আক্বীদাহ্ ও আ’মল

ALLAH O RASUL

আক্বীদাহ্

দয়াময় মায়াময় আল্লাহ্’র নামে শুরু। যাবতীয় প্রশংসা যাঁর তরে নিবেদিত। অগণিত সালাত ও সালাম মহামহিম হযরত রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর পরিবার-পরিজন, সহচর ও অনুসারীগণের প্রতি। অতঃপর বক্তব্য এই যে,
মহান আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন বলেন-
“যে ব্যক্তি বিশ্বাসের বিষয়ে অবিশ্বাস রাখে তার সকল কর্ম বিফলে যাবে এবং আখিরাতে সে হবে ক্ষতিগ্রস্থ ।” (সূরা আল মায়িদাহ ৫:৫)
আয়াতাংশটি থেকে আমরা এই স্পষ্ট ধারণাই লাভ করতে পারি যে, মানবজাতির যাবতীয় পথভ্রষ্টতার মূলে রয়েছে মৌলিক আক্বীদাহ-বিশ্বাস থেকে বিচ্যুত হওয়া। এজন্য একজন মুসলিমের জন্য মৌলিক আক্বীদাহ-বিশ্বাসের ব্যাপারে সুস্পষ্ট জ্ঞান রাখা এবং সে আক্বীদাহ-বিশ্বাসের যথার্থতা নিশ্চিত করা অতীব গুরুত্বপূর্ণ। কেননা আক্বীদাহ-বিশ্বাসের বিশুদ্ধতা ব্যতীত কোন ব্যক্তি প্রকৃত অর্থে মুসলিম হতে পারে না। প্রতিটি কথা ও কর্ম যদি বিশুদ্ধ আক্বীদাহ ও বিশ্বাস থেকে নির্গত না হয় তবে তা আল্লাহ’র কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না।
দুনিয়ায় কল্যাণ ও আখিরাতে মুক্তি চাইলে প্রত্যেক ঈমানদার মুসলিমকেই বিশুদ্ধ আক্বীদাহ্ নিয়ে মৃত্যুবরণ করতে হবে। তবে আক্বীদাহ্ বিশুদ্ধ করার পূর্বে আমাদের জেনে নেয়া জরুরী আক্বীদাহ্ বলতে কী বুঝায় কিংবা আক্বীদাহ্ শব্দটির অর্থ কী?
আভিধানিক অর্থে আক্বীদাহ্ শব্দটি সম্পর্ক স্থাপন করা, মজবুতভাবে আঁকড়ে ধরা অথবা কোন কিছুকে সাব্যস্ত করা বা শক্তিশালী হওয়াকে বুঝায়। পারিভাষিক অর্থে সাধারণভাবে সেই সুদৃঢ় বিশ্বাস ও অকাট্য কর্মধারাকে আক্বীদাহ্ বলা হয় যার প্রতি বিশ্বাস স্থাপনকারী ব্যক্তির মনে সামান্যতম সন্দেহের অবকাশ থাকে না। তবে দ্বীন-ইসলামে আক্বীদাহ্ শব্দটি ব্যাপক অর্থ বহন করে।
অর্থাৎ, মানুষ যে বিশ্বাসের সাথে নিজের অন্তরের সুদৃঢ় যোগাযোগ স্থাপন করে তাকেই তার আক্বীদাহ্ বলা যায়।
তবে দ্বীন-ইসলামে আক্বীদাহ্ বলতে বুঝায়- আসমান-যমীন ও এতদু’ভয়ের মধ্যবর্তী সবকিছুর যিনি সৃষ্টিকর্তা সেই মহান রব্ব আল্লাহ্’র প্রতি সুনিশ্চিত বিশ্বাস স্থাপন করা, তাঁর উলূহিয়্যাত, রুবূবিয়্যাত ও গুণবাচক নামসমূহকে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করা এবং তাঁর ফেরেশতামন্ডলী, নাবী-রাসূলগণ, তাঁদের উপর নাযিলকৃত কিতাবসমূহ, তাক্বদীরের ভাল-মন্দ এবং বিশুদ্ধ দলীল দ্বারা প্রমাণিত দ্বীনের মৌলিক বিষয়সমূহ ও অদৃশ্য বিষয়াদি সম্পর্কিত সংবাদসমূহ ইত্যাদি যে সব বিষয়াদির উপর সালাফে ছালেহীনগণ ঐক্যমত পোষণ করেছেন তার প্রতি সুনিশ্চিত বিশ্বাস রাখা। আল্লাহ’র নাযিলকৃত যাবতীয় হুকুম-আহকামের প্রতি নিঃশর্ত আনুগত্য প্রদর্শন এবং রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রচারিত শরী’আতের প্রতি পূর্ণ আনুগত্য ও অনুসরণ নিশ্চিত করা।
ইসলামী আক্বীদাহর মৌলিক স্তম্ভ দু’টি। প্রথম স্তম্ভ বা মৌলিক বিষয় হচ্ছে “কুফর বিত ত্বাগুত বা তাগুতকে অস্বীকার করা”। আর দ্বিতীয় স্তম্ভ বা মৌলিক বিষয় হচ্ছে “ঈমান বিল্লাহ বা এক আল্লাহর প্রতি ঈমান আনা”। এর প্রমাণ হচ্ছে, আল্লাহ তায়ালার বাণী- “যে ব্যক্তি তাগুতকে অস্বীকার করলো আর আল্লাহর প্রতি ঈমান আনলো, সে এমন এক শক্ত রজ্জু ধারণ করলো যা কখনো ছিড়ে যাবার নয়”। (আল-বাক্বারাহ ২: ২৫৬)
অর্থাৎ, ইসলামী আক্বীদাহর প্রথম স্তম্ভ “কুফর বিত ত্বাগুত বা তাগুতকে অস্বীকার করা” বলতে বুঝায়- কেউ যদি নিজেকে ঈমানদার দাবী করে তাকে অবশ্যই তাগুতকে বর্জন করতে হবে। কারণ যে কালেমার স্বীকৃতি দিয়ে সে ঈমান এনেছে সে কালেমার ঘোষণা করার মাধ্যমে যাবতীয় বাতিল রব্বকে অর্থাৎ তাগুতকে বর্জনের দৃঢ় ঘোষণা দিয়েছে এবং এ ঘোষণার মাধ্যমে আল্লাহকে একমাত্র রব্ব-সার্বভৌমত্ব, আইন-বিধান ও কর্তৃত্বের মালিক হিসাবে মেনে নিয়েছে। সুতরাং তাগুতকে বর্জন না করলে ঈমানের দাবী মিথ্যা প্রমানিত হবে। যারা এই তাগুতদের মানে তারা আল্লাহকে মানতে পারে না, আর যারা আল্লাহকে মানে তারা তাগুতদের মানতে পারে না। তবে হ্যাঁ, এমন অনেক ব্যক্তি আছে যারা কিছু ক্ষেত্রে আল্লাহকে মানে আবার কিছু ক্ষেত্রে তাগুতদেরকেও মানে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তাগুতকে মানলে যে আল্লাহকে মানা হয় না এ বোধই তাদের নেই। আর বর্তমানে অধিকাংশ লোকদের অবস্থাই এরূপ।
উদাহরণস্বরূপ, কুরআন মাজীদে আল্লাহ সুবহনাহু ওয়া তা‘য়ালা ঐ ব্যক্তির ঈমানের মূল্যহীনতার কথা বলেছেন যে ব্যক্তি নিজেকে ঈমানদার দাবী করে আবার তাগুতের কাছে বিচার-ফায়সালা চায়, আল্লাহ তা‘য়ালা বলেন: “আপনি কি তাদেরকে দেখেন নি, যারা দাবী করে যে, আপনার প্রতি যা নাযিল করা হয়েছে এবং আপনার পূর্বে যা নাযিল করা হয়েছে তার প্রতি তারা ঈমান আনয়ন করেছে। তারা বিরোধপূর্ণ বিষয়কে ফয়সালার জন্য তাগুতের দিকে নিয়ে যেতে চায়, অথচ তাদের প্রতি তাকে (তাগুতকে) অমান্য করার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়েছে।” (সূরা আন-নিসা ৪: ৬০)
আর যারা তাগুতের ইবাদতকে প্রত্যাখ্যান করে আল্লাহ তাদের সুসংবাদ প্রদান করেন:
“যারা শয়তানী শক্তির পূজা-অর্চনা থেকে দূরে থাকে এবং আল্লাহ অভিমুখী হয়, তাদের জন্যে রয়েছে সুসংবাদ। অতএব, সুসংবাদ দিন আমার বান্দাদেরকে। যারা মনোনিবেশ সহকারে কথা শুনে, অতঃপর যা উত্তম, তার অনুসরণ করে। তাদেরকেই আল্লাহ সৎপথ প্রদর্শন করেন এবং তারাই বুদ্ধিমান।” (সূরা যুমার ৩৯:১৭-১৮)
ইসলামী আক্বীদাহর দ্বিতীয় স্তম্ভ “ঈমান বিল্লাহ বা এক আল্লাহর প্রতি ঈমান আনা” বলতে বুঝায়- আল্লাহকে একমাত্র রব্ব মানা। অর্থাৎ জীবনের সর্বক্ষেত্রে একমাত্র আল্লাহর সার্বভৌমত্ব মানা। আইন-বিধান দেয়ার ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহরই এ বিশ্বাস রাখা। কারণ আল্লাহ্ ফরমান- “আল্লাহ ছাড়া কারও বিধান দেয়ার ক্ষমতা নেই। তিনি আদেশ দিয়েছেন যে, তিনি ব্যতীত অন্য কারও ইবাদত করো না। এটাই সুদৃঢ় দ্বীন; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা জানে না।” (সূরা ইউসুফ ১২:৪০)
আক্বীদাহ্ এবং শরী’আহ্’র মধ্যে পার্থক্য:
