শির্ক

Flames background

শির্ক শব্দের আভিধানিক অর্থ- অংশীদারিত্ব, অংশীবাদ, সংমিশ্রণ, মিলানো, সমকক্ষ করা, অংশী স্থির করা, সমান করা, ভাগাভাগি, সম্পৃক্ত করা প্রভৃতি। ইংরেজীতে Polytheism (একাধিক উপাস্যে বিশ্বাস), Sharer, Partner, Associate।
তাওহীদের বিপরীত সকল কর্মই শির্ক।শরীয়াহ্’র পরিভাষায় শির্ক হলো আল্লাহ্ পাকের নাম,সত্তা, গুণাবলী,ক্ষমতা ও অধিকারে গায়রুল্লাহ্ (আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য যে কোন সৃষ্ট বস্তু)কে অংশীদার সাব্যস্ত করা বা এসবে গায়রুল্লাহ্’র অংশ আছে মনে করা।
আল্লাহ্’র সাথে অংশীদার স্থাপন জঘন্য অপরাধ। তাওহীদ আর শির্কের উপমা হচ্ছে: আলো আর অন্ধকার, দৃষ্টিহীন আর দৃষ্টিমান, পবিত্র আর অপবিত্র, রহমত আর লানত, জান্নাত আর জাহান্নাম। র্শিক এমন এক বিকলত্ব যার কথা বলার শক্তি পর্যন্ত রহিত। আল্লাহ্ বান্দাহ্’র সব ধরনের গুনাহ ইচ্ছা হলে মাফ করে দিতে পারেন, কিন্তু তওবা ছাড়া শির্ক নিয়ে মৃত্যু বরণ করলে সে গুনাহ কোনক্রমেই ক্ষমা করবেন না। এমন ব্যক্তির অপরাধ শুধু ক্ষমার অযোগ্যই নয়, তার কোন প্রকার আমল-ই আল্লাহ্’র নিকট গ্রহনযোগ্য হবে না। এ কারণেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মাহ্’র উদ্দেশ্যে কঠোরভাবে হুশিয়ারী উচ্চারণ করে বলেছেন, “আল্লাহ্’র সাথে কাউকে শরীক করবে না, যদিও এজন্য তোমাকে হত্যা করে ফেলা হয় অথবা আগুনে পুড়িয়ে ভষ্মিভূত করে ফেলা হয়।” [মিশকাত:বাবুল কাবায়ের, মু’য়ায বিন জাবাল (রাযিআল্লাহু আনহু বর্ণিত)]
অংশীদার গ্রহনের প্রয়োজন কখন হয়?
অংশীদার গ্রহন করার প্রয়োজন তখনই হয়, যখন কারো মাঝে কোন কিছুর অপূর্ণতা বা অক্ষমতা থাকে। যেমন, কেউ ব্যবসায় কাউকে পার্টনার বা অংশীদার করতে চাইলে এ জন্যই করে যে, হয়তো তার কাছে টাকা/পূঁজি আছে কিন্তু ব্যবসা পরিচালনার দক্ষতা নেই বা দক্ষতা আছে কিন্তু টাকা/পূঁজি নেই বা টাকা/পূঁজি ও দক্ষতা উভয়ই আছে কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় কম বিধায় সে ব্যবসা করতে সক্ষম নয় ইত্যাদি। এক কথায় সে নিজের মধ্যে কোন অপূর্ণতা লক্ষ্য করেছে যা পূর্ণ করার জন্য তার অংশীদার প্রয়োজন হয়ে দাঁড়ায়। এখন তাওহীদপন্থীদের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন, আল্লাহ্ পাক কি অপূর্ণাঙ্গ বা কোন বিষয়ে অক্ষম? নাউযুবিল্লাহ! লক্ষ্য করুন এর উপযুক্ত জবাব স্বয়ং আল্লাহ্ তা’য়ালাই স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন:
“আল্লাহ্-ই সব কিছুর স্রষ্টা এবং তিনিই সব কিছু রক্ষণাবেক্ষণ করেন।” (সূরা আয যুমার ৩৯:৬২)
“যখন তিনি কোন কিছু করার সিদ্ধান্ত নেন, তখন শুধু এতটুকুই বলেন যে, “হও”, আর অমনিতেই তা হয়ে যায়।” (সূরা আল বাকারাহ ২:১১৭)
“এরা কি দেখে না যে, আমি ভূখন্ডকে চারদিক থেকে (ধীরে ধীরে) সংকুচিত করে আনছি? আল্লাহ্ আদেশ জারি করেন, তাঁর সিদ্ধান্তসমূহ পূনঃবিবেচনা করার কেউই নেই এবং তিনি হিসাব গ্রহণে একটুও দেরী করেন না।”(সূরা রাদ ১৩:৪১)
