ

আর সে ব্যক্তির চেয়ে বড় জালেম আর কে হবে যে আল্লাহর সম্পর্কে মিথ্যা অপবাদ রটায় অথবা বলে আমার কাছে ওহী এসেছে অথচ তার ওপর কোন অহী নাযিল করা হয়নি অথবা যে আল্লাহর নাযিল করা জিনিসের মোকাবিলায় বলে, আমি এমন জিনিস নাযিল করে দেখিয়ে দেবো? হায়! তুমি যদি জালেমদেরকে সে অবস্থায় দেখতে পেতে যখন তারা মৃত্যু যন্ত্রণায় কাতরাতে থাকবে এবং ফেরেশতারা হাত বাড়িয়ে বাড়িয়ে বলতে থাকবেনাও, তোমাদের প্রাণ বের করে দাওতোমরা আল্লাহর প্রতি অপবাদ আরোপ করে যেসব অন্যায় ও অসত্য কথা বলতে এবং তাঁর আয়াতের বিরুদ্ধে যে ঔদ্ধত্য প্রকাশ করতে তারই শাস্তি স্বরূপ আজ তোমাদের অবমাননাকর শাস্তি দেয়া হবে (সূরা আনআম ৬:৯৩)

এরপরও যদি কেউ দাবী করে যে তাঁর নিকট ওহী নাযিল হয় তবে সূরা আনআম এর ১২১ নং আয়াত অনুযায়ী সে ব্যবস্থাও আল্লাহ্ চালু রেখেছেনসেটি হলো শয়তানের ওহীতাইতো আল-কুরআনে ইরশাদ হয়েছে: নিশ্চয়ই শয়তান তার আওলিয়াদের (বন্ধুদের) কাছে ওয়াহী করে, তারা যেন তোমাদের (মুসলিমদের) সাথে তর্ক করে। (হে মুসলিমরা সাবধান) যদি তোমরা তাদের আনুগত্য করো, তাহলে তোমরাও মুশরিক হয়ে যাবে(সূরা আনআম ৬:১২১)

.দুনিয়া কিংবা আখিরাত এর কোনটিই নাবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর জন্য সৃষ্টি করা হয়নি

হে মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)! আপনি না হলে আমি আসমান, জমিন বা বিশ্বজাহান কিছুই সৃষ্টি করতাম নাকিংবা আপনাকে সৃষ্টি না করলে আল্লাহ্ পাক কোনো কিছুই সৃষ্টি করতেন নাবিভিন্ন বক্তার বক্তব্যে এবং কিছু কিছু সীরাত গ্রন্থে-প্রবন্ধে দালিলিক প্রমান ছাড়াই এ ধরনের বক্তব্য উপস্থাপিত হতে দেখা যায়অথচ আল্লামা সাগানী, মোল্লা আলী ক্বারী, শায়খ আব্দুল হাই লাখনবী সহ অন্যান্য মুহাদ্দিস একবাক্যে কথাটিকে বানোয়াট ও ভিত্তিহীন বলে উল্লেখ করেছেনকারণ এই শব্দ ও বাক্য কোনো হাদীসের গ্রন্থে কোনো প্রকার সনদে বর্ণিত হয়নি[দেখুন হাদীসের নামে জালিয়াতি : ড. খোন্দকার আ.ন.ম. আব্দুল্লাহ্ জাহাঙ্গীর, পৃ. ২৪৭] অনেকে আবার সনদ উদ্ধার করতে ব্যর্থ হয়ে এ বাক্যটিকে হাদীসে কুদসি বলে উল্লেখ করে থাকেনঅথচ স্বয়ং আল্লাহ্ সুব্হানাহু ওয়া তায়ালা কুরআনুল কারীমে দ্ব্যর্থহীনভাবে সুস্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছেনÑ

নিশ্চয়ই আমি জ্বিন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছি একমাত্র আমার ইবাদতের জন্য (সূরা যারিয়াত ৫১:৫৬)

আর নিশ্চয়ই আখিরাত ও দুনিয়া আমারই জন্য (সূরা লাইল ৯২:১৩)

অর্থাৎ আল্লাহ্ পাক এ বিশ্বজগতের সকল কিছু সৃষ্টি করেছেন একমাত্র তাঁরই জন্য; তাঁরই ইবাদত ও গোলামী করার জন্য; তাঁর কোনো সৃষ্টিকে উদ্দেশ্য করে নয়

কালামে পাকে আল্লাহ্ বারী তায়ালা ইরশাদ করেনÑ

অতএব [হে মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)!] আপনি রব্বের সৌন্দর্য স্মরণ করুন এবং সেজদাকারীদের অন্তর্ভূক্ত হয়ে যান এবং আপনার রব্বের ইবাদত করতে থাকুন যতক্ষণ না আপনার মৃত্যু এসে উপস্থিত হয় (সূরা আল হিজর ১৫:৯৮-৯৯)