আক্বীদাহ্ এবং শরী’আহ্ দু’টি পৃথক বিষয়। কেননা শরী’আহ্ হল দ্বীনের কর্মগত রূপ এবং আক্বীদাহ্ হলো দ্বীনের জ্ঞানগত রূপ যার প্রতি একজন মুসলিমের আন্তরিক বিশ্বাস রাখা অপরিহার্য।
আক্বীদাহ্ ও ঈমানের মধ্যে পার্থক্য :
আক্বীদাহ্ শব্দটিকে প্রায়ই অনেকে ঈমানের সাথে মিলিয়ে একাকার করে ফেলেন। অস্বচ্ছ ধারণার ফলশ্রুতিতে অনেকেতো বলেই ফেলেন, আক্বীদাহ্ আবার কি? আক্বীদাহ্ বিশুদ্ধ করারইবা প্রয়োজন কেন? ঈমান থাকলেইতো যথেষ্ট। ফলশ্রুতিতে দ্বীন সম্পর্কে জানার ক্ষেত্রে এক বড় ধরনের অপূর্ণতা সৃষ্টি হয়, যা প্রায়ই মানুষকে পথভ্রষ্টতার দিকে ঠেলে দেয়। এজন্য ঈমান ও আক্বীদাহ্’র মধ্যকার সম্পর্ক ও পার্থক্য স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। নিম্নে বিষয়টি উপস্থাপন করা হল:
প্রথমত: ঈমান সমগ্র দ্বীনকেই অন্তর্ভুক্ত করে। আর আক্বীদাহ দ্বীনের সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সমূহকে অন্তর্ভুক্ত করে।
দ্বিতীয়ত: আক্বীদাহ্’র তুলনায় ঈমান আরো ব্যাপক পরিভাষা। আক্বীদাহ্ হল কতিপয় ভিত্তিমূলক বিষয়ের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাসের নাম। অন্যদিকে ঈমান শুধু বিশ্বাসের নাম নয়; বরং মৌখিক স্বীকৃতি ও কর্মে বাস্তবায়নের মাধ্যমে তার বাস্তব প্রতিফলনকে অপরিহার্য করে দেয়। সুতরাং ঈমানের দু’টি অংশ। একটি হল অন্তরে স্বচ্ছ আক্বীদাহ্ পোষণ। আরেকটি হলো বাহ্যিক কর্ম তৎপরতায় তার প্রকাশ। এ দু’টি পরস্পরের সাথে এমনভাবে সংযুক্ত যে, এর কোন একটির অনুপস্থিতি ঈমানকে বিনষ্ট করে দেয়।
তৃতীয়ত: আক্বীদাহ্ হলো বিশ্বাসের মস্তিস্ক এবং ঈমান হল শরীর। অর্থাৎ আক্বীদাহ্ হলো ঈমানের মূলভিত্তি। আক্বীদাহ্ ব্যতীত ঈমানের উপস্থিতি তেমনি অসম্ভব, যেমনভাবে ভিত্তি ব্যতীত কাঠামো কল্পনা করা অসম্ভব। সুতরাং ঈমান হল বাহ্যিক কাঠামো আর আক্বীদাহ হল ঈমানের আভ্যন্তরীণ ভিত্তি।
চতুর্থত: আক্বীদাহ’র দৃঢ়তা যত বৃদ্ধি পায় ঈমানও তত বৃদ্ধি পায় ও মজবুত হয়। আক্বীদাহ্’য় দুর্বলতা সৃষ্টি হলে ঈমানেরও দুর্বলতা সৃষ্টি হয়, আমলের ক্ষেত্রেও সে দুর্বলতার প্রকাশ পায়। যেমনভাবে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, মানুষের হৃদয়ের মধ্যে একটি গোশতপিন্ড রয়েছে, যদি তা পরিশুদ্ধ হয় তবে সমস্ত শরীর পরিশুদ্ধ থাকে, যদি তা কদর্যপূর্ণ হয় তবে সমস্ত শরীরই কদর্যপূর্ণ হয়ে যায়। (মুত্তাফাকুন আলাইহি, মিশকাত ‘ক্রয়-বিক্রয় অধ্যায়’ হা/২৭৬০)
পঞ্চমত: বিশুদ্ধ আক্বীদাহ্ বিশুদ্ধ ঈমানের মাপকাঠি, যা বাহ্যিক আমলকেও বিশুদ্ধ করে দেয়। যখন আক্বীদাহ্’য় বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয় তখন ঈমানও বিভ্রান্তিপূর্ণ হয়ে যায়। উদাহরণস্বরূপ সাহাবায়ে কেরাম ও সালাফে ছালেহীনের অনুসরণ করা হয় এজন্য যে, তারা যে আক্বীদাহ্’র অনুসারী ছিলেন তা ছিল বিশুদ্ধ এবং কুরআন ও সুন্নাহ্’র সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। আর এজন্যই তারা ছিলেন খালিছ ঈমানের অধিকারী এবং পৃথিবীর বুকে উত্থিত সর্বোত্তম জামায়াত। অন্যদিকে মুসলিমদের বিভিন্ন উপদলসমূহ আক্বীদার বিভ্রান্তির কারণে তাদের ঈমান যেমন ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে, তেমনি তাদের কর্মকান্ড নীতিবিচ্যুত হয়ে পড়েছে। এভাবেই আক্বীদাহ্’র অবস্থান পরিবর্তনের কারণে ঈমানের অবস্থানও পরিবর্তন হয়ে যায়।
ষষ্ঠত: সকল নাবী ও রাসূলের মূল দা‘ওয়াত ছিল তাওহীদের বিশুদ্ধ আক্বীদাহ্’র প্রতি আহবান জানানো। এক্ষেত্রে কারো অবস্থান ভিন্ন ছিল না। কিন্তু আমল-আহকাম সমূহ যুগে যুগে পরিবর্তিত হয়েছে। যেমন সালাত, ছিয়াম, যাকাত, হজ্জ ইত্যাদি আমলসমূহ সকল নাবীদের যুগেই ছিল কিন্তু তার আদায়ের পদ্ধতি ও বৈশিষ্ট্য ছিল ভিন্ন ভিন্ন রূপ। সুতরাং ঈমানের দাবীসূচক আমলসমূহ কালের বিবর্তনে পরিবর্তিত হলেও আক্বীদাহ্’র বিষয়টি সৃষ্টির অনাদিকাল থেকে অভিন্ন ও অপরিবর্তনীয়।
সঠিক আক্বীদাহ্ পোষণের অপরিহার্যতা :
সঠিক আক্বীদাহ্ পোষণ করা ইসলামের যাবতীয় কর্তব্যসমূহের মাঝে সবচেয়ে বড় কর্তব্য। আক্বীদাহ্’র সাথে সংশ্লিষ্ট পাপ তথা শির্ক এমন ধ্বংসাত্মক যে, পাপী ব্যক্তি তওবা না করে মারা গেলে সে চিরস্থায়ী জাহান্নামী হবে। আল্লাহ্ শির্ককারীর প্রসঙ্গে বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সাথে শির্ককারীকে ক্ষমা করবেন না। এ ব্যতীত যে কোন পাপ তিনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করে দিতে পারেন’ (সূরা নিসা ৪:১১৬)।
আক্বীদাহ্ সঠিক থাকলে কোন পাপী ব্যক্তি জাহান্নামে গেলেও চিরস্থায়ীভাবে সেখানে থাকবে না। সহীহ বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে যে, পূর্বযুগে কোন এক ব্যক্তি তার নফসের উপর অনেক যুলুম করেছিল। যখন তার মৃত্যুকাল ঘনিয়ে এলো সে তার পুত্রদেরকে বললো, মৃত্যুর পর আমার দেহ হাড়-মাংস সহ পুড়িয়ে ছাই করে নিও এবং তা প্রবল বাতাসে উড়িয়ে দিও কিংবা প্রচন্ড বাতাসের দিনে সাগরে ভাসিয়ে দিও। আল্লাহর কসম যদি আল্লাহ্ আমাকে ধরে ফেলেন তবে তিনি এমন কঠিনতম শাস্তি দিবেন যা অন্য কাউকেও দেননি। যখন তার মৃত্যু হলো তখন তার সাথে তার অসিয়ত অনুযায়ীই আচরণ করা হলো। অতঃপর আল্লাহ্ যমীনকে আদেশ করলেন, তোমার মাঝে ঐ ব্যক্তির যা আছে জমা করে দাও। যমীন তা করে দিল। এবং ঐ ব্যক্তি তৎক্ষনাৎ আল্লাহর সম্মুখে দাঁড়িয়ে গেল। আল্লাহ্ তাকে জিজ্ঞেস করলেন, কিসে তোমাকে এই কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করলো? সে বললো, হে রব্ব! আপনার ভয়। অতঃপর তাকে ক্ষমা করে জান্নাতে প্রবেশের অনুমতি দিলেন, যেহেতু সে আল্লাহকে ভয় করে এবং আল্লাহর ক্ষমতা সম্পর্কে সুনিশ্চিত বিশ্বাস রাখে। (বুখারী, হা/৩৪৮১, ৩৪৭৯ কিতাবুল আম্বিয়া)।
অন্য হাদীছে এসেছে, যার অন্তরে সরিষা দানা পরিমাণ ঈমান অবশিষ্ট থাকবে তাকেও শেষ পর্যায়ে জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে (মুত্তাফাকুন আলাইহি, মিশকাত হা/৫৫৭৯, ‘কিয়ামতের অবস্থাসমূহ ও সৃষ্টির পুনরুত্থান’ অধ্যায়, ‘হাউযে কাওছার ও শাফা’আত’ অনুচ্ছেদ) অর্থাৎ সঠিক আক্বীদাহর কারণে একজন সর্বোচ্চ পাপী ব্যক্তিও নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত জাহান্নামে অবস্থানের পর জান্নাতে প্রবেশ করতে সমর্থ হবে।