তাওহীদ হচ্ছে আল্লাহ্ রাব্বুল আ’লামীনের ক্ষমা ও জান্নাত লাভের পূর্বশর্ত আর শির্ক হচ্ছে দু’নিয়ায় আযাব-গযব আর মৃত্যুর পর আখিরাতে চিরস্থায়ী জাহান্নামের বাহন। এ প্রসঙ্গে হযরত জাবির (রাযিআল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত এক হাদীসে তিনি বলেন, “এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট এসে জিজ্ঞেস করলো, হে আল্লাহ্’র রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জান্নাত ও জাহান্নাম ওয়াজিবকারী বস্তু দু’টি কি কি? তিনি বললেন: যে ব্যক্তি আল্লাহ্’র সাথে কাউকে শরীক না বানিয়ে মৃত্যু বরণ করলো সে জান্নাতী। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ্’র সাথে কাউকে শরীক বানিয়ে মৃত্যু বরণ করলো সে জাহান্নামী।” (সহীহ মুসলিম:কিতাবুল ঈমান, হা/১৭৭, বা.ই.সে)
বিখ্যাত সাহাবী আবু যার (রাযিআল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেছেন, ‘আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে এ কথা বলতে শুনেছি, “মহামহিম আল্লাহ্ তা’য়ালা বলেছেন, “যে ব্যক্তি আমার দিকে হেঁটে আসে আমি তার দিকে দৌড়ে অগ্রসর হই। আর যে ব্যক্তি দুনিয়া ভর্তি গুনাহ নিয়ে আমার কাছে হাজির হয়, অথচ আমার সাথে কাউকে শরীক স্থির করে নি, তাহলে আমি অনুরূপ দুনিয়া পরিমাণ মাগফিরাত নিয়ে তার দিকে এগিয়ে আসি”। (সহীহ মুসলিম হা/৬৬৪১, বা.ই.সে)
এ প্রসঙ্গে কুরআনুল কারীমে ইরশাদ হয়েছে-
“স্মরণ করো যখন লুকমান নিজের ছেলেকে উপদেশ দিচ্ছিল, সে বললো, ‘হে পুত্র! আল্লাহ্’র সাথে কাউকে শরীক করো না। নিশ্চয়ই শির্ক হচ্ছে সবচেয়ে বড় জুলুম’।” (সূরা লুকমান ৩১:১৩)
“আসলে তো নিরাপত্তা ও নিশ্চিন্ততা তাদেরই জন্য এবং সত্য-সরল পথে তারাই পরিচালিত যারা ঈমান এনেছে এবং যারা নিজেদের ঈমানকে জুলুম (শির্ক) এর সাথে মিশ্রিত করেনি।” (সূরা আন’আম ৬:৮২)
কর্ম ও আচরনের ভিত্তিতে র্শিক বিভিন্ন ধরনের হতে পারে। নিম্নে সংক্ষেপে তিন ধরনের শির্ক সম্পর্কে কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে আমার উপলব্ধি উপস্থাপন করছি:
১. শির্কে আকবার বা বড় শির্ক: যা মূল তাওহীদের পরিপন্থী। আল্লাহ পাকের ক্ষমতা, অধিকার, কার্যাবলীতে র্শিক। আর এসব হচ্ছে সবচেয়ে জঘন্য পর্যায়ের শির্ক। কার্যক্ষেত্রে আল্লাহ্’র সার্বভৌম ক্ষমতায়, আইন প্রণয়নে, ইবাদাতে কাউকে তাঁর সমকক্ষ নির্ধারণ করে নেয়া। অতঃপর আল্লাহ্’র মতই গায়রুল্লাহ্’র দাসত্ব, আইনের আনুগত্য ও উপাসনা করা। তবে র্শিকে আকবর এর মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক কঠিন শির্ক হচ্ছে আল্লাহ্’র সার্বভৌমত্বে অংশীদার সাব্যস্তের মাধ্যমে তাঁর রুবুবিয়্যাতে শির্ক অর্থাৎ হুকুম ও বিধান প্রবর্তনের ক্ষেত্রে আল্লাহ্’র পরিবর্তে গায়রুল্লাহকে অধিকার দেয়া বা হিস্যাদার মনে করা। অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় শির্ক হচ্ছে র্শিকে আকবারের মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক, মানুষ হয়ে মানুষের স্বার্বভৌমত্ব মেনে নেয়া ও মানব রচিত মনগড়া হুকুম ও বিধান দ্বারা রাষ্ট্র পরিচালনা হচ্ছে সবচেয়ে বড় জুলুম। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ ফরমান-