অর্থাৎ, আখেরী নবী মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে আল্লাহ্ পাক সৃষ্টিই করেছেন তাঁর সার্বভৌমত্বের দাওয়াত দুনিয়ার বুকে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য এবং তাঁর ইবাদত করার জন্যসুতরাং মহান আল্লাহ্ পাকের বাণীর সাথে সামঞ্জস্যহীন এবং সাংঘর্ষিক কোনো বাক্য বা বক্তব্যকে হাদীসে কুদসী হিসেবে উপস্থাপন করে রাসূল মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর মর্যাদা বৃদ্ধির চেষ্টা কোন মতেই গ্রহণযোগ্য নয়

.রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রকৃত গায়েব জানতেন না

মহান আল্লাহ্ পাক রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)কে প্রিয় বান্দা হিসেবে অনুগ্রহপূর্বক যা কিছু অবলোকন করিয়েছেন এবং যে সকল বিষয়ে অবগত করেছেন তা ব্যতীত অপরাপর কোনো বিষয় বা গায়েব সম্পর্কে তিনি অবহিত নন বা ছিলেন নাগায়েব জানা আল্লাহ্ পাকের একটি অনন্য গু তাই এই গু অন্য কারও আছে বিশ্বাস করাটা শির্কএ প্রসঙ্গে স্বয়ং আল্লাহ্ পাক ফরমানÑ

আল্লাহ্ পাক আরো ফরমান-

তাঁরই কাছে আছে গায়েবের চাবি, তিনি ছাড়া আর কেউ তা জানে নাজলে- স্থলে যা কিছু আছে সবই তিনি জানেনতাঁর অজ্ঞাতসারে গাছের একটি পাতাও পড়ে নামৃত্তিকার অন্ধকার প্রদেশে এমন একটি শস্যকণাও নেই যে স¤পর্কে তিনি অবগত ননশুষ্ক ও আর্দ্র সবকিছুই একটি সুস্পষ্ট কিতাবে লিখিত আছে (সূরা আল আনআম :৫৯)

আল্লাহ এমন এক চিরঞ্জীব ও চিরন্তন সত্তা যিনি সমগ্র বিশ্ব-জাহানের দায়িত্বভার বহন করছেন, তিনি ছাড়া আর কোন ইলাহ নেইতিনি ঘুমান না এবং তন্দ্রাও তাঁকে স্পর্শ করে নাপৃথিবী ও আকাশে যা কিছু আছে সবই তাঁরকে আছে তাঁর অনুমতি ছাড়া তাঁর কাছে সুপারিশ করবে? যা কিছু মানুষের সামনে আছে তা তিনি জানেন এবং যা কিছু তাদের অগোচরে আছে সে সম্পর্কে তিনি অবগততিনি নিজে যে জিনিসের জ্ঞান মানুষকে দিতে চান সেটুকু ছাড়া তাঁর জ্ঞানের কিছুই তারা আয়ত্ব করতে পারে নাতাঁর কর্তৃত্ব আকাশ ও পৃথিবী ব্যাপীএগুলোর রক্ষণাবেক্ষন তাঁকে ক্লান্ত পরিশ্রান্ত করে নামূলত তিনিই এক মহান ও শ্রেষ্ঠ সত্ত্বা (সূরা বাকারাহ :১৮৬)

রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) গায়েব জানেন এরূপ ধারণা সাহাবীদের মাঝে কেউ কেউ পোষণ করতেন যার পরিপ্রেক্ষিতে স্বয়ং আল্লাহ্ পাক রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে লোকদের উদ্দেশ্যে জানিয়ে দিতে নির্দেশ দিলেন-

[হে মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)!] বলুন, আমি জানি না তোমাদের প্রতিশ্রুত বিষয় আসন্ন না আমার রব্ব-এর জন্য কোন মেয়াদ স্থির করে রেখেছেনতিনি হচ্ছেন গায়েব সম্পর্কে জ্ঞাতঅন্য কারও নিকট তা তিনি প্রকাশ করেননিতবে, রাসূলদের মধ্যে কাউকে কাউকে খুশী হয়ে জানিয়েছেনতখন তিনি তার অগ্রে ও পশ্চাদে প্রহরী নিযুক্ত করেন যাতে আল্লাহ্ তায়ালা জেনে নেন যে, রাসূলগণ তাঁদের রব্বের পয়গাম পৌঁছেছিলেন কি-নারাসূলগণের কাছে যা আছে, তা তাঁর জ্ঞান গোচরতিনি সবকিছুর সংখ্যার হিসাব রাখেন (সূরা জিন ৭২:২৫-২৮)

