সিয়াম/সাওম/রোযা

সিয়াম পালন যাদের উপর ফরজ

প্রত্যেক প্রাপ্ত বয়স্ক, সুস্থ মস্তিষ্ক সম্পন্ন, মুকিম, সামর্থ্যবান মুসলিমের জন্য সিয়াম পালন ফরজ।

যে ব্যক্তি এ সকল শর্তাবলির অধিকারী তাকে অবশ্যই রমজান মাসে সিয়াম পালন করতে হবে।

আল্লাহ্‌ রাব্বুল আলামিন বলেন :—

‘সুতরাং তোমাদের মাঝে যারা এ মাস পাবে তারা যেন এ মাসে সিয়াম পালন করে।’ [সুরা বাকারা : ১৮৫]

 রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন :—

‘যখন তোমরা রমজানের চাঁদ দেখবে তখন সিয়াম পালন করবে।’ [বর্ণনায় : বোখারি ও মুসলিম]

এ বিষয়ে সকল মুসলিমের ঐক্যমত প্রতিষ্ঠিত।

দশ প্রকার মানুষের মাঝে সিয়াম পালনের এ সকল শর্তাবলি অনুপস্থিততারা হল :

প্রথম:কাফের বা অমুসলিম।কারণ তারা ইবাদত করার যোগ্যতা রাখে না। ইবাদত করলেও ইসলামের অবর্তমানে তাসহি হবে না, কবুলও হবে না। যদি কোন কাফের রমজানে ইসলাম গ্রহণ করে তবেপিছনের সিয়ামের কাজা আদায় করতে হবে না।কারণ আল্লাহ্‌ রাব্বুল আলামিন বলেন :—

‘যারা কুফরি করে তাদেরকে বল, ‘যদি তারা বিরত হয় তবে যা অতীতে হয়েছে আল্লাহ্‌ তা ক্ষমা করবেন।’ [সূরা আনফাল : ৩৮]

তবে রমজানের দিনে ইসলাম গ্রহণ করলে ঐ দিনের বাকি অংশটা পানাহার থেকে বিরত থাকবে।

দ্বিতীয়:অপ্রাপ্ত বয়স্ক।অপ্রাপ্ত বয়স্ক ব্যক্তি প্রাপ্ত বয়স্ক না হওয়া পর্যন্ত তার সিয়াম পালন ফরজ নয়।রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন :—

‘তিন ব্যক্তি থেকে কলমকেঅব্যাহতি দেয়া হয়েছে। নিদ্রা মগ্ন ব্যক্তি যতক্ষণ না সে জাগ্রত হয়। কমবয়সী ব্যক্তি যতক্ষণ না সে প্রাপ্ত বয়স্ক হয়। পাগল ব্যক্তি যতক্ষণ না সেসুস্থ হয়।’  [বর্ণনায় : আবু দাউদ]

যদিও অপ্রাপ্ত বয়স্ক বালক-বালিকাদের উপর সিয়াম পালন ফরজ নয় তবেঅভিভাবকরা অভ্যস্ত করার জন্য তাদের সিয়াম পালন করতে বলবেন। সাহাবায়েকেরাম তাদের বাচ্চাদের সিয়াম পালনে অভ্যস্ত করেছেন। তাই আমাদের জন্যমোস্তাহাব হল আমরাও আমাদের অপ্রাপ্ত বয়স্ক সন্তানদের সিয়াম পালনেউদ্বুদ্ধ করব, যদি সিয়াম পালন তাদের কোন ক্ষতি না করে।

 অপ্রাপ্ত বয়স্ক ছেলে মেয়ে কখন বালেগ বা প্রাপ্তবয়স্ক হয় ?

যদি কোন অপ্রাপ্ত বয়স্ক বালক বা বালিকাদের মাঝে তিনটি আলামতের কোন একটি পরিলক্ষিত হয় তখন তাদের প্রাপ্তবয়স্ক বলে ধরা হবে।আলামত তিনটি হল:

(১)স্বপ্নদোষ অথবা অন্য কোন কারণে বীর্যপাত হলে।

(২)যৌনাঙ্গে কেশ দেখা দিতে শুরু করলে।

(৩)বয়স পনেরো বছর পূর্ণ হলে।

ছেলেদের মাঝে যখন এ তিনটি আলামতের কোন একটি পরিলক্ষিত হবে তখন তাদের পূর্ণবয়স্ক বলে ধরা হবে।অবশ্য মেয়েদের জন্যচতুর্থএকটিআলামত রয়েছে, তা হল মাসিক দেখা দেয়া। যদি দশ বছর বয়সী কিশোরীদেরও মাসিকদেখা দেয় তাহলে তাদের পূর্ণবয়স্ক বলে ধরতে হবে। এবং শরিয়তের সকলআদেশ-নিষেধ তার জন্য অবশ্য পালনীয় বলে গণ্য হবে।কোন কিশোর বাকিশোরী রমজান মাসের দিনের বেলা যদি বয়স প্রাপ্ত হয় তবে তাকে দিনেরঅবশিষ্ট অংশ পানাহার থেকে বিরত থাকতে হবে। এ দিনের সওম তার কাজা করতে হবেনা। পিতা-মাতার কর্তব্য হল এ বিষয়ে সতর্ক থাকা ও সন্তানকে সচেতন করা। সাথেসাথে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর তার উপর যে সকল ধর্মীয় দায়িত্ব-কর্তব্যআছে তা পালনে দিক-নির্দেশনা দেয়া। পাক-পবিত্রতা অর্জনের নিয়ম-নীতিগুলো সেজানে কি না বা মনে রাখতে পেরেছে কিনা তার প্রতি খেয়াল রাখা।

তৃতীয়:পাগল।পাগল বলতে বুঝায় যার জ্ঞান-বুদ্ধি লোপ পেয়েছে। যার কারণে ভাল-মন্দেরমাঝে পার্থক্য করতে পারে না। এর জন্য সিয়াম পালন ফরজ নয়। যেমন পূর্বেরহাদিসে উলে¬খ করা হয়েছে। পাগল যখনই সুস্থ হয়ে যাবে তখনই সে সিয়াম পালনশুরু করে দেবে। যদি এমন হয় যে দিনের কিছু অংশ সে সুস্থ থাকে কিছু অংশঅসুস্থ তাহলে সুস্থ হওয়া মাত্রই সে পানাহার থেকে বিরত থাকবে। সিয়াম পূর্ণকরবে। পাগলামি শুরু হলেই তার সিয়াম ভঙ্গ হবে না, যদি না সে সিয়াম ভঙ্গেরকোন কাজ করে।

চতুর্থ:অশীতিপর বৃদ্ধ যে ভাল-মন্দের পার্থক্য করতে পারে না ।এ ব্যক্তি যার বয়সের কারণে ভাল-মন্দ পার্থক্য করার অনুভূতি চলে গেছে সেশিশুর মতই। শিশু যেমন শরিয়তের নির্দেশমুক্ত তেমনি সেও। তবে অনুভূতি ফিরেআসলে সে পানাহার থেকে বিরত থাকবে। যদি তার অবস্থা এমন হয় যে কখনো অনুভূতিআসে আবার কখনো চলে যায় তবে অনুভূতি থাকাকালীন সময়ে তার উপর সালাত, সিয়ামফরজ হবে।

পঞ্চম:যে ব্যক্তি সিয়াম পালনের সামর্থ্য রাখে না।এমন সামর্থ্যহীন অক্ষম ব্যক্তি যার সিয়াম পালনের সামর্থ্য ফিরে আসারসম্ভাবনা নেই। যেমন অত্যধিক বৃদ্ধ অথবা এমন রোগী যার রোগ মুক্তির সম্ভাবনানেই—আল্লাহ্‌র কাছে আমরা এ ধরনের রোগ-ব্যাধি থেকে আশ্রয় চাই। এ ধরনেরলোকদের সিয়াম পালন জরুরি নয়। কারণ সে এ কাজের সামর্থ্য রাখে না।

আল্লাহ্‌ রাব্বুল আলামিন বলেন :—

‘আল্লাহ কারো উপর এমন কোন কষ্টদায়ক দায়িত্ব অর্পণ করেন না যা তার সাধ্যাতীত।’   [সূরা আল-বাকারা: ২৮৬]

কিন্তু এমন ব্যক্তির উপর সিয়ামের ফিদয়াপ্রদান ওয়াজিব। সিয়ামের ফিদয়া হল, প্রতিটি দিনের পরিবর্তে একজন মিসকিন (অভাবী) লোককে খাদ্য প্রদান করবে।

কিভাবে মিসকিনকে খাদ্য প্রদান করবে ?