“তাঁকে বাদ দিয়ে তোমরা যাদের উপাসনা করছো তারা শুধুমাত্র কতকগুলো নাম ছাড়া আর কিছুই নয়, যে নামগুলো তোমরা ও তোমাদের বাপ-দাদারা রেখেছো, আল্লাহ্ এগুলোর পক্ষে কোন দলিল-প্রমাণ পাঠাননি। আইন-বিধান জারি করার অধিকার একমাত্র আল্লাহ্’রই। তোমরা তাঁকে ছাড়া আর কারো গোলামী করবে না। এটিই সরল সঠিক জীবনবিধান; কিন্তু অধিকাংশ মানুষই তা জানে না।” (সূরা ইউসূফ ১২:৪০)
অর্থাৎ আল্লাহ্’র যমীনে মূর্তি পূজা, মাজার পূজা যেমন শির্ক, তেমন আল্লাহ্দ্রোহী শক্তির আইন-বিধান প্রনয়ণের অধিকার ও তা মান্য করাও র্শিক। তবে এটা ঠিক যে, একশ্রেণীর পোষা আলিম আছেন যারা শির্ক-বিদ’আত বলতে মাজার-কবর-তাবিজের বাইরে কিছু দেখতে পান না। তবে যারা মূর্তি পূজা, কবর-মাজার পূজা করাকে র্শিকে আকবর বলে অভিহিত করে থাকেন, অথচ আল্লাহ্দ্রোহী শক্তির আইন-বিধান প্রনয়ণের অধিকার ও তা মান্য করাকে শির্ক বলে আখ্যায়িত করেন না এবং মূর্তি পূজারী, মাজার পূজারীকে মুশরিক মনে করেন, কিন্তু তাগুতী শক্তি তথা মানব রচিত আইনের প্রণেতা, রক্ষক ও অনুসারীদের শির্ককারী-মুশরিক মনে করেন না, তারা প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ্’র কিতাব কুরআনের প্রকৃত জ্ঞান লাভ করতে পারেননি। ফলে তারা ইসলামকেও পরিপূর্ণরূপে গ্রহণ করেননি। মূর্তি পূজা, মাজার পূজা নিঃসন্দেহে শির্ক; কিন্তু এ কথাতো চিরন্তন সত্য যে, মানুষের তৈরী মূর্তি বা কবর-মাজারের মৃত ব্যক্তি তাদের পূজা-উপাসনা করার জন্য কাউকে বাধ্য করে না, করতে পারে না, সে কোন আইন প্রণয়ন করে না, করার ক্ষমতাও রাখে না, কোন হুকুম-বিধানও দেয় না বা দেয়ার ক্ষমতা রাখে না বরং ব্যক্তি বা গোষ্ঠী তার নিজের ইচ্ছায় মুর্তি বা কবর-মাজারে পূজা-উপাসনার মাধ্যমে র্শিকে লিপ্ত হয়। অপরদিকে তাগুতী শক্তি তথা মানব রচিত আইনের প্রণেতা, রক্ষক ও অনুসারীরা মানুষের সার্বভৌমত্বের নামে আল্লাহ্’র বিধানের বিপরীতে নিজেরাই আইন-বিধান প্রণয়ন করে তার আনুগত্য করার মাধ্যমে র্শিকে লিপ্ত হচ্ছে এবং জাতির মানুষকে সেই শির্ক-কুফরীতে লিপ্ত হতে বাধ্য করছে। অর্থাৎ রাষ্ট্র পরিচালনায় যদি আল্লাহ্’র সার্বভৌমত্ব, হুকুম ও বিধান চালু থাকতো তবে রাষ্ট্র অনুমোদন না দিলে মানুষ ইচ্ছা করলেই মূর্তি পূজায় লিপ্ত হতে পারতো না, কবর কে মাজার বানিয়ে গায়রুল্লাহ্’র নিকট মাথা নত করতে পারতো না। মোটকথা রাষ্ট্রীয় অনুমোদন ব্যতিরেখে প্রকাশ্যে কেউ গায়রুল্লাহ্’র উপাসনা করতে সাহস পেতো না।
