সীরাতুন্নবী (সা.)

সীরাত-এ-রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম

জন্ম ও বংশ পরিচয় (সংক্ষিপ্ত)

মহানবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সীরাত আলোচনা করার শুরুতেই আমরা তাঁর জন্ম সম্পর্কে হাদীস ও ইতিহাসের আলোকে আলোচনা করব।  মহান আল্লাহ তায়ালার তাওফীক চাই।

রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জন্ম বার, জন্ম দিন, জন্ম মাস ও জন্ম তারিখ বিষয়ক হাদীস ও ঐতিহাসিক তথ্যাদি বিস্তারিত আলোচনা করার মতো মেধা ও যোগ্যতা এই অধমের নেই বললেই চলে। তথাপিও নির্ভরযোগ্য সীরাত গ্রন্থসমূহের আলোকে এখানে সংক্ষেপে কিছু বিষয় উপস্থাপন করছি।

সহীহ হাদীস থেকে স্পষ্টরূপে জানা যায় যে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সোমবার জন্মগ্রহণ করেছেন। এতে কারো দ্বিমত নেই। আবু কাতাদা আনসারি (রাদিআল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সোমবার দিনের সিয়াম সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, তিনি বলেন : এ দিনে আমি জন্ম গ্রহণ করেছি এবং এ দিনেই আমাকে নবুওয়াত প্রদান করা হয়।” (সহীহ মুসলিম ২/৮১৯; মুসনাদে আহমাদ ৪/১৭২-১৭৩, নং ২৫০৬)। হাদীসে নববী থেকে তাঁর জন্ম মাস ও জন্ম তারিখ সম্পর্কে কোনো তথ্য পাওয়া যায় না।  তবে তাঁর জন্মের বছর সম্পর্কে সংখ্যাগরিষ্ঠ মত এই যে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জন্ম হয়েছিল আমুল ফিল তথা হস্তি বাহিনীর বছর। ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন : “এতে সন্দেহ নেই যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কার অভ্যন্তরে হস্তি বাহিনীর বছর জন্ম গ্রহণ করেন।” (যাদুল ‘মা‘আদ ১/৭৬)।  মুহাম্মাদ ইব্‌ন ইউসুফ সালেহি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন : “ইব্‌ন ইসহাক (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন : তার জন্ম ছিল হস্তি বাহিনীর বছর।  ইব্‌নু কাসির (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন : জমহুরের নিকট এ অভিমতই প্রসিদ্ধ। ইমাম বুখারির উস্তাদ ইবরাহিম ইব্‌নু মুনযির বলেছেন : এ ব্যাপারে কোন আলেম দ্বিমত পোষণ করেননি। খলিফা ইব্‌ন খিয়াত, ইব্‌ন জাযার, ইব্‌ন দিহইয়াহ, ইব্‌নু জাওযি ও ইব্‌নুল কাইয়্যিম এ মতের উপর সকলের ঐক্য নকল করেছেন।” (সুবুল হুদা ওয়ার রাশাদ ফি সিরাতে খাইরিল ইবাদ : ১/৩৩৪-৩৩৫)

ড. আকরাম দিয়া আল-উমরি -ওয়াফ্‌ফাকাহুল্লাহ বলেন : “সত্য হলো, অধিকাংশ আলেম বলেছেন তাঁর জন্ম হস্তি বাহিনীর বছর। আধুনিক যুগে মুসলিম ও পাশ্চাত্য গবেষকদের পরিচালিত গবেষণা এ মতই সমর্থন করে, তারা বলেছেন হস্তি বাহিনীর বছর ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দ অথবা ৫৭১ খ্রিষ্টাব্দ মোতাবেক ছিল”।  (আস-সিরাতুন নববিয়াহ আস-সাহিহাহ : ১/৯৭)

রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জন্ম তারিখ সম্পর্কে সাহাবীগণের মাঝেও কোনো সুনির্দিষ্ট মত প্রচলিত ছিল না। এ কারণে পরবর্তী যুগের আলিম ও ঐতিহাসিকগণ তাঁর জন্ম তারিখ সম্পর্কে অনেক মতভেদ করেছেন। এ বিষয়ে ১২টিরও অধিক মত রয়েছে। ইবনে হিশাম, ইবনে সাদ, ইবনে কাসীর, কাসতালানী ও অন্যান্য ঐতিহাসিক এ বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন মতামত উল্লেখ করেছেন।

(১). রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্মের নির্দিষ্ট দিন ও মাস সম্পর্কে ঐতিহাসিকগণের বিভিন্ন মত পেশ করার পশ্চাতে যৌক্তিক কারণ হচ্ছে, যেহেতু কারোই জানা ছিল না এ নবজাতকের ভবিষ্যৎ কেমন হবে? তাই সবার নিকট অন্যান্য জন্মের ন্যায় তার জন্ম স্বাভাবিক ও অগুরুত্বপূর্ণ ছিল, এ জন্য কারো পক্ষেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্ম তারিখ নির্দিষ্ট ও চূড়ান্তভাবে জানা সম্ভব হয়নি।  কারো মতে তাঁর জন্মতারিখ অজ্ঞাত, তা জানা যায়নি এবং জানা সম্ভব নয়। এ বিষয়ে আলোচনা তারা অবান্তর মনে করেন।

ড. মুহাম্মদ তাইয়্যেব আন-নাজ্জার (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: “এর রহস্য সম্ভবত এই যে, যখন তিনি জন্ম গ্রহণ করেন, তখন তার থেকে কেউ এমন বিপদ আশঙ্কা করেনি, আর এ জন্যই জন্মলগ্ন থেকে নবুওয়াত প্রাপ্তির পূর্ব পর্যন্ত বিশ্ববাসীর দৃষ্টির কেন্দ্রবিন্দুতে তিনি পরিণত হননি, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্মের চল্লিশ বছর পর যখন আল্লাহ তাআলা তাকে রিসালাতের দাওয়াত পৌঁছানোর নির্দেশ প্রদান করেন, তখন থেকেই মানুষ এ নবী সংক্রান্ত তাদের শ্রুত ঘটনাগুলো স্মরণ করা আরম্ভ করে, সম্ভাব্য ও অপরিচিত প্রত্যেক লোকের কাছ থেকেই তার ইতিহাস জানার চেষ্টা করে, এ বিষয়ে তাদেরকে অনেকটা সমৃদ্ধ করেছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খোদ নিজের বর্ণনা, বুঝ হওয়ার পর থেকে  তার উপর দিয়ে যেসব ঘটনা অতিক্রান্ত হয়েছে, অথবা তিনি যেসব পরিস্থিতি পার করেছেন, অনুরূপ তার সাহাবাদের বর্ণনা এবং যারা এসব ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত ছিল তাদের বর্ণনা। মুসলমানেরা তাদের নবীর ইতিহাস সংক্রান্ত শ্রুত সব ঘটনা সংগ্রহ করা আরম্ভ করেন, যেন কিয়ামত পর্যন্ত মানুষের জন্য তা বর্ণনা করে যেতে পারেন”। (আল-কাওলুল মুবিন ফী সীরাতে সায়্যেদিল মুরসালীন, পৃষ্ঠা নং: ৭৮)

(২). কারো মতে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রবিউল আউআল মাসের ২ তারিখে জন্মগ্রহণ করেন। দ্বিতীয় হিজরী শতকের অন্যতম ঐতিহাসিক মুহাদ্দিস আবু মাশার নাজীহ বিন আব্দুর রাহমান আস-সিনদী (১৭০হি) এ মতটি গ্রহণ করেছেন। ইব্‌নু কাসির (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন: “কেউ বলেছেন রবিউল আউয়ালের দ্বিতীয় তারিখ।  ইব্‌ন আব্দুল বারর “ইস্তেআব” গ্রন্থে এ অভিমত বলেন। ওয়াকেদি এ বর্ণনাটি আবু মাশার নাজিহ ইব্‌ন আব্দুর রহমান আল-মাদানি থেকেও নকল করেন”। (আস-সিরাতুন নববিয়্যাহ : ১/১৯৯)

(৩). অন্য মতে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জন্মতারিখ রবিউল আউয়াল মাসের ৮ তারিখ। আলামা কাসতালানী ও যারকানীর বর্ণনায় এই মতটিই অধিকাংশ মুহাদ্দিস গ্রহণ করেছেন। এই মতটি দুইজন সাহাবী ইবনু আব্বাস ও জুবাইর বিন মুতয়িম (রাযিআল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত। অধিকাংশ ঐতিহাসিক ও সীরাত বিশেষজ্ঞ এই মতটি গ্রহণ করেছেন বলে তারা উল্লেখ করেছেন। প্রখ্যাত তাবেয়ী ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে মুসলিম ইবনে শিহাব আয-যুহরী (১২৫ হি.) তাঁর উস্তাদ প্রথম শতাব্দীর প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও নসববিদ ঐতিহাসিক তাবেয়ী মুহাম্মাদ ইবনে জুবাইর ইবনে মুতয়িম (১০০ হি.) থেকে এই মতটি বর্ণনা করেছেন। কাসতালানী বলেন : মুহাম্মাদ ইবনে জুবাইর আরবদের বংশ পরিচিতি ও আরবদের ইতিহাস সম্পর্কে অভিজ্ঞ ছিলেন। রাসূলুলাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জন্ম তারিখ সম্পর্কিত এই মতটি তিনি তাঁর পিতা সাহাবী হযরত জুবাইর বিন মুতয়িম থেকে গ্রহণ করেছেন। স্পেনের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফকিহ আলী ইবনে আহমদ ইবনে হাযম (৪৫৬ হি) ও মুহাম্মাদ ইবনে ফাতুহ আল-হুমাইদী (৪৮৮ হি) এই মতটিকে গ্রহণযোগ্য বলে মনে করেছেন। স্পেনের মুহাদ্দিস আলামা ইউসূফ ইবনে আব্দুলাহ ইবনে আব্দুল বার (৪৬৩ হি) উলেখ করেছেন যে, ঐতিহাসিকগণ এই মতটিই সঠিক বলে মনে করেন। মীলাদের উপর প্রথম গ্রন্থ রচনাকারী আলামা হাফেজ আবুল খাত্তাব ইবনে দিহইয়াহ (৬৩৩ হি) ঈদে মীলাদুন্নবীর উপর লিখিত সর্বপ্রথম গ্রন্থ আত-তানবীর ফী মাওলিদিল বাশির আন নাযীর-এ এই মতটিকেই গ্রহণ করেছেন। হাফেজ মুহাম্মদ ইব্‌ন মুসা আল-খাওয়ারজেমি এ তারিখের ব্যাপারে সম্পূর্ণ নিশ্চিত। (আস-সিরাতুন নববিয়্যাহ : ১/১৯৯)

(৪). কেউ বলেছেন রাসূলুলাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জন্ম রবিউল আউয়ালের নয় তারিখ। কতক মুসলিম গণিত ও জ্যোতির্বিদ গবেষণা দ্বারা বের করেছেন যে, রবিউল আউয়াল মাসের নয় তারিখ-ই সোমবার হয়! এ মতটি শক্তিশালী, এ তারিখ ৫৭১ খৃষ্টাব্দের এপ্রিল/নিসানের বিশ তারিখ মোতাবেক। বর্তমান যুগের কতক সিরাত লেখক এ মতটিই প্রাধান্য দিয়েছেন, তাদের মধ্যে উস্তাদ মুহাম্মদ আল-খিদরি ও শফিউর রহমান মোবারকপুরি অন্যতম।

