হাদীসে রাসূল (সা.)

hadise rasul

হিদায়াতের প্রতি আহ্বান

নাবী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন: “যে হেদায়েতের প্রতি আহবান জানায়, তার জন্য তার অনুসারীদের সমপরিমাণ সওয়াব রয়েছে, তবে তা তাদের সওয়াব থেকে কোন কিছু হ্রাস করবে না। আর যে পথভ্রষ্টতার প্রতি আহবান জানায়, তার ওপর তার অনুসারীদের সমপরিমাণ পাপ আরোপিত, তবে তা তাদের পাপ থেকে কোন কিছু হ্রাস করবে না।” [মুসলিম:২৬৭৪]

ঈমানের প্রকৃত স্বাদ

আব্বাস ইবন আবদুল মুত্তালিব (রাযিআল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলতে শুনেছেন: (“‏ ذَاقَ طَعْمَ الإِيمَانِ مَنْ رَضِيَ بِاللَّهِ رَبًّا وَبِالإِسْلاَمِ دِينًا وَبِمُحَمَّدٍ رَسُولاً ‏”) সে ব্যক্তি প্রকৃত ঈমানের স্বাদ পেয়েছে যে রব হিসাবে আল্লাহকে, দ্বীন হিসাবে ইসলামকে এবং রাসূল হিসাবে মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে সন্তুষ্ট চিত্তে মেনে নিয়েছে। (সহিহ মুসলিম, খন্ড:১, হাদিস:৫৪, কিতাবুল ঈমান অধ্যায়)

আমীরের নেতৃত্বে জামায়াতবদ্ধ থাকতে হবে

হারিছ আল আশআ’রী (রাযিআল্লাহু আনহু) হ’তে বর্ণিত। নাবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: আল্লাহ্ আমাকে পাঁচটি বিষয়ের নির্দেশ দিয়েছেন যেন আমি সেগুলোর উপর আমল করি। আমিও তোমাদেরকে সেগুলোর উপর আমল করার নির্দেশ দিচ্ছি:

(১) জামা‘আতবদ্ধ থাকা।

(২) আমীরের নির্দেশ শ্রবণ করা

(৩) তাঁর আনুগত্য করা

(৪) (প্রয়োজনে) হিজরত করা এবং

(৫) আল্লাহ’র রাস্তায় জিহাদ করা

যে ব্যক্তি জামা‘আত হ’তে এক বিঘত পরিমাণ দূরে সরে গেল, সে নিজের গর্দান হ’তে ইসলামের রশি খুলে ফেললো- যতক্ষণ না সে তওবা করে তাতে ফিরে আসে। আর যে ব্যক্তি মানুষকে জাহেলিয়াতের রীতি-নীতির দিকে আহ্বান জানালো, সে ব্যক্তি জাহান্নামীদের দলভুক্ত হল (কিংবা সে তো জাহান্নামের পঁচা-গলা লাশ)।

সাহাবায়ে কেরামগণের মধ্য হতে কেউ একজন প্রশ্ন করলেন: হে আল্লাহ’র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! যদি সে সালাত আদায় করে, সাওম পালন করে তবুও?

তিনি বললেন: হ্যাঁ, যদিও সে সালাত আদায় করে, সিয়াম পালন করে এবং ধারণা করে যে, সে একজন ‘মুসলিম’।

[আহমাদ হা/১৭২০৯; তিরমিযী হা/২৮৬৩ ইফাবা; মিশকাত হা/৩৬৯৪; সহীহ তারগীব ও তারহীব ১ম খণ্ড হা/৫৫২, সহীহ ইবনে খুজাইমা ১৮৯৫, মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক ৫১৪১]

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ
مَنْ خَرَجَ مِنَ الطَّاعَةِ وَفَارَقَ الْجَمَاعَةَ شبرا فَمَاتَ إلا مَاتَ مِيتَةً جَاهِلِيَّةً
“যে ব্যক্তি আমীরের আনুগত্য থেকে বের হয়ে গেল এবং মুসলিমদের জামাআত থেকে এক বিঘত পরিমাণ বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়ে মৃত্যু বরণ করল, সে জাহেলীয়াতের (কুফরীর) উপর মৃত্যু বরণ করল”। (সহীহ মুসলিম, হাদীছ নং- ৪৮৯২)