আল্লাহ্ কে যেরূপ ভালবাসা উচিত, ভয় করা উচিত, তাঁর উপর যেরূপ তাওয়াক্কুল করা উচিত গায়রুল্লাহ্ কে সেরূপ ভালোবাসা, ভয় করা ও তাওয়াক্কুল করা র্শিক। যেমন গায়রুল্লাহ্ কর্তৃক নির্যাতিত হবার ভয়, আক্রান্ত হবার ভয়, রিযিক বন্ধ হবার ভয়, জান-মালের ক্ষতি হবার ভয় প্রভৃতি। (তবে মৃত্যুর ভয়, আখিরাতে হিসাব-নিকাশের ভয়, চোর ডাকাতের ভয়, হিংস্র জন্তু-জানোয়ারের ভয় শির্ক নয়)। আল্লাহ্ তা’আলা ফরমান-
“তোমরা তাদেরকে ভয় করো না বরং আমাকে ভয় করো, যাতে করে আমি তোমাদের ওপর আমার নি’য়ামত পূর্ণ করে দিতে পারি এবং এই আশায় যে, আমার এই নির্দেশের আনুগত্যের ফলে তোমরা সঠিক সাফল্যের পথের সন্ধান লাভ করতে পারো।” (সূরা আল রাকারাহ ২:১৫০)
“আর তোমরা আল্লাহ্’র উপরই ভরসা (তাওয়াক্কুল) করো, যদি তোমরা (সত্যিকার অর্থে) মু’মিন হয়ে থাকো।” (সূরা মায়িদাহ ৫:২৩)
২. শির্কে আসগার বা ছোট শির্ক : যা তাওহীদের পূর্ণতার পরিপন্থী। ইহা প্রত্যেক ঐ মাধ্যম যা মানুষকে বড় শির্কের দিকে নিয়ে যায়। যেমন আল্লাহ্ ছাড়া অন্যের নামে শপথ করা। কোন আমলের কাঠামো ও মুখের কথায় গায়রুল্লাহ্ কে আল্লাহ্’র সমকক্ষ সাব্যস্ত করা অথবা কথায় ও কাজে আল্লাহ্’র পাশাপাশি গায়রুল্লাহ্ কে তুষ্ট রাখার চেষ্টা করা। যেমন: লৌকিকতা, দুনিয়ার মানুষ থেকে সুনাম ও যশ লাভের আশা, দুনিয়া লাভের উদ্দেশ্যে আমল করা, গায়েব জানে মনে করে পীর-ফকিরের দরবারে যাওয়া, সামর্থ থাকা সত্ত্বেও বুজুর্গী প্রকাশের উদ্দেশ্যে মানুষ আল্লাহ্ ওয়ালা বলবে এই আকাঙ্খায় তালিযুক্ত, ছেঁড়া-ফাড়া পোশাক পরিধান করা, হাতে তাসবীহ নিয়ে ঘোরা প্রভৃতি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “যে কুলক্ষণ গ্রহণ করলো, সে শির্ক করলো।” তিনি আরও বলেন, “যে গণকের কাছে গিয়ে তার কথায় বিশ্বাস করলো সে মুহাম্মাদের উপর যা অবতীর্ণ হযেছে তার সাথে কুফরী করলো।” (মুসনাদে আহমাদ, মুসলিম)
সাহাবী মাহমুদ বিন লবীদ (রাযিআল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: “আমি তোমাদের উপর সব চেয়ে বেশী ভয় পাই ছোট শির্কের। সাহাবারা জিজ্ঞাসা করলেন- হে আল্লাহ্’র রাসূল! ছোট শির্ক কি? তিনি বললেন: তা হল রিয়া বা লোক দেখানো কাজ।” (মুসনাদে আহমাদ)
৩. শির্কে খাফী বা গোপন শির্ক : এ প্রকার শিরকের স্থান হলো ইচ্ছা, সংকল্প ও নিয়্যাতের মধ্যে। যেমন লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে  ও প্রসিদ্ধি অর্জনের জন্য কোন আমল করা। অর্থাৎ আল্লাহ্’র নৈকট্য অর্জন করা যায় এমন কোন কাজ করে তা দ্বারা মানুষের প্রশংসা লাভের ইচ্ছা করা। যেমন সুন্দর ভাবে নামায আদায় করা, কিংবা সদকা করা এ উদ্দেশ্যে যে, মানুষ তার প্রশংসা করবে, অথবা সশব্দে যিকির-আযকার পড়া ও সুকণ্ঠে তেলাওয়াত করা যাতে তা শুনে লোকজন তার গুণগান করে। যদি কোন আমলে রিয়া তথা লোক দেখানোর উদ্দেশ্য সংমিশ্রিত থাকে, তাহলে আল্লাহ্ তা বাতিল করে দেন। ইহা কখনো ছোট, আবার কখনো বড় র্শিকে পরিনত হয়। হযরত জাবির (রাযিআল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বের হলেন, অতঃপর বললেন: “হে লোকসকল! তোমরা নিজেদেরকে গোপন শির্ক থেকে রক্ষা করো, তারা জিজ্ঞাসা করলো- হে আল্লাহ্’র রাসূল! গোপন শির্ক কি? তিনি বললেন- কোনে ব্যক্তি সালাত আদায় করার জন্য দাড়ালো, অতঃপর সালাতকে সুন্দর করে আদায় করলো, কেননা সে দেখেছে মানুষ তার প্রতি লক্ষ্য করছে। এটাই হলো গোপন শির্ক।” (সুনানে বাইহাকী)