প্রকৃতপক্ষে গায়েব বলতে যা বুঝায় তা জানেন একমাত্র আল্লাহ্তিনিই আলিমুল গ্বাইবএটি তাঁর একটি সিফাতআর আল্লাহ্ পাকের সিফাতে অন্য কাউকে সহযোগী বা অংশীদার সাব্যস্ত করা র্শিকরাসূল মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রকৃত গায়েব সম্পর্কে অবগত ছিলেন না এবং আল্লাহ্ এ ঘোষনা সম্পর্কে যারা সন্দেহ পোষণ করছে বা বিভ্রান্তিতে আছে তাদের উদ্দেশ্যে নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)কে আল্লাহ্ পাক নিঃসংকোচে সুস্পষ্টরূপে ঘোষণা করতে বলেছেনÑ

[হে মুহাম্মদ(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)!] আপনি বলুন, আল্লাহ্ ব্যতীত নভোমণ্ডল ও ভূ-মণ্ডলে কেউ গায়েবের খবর জানে না এবং তারা জানে না যে, তারা কখন পুনরুজ্জীবিত হবে (সূরা আন নমল ২৭:৬৫)

অপর এক আয়াতে আবারও সুস্পষ্টরূপে ঘোষণা করতে বলেনÑ

[হে মুহাম্মদ(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)!] বলুন, আমি তোমাদেরকে এ কথা বলিনা যে, আমার নিকট আল্লাহ্র ধন-ভাণ্ডার আছেগায়েব সম্বন্ধেও আমি অবগত নই; এবং তোমাদেরকে একথাও বলিনা যে আমি ফেরেশতা; আমার প্রতি যে ওহী আসে আমি কেবল তারই অনুসরণ করিবলুন, অন্ধ ও চক্ষুষ্মান কি সমান? তোমরা কি অনুধাবন কর না? (সূরা আল আনআম :৫০)

আল্লাহ্ পাক আরো ঘোষণা করতে বলেন-

বলো, আল্লাহ্ যা ইচ্ছা করেন তা ব্যতীত আমার ভালো-মন্দের উপরও আমার কোনো অধিকার নেইআমি যদি গায়েব জানতাম তবে তো আমি বহুবিধ কল্যাণই লাভ করতে পারতাম এবং কোনো অকল্যাণই আমাকে স্পর্শ করতে পারতো নাআমি কেবল মুমিন সম্প্রদায়ের জন্য সতর্ককারী ও সুসংবাদবাহী (সূরা আল আরাফ :১৮৮)

[হে মুহাম্মদ(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)!] বলো, আমিতো তোমাদেরকে  বলি না যে, আল্লার ধন-ভাণ্ডার আমার নিকট রয়েছে, একথাও বলি না যে, আমি গায়েবের খবর জানি এবং এও বলিনা যে, আমি একজন ফেরেশতা; আর তোমাদের দৃষ্টিতে যারা লাঞ্ছিত আল্লাহ্ তাদের কোন কল্যাণ দান করবেন নাতাদের মনের কথা আল্লাহ্ ভাল করেই জানেনসুতরাং এমন কথা বললে আমি অন্যায়কারী হবো (সূরা হুদ ১১:৩১)

.রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সদা-সর্বদা সর্বত্র হাযির-নাযির নন

একমাত্র মহান আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তায়ালাই সদা-সর্বদা-সর্বত্র হাযির-নাযিরএটি একমাত্র তাঁরই সিফাততাঁর এই সিফাতে অন্য কাউকে অংশীদার সাব্যস্ত করা র্শিকএ প্রসঙ্গে কালামে পাকে ইরশাদ হয়েছেÑআমি মানুষের গ্রীবাস্থিত ধমনী অপেক্ষাও নিকটতর (সূরা ক্বা৫০:১৬)

তোমরা যেদিকেই মুখ ফিরাওনা কেন সেদিকেই আল্লাহ্ বিরাজমাননিশ্চয় আল্লাহ্ সর্বব্যাপী সর্বজ্ঞ (সূরা আল বাক্বারা:১১৫)

তিনি নভোমণ্ডল ও ভূ-মণ্ডল সৃষ্টি করেছেন ছয়দিনে, অতঃপর তিনি আরশের উপর সমাসীন হয়েছেনএকমাত্র তিনিই জানেন যা কিছু ভূমিতে প্রবেশ করে ও যা কিছু ভূমি হতে বের হয় এবং আকাশ হতে যা কিছু পতিত হয় ও যা কিছু আকাশে উত্থিত হয়তোমরা যেখানেই থাকনা কেন, তিনি তোমাদের সাথে আছেন; তোমরা যা কিছু করো আল্লাহ্ তা জানেন (সূরা আল হাদীদ ৫৭:৪)

.হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নবুওয়ত ছিল সার্বজনীন অর্থাৎ কিয়ামত পর্যন্ত আগমণকারী সকল জ্বীন ও মানুষের জন্য তিনি হলেন নাবী ও রাসূল

অর্থাৎ হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর পূর্ববর্তী নাবী-রাসূলগণ যেমন বিশেষ একটি গোত্র, সম্প্রদায়, জাতি, ধর্ম ও দেশের জন্য প্রেরিত হয়েছিলেন তিনি তদ্রƒপ না হয়ে জাতি-ধর্ম-বর্ণ-গোত্র-দেশ নির্বিশেষে সকলের জন্য প্রেরিত হয়েছিলেনআল্লাহ্ পাক তাঁকে সমগ্র বিশ্ব মানবতার হিদায়াত ও কল্যাণের জন্য প্রেরণ করেছিলেনতাই একথা বলা তাঁর শানে বেয়াদবী হবে যে, তিনি শুধুমাত্র মুসলমান ও ইসলাম ধর্মানুসারীদেরই জন্য প্রেরিত হয়েছিলেন এবং তিনি একমাত্র মুসলমানদেরই নবী ও রাসূলরাসূলে আকরাম গোটা মানবজাতির জন্যই রহমত ও সুসংবাদ বয়ে নিয়ে এসেছেননবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সার্বজনীনতা তথা বিশ্বজনীতার সম্পর্কে স্বয়ং আল্লাহ্ পাক কুরআনের একাধিক স্থানে ঘোষণা দিয়েছেনÑ

[হে মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)!] আমিতো আপনাকে গোটা মানবজাতির জন্যই রাসূল হিসেবে প্রেরণ করেছিআর আল্লাহ্ সব বিষয়েই যথেষ্টÑসববিষয়ই তাঁর সম্মুখে উপস্থিত (সূরা আন নিসা :৭৯)

আমিতো তোমাকে বিশ্বজগতের প্রতি কেবল রহমতস্বরূপ প্রেরণ করেছি (সূরা আল আম্বিয়া ২১:১০৭)

আমিতো তোমাকে সমগ্র মানবজাতির প্রতি সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপেই প্রেরণ করেছিকিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা জানে না (সূরা সাবা ৩৪:২৮)

কতো মহান তিনি (আল্লাহ্) যিনি তাঁর বান্দার প্রতি ফুরকান অবতীর্ণ করেছেন যাতে সে বিশ্বজগতের জন্য সতর্ককারী হতে পারে (সূরা আল ফুরকান ২৫:১)

তিনিই (আল্লাহ্) উম্মীদের মধ্য হতে তাদের জন্য রাসূল প্রেরণ করেছেন …এবং তাদের অন্যান্যদের জন্যও যারা এখনও (ভূমিষ্ঠ হয়নি এবং) তাদের (উম্মীদের) সাথে মিলিত হয়নিআল্লাহ্ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময় (সূরা জুমু ৬২:২,৩)

.বিশ্ব মানবতার হিদায়াত ও কল্যাণের বাণী সম্বলিত সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ স্বয়ংসম্পূর্ণ মহাগ্রন্থ আল-কুরআন রাসূলে আকরাম হযরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর রচিত নয়

তিনি অন্য কারো সহযোগিতায়ও এই কুরআন রচনা করিয়ে নেননিবরং আল্লাহ্ পাক হযরত জিবরাইল আলাইহিস সালাম মারফত ওহীর মাধ্যমে তিল তিল করে ধীরে ধীরে পরিপূর্ণ বিশুদ্ধতার সাথে এই আসমানী কিতাব তাঁর রাসূল মুহাম্মদের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উপর নাযিল করেছেনএ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ পাক ইরশাদ করেনÑ

[হে মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)!] আমি তোমার প্রতি কুরআন অবতীর্ণ করেছি ক্রমে ক্রমে(সূরা দাহর ৭৬:২৩)

আমি তোমার নিকট উত্তম কাহিনী বর্ণনা করছি; ওহীর মাধ্যমে তোমার নিকট এই কুরআন অবতীর্ণ করে (সূরা ইউসুফ ১২:৩)

কুরআন যদি আসমানী কিতাব হয়ে থাকে তবে পূর্ণাঙ্গ কুরআন একবারে নাযিল হলো না কেন? সন্দেহবাদীদের এ অবান্তর প্রশ্নের জবাবে কালামুল্লাহ্তে ইরশাদ হয়েছেÑ

[মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)]কে উদ্দেশ্য করে] কাফিররা বলে, সমগ্র কুরআন তার নিকট একবারে অবতীর্ণ হলো না কেন? (জবাবে আল্লাহ্ পাক বলেন,) এভাবে আমি (কুরআন) অবতীর্ণ করেছি তোমার হৃদয়কে তা দ্বারা মজবুত করার জন্য আর তাই তা ক্রমে ক্রমে স্পষ্টভাবে আবৃত্তি করেছি (সূরা আল ফুরকান ২৫: ৩২)