আক্বীদাহ্ সঠিক না থাকলে সৎ আমলকারীকেও জাহান্নামে যেতে হবে। যেমন একজন মুনাফিক বাহ্যিকভাবে ঈমান ও সৎ আমল করার পরও অন্তরে কুফরী পোষণের কারণে সে জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরে অবস্থান করবে (সূরা নিসা ৪:১৪৫)। একই কারণে একজন কাফির সারা জীবন ভাল কাজ করা সত্ত্বেও কিয়ামতের দিন সে তার কাজের দ্বারা উপকৃত হতে পারবে না। কেননা তার আক্বীদাহ্ ছিল ভ্রান্তিপূর্ণ। আল্লাহ তাদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘সেদিন আমি তাদের কৃতকর্মের দিকে মনোনিবেশ করব, অতঃপর সেগুলো বিক্ষিপ্ত ধূলিকণায় রুপান্তরিত করব’ (সূরা ফুরকান ২৫:২৩)। কবরের জীবনেও আক্বীদাহ সম্পর্কেই প্রশ্ন করা হবে। অর্থাৎ তোমার রব্ব কে? তোমার নাবী কে? তোমার দ্বীন কি? সেদিন আমল সংক্রান্ত কোন প্রশ্ন করা হবে না। এখান থেকেই দুনিয়া ও আখিরাতে আক্বীদাহ’র গুরুত্ব অনুভব করা যায়।
সমকালীন মুসলিম সমাজের দিকে তাকালে আক্বীদাহ’র গুরুত্ব বিশেষভাবে অনুভব করা যায়। আক্বীদাহ্ সম্পর্কে সঠিক জ্ঞানের অভাব আমাদের পথভ্রষ্ট করে ফেলছে প্রতিনিয়ত। বিভ্রান্ত মতাদর্শের অনুসারী মুনাফিক, বিদ‘আতী এবং ভিন্ন ধর্মানুসারী ইহুদী, খৃষ্টান, পৌত্তলিক ও নাস্তিক্যবাদীরা তাদের আক্বীদাহ প্রচার ও প্রসারে বিভিন্নমুখী যে তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে তা প্রতিরোধ করা ও তা থেকে আত্মরক্ষা করা প্রতিটি মুসলিমের জন্য আবশ্যক কর্তব্য। এজন্য সঠিক আক্বীদাহ্ সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা রাখতেই হবে। অন্যথায় আপাতঃ দর্শনীয় পশ্চিমা বস্তুবাদী চিন্তাধারার জোয়ার আমাদেরকে পথভ্রষ্ট করতে মোটেও সময় নিবে না।
কুরআন ও সুন্নাহ’র বিষয়ে পন্ডিত আলেম-ওলামাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব ছিল মৌলিক আক্বীদাহ্ সমূহের বিষয়ে সাধারণ মুসলমিদের সঠিক জ্ঞান দান করা এবং সাধ্যমত সর্বত্র তার প্রসার ঘটানো। কেননা যে ব্যক্তি তার জীবনের ব্যষ্টিক, সামাজিক, বুদ্ধিবৃত্তিক সর্বক্ষেত্রে বিশুদ্ধ আক্বীদাহ্’র প্রতিফলন ঘটাতে পারে, সে দুনিয়া ও আখিরাত সর্বক্ষেত্রে সফল। অথচ দুঃখজনক হল, বর্তমান যুগে বহু আলেমই আক্বীদাহকে খুব সংকীর্ণ অর্থে গ্রহণ করেছেন, যার প্রভাব অবধারিতভাবে সাধারণ মানুষের মাঝে পড়ছে। ফলে আমলগত ক্ষেত্রে বিশুদ্ধ আক্বীদাহ্’র উপস্থিতিকে নিশ্চিত না করে অনেকে কেবল আক্বীদাহ্ সম্পর্কে সাধারণ ধারণা রাখাই যথেষ্ট মনে করেছে যেমনটি করেছিল মু’তাযিলাসহ আরো কিছু উপদল। অনেকে আবার কেবল অন্যদের সাথে নিজেদের পার্থক্য নিরূপণের ক্ষেত্রে, কিংবা রাষ্ট্রক্ষমতা লাভের মত উপলক্ষ্যের সাথে আক্বীদাহকে সীমাবদ্ধ রেখেছে যেমন-খারেজীরা। ফলশ্রুতিতে বর্তমান সমাজ ও রাষ্ট্রে বিধর্মীগোষ্ঠীর বুদ্ধিবৃত্তিক আগ্রাসনের পথ ধরে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ, জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র ইত্যাদি নিত্য-নতুন শির্কী মতবাদ সহজেই মুসলিম নামধারীদের মাঝে গেড়ে বসতে সক্ষম হয়েছে। সচেতনতার দাবীদার বহু মুসলিম নামধারীই এ ধারণা পোষণ করে যে, ইসলাম ভিন্ন অন্য দ্বীন-ধর্মের লোকেরাও জান্নাতে যাবে যদি তারা সৎ হয়। ‘আক্বীদাহ্ ও শরী’য়াহ্ ভিন্ন জিনিস, আক্বীদাহ্ কেবলমাত্র একটি সাংস্কৃতিক বা বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তাধারা; ব্যবহারিক জীবনে যার বিশেষ কোন গুরুত্ব নেই, দ্বীন-ধর্ম ব্যক্তিগত বিষয়; রাষ্ট্র, সমাজ, শিক্ষা ইত্যাদি সার্বজনীন ক্ষেত্রে তার কোন ভূমিকা থাকা উচিৎ নয়’ ইত্যাদি কুফরী চিন্তাধারা লক্ষ্যে-অলক্ষ্যে অধিকাংশ মুসলিমের মানসজগতকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে। বলা বাহুল্য, এ সমস্ত ধোঁয়াশার প্রভাব এতই ক্ষতিকারক যে মানুষের সত্যানুসন্ধিৎসু মনকে একেবারেই পঙ্গু করে রাখে এবং মিথ্যার আধিপত্যকে মেনে নেওয়ার শৈথিল্যবাদী মানসিকতা প্রস্তুত করে দেয়। আর এসবই সঠিক আক্বীদা থেকে বিচ্যুতির অবধারিত ফলশ্রুতি।
মানুষ ভুলের ঊর্ধ্বে নয়, আমিও এর বাইরে নই। তথাপিও আমি আমার নিজস্ব মতামত, কোনো মুরব্বী বা দলের মতামত প্রতিষ্ঠার জন্য ‘আল কুরআন ও সুন্নাহ’র আলোকে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সম্পর্কে সহীহ্ আক্বীদাহ্’ নামক লেখাটি সংকলন করছি না। কারো কোনো মতামতের প্রতি চ্যালেঞ্জ করেও নয়। শুধু মহান মালিক আল্লাহ্ প্রদত্ত সীমাবদ্ধ জ্ঞান দ্বারা অর্জিত কুরআন ও সুন্নাহ’র নূর’কে মাতৃভাষা বাংলায় অপর বাংলাভাষীর নিকট পৌঁছে দেয়ার জন্যই অধমের এ প্রচেষ্টা। স্বল্প পরিসরে দ্বীনের সঠিক ও নির্ভুল আক্বীদাহ্ প্রচারের মানসে আমি যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি কুরআনের বাণী এবং বিজ্ঞ আলেমদের নিকট স্বীকৃত ও নির্ভরযোগ্য সহীহ হাদীসের অনুসরণ করতে। তাই কোন খিয়ানত যদি হয়ে থাকে, তবে মনে করবেন তা অনিচ্ছাকৃত এবং একান্তই আমার সীমাবদ্ধ জ্ঞানের ফসল।
সংক্ষিপ্ত আলোচনার শেষ প্রান্তে বলতে চাই যে, আক্বীদাহ্ দ্বীনের প্রাথমিক ও মৌলিক বিষয়। আক্বীদাহ্ সঠিক হওয়ার উপরই ঈমান ও আমলের যথার্থতা নির্ভরশীল। তাই সবকিছুর পূর্বে আক্বীদাহ্’র বিশুদ্ধতা নিশ্চিত করাই একজন মুসলিমের প্রথম ও অপরিহার্য দায়িত্ব। আজকের পৃথিবীতে যখন সংঘাত হয়ে উঠেছে বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক তখন একজন মুসলিমের জন্য স্বীয় আক্বীদাহ্ সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা সর্বাধিক বেড়েছে। কেননা হাজারো মাযহাব-মতাদর্শের দ্বিধা-সংকটের ধ্বংসাত্মক, দুর্বিষহ জঞ্জালকে সযত্নে পাশ কাটিয়ে সত্যের দিশা পাওয়া এবং সত্য ও স্বচ্ছ দ্বীনের দিকে ফিরে আসা বিশুদ্ধ আক্বীদাহ্ অবলম্বন ব্যতীত অসম্ভব। আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন সকল মুসলিম ভাই-বোনকে সঠিক আক্বীদাহ্’র ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত স্বচ্ছ ঈমানের উপর অটল থাকার তাওফীক দান করুন ও যাবতীয় শির্কী ও জাহেলী চিন্তাধারা থেকে আমাদেরকে হিফাযত করুন। আমীন।