আবু হুরায়রা (রাযিআল্লাহু আনহু) বর্ণনা করেন, তিনি রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কে বলতে শুনেছেন: “কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম এমন এক ব্যক্তির ব্যপারে ফয়সালা হবে যে শহীদ হয়েছিল। তাকে আনা হবে এবং তাকে যেসব সুযোগ সুবিধা দেওয়া হয়েছিল তা পেশ করা হবে। সে তা চিনতে পারবে। আল্লাহ তা’য়ালা তাকে জিজ্ঞেস করবেন,আমি যে সমস্ত নিয়ামত তোমাকে দিয়েছিলাম, তার বিনিময়ে তুমি কি কাজ করেছ? সে বলবে, আমি আপনার পথে লড়াই করে শহীদ হয়েছি। তিনি বলবেন, তুমি মিথ্যা বলছ। বরং তুমি এজন্য লড়াই করেছ যে, লোকেরা তোমাকে বীর বাহাদুর বলবে! আর তা বলাও হয়েছে। অতঃপর তার সম্বন্ধে নির্দেশ দেওয়া হবে এবং তাকে উপুড় করে টেনে নিয়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। অতঃপর আরেক ব্যক্তিকে নিয়ে আসা হবে, সে ইলম অর্জন করেছে, তা লোকদের শিক্ষা দিয়েছে আর কুরআন পাঠ করেছে। তাকে উপস্থিত করা হবে এবং তাকে দেওয়া সুযোগ সুবিধা গুলোও তার সামনে তুলে ধরা হবে। সে তা দেখে চিনতে পারবে। তুমি তোমার নিয়ামতের কি সদ্ব্যাবহার করেছ? সে বলবে আমি ইলম অর্জন করেছি, লোকদের তা শিক্ষা দিয়েছি এবং আপনার সন্তুষ্টির জন্য কুরআন পাঠ করেছি। আল্লাহ্ বলবেন, তুমি মিথ্যা কথা বলছ। বরং তুমি এই উদ্দেশ্যে বিদ্যা অর্জন করেছিলে যে, লোকেরা তোমাকে আলেম বা বিদ্বান বলবে, এবং কুরআন এই জন্য পাঠ করেছিলে যে, তোমাকে ক্বারী বলা হবে। আর তা বলাও হয়েছে। অতঃপর তার সম্বন্ধে নির্দেশ দেওয়া হবে এবং তাকে উপুড় করে টেনে নিয়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। অতঃপর আরেক ব্যক্তিকে আনা হবে, তাকে আল্লাহ্ অজস্র ধন দৌলত দান করেছেন এবং নানা প্রকারের ধন স¤পদ দিয়েছেন। তাকে দেওয়া সুযোগ সুবিধা গুলোও তার সামনে তুলে ধরা হবে। সে তা দেখে চিনতে পারবে। আল্লাহ জিজ্ঞেস করবেন, তোমার এ স¤পদ দ্বারা তুমি কি কাজ করেছ? সে বলবে, যেখানে ব্যায় করলে আপনি সন্তুষ্ট হবেন এমন কোন খাত আমি বাদ দেইনি বরং সেখানেই খরচ করেছি আপনার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে। মহান আল্লাহ বলবেন, তুমি মিথ্যা বলছ। বরং তুমি এই জন্য দান করেছ যে, লোকেরা তোমাকে দাতা বলবে। আর তা বলাও হয়েছে। অতঃপর তার সম্বন্ধে নির্দেশ দেওয়া হবে এবং তাকে উপুড় করে টেনে নিয়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।” (সহীহ মুসলিম, হা/৪৭৭১, ই.ফা.বা)
শির্ক কেন এত জঘণ্যতম, ভয়াবহ, ক্ষমার অযোগ্য মহা-অপরাধ?