সর্বোত্তম জিহাদ

রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেন – স্বৈরাচারী জালেম শাসকের সামনে সত্য কথা বলা সর্বোত্তম জিহাদ  – [সুনানে আবু দাউদ ৪৩৪৪]

ইখলাসের সহিত একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ইবাদাত-আ’মাল  না করার পরিণতি

আবু হুরায়রা (রাযিআল্লাহু আনহু) বর্ণনা করেন তিনি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে বলতে শুনেছেন- কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম এমন এক ব্যক্তির ব্যপারে ফয়সালা হবে যে শহীদ হয়েছিল। তাকে আনা হবে এবং তাকে যেসব সুযোগ সুবিধা দেওয়া হয়েছিল তা পেশ করা হবে। সে তা চিনতে পারবে। আল্লাহ তা’য়ালা তাকে জিজ্ঞেস করবেন, “আমি যে সমস্ত নিয়ামত তোমাকে দিয়েছিলাম, তার বিনিময়ে তুমি কি কাজ করেছ?” সে বলবে, আমি আপনার পথে লড়াই করে শহীদ হয়েছি। তিনি বলবেনঃ তুমি মিথ্যা বলছ। বরং তুমি এজন্য লড়াই করেছ যে, লোকেরা তোমাকে বীর বাহাদুর বলবে! আর তা বলাও হয়েছে। অতঃপর তার সম্বন্ধে নির্দেশ দেওয়া হবে এবং তাকে উপুড় করে টেনে নিয়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। অতঃপর আরেক ব্যক্তিকে নিয়ে আসা হবে, সে ইলম অর্জন করেছে, তা লোকদের শিক্ষা দিয়েছে আর কুরআন পাঠ করেছে। তাকে উপস্থিত করা হবে এবং তাকে দেওয়া সুযোগ সুবিধা গুলোও তার সামনে তুলে ধরা হবে। সে তা দেখে চিনতে পারবে। তুমি তোমার নিয়ামতের কি সদ্ব্যাবহার করেছ? সে বলবে আমি ইলম অর্জন করেছি, লোকদের তা শিক্ষা দিয়েছি এবং আপনার সন্তুষ্টির জন্য কুরআন পাঠ করেছি। আল্লাহ বলবেন, তুমি মিথ্যা কথা বলছ। বরং তুমি এই উদ্দেশ্যে বিদ্যা অর্জন করেছিলে যে, লোকেরা তোমাকে আলেম বা বিদ্বান বলবে, এবং কুরআন এই জন্য পাঠ করেছিলে যে, তোমাকে ক্বারী বলা হবে। আর তা বলাও হয়েছে। অতঃপর তার সম্বন্ধে নির্দেশ দেওয়া হবে এবং তাকে উপুড় করে টেনে নিয়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। অতঃপর আরেক ব্যক্তিকে আনা হবে, তাকে আল্লাহ অজস্র ধন দৌলত দান করেছেন এবং নানা প্রকারের ধন সম্পদ দিয়েছেন। তাকে দেওয়া সুযোগ সুবিধা গুলোও তার সামনে তুলে ধরা হবে। সে তা দেখে চিনতে পারবে। আল্লাহ জিজ্ঞেস করবেন, তোমার এ সম্পদ দ্বারা তুমি কি কাজ করেছ? সে বলবে, যেখানে ব্যায় করলে আপনি সন্তুষ্ট হবেন এমন কোন খাত আমি বাদ দেইনি বরং সেখানেই খরচ করেছি আপনার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে। মহান আল্লাহ বলবেন, তুমি মিথ্যা বলছ। বরং তুমি এই জন্য দান করেছ যে, লোকেরা তোমাকে দাতা বলবে। আর তা বলাও হয়েছে। অতঃপর তার সম্বন্ধে নির্দেশ দেওয়া হবে এবং তাকে উপুড় করে টেনে নিয়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। (সহীহ মুসলিম: ৪৭৭১ ইফাবা)