আবু কাসেম আস-সুহাইলি (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন: “গণিতবিদগণ বলেন : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্ম সৌর মাস “এপ্রিল/নিসান”-এর বিশ তারিখ মোতাবেক ছিল”। (আর-রওদুল উন্‌ফ : ১/২৮২)। উস্তাদ মুহাম্মদ আল-খুদারী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন : “মিসরের বিখ্যাত বিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞ মাহমুদ পাশা, যিনি জ্যোতির্বিজ্ঞানী, ভূ-গোল, গণিত বিদ্যা, লিখনি ও গবেষণায় ব্যাপক পারদর্শী ছিলেন, (মৃত্যু: ১৮৮৫ খ্রিষ্টাব্দ) তিনি বলেন : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্ম ছিল সোমবার সকাল বেলা, রবিউল আউয়াল মাসের নয় তারিখ, মোতাবেক এপ্রিল/নিসান-এর ২০ তারিখ, ৫৭১ খ্রিষ্টাব্দ। এ বছরটি হস্তি বাহিনীর প্রথম বছর মোতাবেক। তিনি জন্ম গ্রহণ করেন বনু হাশেম পল্লীতে আবু তালেবের ঘরে”।  (নূরুল ইয়াকিন ফি সিরাতে সাইয়্যেদিল মুরসালিন, পৃষ্ঠা:৯, আর-রাহিকুল মাখতুম, পৃষ্ঠা নং: ৪১)।  সাইয়্যেদ সোলায়মান নদভী, সালমান মনসুরপুরীও একই অভিমত ব্যক্ত করেন। (দ্র. মোহাম্মদ সোলায়মান মনসুরপুরী, রহমাতুল লীল ‘আলামীন, ৩য় খন্ড, (দিল্লী : হানিফ বুক ডিপো, তা.বি), পৃ ৩৯)।]

(৫). অন্য মতে রাসূলুলাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জন্ম তারিখ ১০-ই রবিউল আউয়াল। এ মতটি ইমাম হুসাইনের পৌত্র মুহাম্মাদ বিন আলী আল বাকির (১১৪ হি) থেকে বর্ণিত। ১ম-২য় শতাব্দীর প্রখ্যাত মুহাদ্দিস আমির বিন শারাহিল শাবী (১০৪ হি.) থেকেও মতটি বর্ণিত। ঐতিহাসিক মুহাম্মাদ বিন উমর আল-ওয়াকিদী (২০৭ হি) এ মত গ্রহণ করেছেন। ইবনে সাদ তার বিখ্যাত “আত-তাবাকাতুল কুবরা”-য় শুধু দুইটি মত উল্লেখ করেছেন, ২ তারিখ ও ১০ তারিখ। (ইবনে সাদ, আত-তাবাকাতুল কুবরা ১/৮০-৮১।) ইব্‌নু কাসির (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন : “রবিউল আউয়ালের দশ তারিখ।  এ মতটি ইব্‌ন দিহইয়াহ তার গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন।  ইব্‌ন আসাকের আবু জাফর আল-বাকের থেকে এবং মুজালিদ শা‘বি থেকে অনুরূপ মতই বর্ণনা করেন”। (আস-সিরাতুন নববিয়াহ : ১/১৯৯)

(৬). কারো মতে রাসূলুলাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জন্মতারিখ ১২ রবিউল আউয়াল। এই মতটি দ্বিতীয় হিজরী শতাব্দীর প্রখ্যাত ঐতিহাসিক মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক (১৫১ হি) গ্রহণ করেছেন। তিনি বলেছেন: রাসূলুলাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাতির বছরে রবিউল আউয়াল মাসের ১২ তারিখে জন্মগ্রহণ করেন।(ইবনে হিশাম, আস-সীরাতুন নাবাবীয়্যাহ ১/১৮৩)। এখানে লক্ষ্যণীয় যে, ইবনু ইসহাক সীরাতুন্নবীর সকল তথ্য সাধারণত সনদসহ বর্ণনা করেছেন, কিন্তু এই তথ্যটির জন্য কোনো সনদ উল্লেখ করেননি। কোথা থেকে তিনি এই তথ্যটি গ্রহণ করেছেন তাও জানাননি বা সনদসহ প্রথম শতাব্দীর কোনো সাহাবী বা তাবেয়ী থেকে মতটি বর্ণনা করেননি। এ জন্য অনেক গবেষক এ মতটিকে দুর্বল বলে উল্লেখ করেছেন।(মাহদী রেজকুলাহ আহমদ, আস-সীরাতুন নাবাবীয়াহ, ১০৯ পৃ.)।  ইব্‌নু কাসির (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন : “কেউ বলেছেন রবিউল আউয়ালের বারো তারিখ।  ইব্‌ন ইসহাক এ মত বর্ণনা করেন। ইব্‌ন আবু শায়বাহ তার ‘মুসান্নাফ’ গ্রন্থে এ মতটি আফ্‌ফান থেকে, সে সাঈদ ইব্‌ন মিনা থেকে, সে হযরত জাবির ও হযরত ইব্‌ন আব্বাস রাযিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করে, তারা উভয়ে বলেছেন : ‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হস্তি বাহিনীর বছর, রবিউল আউয়াল মাসের বারো তারিখ, সোমবার দিন জন্ম গ্রহণ করেন।  এ দিনেই তাকে নবুওয়াত প্রদান করা হয়, এ দিনেই তার মিরাজ হয়েছিল, এ দিনেই তিনি হিজরত করেছেন এবং এ দিনেই তিনি মারা যান’।  [ইবনে হিশাম, আস্ সিরাত আন্ নববীয়াহ, ১ম খন্ড, পৃ.১৬৩. (কায়রো : দারুল মানার, ১৯৯০), ফাতহুল বারি, লি ইবনু হাজার ৮/১৩০] এত মতভেদ সত্ত্বেও পরবর্তী যুগে ‘রবিউল আউয়ালের বারো তারিখ’ এ মতটিই জমহুর আলিমদের নিকট বেশী প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। অবশ্য এ সম্পর্কে আল্লাহ্ই ভালো জানেন।

(৭). অন্য মতে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রমযান মাসে জন্মগ্রহণ করেছেন। ৩য় হিজরী শতকের প্রখ্যাত ঐতিহাসিক যুবাইর ইবনে বাক্কার (২৫৬হি.) থেকে এ মতটি বর্ণিত। তাঁর মতের পক্ষে যুক্তি হলো যে, রাসূলুলাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সর্বসম্মতভাবে রমযান মাসে নবুয়্যত পেয়েছেন। তিনি ৪০ বৎসর পূর্তিতে নবুয়্যত পেয়েছেন। তাহলে তাঁর জন্ম অবশ্যই রমযানে হবে। এছাড়া কোনো কোন হাদীসে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুলাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হজ্বের পবিত্র দিনগুলিতে মাতৃগর্ভে আসেন। সেক্ষেত্রেও তাঁর জন্ম রমযানেই হওয়া উচিত। এ মতের সমর্থনে হযরত আব্দুলাহ বিন উমর (রাযিআল্লাহু আনহু) থেকে একটি বর্ণনা আছে বলে কেউ কেউ উলেখ করেছেন। (ইবন সা’দ, আত-তাবাকাতুল কুবরা ১/১০০-১০১, ইবনে কাসীর, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া ২/২১৫, আল-কাসতালানী, আহমদ বিন মুহাম্মাদ, আল-মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়্যা ১/৭৪-৭৫, আল-যারকানী, শরহুল মাওয়াহিব আল-লাদুন্নিয়্যা ১/২৪৫-২৪৮, ইবনে রাজাব, লাতায়েফুল মায়ারেফ, প্রাগুক্ত ১/১৫০)

রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জন্মগ্রহণের দিনটি ছিল মানবতার ইতিহাসে সবচেয়ে আলোকজ্জ্বল ও বরকতময় দিন। তাঁর মাতা বলেন ‘‘যখন তিনি জন্ম গ্রহণ করেন তখন দেহ থেকে একটি নূর বের হলো, যার মাধ্যমে শামদেশ উজ্বল হয়ে গেল। (মোহাম্মদ ইবন আব্দুল ওহাব নজদী, মোখতাছার সীরাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, পৃ.১২)।কিসরার রাজপ্রাসাদের চৌদ্দটি পিলার ধসে পড়েছিল। অগ্নি উপাসকদের অগ্নিকুন্ড নিভে গিয়েছিল। তিনি তৎকালীন আরবের শ্রেষ্ঠ বংশ ‘‘বনী হাশিম’’-এ জন্ম গ্রহণ করেছিলেন। স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণী থেকে এ মতের সমর্থন পাওয়া যায়। তিনি বলেন, ‘‘আমি বনী আদমের উত্তম যুগে এবং সর্বোত্তম বংশে প্রেরিত হয়েছি।’’ (দালায়েলুন নবুওয়্যাহ, ১ম খন্ড, পৃ. ১৭৪-১৭৫)। আল্লাহ তা‘আলা ইসমাঈল আলাইহিস সালাম-এর বংশধর থেকে কিনানা গোত্রকে নির্বাচন  করেন; কিনানা থেকে কুরাইশকে নির্বাচন করেন; কুরাইশ থেকে বনী হাশিম কে নির্বাচন করেন এবং বনী হাশিম থেকে আমাকে নির্বাচন করেছেন। তাঁর পিতৃকুলের বংশ পরস্পরা হল : মুহাম্মদ ইবন আব্দুল্লাহ ইবন আব্দুল মুত্তালিব ইবন হাশিম ইবন আবদ্ মানাফ ইবন কুসাই ইবন কিলাব ইবন মুররাহ ইবন কা‘ব ইবন লুওয়াই ইবন গালিব ইবন ফিহর ইবন মালিক ইবন নাদর ইবন কিনানা ইবন খুযায়মা ইবন মুদারিকা ইবন ইলিয়াছ ইবন মুদার ইবন নাদার ইবন সা‘দ ইবন আদনান। (ইবনুল কাইয়্যুম আল-জাওযিয়া, যাদুল মা’আদ, ১ম খন্ড, পৃ. ৭১)। মাতৃকুলের বংশ পরস্পরা কিলাব ইবন মুররাতে গিয়ে পিতার বংশ পরস্পরার সাথে মিলিত হয়। [তাঁর মায়ের বংশ পরিচয় হল : আমিনা বিনত্ ওয়াহাব ইবন যুহরা । (ইবন হাজার আসকালানী, ফাত্হুল বারী, কিতাবুল মানাকিব ১৪তম খন্ড, পৃ.২২৩০)]

জন্মের পর তাঁর মা তাঁর দাদা আব্দুল মুত্তালিবের কাছে পৌত্রের জন্মের সুসংবাদ দিলেন। তিনি খুব খুশি হলেন এবং সানন্দে তাঁকে কাবাগৃহে নিয়ে আল্লাহ’র দরবাবে নবজাতকের জন্য দু’আ করেন এবং শুকরিয়া আদায় করলেন। (ইবন হিশাম)

কোনো কোনো বর্ণনা মতে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শুভ জন্মের সপ্তম দিবসেই ‘‘আব্দুল মুত্তালিব” তাঁর নামে আক্বীকা দিয়েছিলেন এবং কুরাইশ গোত্রের সকলকে দা‘ওয়াত করেছিলেন। [আক্বীকা ইবরাহীম আলাইহিস সালাম এর সুন্নাত। তৎকালীন আরব সমাজে ইহার ব্যাপক প্রচলন ছিল। নবজাতকের নামকরণ ও কেশমূন্ডণ উপলক্ষে পশু কুরবানীর নাম ‘আক্বীকা’ (সংক্ষিপ্ত ইসলামী বিশ্বকোষ, ১ম খন্ড, ই.ফা.বা, ২য় সংস্করণ, পৃ.৮)] তাঁর মায়ের স্বপ্নে আদিষ্ট নাম সম্পর্কে অবগত হয়ে তাঁর দাদা নাম রাখলেন ‘‘মুহাম্মাদ’’। আরবে এ নাম ছিল সম্পুর্ণ অপরিচিত। ফলে লোকেরা এ নাম শ্রবণে বিস্মিত হত। (ইবনে হিশাম)

তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বীয় পিতাকে দেখেন নি। তাঁর মমতাময়ী মাতা অন্তঃসত্তা থাকা অবস্থায় আব্দুল্লাহ খেজুর ক্রয়ের জন্য মদিনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। সেখানে তিনি মামার বাড়ি বনু আদী ইবন নাজ্জার গোত্রে মৃত্যুবরণ করেন। (ইবনে সা’দ মুহাম্মদ ইবন কা’ব হতে আত্ তাবাকাতুল কুবরা, ১ম খন্ডে বর্ণনা করেন, তাঁর পিতা আব্দুল্লাহ সিরিয়ার বাণিজ্য হতে ফেরার পথে পথিমধ্যে ইন্তেকাল করেন।)

তিনি তাঁর দাদা আব্দুল মুত্তালিবের স্নেহ পরশে লালিত পালিত হতে থাকেন। অতএব, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এতীম অবস্থায় জন্ম গ্রহণ করেছিলেন। এদিকে ইঙ্গিত করেই আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