দীর্ঘ ২২ বৎসর ৫ মাস ১৪ দিন সময় লেগেছে পরিপূর্ণ কুরআন অবতীর্ন হতেআর এতেই কাফির ও সন্দেহবাদীরা বলতে থাকে এত দীর্ঘ সময় ধরে মুহাম্মদ নিজেই কুরআন রচনা করেছেঅবিশ্বাসীদের এহেন আচরণে আল্লাহ্ পাক স্বয়ং চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিলেনÑ

তবে কি তারা বলে, এটি সে নিজে রচনা করেছে? বরং এটি তোমার রব্বের নিকট হতে আগত সত্য যাতে আপনি এমন এক সম্প্রদায়কে সতর্ক করেন, যাদের কাছে আপনার পূর্বে কোন সতর্ককারী আসেনিসম্ভবত এরা সুপথ প্রাপ্ত হবে (সূরা আস্ সাজদা ৩২:৩)

তবে কি তারা বলে সে নিজে এটি উদ্ভাবন করেছে? [হে মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)!] বলো যদি আমি নিজে এটি উদ্ভাবন করে থাকি তবে তোমরাতো আল্লাহ্ শাস্তি হতে আমাকে কিছুতেই রক্ষা করতে পারবে না (সূরা আল আহ্ফাক ৪৬:৮)

তারা কি বলে এই কুরআন তাঁর নিজের রচনা? বরং তারা মিথ্যাবাদীযদি তারা সত্যবাদী হয়ে থাকে তবে এর অনুরূপ কোন রচনা উপস্থিত করুক (সূরা আত্ তুর ৫২:৩৩-৩৪)

তারা কি বলে তুমি নিজে এটি (কুরআন) রচনা করেছ? বলো, তোমরা যদি সত্যবাদী হয়ে থাকো তবে এর অনুরূপ দশটি স্বরচিত সূরা এনে দেখাও (সূরা হুদ ১১:১৩)

তারা কি বলে যে, এটি (কুরআন) রচনা করেছ? বলো, তবে তোমরা এর অনুরূপ একটি সূরা এনে দেখাও (সূরা ইউনুস ১০:৩৮)

সুব্হানাল্লাহ্! আল্লাহ্ পাকের এ চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করার মত কোন মাখলুক অদ্যবধি পাওয়া যায়নি, যাবেও না কিয়ামত পর্যন্ত ইনশা-আল্লাহ্

১০.অধিকাংশ মানুষ দ্বীন সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে বলে থাকেন যে, ইসলাম নামক দ্বীন-জীবন ব্যবস্থা-ধর্ম (সংকীর্ণ অর্থে দ্বীন-কে অনেকে ধর্ম বলে থাকেন) হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রবর্তন করেছেন

বাংলাদেশের প্রায় সকল ইসলাম শিক্ষা বইয়েও এ কথাটিই লেখা আছে দেখতে পেয়েছিঅথচ প্রকৃত সত্য হচ্ছেÑ ইসলাম নামক জীবন ব্যবস্থা আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন স্বয়ং প্রবর্তন করেছেন এবং তাঁর বান্দা ও রাসূল মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তা মানুষের মাঝে প্রচার করেছেনইসলাম সম্পর্কে আল্লাহ্ পাক ফরমান-

আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার নিয়ামত সম্পূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম (সূরা মায়িদাহ ৫:৩)

মহান আল্লাহ্ আরও ফরমান-

নিঃসন্দেহে আল্লাহ্র নিকট গ্রহণযোগ্য দ্বীন হচ্ছে একমাত্র ইসলাম (সূরা আলে ইমরান ৩:১৯)

যে ব্যক্তি ইসলাম ব্যতীত অন্য কোন দ্বীন-জীবন ব্যবস্থা গ্রহণ করতে চায়, তার সে ব্যবস্থা কষ্মিণকালেও কবুল করা হবে না এবং আখিরাতে সে হবে ব্যর্থ ও ক্ষতিগ্রস্ত (সূরা আলে ইমরান ৩:৮৫)

হে ঈমানদারগণ! তোমরা পরিপূর্ণভাবে ইসলামের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাও এবং শয়তানের পদাংক অনুসরণ করো নানিশ্চিতরূপে সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু (সূরা আল বাকারাহ ২:২০৮)

১১.কিয়ামত দিবসেআল্লাহ্র নির্দেশ ব্যতীত রাসূলূল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কারো জন্যে সুপারিশকরার ক্ষমতা রাখেন না।