ইস্তেগফারের ফযীলত

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
« مَنْ لَزِمَ الاِسْتِغْفَارَ جَعَلَ اللَّهُ لَهُ مِنْ كُلِّ ضِيقٍ مَخْرَجًا وَمِنْ كُلِّ هَمٍّ فَرَجًا وَرَزَقَهُ مِنْ حَيْثُ لاَ يَحْتَسِبُ ».
‘যে ব্যক্তি নিয়মিত ইস্তেগফার করবে আল্লাহ তার সব সংকট থেকে উত্তরণের পথ বের করে দেবেন, সব দুশ্চিন্তা মিটিয়ে দেবেন এবং অকল্পনীয় উৎস থেকে তার রিজিকের সংস্থান করে দেবেন।’ [আবূ দাঊদ : ১৫২০; ইবন মাজা : ৩৮১৯; তাবরানী : ৬২৯১]

কেয়ামতের দিন জাহান্নামীদের মধ্যে সবচাইতে লঘু শাস্তি প্রাপ্ত ব্যক্তির শাস্তি

নু’মান ইবনে বাশীর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি:
“কেয়ামতের দিন জাহান্নামীদের মধ্যে সবচাইতে লঘু শাস্তি প্রাপ্ত ব্যক্তির শাস্তি হবে এই যে, তার দুই পায়ের তালুর নিচে আগুনের দু’টি অংগার রাখা হবে এবং তাতে তার মস্তিষ্ক সিদ্ধ হতে থাকবে। সে মনে করবে, তার চাইতে কঠিন শাস্তির মুখোমুখি আর কেউ হয়নি। অথচ সে-ই জাহান্নামীদের মধ্যে সবচাইতে হালকা শাস্তি প্রাপ্ত।”
[ বুখারী: ৬৫৬২ , মুসলিম: ২১৩ ]

দুনিয়ায় প্রাচুর্যের অধিকারীরাই কিয়ামতের দিন নিঃস্ব হবে
এবং
শির্ক না করা বান্দাহ জান্নাতে যাবে

আবু যার গিফারী রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি (একবার) নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে মদীনার কালো পাথুরে জমিনে হাঁটছিলাম। উহুদ পাহাড় আমাদের সামনে পড়ল। তিনি বললেন, হে আবু যার! এতে আমি খুশী নই যে, আমার নিকট এই উহুদ পাহাড় সমান স্বর্ণ থাকবে, এ অবস্থায় তিনদিন অতিবাহিত হবে অথচ তার মধ্য হতে একটি দীনারও আমার কাছে অবশিষ্ট থাকবে। অবশ্য তা থাকবে যা আমি ঋণ আদায়ের জন্য বাকী রাখব অথবা আল্লাহর বান্দাদের মাঝে এইভাবে এইভাবে এইভাবে ডানে, বামে ও পিছনে খরচ করবো।

অতঃপর কিছুদুর যাওয়ার পর তিনি বললেন, প্রাচুর্যের অধিকারীরাই কিয়ামতের দিন নিঃস্ব হবে। অবশ্য সে নয় যে সম্পদকে এইভাবে এইভাবে এইভাবে ডানে, বামে ও পিছনে ব্যয় করে। কিন্তু এ রকম লোকের সংখ্যা নেহাতই কম।’’তারপর তিনি আমাকে বললেন, তুমি এখানে বসে থাক, যতক্ষণ না আমি তোমার কাছে (ফিরে) আসছি।’’ এরপর তিনি রাতের অন্ধকারে চলতে লাগলেন, এমনকি শেষ পর্যন্ত তিনি অদৃশ্য হয়ে গেলেন। হঠাৎ আমি এক প্রচন্ড শব্দ শুনলাম। আমি ভয় পেলাম যে, কোনো শত্রু হয়তো নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সামনে পড়েছে। সুতরাং আমি তাঁর নিকট যাওয়ার ইচ্ছা করলাম, কিন্তু তাঁর কথা আমার স্মরণ হল, তুমি এখানে বসে থাক, যতক্ষণ না আমি তোমার কাছে (ফিরে) আসছি।’’