মিসকিনদের দু ভাবে খাদ্য প্রদান করা যায় :

(১)খাদ্য তৈরি করে সিয়ামের সংখ্যা অনুযায়ী সমসংখ্যক মিসকিনকে আপ্যায়ন করাবে।

(২)মিসকিনদেরপ্রত্যেককে এক মুদ পরিমাণ ভাল আটা দেবে। এক মুদ হল ৫১০ গ্রাম। (তবে হানাফিফিকাহ অনুযায়ী দুই মুদ বা এক কেজি বিশ গ্রাম আটা বা সমপরিমাণ টাকা দেয়াযেতে পারে।)

ষষ্ঠ:মুসাফির।মুসাফিরের জন্য সিয়াম পালন না করা জায়েজ আছে। সফরকে যেন সিয়াম পালন না করার কৌশল হিসেবে ব্যবহার না করা হয়।আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেন :—

‘যে কেউ অসুস্থ থাকে বা সফরে থাকে অন্য সময় এ সংখ্যা পূরণ করবে। আল্লাহ তোমাদের জন্য যা সহজ তা চান, যা কষ্টকর তা চান না।’   [সূরা বাকারা : ১৮৫]

সুতরাং যে ব্যক্তি সফরে থাকে তার জন্য সিয়াম ভঙ্গের অনুমতি আছে এবং সফরশেষে সে সিয়াম আদায় করবে। এমনিভাবে সে যদি সফরাবস্থায় সিয়াম পালন করেতবে তা আদায় হবে। তবে উত্তম কোনটি, সফরকালীন সময়ে সিয়াম পালন করা, নাসিয়াম ত্যাগ করা? যেটা সহজ মুসাফির সেটা করবেন। যদি তিনি দেখেন সফরকালীনসময়ে তার সিয়াম পালন বাড়িতে থাকাকালীন সময়ের মতই মনে হয় তবে সফরে তারসিয়াম পালন করা উত্তম। আর যদি দেখেন সফরে সিয়াম পালন করলে অতিরিক্ত কষ্টহয় তবে সিয়াম ত্যাগ করা তার জন্য উত্তম। বরং বেশি কষ্ট হলে সিয়াম পালনমাকরূহ হবে।যেমন রাসূলে করিম স.-এর সাথেএকদল সাহাবি সফরে থাকাকালীন সময়ে সিয়াম পালন করে খুব কষ্ট সহ্য করেছিলেন, রাসুলুল্লাহ (স.) তাদের লক্ষ্য করে বললেন :—

‘তারাইতো অবাধ্য ! তারাইতো অবাধ্য !!’    [বর্ণনায় : মুসলিম]

সফরে কেউ সিয়াম পালন শুরু করল পরে দেখা গেল সিয়াম অব্যাহত রাখতে তারকষ্ট হচ্ছে তখন সে সিয়াম ভঙ্গ করে ফেলবে। এখন কথা হল এক ব্যক্তি সাড়াজীবনই সফরে থাকেন এবং সফরাবস্থায় সিয়াম পালন তার জন্য কষ্টকর সে কীভাবেসিয়াম পালন করবেন ? তিনি শীতকালে ছোট দিনগুলোতে সিয়াম পালন করতে পারেন।

সপ্তম:যে রোগী সুস্থ হওয়ার আশা রাখে।যে রোগাক্রান্ত ব্যক্তির সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা আছে তার অবস্থা তিনটির যে কোন একটি হয়ে থাকে:

এক:এমন রোগী যার পক্ষে সিয়াম পালন কষ্টসাধ্য নয় এবং সিয়াম তার কোন ক্ষতি করে না। এমন ব্যক্তির সিয়াম পালন অপরিহার্য।

দুই:এমন রোগীসিয়াম পালন যার জন্য কষ্টকর। এমন ব্যক্তির সিয়াম পালন বিধেয় নয়-মাকরূহ।সিয়াম পালন করলে আদায় হয়ে যাবে তবে মাকরূহ হবে। ইসলামি শরিয়তেরউদ্দেশ্য মানুষকে কষ্ট দেয়া নয় বরং শরিয়তের উদ্দেশ্য হল মানুষেরসমস্যাকে হালকা করা।

তিন:এমন রোগী যে সিয়াম পালন করলে রোগ বেড়ে যাবে। এ অবস্থায় তার সিয়াম ত্যাগ করাই হল ওয়াজিব বা অপরিহার্য।