  ﴿ أَلَمۡ يَجِدۡكَ يَتِيمٗا فَ‍َٔاوَىٰ ٦ ﴾ [الضحى: ٦]

‘‘তিনি কি আপনাকে এতিম অবস্থায় পাননি? এরপর তিনি আপনাকে আশ্রয় দিয়েছেন।’’ (সূরা আদ্ দুহা : ৬)

শৈশব কাল

দুগ্ধপান : মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্মের পর সাতদিন মাতৃদুগ্ধ পান করেন। তারপর আটদিন ছুয়াইবার দুগ্ধ পান করেন। ছুয়াইবা ছিল আবু লাহাবের দাসী। আব্দুল্লাহর পুত্র সন্তান ভুমিষ্ট হওয়ার সংবাদ সে স্বীয় মালিককে জানালে আনন্দের আতিশায্যে আবু লাহাব তৎক্ষনাৎ তাকে আযাদ করে দেয়। সে সময় তার কোলের শিশুর নাম ছিল মাছরুহ। তাঁর আগে হামজা ইবন আব্দুল মোত্তালিব এবং তাঁর পরে আবু সালমা ইবন আব্দুল আহাদ মাখজুমিকেও ছুয়াইবা দুধ পান করিয়েছিলেন। (দ্র. মুহাম্মদ ইবন আব্দুল ওহাব নজদী, মোখতাছার সীরাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, পৃ. ১৩)। ছুয়াইবার পর খাওলা বিনতে মুনযেরসহ আরও তিনজন মহিলা তাঁকে দুধ পান করিয়েছিলেন। কিছুদিন পর হালিম সাদিয়া এ সৌভাগ্যের অধিকারী হন। সে সময় আরবের সম্ভ্রান্ত ও নেতৃস্থানীয় গোত্রসমূহের মধ্যে এ প্রথা প্রচলিত ছিল যে, তারা  স্ব স্ব সন্তানকে শহরের পার্শ্ববর্তী এলাকায় প্রতিপালন করা পছন্দ করত। এতে শিশুদের দৈহিক স্বাস্থ্য সুন্দররূপে বিকাশ লাভ করত এবং তারা বিশুদ্ধ ও শ্রুতিমধুর আরবী ভাষা আয়ত্ত করতে পারত। চিরন্তন প্রথানুসারে গ্রামাঞ্চলের ধাত্রীরা সম্ভ্রান্ত ও শরীফ পরিবারে সন্তান পাবার আশায় মক্কা শহরে আগমন করত;এর মাধ্যমে  তারা পারিতোষক ও সম্মানী লাভ করত। পিতৃহীন বালক প্রতিপালনে যথাযথ সম্মানী ও পারিশ্রমিক না পাবার আশংকায় বনু সা‘দ গোত্রের অন্যান্য ধাত্রীরা তাঁকে গ্রহণ করে নি; এমনকি হালিমাও প্রথমে তাঁকে গ্রহণ না করে অগত্যা খালি হাতে ফিরে যাবার সময় শিশু মুহাম্মদের লালন-পালনের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। ফলে হালিমার ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলো। তাঁর অভাব অনটন দুরীভূত হয়ে প্রাচুর্যতা ও সচ্ছলতা ফিরে এলো এবং বান্ধবীরা তাঁর ঈর্ষায় মেতে উঠতে লাগল। এরূপে তাঁর গৃহে অতি আদর-যত্নে সুদীর্ঘ দুই বছর তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লালিত পালিত হন। বনু সা‘দ একটি গোত্রের নাম। বিশুদ্ধ আরবী ভাষায় তারা খুবই পারদর্শী ছিল। মক্কা নগর হতে ৭০ মাইল দূরবর্তী শহর তায়েফের পার্শ্বস্থিত গ্রামে তাদের আবাস ছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দুধ মাতা হলেন, বনু সা’দ ইবন বকরের জনৈকা মহিলা হালিমা বিনত্ আবু যুবায়র। হালিমা সা’দিয়া বলেন : আমি দুদ্ধপোষ্য শিশুর সন্ধানে বনু সাদ গোত্রের অন্যান্য মহিলাদের সঙ্গে তায়েফ হতে সাদা গাঁধার পিঠে সওয়ার হয়ে মক্কায় রওয়ানা হই। সে বছর দেশে দূর্ভিক্ষ বিরাজ করছিল। আমার কোলেও একটি দুগ্ধপোষ্য শিশু ছিল কিন্তু আমার স্তনে এই পরিমাণ দুগ্ধ ছিল না যা তার জন্য যথেষ্ট হতে পারে। সারারাত সে ক্ষুধায় কাতরাত আর আমরা বিনিদ্র রজনী যাপন করতাম। আমাদের একটি উটনীও  ছিল, কিন্তু তার স্তনে তখন দুগ্ধ ছিল না। আমার আরোহিত উষ্ট্রীটি এত দূর্বল ছিল যে, মক্কায় পৌঁছাতে অনেক সময় লেগে যায়। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এতিম ভেবে আমাদের মধ্যে কেউই গ্রহণ করল না। এদিকে বিলম্ব হওয়ায় আমি ও অন্য কোন শিশু পোষ্য পাইনি। আমি আমার স্বামীকে বললাম, অগত্যা শুন্য হাতে ফিরে যাওয়ার চেয়ে এ এতিম শিশুটিকে নিয়ে যাওয়াই ভাল। আমার স্বামী এ প্রস্তাবে সম্মত হলেন। ফলে তিনি এতিম শিশুকে সঙ্গে নিয়ে আসেন।  তাঁবুতে এসে দুগ্ধ পান করাতে বসার সঙ্গে সঙ্গে বরকত ও কল্যাণের অজস্রধারা প্রকাশ পেতে লাগল। হালিমা বলেন, আমার স্বামী উটনীর দুধ দোহন করে আসলেন এবং আমরা সকলেই তৃপ্তি সহকারে পান করলাম।  বহুদিন পর সারারাত আরামে কাটালাম। আমাদের দুর্বল উষ্ট্রী অত্যন্ত সবল হয়ে গেল এবং সবাইকে পিছনে রেখে গন্তব্যে পৌঁছে গেলাম। (ইবন হিশাম)

নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দৈহিক ক্রম বিকাশ অন্যান্য শিশুদের তুলনায় হৃষ্টপুষ্ট ও মোটা ছিল। এমনকি দুই বছর বয়সে তাঁকে খুব বড় দেখাত। প্রথানুযায়ী তাঁকে তাঁর মায়ের কাছে নিয়ে আসা হল, কিন্তু হালিমা শিশুটিকে আরও কিছুদিন প্রতিপালনের আকাংখা ব্যক্ত করেন। বিবি আমেনা হালিমার আকুতি দেখে শিশু মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে পুণরায় তার নিকট ফিরিয়ে দেন।

হালিমার গৃহে থাকাকালীন সময়ে তিনি স্বীয় দুধ ভাইদের সাথে খেলাধুলার উদ্দেশ্যে মাঠে যেতেন। এ সময় একদা জিব্রাইল আলাইহিস সালাম আগমন করলেন এবং দেখলেন যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্যান্য শিশুদের সাথে খেলা করছেন। তিনি তাঁকে ধরে শুইয়ে দিলেন এবং বক্ষ বিদীর্ণ  করে তাঁর হৃৎপিন্ডটি বের করে আনলেন। তারপর তিনি তাঁর বক্ষ হতে একটি রক্তপিন্ড বের করলেন এবং বললেন, এ অংশটি হল শয়তানের। এরপর জিব্রাইল আলাইহিস সালাম হৃৎপিণ্ডটি একটি স্বর্নের পাত্রে রেখে যমযমের পানি দিয়ে ধুইলেন এবং তার অংশগুলো জড়ো করে আবার তা যথাস্থানে পূনঃস্থাপন করলেন। অন্য শিশুরা ছুটে বিবি হালিমার কাছে গিয়ে বললো, মুহাম্মদকে মেরে ফেলা হয়েছে। পরিবারের লোকেরা ছুটে এসে দেখলো তিনি বিবর্ণমুখে বসে আছেন। আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেনঃ আমি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বক্ষে সেই সিলাই এর চি‎হ্ন দেখেছি। (মুসলিম, কিতাবুল ঈমান, বাবুল ইসরা)। সে সময় তাঁর বয়স হয়েছিল তিন বা পাঁচ বছর। এভাবে পরবর্তীতেও তাঁর বক্ষ বিদীর্ণের ঘটনা বিদ্যমান রয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর গোটা জীবনে বক্ষবিদারনের ঘটনা মোট চারবার সংগঠিত হয়েছে। প্রথমবার শৈশবে, দ্বিতীয়বার দশ বছর বয়সে, তৃতীয়বার যখন তিনি চল্লিশ বছর বয়সে উপনীত হন এবং চতুর্থবার মেরাজে যাওয়ার প্রাক্কালে সংগঠিত হয়। (মুহাম্মদ ইদ্রীস কান্দাহলভী, সীরাতুল মোস্তফা, ১ম খন্ড, পৃ. ৭৭-৭৮) প্রথমবার তাঁর কলব হতে জমাট বাধা কালো অংশ যা পাপের উৎস তা পবিত্র পানি দ্বারা ধৌত করা হয়। দ্বিতীয়বার যেহেতু দশ বছর বয়সে তিনি উপনীত হয়েছেন এবং এ মূহুর্তে তাঁর মন মানসিকতা বালকসূলভ হওয়ায় খেলাধুলার দিকে বেশী ঝুঁকে পড়া স্বাভাবিক ছিল তাই, এ প্রবণতাকে দূর করার জন্য এ পর্যায়ে বক্ষবিদীর্ণ হয়। তৃতীয়বার ওহী লাভের সূক্ষাতিসূক্ষ্ণ রহস্যাবলী এবং আল্লাহর কালামকে ধারণের যোগ্য করে তোলা হয়েছে। চতুর্থবার তাঁর দৈহিক ও আধ্যাত্মিক উভয় দিক হতে আল্লাহর দর্শন লাভে ও মহাসৃষ্টির গুরু রহস্যাবলী পরিদর্শনের উপযুক্ত করে দেয়া। (মুহাম্মদ ইদ্রীস কান্দাহলভী, সীরাতুল মোস্তফা, ১ম খন্ড, পৃ. ৮৩-৮৪)। এদিকে ইঙ্গিত করেই মহান আল্লাহ বলেন,

﴿أَلَمۡ نَشۡرَحۡ لَكَ صَدۡرَكَ ١ ﴾ [الشرح: ١]

‘‘হে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমি কি আপনার বক্ষকে বিদীর্ণ করে দেইনি?’’ (সূরা আশ্ শরাহ ৯৪: ১।)

এঘটনার পর তিনি (হালিমা) ভীত হয়ে পড়লেন এবং শিশুকে তাঁর মায়ের কাছে ফিরিয়ে দিলেন। মা আপন সন্তানকে সুস্থ সবল দেখে প্রীত হন এবং স্নেহ ভালবাসা ও আদর সোহাগ দিয়ে লালন-পালনে সচেষ্ট হন। তাঁর দেখাশুনা ও তত্বাবধানের জন্য স্বীয় পরিচারিকা উম্মু আয়মানকে নিযুক্ত করেন। তার আসল নাম বারাত, তিনি আবিসিনিয়ার অধিবাসী ছিলেন।  বায়দ ইবনুল হারিছ আল-খাযরাজীর সাথে প্রথম তার বিয়ে হয়। এ ঘরে আয়মান নামক একজন পুত্র জন্মে। এ সুত্রেই তার নাম হয় উম্মে আয়মান। উপরন্তু তার মৃত্যুর পর তিনি যায়দ ইবন হারিছের সাথে পরিবার সূত্রে আবদ্ধ হন। (ইসলামী বিশ্বকোষ, ২০শ খন্ড, পৃ. ৫৭১-৫৭২)