উপরোল্লিখিত আলোচনা থেকে এ কথা স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, শির্ক হচ্ছে মহান রব্ব আল্লাহ্’র সাথে কাউকে অংশীদার করা এবং অংশীদারিত্বের আকীদাহ পোষণ করা। র্শিকের মাধ্যমে আল্লাহ্’র নিরঙ্কুশ সার্বভৌমত্ব ক্ষুন্ন করা হয়। শির্কের মাধ্যমে আল্লাহ্’র সমস্ত শান-মান কে অস্বীকার করা হয়। এ সকল কারণেই শির্ক ক্ষমার অযোগ্য জঘন্যতম অপরাধ। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-
“তারা (র্শিককারীরা) আল্লাহ্’র যথোচিত সম্মান করে না। (তাঁর অসীম ক্ষমতার অবস্থা এই যে,) কিয়ামতের দিন সমগ্র পৃথিবী থাকবে তাঁর হাতের মুঠোয় এবং আকাশমন্ডলী ভাঁজ করা থাকবে তাঁর ডান হাতে। পবিত্র মহান তিনি। তারা যাকে শরীক করে তিনি তা থেকে অনেক উর্দ্ধে।” (সূরা যূমার ৩৯:৬৭)
বিশ্ব-জাহানের মহান রব্ব, সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ্ তা’আলা যে সকল বিষয়কে নিজের জন্য খাস করেছেন যেমন হুকুম-বিধান দেয়া, হালাল-হারাম নির্ধারণ করা, কুরআন ও সুন্নাহ মোতাবেক বিচার ফয়সালা করা, তাঁর নাযিল করা আইন-সংবিধান দিয়ে সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনা করা ইত্যাদি বিষয়ে মানুষের তৈরি মনগড়া আইন-বিধান ও সংবিধানকে মেনে নিয়ে আল্লাহ্’র সাথে শরীক করাকে তিনি সহ্য করে যাচ্ছেন, এ ধরনের খেলো, যুক্তি বিরুদ্ধ চিন্তা মুসলিম নামধারী অনেকেরই মন-মগজে বাসা বেঁধে আছে। আসলে কোনটি যুক্তিগ্রাহ্য, কোনটি অযৌক্তিক, কোনটি গ্রহণীয়, কোনটি বর্জনীয় তা স্বাভাবিক জ্ঞান-বুদ্ধি দ্বারা আমরা ঠিকই বুঝতে পারি কিন্তু নফ্সের তাড়নায় দুনিয়াবী স্বার্থান্ধতার কারণে নানারূপ টালবাহানা করি। আমাদের এ চরিত্র আল্লাহ পাক তাঁর কালামে প্রকাশ করে দিলেন এভাবে-
“বরং মানুষ নিজেই তার নিজের সম্পর্কে চক্ষুমান। যদিও সে নানারূপ ওজর-আপত্তি পেশ করে।” (সূরা ক্বিয়ামাহ ৭৫:১৪-১৫)
স্পষ্ট জেনে রাখুন, যদি কোন ব্যক্তি, কোন নেতা, পন্ডিত বা আলেমের কথায় আল্লাহ্’র হারাম করা যে কোন কিছুকে হালাল মনে করে কিংবা আল্লাহ্’র হালাল করা কোন কিছুকে হারাম মনে করে তবে যার কথাকে সে আল্লাহ’র হুকুমের উপরে স্থান দিল সে নেতা, পন্ডিত বা আলেম তার রব্ব বা সার্বভৌম আইনদাতা-বিধানদাতায় পরিণত হবে। (দেখুন তাফসীর সূরা তওবা ৯:৩১ এবং আদি ইবনে হাতেম রাযিআল্লাহু আনহু বর্ণিত হাদীস, সহীহ তিরমিযী)। মা’আরেফুল ক্বোরআন, সংক্ষিপ্ত তাফসীর, পৃ.১২৪৪-এ উল্লেখ আছে: “যে ব্যক্তি আল্লাহ্ তা’য়ালার আনুগত্যের মোকাবেলায় অন্য কারও আনুগত্য অবলম্বন করে, তাকেই তার উপাস্য বলা হবে।” ফলাফল হিসেবে উভয় ক্ষেত্রেই আল্লাহ্’র সাথে শরীক স্থাপন করার কারণে ঐ ব্যক্তি মুশরিকে পরিণত হবে আর খালেছ তাওবা ব্যতীত মৃত্যু বরণ করলে যার পরিণতি চিরস্থায়ী জাহান্নাম।