দু’আর মুহতাজ
আবু যারীফ
ঢাকা, ২১ ফেব্রুয়ারী, ২০১৪ ঈসায়ী।

আল কুরআন ও সুন্নাহ আলোকে Untitled-1 copyআল্লাহ্ সম্পর্কি আক্বীদাহ্

প্রশ্ন: আমাদের রব্ব কে?

উত্তর: আমাদের একমাত্র রব্ব হলেন আল্লাহ্। যিনি আমাকে এবং সমগ্র বিশ্বকে তাঁর অশেষ নিয়ামাত (দান ও অনুগ্রহ) দ্বারা প্রতিপালন করছেন। তিনিই হলেন আমাদের একমাত্র সার্বভৌম মালিক, সার্বভৌম আইনদাতা-বিধানদাতা ও নিরংকুশ কর্তা, তিনি ব্যতীত দাসত্ব, আইনের আনুগত্য ও উপাসনা লাভের সত্ত্বা আর কেউ নেই।

প্রশ্ন: এ কথার প্রমাণ কী?

উত্তর: এ কথার প্রমাণ হলো আল্লাহ্ সুব্হানাহু ওয়া তাআলার এ বাণী:

যাবতীয় প্রশংসা আল্লাহ্ তাআলার, যিনি সমগ্র সৃষ্টি জগতের রব্ব। (সূরা আল ফাতিহা ১:১)

প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ্ই তোমাদের রব্ব, যিনি নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলকে ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর আরশের উপর অধিষ্ঠিত হয়েছেন। তিনি রাতকে দিনের উপর সমাচ্ছন্ন করে দেন এমতাবস্থায় যে, রাত দ্রুত গতিতে দিনের অনুসরণ করে চলে। তিনি সৃষ্টি করেছেন সূর্য, চন্দ্র ও নক্ষত্র, এগুলো তাঁর নির্দেশে পরিচালিত। জেনে রাখো, সৃষ্টি করা এবং আদেশ প্রদানের মালিক তিনিই। আল্লাহ্ বরকতময় যিনি বিশ্ব জগতের রব্ব। (সূরা আল আরাফ ৭:৫৪)

একমাত্র আল্লাহ্ তাআলা ব্যতীত সকল কিছুই হলো তাঁর সৃষ্টি, আর আমি সহ সকল মানুষ তাঁর সৃষ্ট পৃথিবী নামক এক গ্রহের বাসিন্দা তথা আল্লাহ্র এক সৃষ্টি বা মাখলূক্ব।

প্রশ্ন: কিসের দ্বারা আমরা মহান রব্বের পরিচয় লাভ করলাম?

উত্তর: আসমান ও জমীনের মধ্যবর্তী যা কিছু রয়েছে সে সবের দ্বারা আমরা আমাদের মহান রব্বের পরিচয় লাভ করেছি।

প্রশ্ন: এ কথার প্রমাণ কী?

উত্তর: এর প্রমাণ হলো কুরআনুল কারীমের নিম্নের আয়াত সমূহ:

তাঁর নিদর্শন সমূহের মধ্যে রয়েছে রাত, দিন, সূর্য ও চন্দ্র। তোমরা সূর্যকে সিজদাহ করো না, চন্দ্রকেও না। তোমরা সিজদাহ করো সেই আল্লাহকে যিনি এগুলো সৃষ্টি করেছেন, যদি তোমরা বাস্তবিকই কেবল তাঁরই ইবাদাতকারী হও। (সূরা হা-মীম আস সিজদাহ/ফুসসিলাত ৪১:৩৭)

প্রশ্ন: আল্লাহর প্রতি ঈমান বলতে কী বুঝায়?

উত্তর: আল্লাহ্কে একমাত্র রব্ব মানা-ই আল্লাহ্র প্রতি ঈমান দলিল দেখুন:

আর (হে নবী!) লোকদেরকে স্মরণ করিয়ে দাও সেই সময়ের কথা, যখন তোমার রব্ব বনী আদমের পৃষ্ঠদেশ থেকে তাদের সন্তানদের বের করলেন এবং তাদেরকেই তাদের নিজেদের ব্যাপারে সাক্ষী রেখে জিজ্ঞেস করলেন, আমি কি তোমাদের একমাত্র রব্ব নই? তারা সবাই বললো- হ্যাঁ, আমরা সাক্ষ্য দিলাম (যে আপনিই আমাদের একমাত্র রব্ব)। (সূরা আরাফ ৭:১৭২)

তোমাদের কী হলো যে, তোমরা আল্লাহ্Õর প্রতি ঈমান আনছো না? অথচ রাসূল তোমাদেরকে রব্বের প্রতি ঈমান আনার জন্য দাওয়াত দিচ্ছেন; আর আল্লাহ্ তো (রব্বের ব্যাপারে মানুষকে দুনিয়ায় পাঠানোর) পূর্বেই তোমাদের নিকট থেকে প্রতিশ্রতি নিয়েছেন; যদি তোমরা সত্যিই ঈমানদার হও (তবে আল্লাহ্কে একমাত্র রব্ব মেনে সেই প্রতিশ্রতি পূর্ণ কর)।’’ (সূরা আল হাদীদ ৫৭:৮)

‘‘নিশ্চয়ই যারা ঘোষণা করেছেÑ রাব্বুনাল্লাহ্ (আল্লাহ্ই আমাদের একমাত্র রব্ব-সার্বভৌমত্ব, আইন-বিধান ও নিরংকুশ কর্তৃত্বের একমাত্র মালিক), অতঃপর তার উপরে অবিচল থেকেছে, নিশ্চয়ই তাদের কোন ভয় নেই এবং তারা চিন্তিত হবে না। তারাই জান্নাতের অধিকারী! তারা তথায় চিরকাল থাকবে। আর এটা হচ্ছে তাদের সেই কাজের বিনিময় যা তারা পৃথিবীতে করেছিলো।’’ (সূরা আহক্বাফ ৪৬:১৩,১৪)