তাঁর বয়স যখন ছয় বছর তখন তাঁর মা তাঁকে দাদার মাতৃকুলকে দেখাবার নিমিত্তে তাঁকে ইয়াসরিব নিয়ে যান। তিনি তাঁর প্রিয়তম স্বামী আব্দুল্লাহ ইবন আব্দুল মোত্তালিবের কবর যিয়ারতের ইচ্ছুক ছিলেন। মক্কা প্রত্যাবর্তনের পথে আল-আবওয়া (জায়গাটি মস্তুরার নিকটবর্তী যা এখন মক্কা ও মদিনার মাঝখানে সুপ্রসিদ্ধ স্থান) নামক স্থানে বিবি আমেনা রোগাক্রান্ত হয়ে পড়েন এবং কিছুদিন পর সেখানেই মারা যান। মাতৃবিয়োগের শোকে তিনি তখন বিহ্বল হয়ে উঠেন; উম্মে আয়মান তাঁকে মক্কায় নিয়ে আসেন এবং দাদা আব্দুল মোত্তালিবের নিকট সোর্পদ করেন।

এরপর তিনি দাদার স্নেহ ছায়ায় অবস্থান করেন, তিনি তাঁকে অত্যধিক ভালবাসতেন এবং সব সময় নিজের সঙ্গে রাখতেন। কাবা শরীফের ছায়ায় স্বীয় ফরাশের উপর সাথে নিয়ে বসতেন এবং নানাভাবে স্নেহ ও ভালবাসার প্রকাশ ঘটাতেন।  দু’বছর যেতে না যেতেই তাঁর বয়স যখন আট হল তখন তাঁর দাদা এ অস্থায়ী জগত ছেড়ে চিরস্থায়ী জগতে পাড়ি জমান। এভাবে শিশুকালেই যাবতীয় শিক্ষা, প্রশিক্ষন ও প্রতিপালনের বস্তুগত  উপকরণ থেকে তিনি বঞ্চিত হয়ে এক ও অপরিসীম ক্ষমতাধর বেনিয়াজ আল্লাহ’র শিক্ষা-প্রশিক্ষন ও প্রতিপালনের জন্য নির্বাচিত হন।

আব্দুল মোত্তালিব মৃত্যুর পূর্বে স্বীয় পুত্র আবু তালেবকে ওসিয়ত করে গেলেন; তিনি যেন ভাতৃষ্পুত্রের বিশেষভাবে যত্ন নেন। আব্দুল্লাহ ও আবু তালিব উভয়ে ছিলেন সহোদর ভাই। পিতার অন্তিম উপদেশ এবং নিজের স্বাভাবিক স্নেহবশতঃ আবু তালিব এতিম ভাতিজার প্রতিপালন করতে থাকেন। তিনি তাকে সর্বদা চোখে চোখে রাখতেন। শোবার সময় এবং কোথাও বেড়াতে গেলেও তাঁকে ছাড়া যেতেন না। বয়োঃবৃদ্ধির সাথে সাথে তাঁর বাহ্যিক সৌন্দর্য্য ও চরিত্র মাধুরী এমন সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছিল যে, আবু তালিব তা দেখে এতিম ভাতিজার প্রতি আরও বেশী অনুরক্ত হয়ে পড়েছিলেন। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত ভাতিজার প্রতি তাঁর অকৃত্রিম স্নেহ মমতা অক্ষুন্ন ছিল।

কর্মময় জীবন

মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন থেকে তাঁর চাচা আবু তালিবের তত্ত্বাবধানে জীবন যপন করতে আরম্ভ করেন, তখনই তিনি তাকে সহযোগিতা করার ইচ্ছা পোষণ করেন। আবু তালিব নিজের পরিবারের সদস্য বেশী হওয়ায় ও আর্থিক দীনতার কারণে সাহায্যের মুখাপেক্ষীও ছিলেন। ফলে তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কার পাহাড়ী রাস্তায় চাচা আবু তালিবের ছাগল চরাতেন ; এর মাধ্যমে তিনি আর্থিক স্বচ্ছলতা লাভের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সাথে লেনদেন করার সুযোগ পেতেন, যা পরবর্তীতে তাঁর ব্যবসা পরিচালনায় ও নেতৃত্বদানে সহায়ক ভুমিকা পালন করেছিল। এ মর্মে তিনি বলেন, ‘‘প্রত্যেক নবীই ছাগল চরিয়েছেন। সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞাসা করেন, হে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আপনিও? তিনি বলেন হ্যাঁ, আমি কিছু ক্বিরাতের বিনিময়ে মক্কাবাসীর ছাগল চরাতাম। (ইবন হাজর আসকালানী, ফাত্হুল বারী)। বস্তুত ছাগল চরানোর মাধ্যমে আল্লাহ তা‘আলা তাঁকে রিসালাত গ্রহণ এবং দীনের দা‘ওয়াতের মহান দায়িত্ব পালনের জন্য যে ধৈর্য ও মমত্ববোধ সৃষ্টি, দুর্বলদের প্রতি সদয় ও স্নেহ প্রবণতা, যথাযথ রক্ষনাবেক্ষণ ও কষ্ট সহিষ্ণুতা অবলম্বন প্রয়োজন, তার প্রশিক্ষন দিয়েছিলেন। তাছাড়াও ছাগল চরানোর পেশা সেই যুগে জীবিকা অর্জনের একটি অভিজাত উপায় হওয়ার সাথে সাথে মানসিক ও মনস্তাত্বিক প্রশিক্ষন, দুর্বল ও অভাবী লোকদের উপর স্নেহ ও ভালবাসার প্রেরণা সৃষ্টি, স্বচ্ছ ও নির্মল বায়ুর আমেজ লাভ এবং শরীরের শক্তি ও ব্যায়ামের উপকরণ ও বটে।

পঁচিশ বছর বয়সে তিনি আরবের বিশিষ্ট ধনবতী ও অভিজাত মহিলা খাদিজা বিনতে খুয়াইলিদের বানিজ্যিক পণ্য পরিচালনার দায়িত্বভার গ্রহণের মাধ্যমে আর্থিক দীনতা মোচন করতে সক্ষম হন। পবিত্র কুরআনুল কারীমে এ মর্মে ঘোষিত হয়েছে

﴿ وَوَجَدَكَ عَآئِلٗا فَأَغۡنَىٰ ٨ ﴾ [الضحى: ٨] 

‘‘আর আপনি কি নিঃসম্বল ছিলেন না? পরে আল্লাহ আপনাকে সম্বল দান করেছেন।’’ (সূরা আদ দোহা : ৭)

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বিবাহ

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খাদিজার বাণিজ্যিক কাফেলা পরিচালনার মধ্যে তাঁর উন্নত চরিত্র, সততা, ন্যায়পরায়ণতা প্রভৃতি গুণ প্রকাশ পেল। ফলে খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহু মনের অজান্তেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ভালবেসে ফেললেন। তিনি স্বীয় ভৃত্য মায়সারার কাছে তা ব্যক্ত করলেন এবং বিয়ের প্রস্তাব পাঠান। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর চাচাদের সাথে পরামর্শ করে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিলেন। সিরিয়া থেকে বাণিজ্যিক সফর শেষে ফিরে আসার দু’মাস পর তিনি খাদিজার সাথে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হন। খাদিজা বিনতে খুয়াইলিদ রাদিয়াল্লাহু আনহা ছিলেন তৎকলীন আরবের একজন সম্ভ্রান্ত ও ধনাঢ্য ব্যবসায়ী মহিলা। তিনি বিবেক বুদ্ধি, সৌন্দর্য, অর্থ সম্পদ, বংশমর্যাদায় ছিলেন সে কালের শ্রেষ্ঠ নারী।  সেসময় নারীদের অধিকার বলতে কিছুই ছিল না এবং তারা চরম অবমাননা ও লাঞ্চনা স্বীকার হত। এই পবিত্রা মহিলা তখন স্বীয় চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের কারণে জাহিলিয়াতের যুগেও লোকজন তাকে ‘তাহিরা’ ভূষিত করে। তখন তিনি পঁচিশ বছরের যুবক, আর খাদিজার বয়স ছিল চল্লিশ বছর। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিয়ের মোহরানা হিসেবে বিশটি উট দিয়েছিলেন। (ইবন খালদুন, তারীখে ইবন খালদুন)। এটি ছিল হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রথম বিবাহ। হযরত খাদিজা বেঁচে থাকা অবস্থায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্য কারো সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন নি।

ইবরাহীম ব্যতিত রাসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সকল সন্তান ছিলেন বিবি খাদিজার গর্ভজাত। তাঁর গর্ভে একজন পূত্র সন্তান ও চারজন কন্যা সন্তান জন্মগ্রহণ করে। পূত্র সন্তানের মধ্যে কাসেম সবার জৈষ্ঠ্য এবং তিনি শৈশবেই মৃত্যুবরণ করেছিলেন। আর কন্যারা হলেন যথাক্রমে যয়নব, রোকাইয়া, উম্মে কুলসুম ও ফাতেমা রাদিয়াল্লাহু আনহুমা। তারা সকলেই ইসলামের যুগ পেয়েছিলেন এবং ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নিয়েছেন।

চরিত্র মাধুর্য

বাল্যকালেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বীয় কাওম কর্তৃক ‘আস্ সাদিক’ বা সত্যবাদী উপাধিতে ভূষিত হন। আমানতদার, দৃঢ়তা, সততা, ন্যায়-নিষ্ঠা, সাধুতা, স্বভাবগত চারিত্রিক মাহাত্ম্য প্রভৃতি গুণে তিনি গুণান্বিত ছিলেন। মহান আল্লাহ তাঁর মর্যাদাকে জাহেলী সমাজেও সুউচ্চ করে দিয়েছেন। (সূরা আশ্ শরাহ : ৪)। জাহিলিয়াতের নাপাক ও খারাপ অভ্যাসসমূহ থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত থেকে স্বজাতির নিকট সবচেয়ে বেশী প্রশংসনীয় গুণাবলী, উন্নত মনোবল, লাজনম্র ও উত্তম চরিত্রের অধিকারী ছিলেন তিনি। কিশোর বয়সের সততা, ন্যায়নিষ্ঠা, নম্রতা ও ভদ্রতা, নিঃস্বার্থ মানবপ্রেম ও সত্যিকার কল্যাণ প্রচেষ্টা, চরিত্র মাধুর্য ও অমায়িক ব্যবহারের ফলে আরবগণ তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হয়। অবশেষে আরবগণ তাঁকে আল-আমিন বা বিশ্বস্ত বলে ডাকতে থাকে। ফলে মুহাম্মদ নাম অন্তরালে পড়ে গিয়ে তিনি আল-আমিন নামে খ্যাত হয়ে উঠলেন। নীতিধর্ম বিবর্জিত, ঈর্ষা-বিদ্বেষ কলূষিত, পরশ্রীকাতর দুর্ধর্ষ আরবদের অন্তরে এতখানি স্থান লাভ করা ঐ সময়ে খুবই কঠিন ছিল। অনুপম চরিত্র মাধুর্যের অধিকারী হওয়ার কারণেই মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পক্ষে তা সম্ভব হয়েছিল। এমন কি তারা বিভিন্ন জটিল বিষয়াদি মীমাংসার ব্যাপারে তাঁর পরামর্শ ও সিদ্ধান্ত কামনা করত। কুরাইশ বংশের সকল গোত্রে কাবাগৃহে হাজারে আসওয়াদ স্থাপন নিয়ে যে তীব্র বিতন্ডা ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের আশংকা দেখা দিয়েছিল তাও তিনি যুক্তিপুর্ণ উপায়ে অত্যন্ত বিচক্ষনতা ও দূরদর্শিতার মাধ্যমে মীমাংসা করেছিলেন। (আল্লামা ছফিউর রহমান মোবারকপুরী, আর রাহীকুল মাখতুম, অনূ: খাদিজা আখতার রেজায়ী, (আল-কুরআন একাডেমী লন্ডন, ১ম সংস্করণ, ২০০৩), পৃ.৭৮)। এভাবে তিনি সর্বজনবিদিত ও নিরপেক্ষ একজন বিচারকের মর্যাদায় আসীন হন। এ মর্মে সীরাতে ইবন হিশামে বর্ণিত আছে, ‘‘অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ অবস্থায় রয়ঃপ্রাপ্ত হতে লাগলেন যে, স্বয়ং আল্লাহ পাক তাঁকে হেফাজত ও তাঁর প্রতি দৃষ্টি রাখেন এবং জাহিলিয়াতের সমস্ত অনচার থেকে তাঁকে পবিত্র রাখেন। কেননা তাঁকে নবুওয়ত ও রিসালাতের উচ্চ মর্যাদায় আসীন করা ছিল মহান আল্লাহর অভিপ্রায়। ফলে তিনি একজন নম্র, ভদ্র, চরিত্রবান, উত্তম বংশীয়, ধৈর্যশীল, সত্যবাদী ও আমানতদার ব্যক্তি হিসেবে সমাজে শীর্ষস্থান অধিকার করেন। অশ্লীলতা ও অনৈতিকতা হতে সর্বদা দূরে থাকতেন। এ সকল উত্তম ও নৈতিক গুণাবলীর কারণে স্বজাতির মধ্যে তিনি আল-আমিন খেতাবে ভূষিত হয়েছিলেন। (ইবন হিশাম, ১ম খন্ড, পৃ. ৬২)।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চরিত্র মাধুর্যের বর্ণনা দিতে গিয়ে স্বয়ং মহান আল্লাহ বলেন,