তবে কেউ যদি বলে, অনেকেই অজ্ঞতার কারণে আল্লাহ্’র সাথে শরীক হয় এমন অনেক কাজকে র্শিক না জেনে, না বুঝে করে থাকে, এক্ষেত্রে তাদেরকে মুশরিক বলাটা বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে। আসলেই এটা বাড়াবাড়ি কি-না চলুন যুক্তি প্রয়োগ করে দেখি। আমারা সবাই জানি যে, সায়ানাইড একটি মারাত্মক বিষাক্ত পদার্থের নাম, যা খেলে মানুষ মারা যায়। এখন সায়ানাইড নামক বস্তুটি যে বিষ, এটা কেউ না যেনে যদি সেবন করে, তাহলে কি লোকটির অজ্ঞতা বিষের বিষক্রিয়া হতে তাকে রক্ষা করতে পারবে? সবাই বলবেন, এক্ষেত্রে অজ্ঞতা লোকটিকে তো রক্ষা করবেই না, বরং অজ্ঞতার কারণে প্রতিষেধক নিতে বিলম্ব হওয়ার কারণে লোকটি স্বাভাবিকের চেয়ে আরো দ্রুততম সময়ে বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু বরণ করবে। সুতরাং কারো জানা বা না জানার কারণে যেমন বিষের বিষক্রিয়ার কোন তারতম্য হয় না, তদ্রূপ অজ্ঞতার কারণে কেউ আল্লাহ্’র সাথে শরীক করে বসলে, তার অজ্ঞতা তাকে ইসলাম থেকে বের হয়ে মুশরিকে পরিণত হওয়াকে ঠেকাতে পারে না।
তবে আমাদের সমাজে শির্ক কে বিভিন্ন শ্রেণীতে বিভক্ত করার মাধ্যমে তা যত হালকা করেই দেখা হোক না কেন, আল্লাহ্ পাকের নিকট ছোট হোক বা বড়, সকল ধরনের শির্ক-ই যুলুম, যুলমুন আযীম-চুড়ান্ত পর্যায়ের যুলুম, যার চেয়ে বড় যুলুম আর দুনিয়ার বুকে হতে পারে না! তাইতো কালামে পাকে এবং সহীহ হাদীস গ্রন্থে বলা হয়েছে:
“আল্লাহ্ তাঁর সাথে শির্ক করার গুনাহ মাফ করবেন না। শির্ক ছাড়া অন্যান্য যে সব গুনাহ রয়েছে সেগুলো যাকে ইচ্ছা মাফ করে দিবেন।” (সূরা নিসা ৪:৪৮)
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাযিআল্লাহু আনহু) থেকে বর্নিত, তিনি বলেন আমি জিজ্ঞেস করলাম, “হে আল্লাহ্’র রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম), সবচেয়ে বড় পাপ কোনটি? রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, আল্লাহ্’র সাথে শরীক করা, অথচ আল্লাহ্ই তোমাকে সৃষ্টি করেছেন।” (সহীহ বুখারী, মুসলিম:কিতাবুল ঈমান, হা/১৬৬, বা.ই.সে)
হযরত জাবির বিন আবদুল্লাহ (রাযিআল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,বান্দাহ্’র জন্য সর্বদাই ক্ষমা রয়েছে যতক্ষণ পর্যন্ত (আল্লাহ্ ও তাঁর বান্দাহ’র মাঝে) হিযাব বা পর্দা পতিত না হয়।বলা হলো, হে আল্লাহ্’র রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)! হিযাব বা পর্দা কি? তিনি বললেন,আল্লাহ্’র সাথে শরীক করা।” (মুসনাদে আহমদ, তাফসীর ইবনু কাছীর ১ম খন্ড ৬৭৮ পৃ.)