‘‘নিশ্চয়ই যারা ঘোষণা করেছেÑ রাব্বুনাল্লাহ্ (আল্লাহ্ই আমাদের একমাত্র রব্ব-সার্বভৌমত্ব, আইন-বিধান ও নিরংকুশ কর্তৃত্বের একমাত্র মালিক), অতঃপর এ ঘোষণার উপর অটল (দৃঢ় ও স্থির) থেকেছে, নিশ্চিত তাদের কাছে ফিরিশতারা আসে এবং বলে, তোমরা ভয় করো না, চিন্তিত হয়ো না এবং সেই জান্নাতের সুসংবাদ শোন, যার প্রতিশ্রতি তোমাদেরকে দেয়া হয়েছে।’’ (সূরা হা-মীম সিজদাহ ৪১:৩০)

আমি প্রত্যেক উম্মতের জন্য ইবাদাতের একটি নিয়ম-কানুন নির্ধারণ করে দিয়েছি, যা তারা পালন করে। অতএব (হে নবী!) কাফিররা যেন কখনো এ বিধানের প্রচার কাজ হতে আপনাকে ফিরিয়ে রাখতে না পারে। আপনি লোকদেরকে রব্বের দিকে দাওয়াত দিন। নিঃসন্দেহে আপনি সঠিক পথেই রয়েছেন। (সূরা আল হাজ্জ ২২:৬৭)

হে আমাদের রব্ব! আমরা নিশ্চিতরূপে শুনেছি একজন আহবানকারীকে ঈমানের প্রতি আহবান করতে। তিনি বলছিলেন, হে লোকসকল! তোমরা তোমাদের রব্বের প্রতি ঈমান আনো। অতঃপর আমরা ঈমান এনেছি। কাজেই হে আমাদের রব্ব! আমাদের সকল গোনাহ মাফ কর এবং আমাদের সকল দোষত্রটি দুর করে দাও, আর আমাদের মৃত্যু দাও নেক লোকদের সাথে। (সূরা আলে ইমরান ৩:১৯৩)

তোমাদের কী হলো যে, তোমরা আল্লাহর প্রতি ঈমান আনছো না? অথচ রাসূল তোমাদেরকে তোমাদের রব্বের প্রতি ঈমান আনার জন্য দাওয়াত দিচ্ছেন? আল্লাহ তো (রব্বের ব্যাপারে রূহের জগতে) পূর্বেই তোমাদের নিকট থেকে প্রতিশ্রুতি (অঙ্গীকার) নিয়েছেন; (অতএব আল্লাহকেই একমাত্র রব্ব মেনে নাও) যদি তোমরা ঈমানদার হও। (আল হাদীদ ৫৭:৮)

প্রশ্ন: ঈমানের ঘোষণা রব্বিআল্লাহু/রব্বুনাল্লাহু (আল্লাহ্ আমার/আমাদের একমাত্র রব্ব) এখানে রব্ব বলতে কী বুঝানো হয়েছে?

উত্তর: রব্ব শব্দের যে সকল অর্থ পাওয়া যায় তা হলো- সৃষ্টিকর্তা, মালিক, ক্রমোন্নতি বিধায়ক, প্রভু, প্রতিপালক, পালনকর্তা, রক্ষাকর্তা, শৃংখলা বিধানকারী, পূর্ণতাদানকারী, হাশরের ময়দানে একত্রে জমাকারী, সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক, বিবর্তক, বিধানদাতা, নিরংকুশ কর্তা। (দেখুন: তাফসীরে ইবনে কাছীর ১ম খন্ড, সূরা আল ফাতিহা, আল্লামা আশরাফ আলী থানবী (রহমাতুল্লাহি আলাইহি) কৃত মুনাজাতে মকবুল, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ কর্তৃক প্রকাশিত আল কুরআনুল করীম, সূরা আল ফাতিহার টীকা, লিসানুল আরব ৩য় খন্ড, ৫৪৫ পৃষ্ঠা, মিছবাহুল লুগাত ২৭২ পৃষ্ঠা, সূরা আল বাক্বারাহ ২:২১-২২, সূরা মুমিন ৪০:৬২-৬৮, সূরা আরাফ ৭:৪, সূরা যুমার ৩৯:৫-৬, সূরা ফাতির ৩৬:১১-১৪, সূরা শুয়ারা ২৬:৭৭-৮২ ইত্যাদি)। মানুষ যেহেতু তার বাধ্যগত জীবনে ইচ্ছা-অনিচ্ছায় আল্লাহকে সৃষ্টিকর্তা, মালিক, প্রভু, প্রতিপালক, পালনকর্তা, রক্ষাকর্তা, শৃংখলা বিধানকারী, পূর্ণতাদানকারী, হাশরের ময়দানে একত্রে জমাকারী মানতে বাধ্য সেহেতু এসব অর্থে আল্লাহকে রব্ব মানার নাম আল্লাহর প্রতি ঈমান নয়। এসব অর্থে কাফির-মুশরিকরাও আল্লাহকে মানে। তাই যে সকল অর্থে মানুষ তার স্বাধীন জীবনে আল্লাহর সাথে শির্ক করতে পারে সেসব অর্থে তাওহীদ গ্রহণ করার নামই আল্লাহ্ কে রব্ব মানা এবং এটাই আল্লাহর প্রতি ঈমানের মূল বিষয়। যেমন রব্ব শব্দটির সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক, আইনদাতা-বিধানদাতা ও নিরংকুশ কর্তা অর্থের ক্ষেত্রে মানুষ আল্লাহর পরিবর্তে বা পাশাপাশি অন্য মানুষকে বা নিজেকে সার্বভৌমত্ব, আইন-বিধান ও কর্তৃত্বের মালিক মেনে বা দাবী করে মহান রব্ব আল্লাহর সাথে শির্কে লিপ্ত হতে পারে। তাই আল্লাহকে সার্বভৌমত্ব, আইন-বিধান ও কর্তৃত্বের মালিক হিসেবে রব্ব মানলেই আল্লাহকে রব্ব মানার ক্ষেত্রে তাওহীদ হয়, আল্লাহর প্রতি ঈমান হয়। অর্থাৎ উক্ত রব্বিআল্লাহু/রব্বুনাল্লাহু ঘোষণায় রব্ব বলতে আল্লাহকে সার্বভৌমত্ব, আইন-বিধান ও কর্তৃত্বের একমাত্র মালিক বুঝানো হয়েছে।

প্রশ্ন: আল্লাহ্ই সার্বভৌম ক্ষমতার একমাত্র মালিক কেন?

উত্তর: আল্লাহ্ই সার্বভৌম ক্ষমতার একমাত্র মালিক। কারণ সার্বভৌম ক্ষমতার মালিককে চিরন্তণ ও চিরস্থায়ী সত্ত্বা হওয়া অপরিহার্য। মানুষ মাত্রই মরণশীল, তাই মানুষ কখনোই চিরন্তণ ও চিরস্থায়ী সত্ত্বা এবং কোন বিষয়ের চূড়ান্ত মালিকও নয়। সুতরাং সৃষ্টিগতভাবেই মানুষ সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক হওয়ার যোগ্যতা রাখেনা। সৃষ্টি জগতসমূহের সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন ব্যতীত চিরন্তণ ও চিরস্থায়ী সত্ত্বা নাই বিধায় স্বাভাবিকভাবেই তিনি সার্বভৌম ক্ষমতার একমাত্র মালিক, বিশ্বজাহানের সর্বত্র সার্বভৌমত্ব একমাত্র তাঁরই। আর সার্বভৌমত্বের মালিক হওয়ার কারণে আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীনই মানুষের জীবনের সকল দিক ও বিভাগ এবং সৃষ্টিজগতের সকলের জন্য একমাত্র আইনদাতা-বিধানদাতা, নিয়ন্ত্রনকর্তা এবং প্রতিপালক। অতএব মানুষের নয়! সার্বভৌমত্ব, আইন-বিধান ও নিরংকুশ কর্তৃত্ব একমাত্র আল্লাহ্র-এটাই মহা সত্য।

তাছাড়া সার্বভৌমত্বের কোন বিভাজন হয়না। বিভাজন হলে তা আর সার্বভৌম ক্ষমতা বলে গণ্য হবে না। এই বাস্তবতায় বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে মানবজাতি তাদের জীবনের ব্যবহারিক ও প্রায়োগিক ক্ষেত্রে সার্বভৌমত্ব শব্দটিকে যে অর্থে ব্যবহার করছে তা হলো- সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগের সর্বোচ্চ ও চূড়ান্ত ক্ষমতা। কাজেই, সার্বভৌমত্বে বিভাজন করে মানব জাতি শুধুমাত্র সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় সৃষ্টিকর্তাকে সার্বভৌম মালিক বাদ দিয়ে নিজেরা মিথ্যা সার্বভৌমত্ব দাবীর মাধ্যমে সমগ্র জাতিকে এর অধীনে বন্দী করে সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ্র সাথে শির্কে লিপ্ত করেছে।

প্রশ্ন: আল্লাহ্র সার্বভৌমত্ব বিষয়টি কি ঈমানের সাথে সংশ্লিষ্ট?