 ﴿ وَإِنَّكَ لَعَلَىٰ خُلُقٍ عَظِيمٖ ٤ ﴾ [القلم: ٤]   

‘‘নিশ্চয় আপনি উত্তম চরিত্রের উপর অধিষ্ঠিত ।’’ (সূরা আল্ কলম :৪)

মূলতঃ তাঁর চরিত্র হল পবিত্র কুরআনের বাস্তব প্রতিচ্ছবি। তাঁর গোটা জীবন কাহিনী তথা সীরাত পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, তাঁর চরিত্রে ছিল ভীতিজড়িত বিনয়, বীরত্ব ও সাহসিকতা মিশ্রিত লজ্জা, প্রচার বিমুখ দানশীলতা, সর্বজনবিদিত আমানতদারী, বিশ্বস্ততা, কথা ও কাজে সত্য ও সততা, পার্থিব ভোগ বিলাস থেকে সম্পুর্ণ বিমুখতা, নিষ্ঠা, ভাষার বিশুদ্ধতা ও হৃদয়ের দৃঢ়তা, অসাধারণ জ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তা, ছোট-বড় সকলের প্রতি দয়া ও ভালবাসা, নম্র আচরণ, অপরাধীর প্রতি ক্ষমাপ্রিয়তা, বিপদাপদে ধৈর্য ও সত্য বলার দুর্বার সাহসিকতা। তাঁর প্রিয় সহধর্মিনী আয়েশা রাযিআল্লাহু আনহা-এর দৃষ্টিতে-

«كان خلقه القرآن»

‘‘পবিত্র কুরআনই ছিল তাঁর চরিত্র।’’ (মুসলিম, ১ম খন্ড, পৃ. ৭৪৬)

সমাজের দুর্বল অসহায় ও নির্যাতিতদের অবস্থা দৃষ্টে তিনি অত্যন্ত চিন্তিত ও বিহ্বল হয়ে পড়তেন; তাদের মুক্তি নিশ্চিত করার নিমিত্তে সারাক্ষণ চিন্তা করতেন। তৎকালীন সমাজে প্রচলিত যাবতীয় অশ্লীলতা, বেহায়াপনা, পাপাচার, মুর্তিপূজা তাঁকে পীড়া ও মর্মন্তুদ করত। এসব নিরসনকল্পে সমাজে শান্তি ও মুক্তি ফিরিয়ে আনার জন্য তিনি ‘‘হিলফুল ফুযুল’’ নামক একটি শান্তি সংঘে যোগ দিয়েছিলেন। হিলফুল ফুযুল (حلف الفضول)-এর হিলফ শব্দের অর্থ পারস্পরিক সহযোগিতা ও ঐক্যের অঙ্গীকার। (দ্র.ইবন মানযুর, ২য় খন্ড, পৃ. ৯৬৩) সুদুর অতীতে আল-ফাদল নামক কয়েকজন শান্তিপ্রিয় লোকের উদ্যোগে মক্কায় সামাজিক শান্তি-শৃংখলা ও জান-মালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য একটি সংঘ প্রতিষ্ঠিত হয়। এটিই ইতিহাসে হিলফুল ফুযূল নামে প্রসিদ্ধ। এ সংঘের মাধ্যমে তারা সমাজ হতে যাবতীয় অন্যায় অবিচার দূর করে শান্তি, শৃংখলা ও নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনতে চেয়েছিল। ফলে তাদের অঙ্গীকার ছিল নিন্মরূপ :

تحالفوا أن ترد الفضول على أهلها و إلا يغزو ظالمٌ مظلوماً.

‘‘তারা (জোরপূর্বক ছিনিয়ে নেয়া) ‘ফুদূল’ মাল তার প্রাপককে ফিরিয়ে দিবে এবং শক্তিহীনদের উপর শক্তিমানদের অত্যাচার প্রতিহত করবে।’’ (ইবন হিশাম, সীরাতুন নাবাবিয়্যা, ১ম খন্ড, পৃ. ১৩৯)।

মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নবুওয়ত লাভের বিশ বৎসর পূর্বে যিলকদ মাসে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। (ইবন হিশাম, সীরাতুন নাবাবিয়্যা, ১ম খন্ড, পৃ. ১৪০ ; ইবন সা‘দ, ১ম খন্ড, পৃ. ১২৮) আব্দুল্লাহ ইবন জুদ‘আনের বাড়ীতে এ মহানুভবতামূলক চুক্তি অনুষ্ঠিত হয়। নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন, তখন তাঁর বয়স হয়েছিল বিশ বছর। নবুওয়তপ্রাপ্তির কোন এক সময়ে তিনি এ সম্পর্কে বলেন,

«لقد شهدت مع عمومتي حلفا في دار عبد الله بن جدعان ما احب أن لي به حمر النعم ولو دعيت به في الإسلام لأجبت».  

‘‘আব্দুল্লাহ ইবন জুদ‘আনের গৃহে অনুষ্ঠিত শপথ অনুষ্ঠানে আমি আমার চাচাদের সাথে অংশগ্রহণ করেছি। তার বিনিময়ে আমাকে লালবর্ণের উষ্ট্রী প্রদান করা হলেও আমি সন্তুষ্ট হব না। ইসলামী সমাজেও যদি কেউ আমাকে ইহার জন্য ডাকে তবে আমি অবশ্যই সাড়া দিব।’’ (হাকেম আন্ নিশাপুরী, মুসতাদরাকে হাকেম, ২য় খন্ড, (হায়দারাবাদ: দায়েরাতুল মা’আরেফ আল ওসমানীয়া, তা.বি) পৃ.২২০ ; ইমাম আহমদ ইবন হাম্বল, মুসনাদে আহমাদ, ১ম খন্ড, পৃ. ১৯০-১৯৪)। নবুওয়ত পাওয়ার পর এ ঘটনার উল্লেখ করে তিনি বলতেন, আমি আব্দুল্লাহ ইবন জুদ‘আনের ঘরে এমন চুক্তিতে শরীক ছিলাম, যার বিনিময়ে লাল উটও আমার পছন্দ নয়। ইসলামী যুগে সে চুক্তির জন্যে যদি আমাকে ডাকা হতো তবে আমি অবশ্যই উপস্থিত হতাম। সুতরাং তাঁর স্বগোত্রের লোকেরা যে সকল মূর্তির উপাসনায় লিপ্ত ছিল, সেগুলোর প্রতি ছিল তাঁর ঘৃণা এবং সমস্ত বিকৃত আকীদা বিশ্বাস যা সমসাময়িক বিশ্বকে ভ্রান্তির আঁধারে নিমজ্জিত করেছিল তার প্রতি ছিল অশ্রদ্ধা।

নবুওয়ত লাভ

সমাজের অন্যায়-অবিচার, জুলুম-নির্যাতন, মূর্তিপূজাসহ অন্যান্য আনুষ্ঠানিক কার্যাদি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মনে খুব নাড়া দিত এবং তিনি নিজের ভেতর এক ধরনের অদৃশ্য ও অনিশ্চিত অস্থিরতা অনুভব করতেন; মানসিক চিন্তায় বিভোর থাকতেন। এ অবস্থায় একাকীত্ব ও নির্জনতাপ্রিয়তা তাঁর নিয়মিত অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল। নবুওয়ত প্রাপ্তির দিকে তিনি যতই অগ্রসর হচ্ছিলেন, ততই তাঁর চিন্তাশীলতা ও গাম্ভীর্যের গভীরতা বৃদ্ধি পাচ্ছিল। এ সময় তিনি প্রায়শঃ গৃহ ত্যাগ করে মক্কা থেকে দুই মাইল দুরে অবস্থিত হেরা পাহাড়ের একটি ছোট গুহায় নির্জনে চলে যেতেন। গুহার দৈর্ঘ্য চারগজ এবং প্রস্থ পৌনে দুই গজ। নীচের দিক গভীর নয়। ছোট একটা পথের পাশে ওপরের প্রান্তরে সঙ্গমস্থলে এ গুহা অবস্থিত। (আল্লামা ছফিউর রহমান মোবারকপূরী, প্রাগুক্ত, পৃ. ৮৪)। এমতাবস্থায় কোন কোন সময় তিনি রাত্রেও বাড়ী ফিরতেন না। অনেক সময় এরূপ হত যে, বিবি খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহা বিচলিত হয়ে পড়তেন এবং তাঁকে খুঁজে বের করে খাবার ও পানীয় পৌঁছে দিয়ে আসতেন।(শায়খুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক, বুখারী, ৫ম খন্ড, পৃ. ৮২)। নির্জনবাসকালীন সময়ে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাতের পর রাত বিনিদ্র কাটিয়ে দিতেন, দিনের পর দিন রোযা রাখতেন।(ড. মুহাম্মদ হোসাইন হায়কল, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জীবন চরিত, বঙ্গানুবাদ : মাওলানা আব্দুল আউয়াল, (ঢাকা : ইসলামিক ফাইন্ডেশন বাংলাদেশ,১৯৯৮), পৃ. ৬৬)। এ সময় তাঁর কাছে যত দরিদ্র লোক আসতো তিনি তাদেরকে খাবার ও পানীয় দান করতেন। নির্জনবাস শেষে বাড়ী ফিরবার পূর্বে তিনি সর্বপ্রম কা‘বা শরীফে প্রবেশ করে সাতবার বা ততোধিকবার কা‘বা গৃহের তাওয়াফ করতেন।(ইবন হিশাম, প্রাগুক্ত, পৃ . ৫৬-৫৭)। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরূপ নির্জনবাসের জন্য রমযান মাসকে বিশেষ করে বেছে নিতেন। এতে তাঁর আধ্যাত্মিক উৎকর্ষ প্রশান্তি ও চিন্তাশক্তির দৃঢ়তা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছিল। (মুহাম্মদ হোসাইন হায়কল, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জীবন চরিত, পৃ.৬৫)

অতঃপর তিনি যখন চল্লিশ বছর বয়সে পদার্পন করেন, তখন তাঁর উপর ওহী নাযিল হওয়া আরম্ভ হয় (ইবন হাজর আসকালানী, ফাত্হুল বারী, পৃ. ৫৩৪, ৭ম খন্ড, পৃ. ১৩২ও ২২৭ ; ইমাম নববী, শারহে মুসলিম, ৪ র্থ খন্ড, পৃ. ১৮২৪ও ১৮২৭ , ইবন হিশাম, ১ম খন্ড, পৃ. ২৫১-২৫২)। কেননা, চল্লিশ বছর বয়স হচ্ছে মানুষের পূর্ণতা ও পরিপক্কতার বয়স। এ সময় মানুষের শারিরীক ও আত্মিক শক্তির উৎকর্ষ চুড়ান্তরূপে পরিগ্রহ করে। পবিত্র কুরআন এ বিষয়ে ঘোষণা:

 ﴿ حَتَّىٰٓ إِذَا بَلَغَ أَشُدَّهُۥ وَبَلَغَ أَرۡبَعِينَ سَنَةٗ ﴾ [الاحقاف: ١٥] 

‘‘অবশেষে সে যখন শক্তি সামর্থের রয়সে ও চল্লিশ বছরে পৌঁছেছে।’’ (সূরা আল-আহকাফ : ১৫)

সুতরাং নবুয়তের ন্যায় গুরু দায়িত্ব বহন ও যথাযথভাবে পালনের এটিই সবচেয়ে উপযুক্ত সময়কাল।