অষ্টম:যে নারীর মাসিক চলছে।ঋতুকালীন সময়ে নারীর জন্য সওম পালন জায়েজ নয় বরং নিষেধ। যদি সওম পালনকরা অবস্থায় মাসিক দেখা দেয় তাহলে তার সওম ভেঙে যাবে যদি সূর্যাস্তের একমুহূর্ত পূর্বেও দেখা যায় এবং এ সওমের কাজা আদায় করতে হবে। মাসিকঅবস্থায় রমজানের দিনের বেলা কোন মহিলার মাসিক বন্ধ হয়ে গেল তাহলে তাকে ঐদিনের বাকি সময়টা খাওয়া-দাওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে পরে এটাও কাজা করতেহবে। যদি সুবহে সাদিকের এক মুহূর্ত পূর্বে মাসিক বন্ধ হয়ে যায় তাহলে ঐদিনের সওম পালন অপরিহার্য। এমন ভাবা ঠিক নয় যে, গোসল করা হয়নি তাই সওমপালন থেকে বিরত থাকতে হবে। রোজার নিয়ত করে নিবে। গোসল পরে করলে সমস্যানেই। সিয়াম আদায়ের ক্ষেত্রে সদ্য প্রসূতি নারীর বিধান ঋতুবতী নারীরঅনুরূপ। ঋতুবতী ও সদ্য প্রসূতি নারীরা সুস্থ হয়ে সিয়ামের কাজা আদায়করবে। তবে তাদের সালাতের কাজা আদায় করতে হবে না।

আয়েশা রা.-কে প্রশ্ন করা হয়েছিল যে,ঋতুবতী নারী সালাতের কাজা আদায় করবে না, কিন্তু তাদের সিয়ামের কাজা আদায় করতে হবে কেন ?

তিনি উত্তরে বললেন, আমাদের এঅবস্থায় শুধু সিয়ামের কাজা আদায় করতে রাসুলুল্লাহ (স.) নির্দেশদিয়েছেন, সালাতের কাজা আদায়ের নির্দেশ দেননি।[বর্ণনায় : বোখারি ও মুসলিম]

এটা আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের এক বিরাট অনুগ্রহ যে তিনি মহিলাদের হায়েজ ও নিফাস চলাকালীন সময়ের সালাত মাফ করে দিয়েছেন।

নবম:গর্ভবতী ও দুগ্ধ দানকারী নারী।যদি গর্ভবতী বা দুগ্ধ দানকারী নারী সিয়ামের কারণে তার নিজের বা সন্তানেরক্ষতির আশঙ্কা করে তবে সে সিয়াম ভঙ্গ করতে পারবে। পরে নিরাপদ সময়ে সেসিয়ামের কাজা আদায় করে নিবে।রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন :—

‘আল্লাহ রাব্বুল আলামিনমুসাফিরের অর্ধেক সালাত কমিয়ে দিয়েছেন এবং গর্ভবতী ও দুগ্ধ দানকরী নারীরসিয়াম না রেখে পরে আদায় করার অবকাশ দিয়েছেন।’  [বর্ণনায় : তিরমিজি]

দশম:যে অন্যকে বাঁচাতে যেয়ে সিয়াম ভেঙে ফেলতে বাধ্য হয়।যেমন কোন বিপদগ্রস্ত ব্যক্তি ; পানিতে পড়ে যাওয়া মানুষকে অথবা আগুনেনিপতিত ব্যক্তিকে কিংবা বাড়িঘর ধসে তার মাঝে আটকে পড়া মানুষকে উদ্ধারকরতে যেয়ে সিয়াম ভঙ্গ করল। এতে অসুবিধা নেই। যদি এমন হয় যে সিয়াম ভঙ্গকরা ব্যতীত এ সকল মানুষকে উদ্ধার করা সম্ভব হচ্ছে না তাহলে সিয়াম ভঙ্গ করেউদ্ধার কাজে নিয়োজিত হওয়া অপরিহার্য হয়ে পড়বে।কেননা জীবনের প্রতি হুমকি সৃষ্টি হয়েছে এমন বিপদগ্রস্ত মানুষকে উদ্ধার করা ফরজ।এমনিভাবে যে ইসলাম ও মুসলিমদের শত্র“দের বিরুদ্ধে আল্লাহ্‌র পথে জিহাদে নিয়োজিত সে সিয়াম ভঙ্গ করে শক্তি অর্জন করতে পারবে।এ দশ প্রকার মানুষ যাদের জন্য সিয়াম ভঙ্গ করার অনুমতি দেয়া হল তারা যেন প্রকাশ্যে পানাহার না করে সে দিকে খেয়াল রাখা উচিত।কারণ এতে অনেক অজানা লোকজন খারাপ ধারণা পোষণ করবে যা ব্যক্তি ও সমাজের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

Curtsey: Mohammad Gaffer

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s