উত্তর: সার্বভৌমত্ব বিষয়টি অবশ্যই ঈমানের সাথে সংশ্লিষ্ট। ঈমানের মূল-ই হচ্ছে আল্লাহ্র রুবুবিয়্যাতে তাওহীদ। আর রুবুবিয়্যাতে তাওহীদের অন্যতম গুণ-বৈশিষ্ট্য হচ্ছে আল্লাহ্র একক সার্বভৌমত্ব। বিশ্বজাহানের একমাত্র রব্ব আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীনের এ গুণ-বৈশিষ্ট্যকে অস্বীকার করা কুফরী, আর আল্লাহ পাকের সার্বভৌমত্ব মানার পাশাপাশি সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় মানুষের সার্বভৌমত্ব মানা (অর্থাৎ মানুষকে আইনদাতা-বিধানদাতা মানা বা মানুষকে আইন-বিধান প্রনয়ণের ক্ষমতা দান করা) শির্ক দুনিয়াতে এই কুফর আর শির্ক না থাকলে কোন জুলুম-শোষণও থাকতো না। আর শির্ক সম্পর্কে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ফরমান- যদি তুমি শির্ক করো তাহলে তোমার সকল আমল বিনষ্ট হয়ে যাবে এবং তুমি হবে ক্ষতিগ্রস্থদের অন্তর্ভূক্ত” (সূরা যুমার ৩৯:৬৫)। চূড়ান্ত ঘোষণা দিয়ে আল্লাহ আরও ফরমান- নিশ্চয়ই যারা আল্লাহর সাথে র্শিক করবে, আল্লাহ তাদের জন্য জান্নাতকে হারাম করে দিবেন; তাদের স্থান হবে জাহান্নামের আগুনে এবং এই জালিমরা কোন সাহায্য পাবে না” (সূরা মায়েদা ৫:৭২ শেষাংশ)। সুতরাং বুঝা গেলো যে, সমাজ ও রাষ্ট্রে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত না থাকাটাই মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় ক্ষতি বা মহাক্ষতি। আমাদেরকে আরেকটি কথা মনে রাখতে হবে যে, সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে আল্লাহ্র সার্বভৌমত্ব বহাল থাকলেই এবং আল্লাহ্কে সার্বভৌমত্বের একমাত্র মালিক স্বীকার করে একমাত্র নিরংকুশ আইনদাতা মানলেই ইসলামের অস্তিত্ব অক্ষুন্ন থাকে। আল্লাহ্র সার্বভৌমত্ব বজায় না থাকলে সেখানে ইসলামের অস্তিত্ব এক মুহুর্তও থাকতে পারে না। সুতরাং মানুষের নয়! সার্বভৌমত্ব, আইন-বিধান ও নিরংকুশ কর্তৃত্ব একমাত্র আল্লাহ্র-এটাই মহা সত্য।

প্রশ্ন: মহান রব্ব আল্লাহ কোথায় অবস্থান করেন?

উত্তর: মহান আল্লাহ আরশে আযীমের উপর অবস্থান করেন। আল্লাহর কথাই এর দলীল। আল্লাহ তায়ালা বলেন:

পরম দয়াময় আরশের উপর সমাসীন রয়েছেন। [সূরা ত্ব-হা ২০:৫]

প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ্ই তোমাদের রব্ব, যিনি নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলকে ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর আরশের উপর অধিষ্ঠিত হয়েছেন। তিনি রাতকে দিনের উপর সমাচ্ছন্ন করে দেন এমতাবস্থায় যে, রাত দ্রুত গতিতে দিনের অনুসরণ করে চলে। তিনি সৃষ্টি করেছেন সূর্য, চন্দ্র ও নক্ষত্র, এগুলো তাঁর নির্দেশে পরিচালিত। জেনে রাখো, সৃষ্টি করা এবং আদেশ প্রদানের মালিক তিনিই। আল্লাহ্ বরকতময় যিনি বিশ্ব জগতের রব্ব। (সূরা আল আরাফ ৭:৫৪)

মহান আল্লাহ্ আসমানের উপর বা আরশে আযীমের উপর সমাসীন-সমুন্নত আছেন, এই অর্থে কুরআন মাজীদের ৭টি আয়াত রয়েছে- আল ফুরকান ২৫:৫৯, ত্বোয়া-হা ২০:৫, আর রাদ ১৩:২, ইউনূছ ১০:৩, রাফ ৭:৫৪, হাদীদ ৫৭:৪, আস সাজদাহ ৩২:৪।

আল্লাহ তা‘আলা আসমানে আছেন এটাও স্পষ্টভাবে পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত। আল্লাহ বলেন,

‘তোমরা কি (এ বিষয়ে) নিরাপদ হয়ে গেছ যে, যিনি আসমানে আছেন তিনি তোমাদের সহ ভূমিকে ধসিয়ে দিবেন না? আর তখন ওটা আকস্মিকভাবে থরথর করে কাঁপতে থাকবে। অথবা তোমরা কি নিরাপদ হয়ে গেছ যে, আসমানে যিনি রয়েছেন তিনি তোমাদের উপর পাথর বর্ষণকারী ঝঞ্ঝাবায়ু প্রেরণ করবেন না? তখন তোমরা জানতে পারবে কিরূপ ছিল আমার সতর্কবাণী’? (সূরা মুলক ১৬-১৭)

এছাড়া সূরা আলে ইমরান-৫৫ এবং নিসা-১৫৮ আয়াত দ্বারাও তাঁর আসমানে অবস্থানের কথা প্রমাণিত হয়।

হাদীছেও এ ব্যাপারে স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে।

আবু হুরায়রা (রাযিআল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘যখন আল্লাহ মাখলূক্ব সৃষ্টির ইচ্ছা করলেন, তখন আরশের উপর তাঁর কাছে রক্ষিত এক কিতাবে লিপিবদ্ধ করেন যে, অবশ্যই আমার করুণা আমার ক্রোধের উপর জয়লাভ করেছে’।[ছহীহ বুখারী হা/৩১৯৪, ‘সৃষ্টির সূচনা’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-১; মিশকাত হা/২৩৬৪, ‘দু‘আ’ অধ্যায়, ‘আল্লাহর রহমতের প্রশস্ততা’ অনুচ্ছেদ]

আনাস বিন মালেক (রাযিআল্লাহু আনহু) বলেন, ‘যয়নব (রাযিআল্লাহু আনহুমা) নাবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর অন্যান্য স্ত্রীগণের উপর গর্ব করে বলতেন, তাঁদের বিয়ে তাঁদের পরিবার দিয়েছে, আর আমার বিয়ে দিয়েছেন স্বয়ং আল্লাহ সপ্ত আসমানের উপর থেকে’।[বুখারী হা/৭৪২০, ‘তাওহীদ’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-২০]

আবু হুরায়রা (রাযিআল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘প্রতি রাতের শেষ তৃতীয়াংশে মহান আল্লাহ দুনিয়ার আসমানে  অবতরণ করেন এবং বলেন, কে আছ যে আমাকে ডাকবে আর আমি তার ডাকে সাড়া দিব? কে আছ যে আমার কাছে কিছু চাইবে আর আমি তাকে তা দান করব। কে আছ যে আমার কাছে ক্ষমা চাইবে আর আমি তাকে ক্ষমা করব’।[বুখারী হা/১১৪৫; মুসলিম হা/৭৫৮; মিশকাত হা/১২২৩, ‘ছালাত’ অধ্যায়, ‘তাহাজ্জুদের প্রতি উৎসাহ প্রদান’ অনুচ্ছেদ]

মু‘আবিয়া বিন হাকাম আস-সুলামী (রাযিআল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমার একজন দাসী ছিল। ওহুদ ও জাওয়ানিয়্যাহ নামক স্থানে সে আমার ছাগল চরাত। একদিন দেখি, নেকড়ে বাঘ একটি ছাগল ধরে নিয়ে গেছে। আমি একজন আদম সন্তান হিসাবে অনুরূপ রাগান্বিত হই যেভাবে তারা হয়। ফলে আমি তাকে এক থাপ্পড় মারি। অতঃপর রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট আসলে একে তিনি বড় অন্যায় মনে করলেন। তাই আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)! আমি কি তাকে আযাদ করব না? তিনি বললেন, তাকে আমার নিকট নিয়ে আস। আমি তাকে রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট নিয়ে আসলাম। তিনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, আল্লাহ কোথায়? সে বলল, আসমানে। তিনি তাকে আবার জিজ্ঞেস করলেন, আমি কে? তখন সে বলল, আপনি আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)। তখন নাবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, তাকে মুক্ত করে দাও, কারণ সে একজন ঈমানদার মেয়ে’।[ছহীহ মুসলিম হা/৫৩৭, ‘মসজিদ সমূহ’ অনুচ্ছেদ]