রাসূলের দাওয়াতের পদ্ধতি ও কৌশল

মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আল্লাহ তাআলা সত্য দীন সহকারে মানবজাতির মুক্তি ও কল্যাণের পথ নির্দেশক হিসেবে সুসংবাদদাতা ও ভীতিপ্রদর্শক রূপে পাঠিয়েছেন। মহান আল্লাহ পাক ফরমান- হে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমি আপনাকে সাক্ষ্যদাতা, সুসংবাদদাতা, ভীতিপ্রদর্শক, আল্লাহর দিকে আহবানকারী এবং জ্বলন্ত প্রদীপরূপে প্রেরণ করেছি। (আল-কুরআন, সূরা আহযাব : ৪৫)। বাল্যকাল থেকেই আল্লাহ তাঁকে সে কাজের জন্য প্রস্তুত করে নিতে থাকেন। জাহেলিয়াতের নাপাক ও খারাপ অভ্যাসসমূহ থেকে আল্লাহ তাআলা তাঁকে সর্বদাই দূরে ও মুক্ত রাখেন। নবুয়তের পূর্বে আরবে যে শির্ক ও মূর্তিপূজার প্রচলন ছিল তা থেকে তিনি মুক্ত ছিলেন। তিনি কখনও কোন মূর্তির সামনে মাথা নত করেন নি। মূর্তির নামে পশু যবেহ করেননি এবং যবেহকৃত কোন প্রাণীর গোশতও ভক্ষন করেননি, তখন থেকেই তাঁর মনে তাওহীদের ধারণ বদ্ধমূল ছিল। নবুয়তের পূর্বে মক্কায় কোন অশ্লীল কাজে তিনি কখনও অংশগ্রহণ করেন নি। এ মর্মে তিনি বলেন, ‘‘আমি একদা পারিবারের ছাগল চরাচ্ছিলাম। এক রাতে আমি আমার সঙ্গীকে বললাম, আমার ছাগলগুলো দেখশুনা কর। আমি মক্কা যাব এবং যুবকরা যেখানে কিচ্ছা-কাহিনী শুনে আমিও শুনব। সাথী বলল যাও। আমি মক্কায় আসলাম, সেখানে এক ঘরে কৌতুক ও ঢোল-বাজনার শব্দ পেয়ে জিজ্ঞেস করলাম, এখানে কি হচ্ছে? আমাকে বলা হলো: অমুক ব্যক্তি অমুক মহিলাকে বিবাহ করছে। আমি দেখার উদ্দেশ্যে বসে পড়লাম। তৎক্ষনাৎ আল্লাহ আমার চোখে নিদ্রা চেপে দিলেন। আল্লাহর কসম ! আমি রৌদ্রের খরতাপে জাগ্রত হলাম। কিছুই দেখতে পেলাম না। (জালালুদ্দীন সুয়ূতী, আল খাসাইসুল কুবরা, পৃ. ১৫৬) তবে বর্ণনাটি দুর্বল। কারণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে এ ধরনের কোন ইচ্ছাও সংঘটিত হয় নি। চাল-চলন, আচার-ব্যবহার ও কথাবার্তায় তিনি ছিলেন এক অনন্য ও ব্যতিক্রমধর্মী আদর্শবান বালক। তৎকালীন সমাজ তাঁকে সবচেয়ে বেশী প্রশংসনীয় গুণাবলী, উন্নত মনোবল, উত্তম চরিত্রে বিভূষিত, লাজনম্র, সত্যবাদী, আমানতদার, কটুক্তি ও অশ্লীল বাক্য উচ্চরণ থেকে দূরে বলে ধারণা করত। এমনকি তাঁর জাতির লোকেরা তাঁকে আল্ আমিন (বিশ্বস্ত, আমানতদার) নামে আখ্যায়িত করে। (ইবন হিশাম, ১ম খন্ড, পৃ. ১৮৩।) তাঁর দাদা আরবের কুরাইশ নেতৃবৃন্দের সামনে তাঁকে সাইয়্যেদ বা নেতা বলে ডাকতেন। (ইবন কাছীর, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১ম খন্ড, পৃ. ২৫২।) আল্লাহ প্রথম থেকেই তাঁকে মহান দাওয়াতের জন্য উত্তম চরিত্র গঠনের প্রশিক্ষন দিয়েছেন। সুতরাং নৈতিক দিক দিয়ে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সুপ্রশিক্ষিত।

খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহা-এর ব্যবসা পরিচালনার মাধ্যমে দৈহিক কষ্ট সহিষ্ণুতা, ধৈর্য, পরিশ্রমপ্রিয়তা ও সততা প্রভৃতি বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ছিলেন তিনি। আল্লাহর নৈকট্য লাভ ও আনুগত্য করার জন্য তিনি নিজেকে সম্পূর্ণরুপে সপে দেয়ার মাধ্যমে দা‘ওয়াতের জন্য মানসিক ভাবে প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। ইবাদাত করার মাধ্যমে তিনি আল্লাহর নৈকট্য লাভ করেন। স্বীয় আত্মাকে পবিত্র ও শক্তিশালী করেন এবং আধ্যাত্মিক শক্তিতে বলীয়ন হয়ে উঠেন। স্নেহ, মমতা ভালবাসা ধৈর্য, কষ্ট ও পরিশ্রমপ্রিয়তাসহ সকল  গুণে গুণান্বিত হয়ে নিজেকে দৈহিক, মানসিক, আধ্যাত্মিক ও নৈতিক দিক দিয়ে প্রস্ত্তত করার পর ওহীর জ্ঞানে সমৃদ্ধ হন। অতএব দা‘ওয়াতের সূচনালগ্নে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যক্তিগত প্রস্তুতির মাধ্যমে নিজকে দা‘ওয়াতের উপযোগী করে গড়ে তুলেছিলেন। কেননা ইসলামী দা‘ওয়াতের প্রভাব হলো, ব্যক্তি নিজে যে আদর্শের প্রতি ঈমান এনেছে, তা কতটুকু তার হৃদয়ে শিকড় স্থাপন করেছে এবং বাস্তবে প্রতিফলিত হয়েছে এর উপর ভিত্তি করেই স্বীয় পরিবার, পরিজন, আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীর উপর প্রভাব পরে। এজন্যে প্রয়োজন ব্যক্তির প্রাথমিকভাবে ব্যক্তিগত প্রস্তুতি গ্রহণ, যা তাকে সাফল্যের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দিতে সক্ষম হবে। ইসলামের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, যুগে যুগে সকল নবী-রাসূল নিজেদেরকে প্রথমে এ কাজের জন্য উপযোগী করে গড়ে তুলেছেন ব্যক্তিগত প্রস্তুতির মাধ্যমে।

দা‘ওয়াতের সূচনা

হেরা গুহায় প্রথম ওহী নাযিল হওয়ার মধ্য দিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নবুওয়ত, আর সূরা আল-মুদ্দাসসিরের মাধ্যমে রিসালাতের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হন। সূরা ‘আলাকের প্রথম পাঁচটি আয়াতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে জ্ঞান অন্বেষণের প্রতি আহবান জানানো হয়েছে। তৎকালীন সমাজ জ্ঞান-বিজ্ঞানের উচ্চ শিখরে আরোহন করেছিল। বিশেষতঃ সাহিত্যের অঙ্গনে তাদের বিচরণ ছিল অত্যাধিক। এজন্য মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে দা‘ওয়াতের কাজ আঞ্জাম দেয়ার প্রস্তুতিস্বরূপ জ্ঞান অর্জন করার আহবান জানানো হয়। কারণ আল্লাহর পথে মানুষদেরকে যিনি দা‘ওয়াত দিবেন, তাঁকে অবশ্যই উদ্দিষ্ট বিষয়ে প্রভূত জ্ঞানের অধিকারী হতে হবে। এটি আল্লাহ প্রদত্ত ওহীর জ্ঞান, যা মানুষদেরকে অন্ধকার থেকে আলোর পথে, বাতিলের পথ থেকে হকের পথে, সন্দেহ-সংশয় থেকে বিশ্বাসের পথে চলতে সাহায্য করে। কিন্তু পরবর্তীতে দীর্ঘ সময় ওহীর আগমন বন্ধ থাকে যা ‘‘ফাতরাতুল ওহী’’ নামে খ্যাত।  ‘‘فترة الوحي-এর সময়কাল কারও কারও নিকট তিন বা আড়াই বছর। মূলত: সেটা অল্প কিছু দিন ছিল। [আর রাহীকুল মাখতুম, পৃ.৯৬-৯৭, তাওহীদ পাবলিকেশন্স] এ সময়ে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উপর পবিত্র কুরআনের অবতরণ বন্ধ ছিল। সময়টি হলো সূরা আলাক ও সূরা আল-মুদ্দাচ্ছির অবতীর্ণ হওয়ার মধ্যবর্তী সময়। (ইবন হাজর আসকালানী, ফতহুল বারী, ১ম খন্ড, প্রাগুক্ত, পৃ.২২)। তারপরও আবার কিছু দিন বন্ধ থাকার পর সূরা দুহা নাযিল হয়। ফলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অত্যন্ত অস্থির ও বিচলিত হয়ে মানসিকভাবে কষ্ট অনুভব করেন। তাঁর মানসিক অস্থিরতা ও দুশ্চিন্তা দূরীভূত করে মহান আল্লাহ ওহী নাযিল করেন। এ সময় সূরা মুদ্দাসি্সর এর ১-৭ আয়াত অবতীর্ণ হয়, যার মাধ্যমে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দা‘ওয়াতী কাজে অগ্রবর্তী হয়ে সংশোধন ও সংস্কারের নির্দেশসহ পবিত্রতা অন্যায়-অবিচার হতে বিরত থাকা, অল্পে তুষ্ট থাকা ও যাবতীয় বাধা বিপত্তিতে ধৈর্য ধারণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।  আল্লাহর বাণী,

  ﴿ يَٰٓأَيُّهَا ٱلۡمُدَّثِّرُ ١ قُمۡ فَأَنذِرۡ ٢ وَرَبَّكَ فَكَبِّرۡ ٣ وَثِيَابَكَ فَطَهِّرۡ ٤ وَٱلرُّجۡزَ فَٱهۡجُرۡ ٥ وَلَا تَمۡنُن تَسۡتَكۡثِرُ ٦ ﴾ [المدثر: ١،  ٦] 