বুখারীও মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে যে, হাশরের মাঠে মানুষ যখন বিপদে পড়ে যাবে এবং অসহনীয় আযাবে গ্রেপ্তার হবে, তখন তারা একজন সুপারিশকারী খুঁজে ফিরবেযাতে করে তারা এই ভীষণ সংকট থেকে রেহাই পেতে পারেপ্রথমে তারা আদম (আলাইহিস সালাম)এর কাছেগমণ করবেঅতঃপর পর্যায়ক্রমে নূহ, ইবরাহীম, মূসা, ঈসা (আলাইহিস সালাম)এর কাছে যাবেতাঁরা কেউ সুপারিশ করতে সাহস করবেন নাপ্রত্যেক নাবী নিজেদের অক্ষমতার কথা প্রকাশ করবেনঅবশেষে তারা নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর কাছেআসবেতিনি মানুষকে এই বিপদজনক অবস্থা হতে মুক্ত করার জন্য আল্লাহর আরশের নীচে সিজদাবনত হবেনআল্লাহর প্রশংসা ও গুণকীর্তণ করবেনতখন আল্লাহ্ তাঁকেমাথা উঠিয়ে প্রার্থনা করার অনুমতি দিবেনতিনি তখন সমগ্র মানুষের হিসাব-নিকাশের জন্যে আল্লাহর কাছে সুপারিশ করবেনআল্লাহ তাঁর দোয়া এবং শাফায়াত কবুল করবেনএটিই হল মাক্বামে মাহমূদবা সুমহান মর্যাদা, যা আল্লাহ তাকে দান করেছেন। (এসম্পর্কে দীর্ঘ হাদীছ বর্ণিত হয়েছেদেখুন: সহীহ্ বুখারী, অধ্যায়: তাওহীদ, অনুচ্ছেদ: কিয়ামতের দিন নাবী-রাসূল ও অন্যদের সাথে আল্লাহর কথা বলার বিবরণ, হা/৬৯৫৬সহীহ্ মুসলিম, অনুচ্ছেদঃ জান্নাতের সর্বনিম্ন মর্যাদার অধিকারী ব্যক্তি হা/ ২৮৬।)

এই হাদীসের উপর ভিত্তি করে অনেকে বলে থাকেন যে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কিয়ামতের দিন তাঁর ইচ্ছামত পাইকারী হারে উম্মতকে জান্নাতে প্রবেশ করানোর জন্য শাফায়াত তথা সুপারিশ করবেন, তাই আমরা তাঁর নিকট শাফায়াত কামনা করবো। অথচ শাফায়াত বিষয়টি মোটেও তেমন নয়। সকল শাফায়াতের মালিক একমাত্র আল্লাহ্ তাআলাতাঁর অনুমতি ছাড়া কেউ শাফায়াত করতে পারবেনা। এমনকি রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বা অন্য কেউ কারো জন্য শাফায়াত করবেন না যে পর্যন্ত আল্লাহ্ অনুমতি না দিবেন, যেহেতু তাওহীদপন্থী ছাড়া আল্লাহ্ কারো জন্য অনুমতি দিবেন না, যেহেতু শির্ক করলে শাফায়াত থেকে বঞ্চিত হতে হবেযেহেতু এ কথা প্রমাণিত সত্য যে,কল শাফায়াত একমাত্র আল্লাহর অধিকারে- সেহেতু আমরা এই শাফায়াত একমাত্র আল্লাহর কাছেই চাইবকোন মানুষের কাছে নয়; কোন রাসূল, নাবী, ওলী, দরবেশ বা পীরের কাছে নয়আল্লাহ তাআলা কুরআনুল কারীমে ফরমান-

আল্লাহ্ আরও বলেন, “কে এমন আছে যে, সুপারিশ করবে তাঁর কাছে তাঁর অনুমতি ছাড়া?” (সূরা বাক্বারা ২:২৫৫)

আল্লাহ্ আরও বলেন:  “তাঁর অনুমতি ব্যতীত কেউ কারো জন্যে সুপারিশ করতে পারবে না (সূরা ইউনুস ১০:৩)

আল্লাহ্ পাক বলেন,  “আল্লাহ্ যার প্রতি সন্তুষ্ট সে ছাড়া কারো জন্য সুপারিশ করা হবে না (সূরা আম্বিয়া২১:২৮)

তিনি আরো বলেন: “যার জন্যে অনুমতি দেয়া হবে সেছাড়া তাঁর নিকট কারো জন্যে সুপারিশ ফলপ্রসূ হবে না (সূরা সাবা৩৪:২৩)

দয়াময় আল্লাহ্ যাকে অনুমতি দেবেন এবং যার কথায় সন্তুষ্ট হবেন সে ছাড়া কারও সুপারিশ সেদিন কোন উপকারেআসবে না” (সূরা ত্বোয়া-হা ২০:১০৯)