আব্দুল্লাহ ইবনু আমর (রাযিআল্লাহু আনহু) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, দয়াশীল মানুষদের উপর দয়াময় আল্লাহ রহম করেন। সুতরাং তোমরা পৃথিবীবাসীর উপর দয়া কর, যিনি আসমানে আছেন তিনি তোমাদের উপর অনুগ্রহ করবেন।[আবুদাঊদ হা/৪৯৪১; তিরমিযী হা/১৯২৪, ‘সৎ আমল ও সদাচারণ’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-১৬; মিশকাত হা/৪৯৬৯]

রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আল্লাহর সাথে সাক্ষাতের জন্য মি‘রাজে গিয়েছিলেন সপ্তম আসমানের উপরে এবং বার বার মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর নিকট থেকে আল্লাহর কাছে যাওয়ার বিষয়টি সবারই জানা।[বুখারী হা/৩৮৮৭, ‘মর্যাদা’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-৪২]

আরো অনেক দলীল আছে যার মাধ্যমে প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহ আরশের উপর সমুন্নীত।[বুখারী হা/৪৩৫১, ‘মাগাযী’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-৬১; মুসলিম হা/২৫০০, ‘যাকাত’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-৪৮; ছহীহ মুসলিম হা/১২১৮ ‘হজ্জ’ অধ্যায়, অনুচ্ছেদ-১৯; মুত্তাফাক্বুন আলাইহি; মিশকাত হা/৫৮৬২]

তাছাড়া মানুষের স্বভাবজাতও প্রমাণ করে আল্লাহ উপরে আছেন। কারণ কোন বিষয়ে আল্লাহকে সাক্ষী রাখতে চাইলে মানুষ আগে উপরের দিকে হাত উঠায়। দুই হাত তুলে দু‘আ করার সময়ও মানুষের লক্ষ্য থাকে উপরের দিকে।

অতএব যারা দাবী করেন যে, মহান আল্লাহ সর্ব জায়গায় বিরাজমান, অথবা তিনি মুমিন বান্দার ক্বলবের ভিতর অবস্থান করেন, আর মুমিন বান্দার ক্বলব বা অন্তর হলো আল্লাহর আরশ বা ঘর। তাদের এ সমস্ত দাবী কতটুকু ভিত্তি রাখে তা জ্ঞানীদের বুঝা কোন সমস্যা নয়।

প্রশ্ন: মহান আল্লাহ পাকের চেহারা মোবারক কি? থাকলে তার দলীল কী?

উত্তর: হাঁ, মহান আল্লাহ পাকের চেহারা মোবারক আছে। আল্লাহ পাকের কথাই এর দলীল ।

ভূ-পৃষ্ঠের সবকিছুই ধ্বংস হয়ে যাবে। তবে (হে রাসূল!) আপনার মহিমাময় ও মহানুভব রব্বের চেহারা মুবারক অর্থাৎ সত্তাই একমাত্র বাকী থাকবে। (সূরা আর-রাহমান ৫৫:২৬-২৭)

প্রশ্ন: মহান আল্লাহর কি হাত আছে? থাকলে তার দলীল কী?

উত্তর: মহান আল্লাহর হাত আছে, আল্লাহর কথাই এর দলীল।

আল্লাহ্ বললেন, হে ইবলীস! আমি নিজ দুহাতে যাকে সৃষ্টি করেছি, তাকে সিজদা করতে তোমাকে কিসে বাঁধা দিল?” (সূরা ছোয়াদ ৩৮:৭৫)

তারা আল্লাহর উপযুক্ত সম্মান করে না। ক্বিয়ামতের দিন গোটা পৃথিবী থাকবে তাঁর হাতের মুঠোয় এবং আকাশ সমূহ ভাঁজ করা অবস্থায় থাকবে তাঁর ডান হাতে। তিনি পবিত্র। আর এরা যাকে শরীক করে, তা থেকে তিনি অনেক উর্ধ্বে। (সূরা যুমার ৩৯:৬৭)

আর ইহুদীরা বলে, আল্লাহর হাত বন্ধ হয়ে গেছে। তাদের হাতই বন্ধ হয়ে গেছে এবং তাদের এ উক্তির কারণে তাদের উপর অভিশাপ করা হয়েছে; বরং তাঁর (আল্লাহ্’র) দুই হাতই প্রসারিত। (সূরা মায়েদাহ ৫:৬৪)

বরকতময় তিনি, যাঁর হাতে সর্বময় কর্তৃত্ব, তিনি সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান। (সূরা মুলক ৬৭:১)

আল্লাহর হাত তাদের হাতের উপর। (সরা ফাতহ ৪৮:১০)

প্রশ্ন: মহান আল্লাহ কি পা আছে? থাকলে তার দলীল কী?

আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘সেদিন পায়ের নলা উন্মোচিত করা হবে এবং তাদেরকে (কাফেরদেরকে) সিজদা করার জন্য আহবান করা হবে। কিন্তু তারা সিজদা করতে সক্ষম হবে না । (ক্বলম ৬৮:৪২)

আল্লাহর পা সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন,

‘(ক্বিয়ামতের দিন) আমাদের রব্ব পায়ের নলা উন্মুক্ত করে দিবেন। অতঃপর সকল মুমিন পুরুষ ও নারী তাঁকে সিজদাহ করবে। কিন্তু বাকী থাকবে ঐ সমস্ত লোক, যারা দুনিয়ায় সিজদাহ করতো লোক দেখানো ও প্রচারের জন্য। তারা সিজদাহ করার জন্য যাবে, কিন্তু তাদের পৃষ্ঠদেশ একখন্ড তক্তার মত শক্ত হয়ে যাবে’। (বুখারী হা/৪৯১৯, ‘তাফসীর’ অধ্যায়)

‘জাহান্নামে (জাহান্নামীদের) নিক্ষেপ করা হতে থাকবে আর সে (জাহান্নাম) বলবে, আরো আছে কি? শেষ পর্যন্ত জগৎ সমূহের রব্ব তাতে পা রাখবেন। ফলে জাহান্নামের একাংশ আরেকাংশের সাথে মিশে যাবে। অতঃপর জাহান্নাম বলবে, আপনার প্রতিপত্তি ও মর্যাদার শপথ! যথেষ্ট হয়েছে, যথেষ্ট হয়েছে’। (বুখারী হা/৭৩৮৪, ২/৭১৯ পৃঃ, ‘তাওহীদ’ অধ্যায়, তাওহীদ প্রকাশনী; হা/৬৮৮০: ইসলামিক ফাউন্ডেশন, মুসলিম, হা/৬৯১৪, ৬৯১৬: ইসলামিক ফাউন্ডেশন; মুসলিম, হা/৬৯৭১, ৬৯৭৩: ইসলামিক সেন্টার)

প্রশ্ন: মহান আল্লাহ কি চক্ষু বা দর্শণ অঙ্গ আছে? থাকলে তার দলীল কী?

উত্তর: হাঁ, মহান আল্লাহ্র চক্ষু আছে। আল্লাহ্র কথাই এর দলীল। যেমন তিনি হযরত মূসা (আলাইহিস সালাম) কে লক্ষ্য করে বলেছিলেন:

আমি আমার নিকট হতে তোমার উপর ভালবাসা ঢেলে দিয়েছিলাম, যাতে তুমি আমার চোখের সামনে প্রতিপালিত হও। (সূরা ত্বোয়া-হা ২০:৩৯)

এমনিভাবে আল্লাহ তাআলা রাসূল মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে শান্তনা দিতে যেয়ে বলেন:

(হে রাসূল!) আপনি আপনার রব্বের নির্দেশের অপেক্ষায় ধৈর্য্যধারণ করুন, আপনি আমার চোখের সামনেই রয়েছেন। (সূরা আত-তূর ৫২:৪৮)

রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ অন্ধ নন। সাবধান! দাজ্জালের ডান চোখ কানা। তার চোখটা যেন ফুলে যাওয়া একটি আঙ্গুরের মত। [বুখারী হা/৩৪৩৯, নবীদের ঘটনাবলী অধ্যায়]

প্রশ্ন: মহান আল্লাহ শুনেন এবং দেখেন, এর দলীল কী?