সুতরাং আমি তাঁর ফিরে না আসা পর্যন্ত বসে থাকলাম। (তিনি ফিরে এলে) আমি বললাম, আমি এক প্রচন্ড শব্দ শুনলাম, যাতে আমি ভয় পেলাম।’ সুতরাং যা শুনলাম আমি তা তাঁর কাছে উল্লেখ করলাম। তিনি বললেন, তুমি শব্দ শুনেছিলে?’’ আমি বললাম, জী হ্যাঁ!’ তিনি বললেন, তিনি জিব্রাঈল ছিলেন। তিনি আমার কাছে এসে বললেন, আপনার উম্মতের মধ্যে যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক না করে মরবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।’ আমি বললাম, ‘যদিও সে ব্যভিচার করে ও চুরি করে তবুও কি?’ তিনি বললেন, ‘যদিও সে ব্যভিচার করে ও চুরি করে’।

[বুখারি ৬২৬৮, ১২৩৭, ২৩৮৮, ৩২২২, ৫৮২৭, ৬৪৪৩, ৬৪৪৪, ৭৪৮৭, মুসলিম ৯৪, তিরমিযি ২৬৪৪, আহমদ ২০৮৪০, ২০৯০৫, ২০৯১৫, ২০৯৫৩]

সঠিক পথের দিকে ডাকার ফযীলত

আবূ হুরাইরাহ (রা:) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (সা:) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি সঠিক পথের দিকে ডাকে কিয়ামাত পর্যন্ত তার জন্য সে পথের অনুসারীদের প্রতিদানের সমান প্রতিদান রয়েছে। এতে তাদের প্রতিদান হতে সামান্য ঘাটতি হবে না। আর যে লোক বিভ্রান্তির দিকে ডাকে তার উপর সে রাস্তার অনুসারীদের পাপের অনুরূপ পাপ বর্তাবে। এতে তাদের পাপরাশি সামান্য হালকা হবে না। [মুসলিম, সহীহ, ইলম পর্ব, হা: ২৬৭৪; তিরমিযী, সুনান, পর্ব-ইলম, হা: ২৬৭৪; আবূ দাউদ, সুনান, হা: ৪৬০৯; ইবনে মাজাহ, হা: ২০৬; মুসনাদে আহমাদ, ২/৩৯৭; সুনান আদ-দারামী, হা: ৫১৩]

একদল আলেম ক্বিয়ামতের দিন তাদের নাড়িভুঁড়ির চারপাশে ঘুরতে থাকবে, যারা জনগণকে যা উপদেশ দিত নিজেরা তা মেনে চলত না।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

‘ক্বিয়ামতের দিন এক ব্যক্তিকে এনে তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। আগুনে তার নাড়িভুঁড়ি বেরিয়ে যাবে। তখন সে ঐ নাড়িভুঁড়ির চতুষ্পার্শ্বে ঘুরতে থাকবে। যেমনভাবে গাধা ঘানির চতুষ্পার্শ্বে ঘুরে থাকে। এহেন অবস্থাদৃষ্টে জাহান্নামবাসীরা তার চারপাশে একত্রিত হবে ও তাকে লক্ষ্য করে বলবে, হে অমুক! তোমার এ কী দশা? তুমি না সর্বদা আমাদেরকে ভাল কাজের উপদেশ দিতে ও মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করতে? তখন লোকটি বলবে, আমি তোমাদেরকে ভাল কাজের উপদেশ দিতাম, কিন্তু নিজে তা করতাম না। আমি তোমাদেরকে মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করতাম, কিন্তু আমি নিজে সে কাজ করতাম’
(বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/৫১৩৯ ‘সৎ কাজের নির্দেশ’ অনুচ্ছেদ)

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s