আকাশে অনেক ফেরেশতা রয়েছেন, যাদের কোন সুপারিশ ফলপ্রসু হয়নাকিন্তু আল্লাহ যার জন্য ইচ্ছা ও যাকে পছন্দ করেন এবং যাকে শাফায়াত করার অনুমতি দেন তার কথা ভিন্ন” (সূরা নাজম৫৩:২৬)

সুতরাং শাফায়াত করা বা পাওয়ার জন্য আল্লাহ্র পূর্বানুমোদন থাকা আবশ্যক আল্লাহ্ পাক রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)কে উম্মতের জন্য শাফায়াতের যে অনুমোদন দিবেন তাও কিন্তু শর্তের অধীনঅর্থাৎ যার জন্য সুপারিশ করা হবে, তার উপর আল্লাহর সন্তুষ্টি থাকা চাইখালেছ তাওহীদ ও রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর তরীকার উপর প্রতিষ্ঠিত থাকা ব্যতীত করো উপর আল্লাহ্ সন্তুষ্ট হবেন নাকারণ আল্লাহ তাআলা মুশরিকদের শির্কের কারণে তাদের উপরে সন্তুষ্ট ননতাদেরকে শাফায়াতের অনুমতি দেয়াও সম্ভব নয় সুতরাং নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)কি শির্ককারীদের জন্যে সুপারিশ করবেন? দেখুন এ প্রসঙ্গে তিনি স্পষ্ট বলেছেন,

আমার রব্বের পক্ষ থেকে জনৈক ফেরেশতা আগমণ করে আমাকে দুটি বিষয়ের যে কোন একটি কিয়ামত দিবসে গ্রহণ করার জন্য স্বাধীনতা দেনএকটি হচ্ছে আমার উম্মতের অর্ধেক মানুষ জান্নাতে প্রবেশ করবেদ্বিতীয়টি হচ্ছে কিয়ামত দিবসে আমি তাদের জন্যে শাফায়াত করবআমি সুপারিশের বিষয়টিকে গ্রহণ করিআমার শাফায়াত ঐ লোকদের জন্যে যারা আল্লাহর সাথে কোন কিছুকে শরীক না করে (তথা তাওহীদ নিয়ে) মৃত্যু বরণ করেছে (আওফ বিন মালেক আশজাঈ (রাযিআল্লাহু আনহু) থেকে ইমাম তিরমিযী শাফাআত অনুচ্ছেদে হাদীছটি বর্ণনা করেনহা/২৩৬৫  ইবনে মাজাহ্ হা/৪৩০১ ও ৪৩০৮।)

এজন্য সহীহ্ বুখারী ও সহীহ্ মুসলিমে আবু হুরায়রা (রাযিআল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত হয়েছে, আল্লাহ্ যখন নাযিল করলেন: “এবং আপনার বংশের নিকটাত্মীয়দেরকে জাহান্নামের ভয় দেখান (সূরা শুআরা২৬:২১৪) তখন নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়া সাল্লাম) নিজ বংশ কুরায়শ এবং কুরায়শের অন্যান্য গোত্রকে একত্রিত করলেন এবং বললেন:

হে কুরায়শ সম্প্রদায় তোমরা নিজেদেরকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা কর, আমি আল্লাহর পাকড়াও থেকে তোমাদের কোন কাজে আসব নাহে আবদে মানাফ গোত্র! আল্লাহর পাকড়াও থেকে আমি তোমাদের কোন উপকার করতে পারব নাহে আমার চাচা আব্বাস বিন আবদুল মুত্তালিব! আল্লাহর পাকড়াও থেকে আমি আপনার কোন উপকার করতে পারব নাহে ছাফিয়া! রাসূলুল্লাহর ফুফু, আল্লাহর পাকড়াও থেকে রক্ষা করার জন্যে আমি আপনার কোন উপকার করতে পারব নাহে মুহাম্মাদের কন্যা ফাতিমা! আমার নিকট দুনিয়ার সম্পদ থেকে যাইচ্ছা চেয়ে নাওআল্লাহর পাকড়াও থেকে বাঁচানোর জন্যে আমি তোমার কোন উপকার করতে পারব না (নাসাঈ, অনুচ্ছেদ: ওসীয়ত, হা/ ৩৫৮৬, সহীহ্ নাসাঈআলবানী হা/৩৬৪৬, ও সহীহ্ মুসলিম, হা/ ৩০৫)

নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) জানতেন যে তিনি কিয়ামতের দিন আল্লাহর অনুমতিতে মুমিনদের জন্যে সুপারিশ করবেন, সুপারিশ করবেন কাবীরা গুনাহে লিপ্ত লোকদের জন্যেওতারপরও তিনি নিকটাত্মীয় হওয়ার সূত্রে এই লোকগুলোর জন্যে কোন ধরণের সাহায্য করার বিষয়কে নাকচ করে দিলেনযারা মুশরিক তাদের কথা বাদ দিলে তো অন্য যারা ঈমানদার ছিলেন, তাদের বিষয়টি তো নাকচ করার কোন কারণ নেইকিন্তু যেহেতু তিনি নির্দিষ্টভাবে ব্যক্তি বিশেষের জন্যে সুপারিশ করার বিষয়ে কোন ক্ষমতা রাখেন না, তাই তিনি তা নাকচ করে দিয়েছেনযাতে করে আত্মীয় হওয়ার দাবীতে কেউ এই আশা রাখতে না পারে যে আমরা নবীজীর মাধ্যমে পার পেয়ে যাবআল্লাহ্ অনুমতি না দিলে এবং শাফায়াতকৃত ব্যক্তির উপর আল্লাহ্ সন্তুষ্ট না হলে নবীজী তার জন্যে কখনই সুপারিশ করবেন নাঅতএব নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহিওয়া সাল্লাম)এর সবচেয়ে নিকটবর্তী লোকদের যখন এই অবস্থা তখন অন্যদের অবস্থা কিরূপ হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়

এই আলোচনার পরও যদি কেউ যদি বিশ্বাস করে নির্দিষ্টভাবে উমুক ব্যক্তি তার এবং আল্লাহর মাঝে মধ্যস্থতাকারী হিসেবেতার জন্যে আল্লাহর কাছে সুপারিশ করবেন সেও কাফের মুশরিকযদিও সেকালেমা লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ্ পাঠ করে, সালাত আদায় করে, যাকাত দেয়, সওম পালন করে, হজ্জ-ওমরাহ করে এবং দাবী করে যে আমি মুসলিম

পরিশিষ্ট : মহামহিমান্বিত রব্ব আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর শান ও মান সম্পর্কে আল কুরআনের পাতায় পাতায় সুস্পষ্টভাবে যা বর্ণিত আছে এসবই আমাদের মতো শেষ জামানার উম্মতদের জন্য যথেষ্টসুতরাং অতি ভক্তি প্রদর্শন করতে গিয়ে তাঁর মর্যাদা ও মর্তবা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে কুরআনুল কারীমের সুস্পষ্ট আয়াত ও ঘোষণাকে অস্বীকার করে, বিকৃত করে, ভ্রান্ত তাফসীর করে, জাল-বানোয়াট ও মনগড়া হাদীসের অবতারণা করে ইয়াহুদী ও খৃষ্টানদের ন্যায় সীমালঙ্ঘনকারী হওয়া কখনো-ই ঈমানদারের পরিচায়ক হতে পারে নারাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) স্বয়ং তাকে ম্মাদেখানোর ্যাপারে বাড়াবাড়ি করতে নিষেধ করেছেনসুতরাং যারাই তার নিষেধকে উপেক্ষা করছেন তারা অবশ্যই মস্তবড় অন্যাকরেছন হাদীসে এসেছে-

আব্দুল্লাইবনু ব্বা(রাযিআল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি উমার (রাযিআল্লাহু আনহু)কে মিম্বরের উপর বলতে শুনেছেনতিনি বলেন, আমি নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে বলতে শুনেছি, তোমরা আমার প্রশংসায় বাড়াবাড়ি করোনা যেমনভাবে খৃষ্টানরা ঈসা ইবনু মারিয়ামের প্রশংসায় বাড়াবাড়ি করেছেবরং আমি ল্লাহর বান্দাঅতএব তোমরা বল ল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল

(বুখারী হা:৩৪৪৫; মুসনাদেআহমদ হা:১৪৯,১৫৯,৩১৩)

আর তাই আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীনও সূরা কাহ্ফ, ১০৩-১০৪ আয়াতে তাঁর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে উম্মতের উদ্দেশ্যে সতর্কবাণী উচ্চারণ করতে বলেছেন এভাবেÑ

আপনি বলুন, আমি কি তোমাদেরকে সংবাদ দিব, কাদের যাবতীয় আমল বরবাদ? তারা হচ্ছে সেই লোক, দুনিয়ার জীবনে যাদের কর্মপ্রচেষ্টা গুমরাহীর পথে পরিচালিত হয়েছে; অথচ তারা মনে করে যে তারা নেক আমল করছে

তাই আমাদের উচিত হবে আল্লাহ্ পাক ও তাঁর রাসূল মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর হিদায়াত অনুসরণ করা যাতে সহীহ্ আক্বীদাহর মজবুত ঈমান নিয়ে মৃত্যুবরণ করতে পারিআমীন, ইয়া রাব্বাল আলামীন

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s