‘‘হে বস্ত্রাবৃত ! উঠ এবং সতর্ক কর। তোমার রবের শ্রেষ্ঠত্ব বর্ণনা কর। স্বীয় পোশাক পরিচ্ছেদ পবিত্র করুন। অপবিত্রতা হতে দূরে থাক। অধিক পাওয়ার প্রত্যাশায় দান করিও  না এবং তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে ধৈর্য ধারণ কর।’’ সূরা মুদ্দাচ্ছির : ১-৭।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি আলোচ্য আয়াত ক’টি অবতীর্ণের মাধ্যমে ইসলামী দা‘ওয়াতের সূচনা হয়। তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যক্তিগতভাবে এ কাজ শুরু করেন। সে সময় তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সবচেয়ে নিকটতম ব্যক্তিদের দা‘ওয়াত দেওয়ার টার্গেট নির্ধারণ করেন। স্বীয় পরিবার-পরিজন, আত্মীয়-স্বজন এবং বন্ধু-বান্ধবদের নিকট ইসলামের সুমহান দা‘ওয়াত উপস্থাপন করেন। এ ক্ষেত্রে তিনি ঐ সকল লোকদের দা‘ওয়াত দিয়েছেন, যাদের চেহারায় সরলতা ও নমনীয়তার ছাপ রয়েছে এবং যারা তাঁকে সত্যবাদী, ন্যায়নীতিপরায়ণ ও সৎমানুষ হিসেবে জানে ও শ্রদ্ধা করে। (আর রাহীকুল মাখতুম, পৃ.৯০।) তাঁর সহধর্মিনী খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহা ওহীর অবতরণ ও ওয়ারাকা ইবন নওফলের ভবিষ্যতবাণী শুনে তাঁর প্রতি ঈমান আনয়নের ঘোষণা দেন এবং অত্যন্ত বিচলিত অবস্থায় তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে দৃঢ়তার সাথে সান্ত্বনা দিলেন। অতপরঃ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর নিকটতম ব্যক্তিদের মধ্যে স্বীয় চাচাত ভাই আলী ইবন আবি তালেব ও স্বীয় গোলাম যায়েদ বিন হারেছাকে দা‘ওয়াত দেন। যায়েদ ইবন হারেছা এসেছিলেন যুদ্ধে বন্দী হয়ে। পরে খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহা তাঁর মালিক হন এবং স্বামীর জন্য তাকে নিয়োজিত করেন। এরপর তার পিতা ও চাচা তাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য এসেছিলেন কিন্তু পিতা ও চাচাকে ছেড়ে তিনি প্রিয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে থাকতে পছন্দ করেন। এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর ভৃত্য যায়েদকে আরব দেশীয় রীতি অনুযায়ী পালক পুত্র হিসেবে গ্রহণ করেন। এ ঘটনার পর তিনি যায়েদ ইবন মুহাম্মদ নামে পরিচিত হন। (আর রাহীকুল মাখতুম, পৃ.৯০)। এভাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথমে নিজ পরিবারে দা‘ওয়াতের কাজ করেন। এরা সবাই প্রিয় রাসূলের সততা, সত্যবাদিতা ও মহানুভবতা দেখে ইসলামের সূশীতল ছায়াতলে আশ্রয় নেন। ইতিহাসে তারা ‘‘সাবেকীনে আউয়ালীন’’ নামে পরিচিত। সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণকারীদেরকে ‘‘সাবেকীনে আউয়ালীন’’ বলে। ইসলামে তাদের মর্যাদা সর্বাধিক। সর্বপ্রথম স্বাধীন পুরুষদের মধ্যে ইসলাম গ্রহণ করেন আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু, মহিলাদের মধ্যে খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহা, আযাদকৃত গোলামদের মধ্যে যায়েদ ইবন হারেছা রাদিয়াল্লাহু আনহু এবং বালকদের মধ্যে আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু। (আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩য় খন্ড, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩১)। খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহা ইসলাম গ্রহণের পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খাদিজাকে নিয়ে প্রথম দু’রাকাত নামায আদায় করেন। তখন নামায দু’রাকাতই ছিল। পরে আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুকে নিয়ে কাবাগৃহে নামায আদায় করেন। আফীফ কিন্দী বলেন, আমি জাহেলী যুগে স্ত্রীর আতর ও কাপড় ক্রয় করার জন্য মক্কায় এসেছিলাম। সেখানে ভোর বেলায় কা‘বা শরীফের দিকে আমার দৃষ্টি পড়ে। আব্বাস রাযিআল্লাহু আনহুও আমার সাথে ছিলেন। এ সময় একজন যুবক আগমন করেন এবং আকাশ পানে তাকিয়ে কিবলার দিকে মুখ করে দাঁড়ান। কিছুক্ষন পর একজন বালক এসে তাঁর ডান পাশে দাঁড়ায়। অতঃপর একজন নারী এসে এদের পিছনে দাঁড়ায়। এরা দু’জন নামায আদায় করে চলে গেলে আমি আব্বাস রাযিআল্লাহু আনহুকে জিজ্ঞেস করলাম, আব্বাস ঘটনা কি? তখন আব্বাস বললেন, তুমি কি জান এ যুবক ও মহিলাটি কে? আমি জবাব দিলাম না। তিনি বললেন যুবকটি হচ্ছে আমার ভ্রাতুষ্পুত্র মুহাম্মাদ ইবন আব্দুল্লাহ। আর বালকটি হচ্ছে আলী। আর এ মহিলা হচ্ছে মুহাম্মাদের স্ত্রী। আমার ধারণা সারা দুনিয়ায় এ তিনজন ছাড়া কেউ তাদের দীনের অনুসারী নেই। আফীফ বলেন, এ কথা শুনে আমার মনে হয়েছে, চতুর্থ ব্যক্তি যদি তাদের সাথে আমি হতাম! তারপর তাঁর ঘনিষ্ট সুহৃদ আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু ইসলাম গ্রহণ করলেন এবং ইসলাম প্রচারে নিজেকে আত্মনিয়োগ করেন। তিনি ছিলেন সর্বজনপ্রিয়, নরম মেজায, উত্তম চরিত্র এবং উদার মনের মানুষ। চমৎকার ব্যবহারের কারণে সবসময় তার কাছে মানুষ আসা যাওয়া করতো। এ সময় তিনি সমাজের এমন কিছু ব্যক্তিবর্গকে দা‘ওয়াতের জন্য বেছে নিলেন, যাদের উপর তাঁর দৃঢ় আস্থা ও বিশ্বাস রয়েছে। তাঁর একান্ত প্রচেষ্টায় অনেক লোক ইসলামের অমীয় সূধা গ্রহণে উদ্বুদ্ধ হয়। তারা হলেন : ওসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু, আব্দুর রহমান ইবন আউফ, সা‘দ ইবন আবি ওয়াক্কাস, তালহা ইবন ওবায়দুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহুম প্রমুখ। পরবর্তীতে এদের অনেকেই জান্নাতের সুসংবাদ প্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিলেন। এরা সংখ্যায় আট জন, তারাই ছিল প্রথম ইসলাম গ্রহণকারী দল। তারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি ওহী নাযিলে বিশ্বাস স্থাপন করেন এবং তাঁর সাথে নামাজ আদায় করেন। এভাবে বিভিন্ন গোত্রের লোকজন ইসলামের শীতল ছায়ায় দলে দলে যোগদান করতে লাগল। মক্কার সর্বত্র ইসলামের আলোচনা চলতে থাকে এবং ইসলাম ব্যপকতা লাভ করে। (সীরাতে ইবন হিশাম, ১ম খন্ড, পৃ. ২৬২)। গোপন দা‘ওয়াতে যারা ইসলাম গ্রহণ করে তাদের সংখ্যা ছিল ৬০ জন। যার মধ্যে ১২ জন মহিলা ও ১৪ জন গোলাম ছিল। (ড. আকিল আব্দুহ মিশরী, তারিখুদ্ দাওয়াতুল ইসলামীয়্যা, ১ম সংস্করণ, সৌদি আরব: মাকতাবা দারুল মদিনা, ১৯৮৭, পৃ. ৮৬।) দা‘ওয়াতের এ পর্যায়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ পরিবারকে সর্বপ্রথম তাঁর এ কাজে সহযোগী বানান। ফলে সর্বপ্রথম স্বীয় স্ত্রীর নিকট দা‘ওয়াত উপস্থাপন করেন। কারণ, নিজের স্ত্রী যদি তার আদর্শের সাথে একমত না থাকে তাহলে এ কাজ যতই ভাল হোক অন্যরা তা গ্রহণ করতে কখনো এগিয়ে আসবে না। মানুষ কোন ব্যক্তিকে তখনই সার্বজনীনভাবে গ্রহণ করে যখন তাকে স্বীয় পরিবার পরিজনের নিকট গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি হিসেবে দেখে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উপর দা‘ওয়াতের এ গুরুদায়িত্ব সাময়িক কোন কাজ ছিল না। বরং এটি ছিল মৃত্যু পর্যন্ত তাঁর উপর অর্পিত দায়িত্ব। ফলে পরিবারের সহযোগিতা না থাকলে এ কাজ আঞ্জাম দেয়া খুবই দুরূহ ব্যাপার ছিল। এ কারণে তিনি প্রথমেই তাঁর স্ত্রীকে এ কাজের সাথী হিসেবে পেলেন। অপরদিকে আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু ছিলেন তাঁর পরিবারের সদস্য ও স্বীয় তত্বাবধানে প্রতিপালিত দশ বৎসর বয়সের এক বালক। আজ হয়ত সে বালক, কিন্তু আগামী দিনে সে হবে যুবক। একটি সমাজ ব্যবস্থাকে পরিবর্তন করার জন্য যুবকদের ভূমিকা অপরিসীম। কেননা যুবকেরাই সমাজ গড়ে এবং ভাঙ্গে। সুতরাং যুবকেরা যদি প্রথমেই একটি আদর্শের উপর বিশ্বাস স্থাপন করে তাহলে তাদের পক্ষে রিসালাতের এ মহান দায়িত্বের বোঝা বহন করা এবং সেটা প্রতিষ্ঠার কাজে ত্যাগ-তিতিক্ষা ও যাবতীয় কষ্ট মসিবত বরদাশত করা সম্ভব। তাই তিনি এ পর্যায়ে আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুকে প্রথমে টার্গেট নিলেন। অতঃপর তিনি স্বীয় ক্রীতদাস যায়েদ ইবন হারেছাকে ইসলাম গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করেন। মূলতঃ সে ছিল তাঁর পরিবারের একজন সদস্য। পরিবারের ভাল-মন্দ সবই তাঁর জানা আছে। তৎকালীন সমাজে দাস-দাসীদের মাধ্যমে মালিকগণ অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ করাতো। অন্যদিকে কোন ব্যক্তি ভাল না মন্দ তার পরিচয় পাওয়া যায় দাসদের নিকট থেকে। অতএব, দাসদের ইসলাম গ্রহণ অত্যধিক গুরুত্বের দাবী রাখে। তিনি জাহেলী সমাজের চরিত্রবান, প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে ইসলামের ছায়াতলে আনতে সক্ষম হন। এভাবে গোপন দা‘ওয়াতে ইসলাম গ্রহণকারী সকল মুসলিম নিজের জান মাল দীনের জন্য উৎসর্গ করার প্রতিশ্রুতি নিয়ে সীসাঢালা প্রাচীরের ন্যায় ঐক্যবদ্ধ থেকে একজন নেতার আনুগত্যের পরাকাষ্ঠার অধীনে ইসলামের সুমহান আলোকে চারদিকে বিচ্ছুরিত করে দেন। সময়, স্থান, কাল ও পরিপার্শ্বিক অবস্থার প্রতি লক্ষ্য রেখে তাঁরা দা‘ওয়াত দিয়েছেন। শুধু আবেগের বশবর্তী হয়ে দা‘ওয়াত দিলে লাভের চেয়ে ক্ষতির সম্ভাবনা ছিল অত্যাধিক। মক্কায় প্রাথমিক পর্যায়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর গোপন দা‘ওয়াতের পশ্চাতে উল্লেখযোগ্য কারণসমূহ হলো :

মক্কার কাফেরগণ যাতে এ বিষয়ে অবগত হয়ে প্রথম থেকে দা‘ওয়াতের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করার সুযোগ না পায়।

গোপন দা‘ওয়াতের মাধ্যমে প্রশিক্ষনপ্রাপ্ত দৃঢ় মনোবল সম্পন্ন একদল সাহায্যকারী লোক তৈরী অতীব প্রয়োজন ছিল। কেননা, কোন আদর্শই সমাজে বাস্তবায়িত হওয়া সম্ভব নয়, যতক্ষণ সে আদর্শ বাস্তবায়নের জন্য একদল সাহায্যকারী ও সমর্থক পাওয়া না যায়।

গোপন দা‘ওয়াতে যারা ইসলাম গ্রহণ করেছিল তাদের জাহেলিয়াতের সকল বন্ধন ও সম্পর্ক ভুলে গিয়ে নতুন ভৃাতৃত্ববন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার প্রয়োজন ছিল। যা অতি অল্প সময়ে সম্ভব নয় বরং সুদীর্ঘ সময়ে তিন বছরে এ ধরনের একদল ভাতৃত্ব সম্পন্ন লোক তৈরী হয়েছিল।

গোপনে দা‘ওয়াতী কাজ পরিচালনার মাধ্যমে মক্কার সকল গোত্রের নিকট দা‘ওয়াত পৌঁছানো সম্ভব হয়েছিল। সমাজের সকল শ্রেণীর ও সকল পর্যায়ের লোকদের অংশগ্রহণ একটি আন্দোলনের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

এ পর্যায়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নবাগত মুসলিমদেরকে ‘‘দারুল আরকামে’’ প্রশিক্ষণ দিয়ে এমন এক পর্যয়ে উন্নীত করতে সক্ষম হয়েছিলেন যারা পরবর্তীতে কুরাইশদের নিষ্ঠুর, নির্মম অত্যাচার-নির্যাতন ও কঠিন অগ্নি পরীক্ষার সময়ও ইসলাম থেকে বিচ্যুত হননি বরং সীসাঢালা প্রাচীরের ন্যায় একতাবদ্ধ থেকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সার্বিক সাহায্য ও সহযোগিতা করার জন্য সার্বক্ষণিক নিজেদেরকে উৎসর্গ করে দিয়েছিলেন।