উত্তর: মহান আল্লাহ্ শুনেন এবং দেখেন। আল্লাহর কথাই এর দলীল। যেমন তিনি বলেছেন,

নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা শ্রবণ করেন ও দেখেন। (সূরা মুজাদালাহ ৫৮:১)

তিনি সব কিছু শোনেন ও দেখেন। আসমান ও যমীনের ভান্ডারসমূহের চাবি তাঁরই হাতে, যাকে ইচ্ছা অঢেল রিযিক দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা মেপে দেন। তিনি সব কিছু জানেন। (সূরা আশ শুরা ৪২:১২)

প্রশ্ন: মানুষের চেহারা, হাত, চক্ষু, শ্রবণ শক্তি ও দৃষ্টি শক্তি, অপর দিকে মহান আল্লাহচেহারা, হাত, চক্ষু, শ্রবণ শক্তি ও দৃষ্টি শক্তি, দুয়ের মাঝে কোন পার্থক্য আছে কী?

উত্তর: হ্যাঁ, মানুষের চেহারা, হাত, চক্ষু আছে, আল্লাহ্ পাকেরও চেহারা, হাত, চক্ষু আছে; মানুষেরা কানে শুনে ও চোখে দেখে, মহান আল্লাহ পাকও শুনেন ও দেখেন, তবে এ দুয়ের মাঝে অবশ্যই বিরাট পার্থক্য রয়েছে। আল্লাহ্ পাকের চেহারা মোবারক, হাত, চক্ষু, শ্রবণ শক্তি ও দৃষ্টি শক্তি আল্লাহ্ পাকের মতই বে-নজীর। এসব সম্পর্কে অহেতুক প্রশ্ন উত্থাপন বা বিতর্ক করা গোমরাহী কিন্তু বিশ্বাস রাখা ফরয। তাঁর সাথে কোন সৃষ্টির সাদৃশ্য কল্পনাতেও আসা উচিত নয়। মহান আল্লাহর কথাই এর দলীল। যেমন তিনি বলেন, আল্লাহ সাদৃশ্য কোন বস্তুই নাই এবং তিনি শুনেন ও দেখেন (সূরা আশ শূরা ৪২:১১)। তিনি আরও বলেন, এবং তাঁর সমতুল্য কেউ নেই (সূরা ইখলাছ ১১২:৪)। সুতরাং তোমরা আল্লাহর কোন সাদৃশ্য বর্ণনা করো না (নাহল ১৬:৭৪)।

বাস্তবতার আলোকে চিন্তা করলে আমরা বুঝতে পারি যে, নিঃসন্দেহে মানুষের দৃষ্টিশক্তি ও শ্রবণশক্তির একটা নির্ধারিত আয়তন, সীমা বা দুরত্ব আছে যার ভিতরের বস্তু গুলি মানুষেরা সহজে চোখে দেখতে পায় এবং আওয়ায বা শব্দ সমূহ সহজে কানে শুনতে পায়। তবে ঐ নির্ধারিত সীমা বা দূরত্বের বাইরে চলে গেলে তখন মানুষ আর কিছুই চোখে দেখতেও পায় না আর শুনতে পায় না। অপর দিকে মহান আল্লাহর দর্শনশক্তি ও শ্রবণ শক্তির জন্য নির্ধারিত কোন সীমা বা দুরত্ব বলতে কিছুই নেই। যেমন মানুষেরা ২/৩ হাত দূর থেকে বইয়ের ছোট অক্ষরগুলি দেখে পড়তে পারে, কিন্তু ৭/৮ হাত দূর থেকে ঐ অক্ষরগুলি আর পড়া সম্ভব হয় না। এমনিভাবে মানুষের চোখের সামনে যদি সামান্য একটা কাপড় বা কাগজের পর্দা ঝুলিয়ে রাখা হয় তাহলে ঐ কাপড় বা কাগজের ওপাশে সে কিছুই দেখতে পায় না। এমনিভাবে মানুষেরা গভীর অন্ধকার রাতে কিছুই দেখতে পায় না। অপর দিকে মহান আল্লাহ তাআলা অমাবস্যার ঘোর অন্ধকার রাতে কাল পাহাড় বা কাল কাপড়ের উপর দিয়ে কাল পিঁপড়া চলাচল করলেও সেই পিঁপড়াকে দেখতে পান এবং তার পদধ্বনি শুনতে পান।

প্রশ্ন: আল্লাহ্ পাকের সদৃশ এবং তুলনা কোন কিছু আছে কি?

উত্তর: আল্লাহ্ পাকের কোন সদৃশ নেই। কোন কিছুই তাঁর অনুরূপ নয়। তাঁর তুলনা হতে পাও এমন কোন বস্তু নেই। দলিল দেখুন:

বলো, তিনি আল্লাহ্, এক-একক। …এবং তাঁর সমতুল্য কেউ নেই। (সূরা ইখলাস ১১২:১,৪)

আসমান ও যমীনের স্রষ্টা, যিনি তোমাদের আপন প্রজাতি থেকে তোমাদের জোড়া সৃষ্টি করেছেন, অনুরূপ অন্যান্য জীবজন্তুর ও (তাদের নিজ প্রজাতি থেকে) জোড়া বানিয়েছেন এবং এই নিয়মে তিনি তোমাদের প্রজন্মের বিস্তার ঘটান। বিশ্বজাহানের কোন কিছুই তাঁর সদৃশ নয়। তিনি সব কিছু শোনেন ও দেখেন। আসমান ও যমীনের ভান্ডারসমূহের চাবি তাঁরই হাতে, যাকে ইচ্ছা অঢেল রিযিক দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা মেপে দেন। তিনি সব কিছু জানেন। (সূরা আশ শুরা ৪২:১১-১২)

প্রকৃত সত্য এই যে, বই-পুস্তক হতে আহরিত সীমিত জ্ঞান কিংবা মানবীয় যুক্তি দ্বারা আল্লাহ’র অস্তিত্ব যেমন অনুধাবন করা যায়না ঠিক তেমনি গভীর আন্তরিক উপলব্ধি ছাড়া আল্লাহ্’র আকার, আকৃতি, অবস্থান সম্পর্কিত সকল বিষয়ও বুঝা যায়না…। আল্লাহ’র সকল কাজ, গুণাবলী ও নাম সব মিলে যা বুঝায় তা বিনা দ্বিধায় কোন সত্ত্বার দিকে ইঙ্গিত প্রদান করে। তবে সে সত্ত্বা কেমন, কত বড়, কখন, কিভাবে কী করে… এর কোন কিছুই কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারে না। তিনি ইচ্ছা করেই এসব থেকে সৃষ্টিকে আড়ালে রেখেছেন। তিনি চাইলে সব জানাতেন ও দেখাতেন। কিন্তু তিনি তা চান নি। আর তাই না দেখে (গায়েবের প্রতি) বিশ্বাস করাকেই ঈমানের প্রধান অঙ্গ করা হয়েছে। দ্বীন ইসলামের মূল কথাই হলো আগে বিশ্বাস তারপর প্রমাণ কিন্তু প্রমাণের পর বিশ্বাস নয়! এতে যার পোষায় সে ঈমান আনবে, যার পোষায় না সে ঈমান আনবে না। এমনই আল্লাহ্ চেয়েছেন বলে মনে হয়। তাই আল্লাহ্ কুরআনের প্রথম দিকেই ঘোষণা করেছেন, এই কিতাব মুত্তাকীনদের জন্যে হিদায়েত। মুত্তাকীন কারা? যারা অজানা অদেখা বিষয়ে বিশ্বাস স্থাপন করে। (সূরা বাকারাহ ২:২)

উপরোল্লিখিত কুরআনের আয়াত এবং হাদীসসমূহ হতে সুস্পষ্ট প্রমাণিত হয় যে,

আল্লাহ্ আরশের অধিপতি। তিনি আরশে অবস্থান করেন। আরশ থেকেই পৃথিবীর সব নিয়ন্ত্রণ করেন। তিনি নেমে আসেন আবার উপরে উঠে যান। তার এই সব অবস্থান ও কর্মের ধরন মানুষ ব্যাখ্যা করার ক্ষমতা রাখে না। কারণ কেউ এসব করতে ও হতে দেখেনি। আমাদের সীমিত জ্ঞানে বুঝতে অক্ষম হলেও এসব আয়াতের অর্থ অস্বীকার করার উপায় নেই। কারণ এসব আল্লাহ্’র কথা। স্বর্ণ মাপার পাল্লায় ওহুদ পাহাড় ওজন করা না গেলেও পাল্লার কাজ ও ওহুদের ওজন কোনটাই অস্বীকার করা যায়না।

যারা সীমিত জ্ঞান নিয়ে আল্লাহ্’র একান্ত বিষয়ে বেশী কথা বলে তারা মহান আল্লাহ্’র তাওহীদের বিষয়ে সংশয়ে পতিত হয়। শয়তান এই সুযোগ নিয়ে তার ঈমান লুটে নেয়। জ্ঞান দিয়ে যারা সব কিছু বুঝতে চেয়েছে তাদের হিদায়েত নসীব হয়নি।

 

One thought on “আক্বীদাহ্ ও আ’মল

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s