প্রকাশ্য দা‘ওয়াত

নবুয়তের সূচনালগ্নে সূদীর্ঘ তিন বছর গোপন দা‘ওয়াতের মাধ্যমে যখন একদল লোক রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আদর্শ গ্রহণে উদ্বুদ্ধ হয়ে দীপ্ত কদমে মুষ্টিবদ্ধ হাতে দা‘ওয়াতের কাজ আঞ্জাম দিচ্ছিল, তখন আল্লাহ তা’য়ালা প্রকাশ্যে এ দা‘ওয়াত প্রদানের নির্দেশ প্রদান করেন। এ মর্মে মহান আল্লাহ বলেন

 ﴿ فَٱصۡدَعۡ بِمَا تُؤۡمَرُ وَأَعۡرِضۡ عَنِ ٱلۡمُشۡرِكِينَ ٩٤ ﴾ [الحجر: ٩٤] 

‘‘হে নবী আপনাকে যে বিষয়ে আদেশ দেয়া হয়েছে, তা প্রকাশ্যে ঘোষণা দিন এবং মুশরিকদের মোটেও পরোয়া করবেন না।’’ (সূরা হিজর : ৯৪) কুরআনের অন্যত্র আরো ঘোষিত হয়েছে

  ﴿ وَأَنذِرۡ عَشِيرَتَكَ ٱلۡأَقۡرَبِينَ ٢١٤ ﴾ [الشعراء: ٢١٤]  

‘‘আর আপনি নিজের ঘনিষ্ট আত্নীয়স্বজনকে (আল্লাহর) ভয় প্রদর্শন করুন। (সূরা আশ্-শু’আরা : ১৪)

আল্লাহর এই নির্দেশ প্রাপ্ত হয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যাপকভাবে সর্বসাধারণকে এবং বিশেষভাবে নিজের আত্নীয়স্বজনকে আল্লাহর নির্দশিত মহাসত্য এবং আল্লাহর মনোনীত একমাত্র দ্বীন গ্রহণের জন্য প্রকাশ্যে আহবান জানাতে প্রস্তুত হলেন। এক্ষেত্রে তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দু’টি মাধ্যম গ্রহণ করেন।

ক. ব্যক্তিগত যোগাযোগ ও সুসম্পর্ক স্থাপন

ইসলামী দা‘ওয়াতের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত যোগাযোগ এর গুরুত্ব আপরিসীম। এর মাধ্যমে পরস্পরের মাঝে সৌহার্দ্যপূর্ণ ও সুসম্পর্ক সৃষ্টি হয় । ফলে পরষ্পারিক বিশস্ততা ও ভাতৃত্ববোধ বৃদ্ধি পায়। ব্যক্তিগতভাবে এ সম্পর্ক বৃদ্ধির অন্যতম রূপ হলো একত্রে আহার করা । রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জীবনে এ পদ্ধতির সমাবেশ ঘটেছিল। তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রকাশ্যে দা‘ওয়াতের নির্দেশ পেয়ে আব্দুল মোত্তালিব পরিবারের লোকদের জন্য একটি ভোজের আয়োজন করলেন, এই ভোজে তাঁর চাচা হামযা রাদিয়াল্লাহু আনহু, আবুতালিব ও আব্বাসের ন্যায় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গও যোগদান করেন। আহারের পর তিনি সংক্ষিপ্ত ভাষণ দেন। তিনি বলেন ‘‘হে আব্দুল মুত্তালিবের বংশধর!  আমি আপনাদের জন্য ইহকাল ও পরকালের এমন কল্যাণ নিয়ে আগমন করেছি, যা আরবের কোন ব্যক্তি তার স্বজাতির জন্য কোনদিন আনয়ন করেনি। আমি আপনাদেরকে সে কল্যাণের দিকে আহবান জানাচ্ছি। এ কাজে আমার সাথী হবার জন্য কে কে প্রস্তুত? সত্যের আহবানে আসুন। পথ প্রদর্শক কখনও তার সঙ্গীদের কাছে মিথ্যা বলে না। আল্লাহর শপথ ! যদি সকল লোক মিথ্যা কথা বলে, তবুও আমি আপনাদের নিকট মিথ্যা বলব না, যদি সকল লোক ধোঁকা দেয়, তবুও আমি ধোঁকা দিব না। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহ নেই এবং আমি বিশেষভাবে আপনাদের ও সকল মানুষের নিকট আল্লাহর রাসূল হিসেবে মনোনীত। আল্লাহর শপথ! যেভাবে তোমরা নিদ্রা যাও সেভাবে মৃত্যুবরণ করবে, যেভাবে তোমরা নিদ্রা থেকে উঠ সেভাবে তোমরা কবর থেকে জাগ্রত হবে। তোমরা যে কাজই করো না কেন আল্লাহর কাছে তার অবশ্যই হিসেব দিতে হবে। ভাল কাজের জন্য ভাল পুরস্কার এবং মন্দ কাজের জন্য মন্দ পুরুস্কার পাবে। মনে রেখ, জান্নাত চিরস্থায়ী, জাহান্নামও চিরস্থায়ী। আল্লাহর শপথ! হে আব্দুল মোত্তালিবের বংশধর, আমি তোমাদের নিকট উত্তম জিনিস নিয়ে এসেছি, আমার জ্ঞাতসারে জাতির মধ্যে কোন যুবক তা নিয়ে আনে নি। আমি দুনিয়া ও আখেরাতের  কল্যাণ নিয়ে এসেছি। এতদশ্রবণে উপস্থিত শ্রোতমন্ডলী সকলে একটু নরম সুরে কথা বলতে লাগল। আবু তালেব তাঁকে সাহায্য ও হেফাজত করার প্রতিশ্রুতি দিল। কিন্তু আব্দুল মোত্তালিব (পূর্ব পুরুষদের) ধর্ম ত্যাগের পক্ষপাতি নয়। আর আবু লাহাব বলল, চলো সে আমাদের ধবংস করে দিবে’’।

খ.  সংক্ষিপ্ত জনসভা

জনসভার মাধ্যমে সমবেত অসংখ্য মানুষের নিকট ইসলামের সুমহান আদর্শ সুস্পষ্ট ভাবে তুলে ধরা সহজ হয়। অতএব, দা‘ওয়াতের ক্ষেত্রে জনসভার গুরুত্ব অত্যাধিক। জনসভায় প্রাঞ্জলময় ভাষার বক্তৃতা প্রদানের মাধ্যমে জনগণের উপর প্রভাব বিস্তার করা সম্ভব হয় এবং মানুষের হৃদয়ে সত্য গ্রহণের সহজাত প্রবৃত্তিকে কার্যকর করা যায়। ফলে কোন কোন ভাষণ জাদুর ন্যায় প্রভাব ফেলে থাকে। প্রকাশ্যে দা‘ওয়াতের এ পর্যায়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ পদ্ধতিটিকে বেছে নিয়েছিলেন। তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সমস্ত হিম্মত ও সাহস সঞ্চার করে নতুন সম্ভাব্য সংঘাতময় পরিস্থিতির জন্য নিজেকে প্রস্তুত করে একদিন সাফা পাহাড়ের উপর উঠে দাঁড়ালেন। তারপর তিনি আরবের বিশেষ রীতি অনুযায়ী কুরাইশ জনতাকে ডাক দিলেন। তৎকালীন সময়ে কোন বিপদের মূহুর্তে জনগণকে সাহায্যের জন্য একটা বিশেষ সাংকেতিক ধ্বণি দিয়ে ডাকার রেওয়াজ ছিল। আর তা হল,  يا صباحاه  ‘‘হে প্রভাত কালের বিপদ!’’ তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে পদ্ধতি আবলম্বন করে আরবদের বিভিন্ন গোত্রের নাম ধরে ( ওহে ফিহরের বংশধর, ওহে আদীর বংশধর!) বলে ডাক দিলেন। অতঃপর কুরাইশ গোত্র ও আবু লাহাব সহ বিরাট জনতার দল ছুটে এলো। সবাই রুদ্ধশ্বাসে কান পেতে রইল কী হয়েছে জানার জন্যে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথমেই উচ্চস্বরে জিজ্ঞেস করলেন,

«أ رايتكم  لو أخبرتكم أن خيلا تخرج بسفح هذا الجبل أ كنتم مصدقي قالوا ما جرينا عليكم كذبا قال فاني نذير لكم بين يدي عذاب شديد» .

‘‘আমি যদি বলি যে, ও পাহাড়ের অপর পাশে এক বিরাট শত্রু বাহিনী তোমাদের উপর আক্রমণের অপক্ষায় রয়েছে। তারা এখনই তোমাদের উপর আক্রমণ করবে। তাহলে তোমরা কি আমার কথা বিশ্বাস করবে?’’ (ইমাম বুখারী, ২য় খন্ড, প্র. ৭০২ ও ৭৪৩, ইমাম মুসলিম, ২য় খন্ড, পৃ. ১১৪) সবাই সমবেত স্বরে বলে উঠলো : হ্যাঁ, কেন করব না ? আমাদের জনামতে তুমি কখনো মিথ্যা কথা বলনি। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: তাহলে শোন! আমি বলছি তোমরা এক  আল্লাহকে প্রভু ও উপাস্য মেনে নাও নচেৎ তোমাদের উপর কঠিন আযাব নেমে আসবে।

এভাবে তিনি অতি সংক্ষেপে প্রথমবারের মত উন্মুক্তভাবে দা‘ওয়াত পেশ করলেন। তাঁর চাচা আবু লাহাব কথাটা শুনা মাত্রই তেলে বেগুনে জ্বলে উঠে বললো ‘‘ওরে হতভাগা ! তুই আজকের মধ্যেই ধ্বংস হয়ে যা। এ কথা বলার জন্যই কি আমাদের এখানে ডেকেছিলি। ফলে আবু লাহাব অন্যান্য নেতৃস্থানীয় লোকেরা খুবই ক্ষুদ্ধ ও ক্রুদ্ধ হয়ে চলে গেল।

এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয় যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দা‘ওয়াতের প্রথম পর্যায়ে নিকটাত্মীয়দের ও নিজবংশীয় লোকদের মাঝে এ মহান আহ্বান পৌঁছাতে সচেষ্ট ছিলেন। কেননা, নিকটতর লোকজনের সাথে দা‘ঈকে সবসমময় পারিবারিক ও সামাজিকভাবে চলাফেরা করতে হয়। এমনকি বিভিন্ন বিপদ-আপদে তারা সর্বদা পাশে থাকে। কোন ব্যক্তির ভাল-মন্দের সাক্ষ্য স্বীয় বংশের লোকদের দ্বারাই অধিকতর গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হয়। সুতরাং নিজ বংশীয় লোকজন যদি কোন ব্যক্তির আদর্শের প্রতি একাত্মতা পোষণ করে তাহলে সে আদর্শ বাস্তবায়ন করা অনেক সহজ হয়। আর যদি বংশের লোকেরা প্রথম বিরোধী ভুমিকায় অবতীর্ণ হয়, তাহেল বহিরাগত লোকদের সে আদর্শ গ্রহণের প্রতি চরম অনীহা সৃষ্টি হয়। অতএব, যে কোন আদর্শ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে নিজ বংশের লোকদের সর্বপ্রথম সে আদর্শে অনুপ্রাণিত করা অতীব গুরুত্বপূর্ণ কাজ।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন ইসলামের একনিষ্ঠ দা‘ঈ। তিনি অত্যন্ত হিকমতপূর্ণ পন্থায় ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে তৎকালীন আরবের বর্বর ও জাহেলী সমাজে ইসলামী দা‘ওয়াত উপস্থাপন করেছেন। তার দা‘ওয়াত ছিল অত্যন্ত ব্যাপক, যা মানুষের ব্যক্তিগত জীবন, পারিবারিক জীবন, সামাজিক জীবন, রাষ্ট্রীয় জীবন, এমনকি আন্তর্জাতিক জীবন পর্যন্ত পরিব্যপ্ত। ধনী-দরিদ্র, মুসলিম-অমুসলিম, সাদা-কালো, কাফির-মুশরিক, নারী-পুরুষ, রাজা-প্রজা, সকলেই তাঁর দা‘ওয়াতের অন্তর্ভুক্ত ছিল।

চলবে. . .

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s