তবে দুনিয়ায় বেঁচে থাকা অবস্থায়, যদি কেউ শির্ক করার পর তার অপরাধের ভয়াবহতা উপলব্ধি করতে পারে, অতঃপর কৃত অপরাধের জন্য খালেছ ভাবে তওবা করে, তবে মহান রব্ব আল্লাহ্ তাঁর অনুতপ্ত বান্দাহ্ কে রহমতের ছায়াতলে অবশ্যই ঠাঁই দিবেন, এতটুকু আশা আমরা করতেই পারি!
আমাদের সমাজের অধিকাংশ মানুষ আমল সম্পর্কে যতটা সচেতন, শির্ক সম্পর্কে তার দশ শতাংশও সচেতন নয়। যেমন কেউ কবিরা গুনাহ (সালাত আদায় না করা, বিশেষ করে জামাতে সালাত আদায় না করা) করলে তাকে খুবই খারাপ নজরে দ্যাখে; কিন্তু শির্ক করলে নিজস্ব অজ্ঞতার কারণে তার বিরুদ্ধে কোন সাবধান, সতর্ক ও প্রতিবাদ বাণী উচ্চারিত হয় না বললেই চলে। যেমন একজন নামাযী ব্যক্তি নামাযে প্রত্যেক তাকবীরে আল্লাহ্’র বড়ত্ব, শ্রেষ্ঠত্ব ও সার্বভৌমত্ব ঘোষণা করে, সে এটাও জানে, আইন-বিধান দানের ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহ্’র। এটা জেনেও সে নিজে আইন রচনা করল কিংবা যে সকল ব্যক্তিবর্গ নিজস্ব মনগড়া আইন রচনা করলো তাদেরকে এবং তাদের তৈরি করা আইনকে মানলো। অতঃপর মানুষের তৈরি করা আইনের কাছে বিচার ফয়সালা চাওয়া শিরকে আকবর জেনেও তাগুতের আদালতে বিচার ফয়সালার জন্য গেলো, তবে সে মুশরিকে পরিণত হবে। এক্ষেত্রে “আল্লাহ্-ই আমাদের একমাত্র আইনদাতা-বিধানদাতা’’ অন্তরে এ বিশ্বাস তার কাফির-মুশরিক হওয়াকে আটকাতে পারবে না। কারণ অন্তরের খবর একমাত্র আল্লাহ্ জানেন। আমরা তাকে যাচাই করবো তার মুখের ঘোষণা এবং আমলের দ্বারা। অতএব কেউ অন্তরে বিশ্বাসের দোহাই দিয়ে যদি মুখে কিংবা কাজে শির্ক ও কুফরীর পথ অবলম্বন করে তবে সে তো ইসলামের গন্ডির বাইরে চলে গেল আর এই অবস্থায় কারো মৃত্যু হলে তার মৃত্যুতো শির্ক ও কুফরীর উপরই হলো অর্থাৎ কাফির-মুশরিক অবস্থায় মৃত্যু হলো। যেমন আল্লাহ ফরমান-
“এখন টাল-বাহানা করিও না। তোমরা ঈমান গ্রহণের পর কুফরী করেছ ।” (সূরা আত-তওবা ৯:৬৬)।
“তারা আল্লাহ্’র নামে কসম খেয়ে খেয়ে বলে, আমরা ও কথা বলিনি, অথচ নিঃসন্দেহে তারা কুফরী বাক্য বলেছে এবং ইসলাম গ্রহনের পর কুফরী অবলম্বন করেছে।” (সূরা আত-তওবা ৯:৭৪)
তবে কাউকে যদি জোর করে অত্যাচার করতে করতে মৃত অবস্থায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং তখন অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে তার মুখ থেকে অন্তরের বিশ্বাসের বিপরীত কোন কুফরী কথা বের হয় বা শির্কী কাজ সংঘটিত হয় যা কিনা রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর সাহাবী আম্মার ইবনে ইয়াসীর (রাযিআল্লাহু আনহু) এর সাথে করা হয়েছিল, তবে আশা করা যায় তাকে আল্লাহ মাফ করে দিবেন। তবে এক্ষেত্রেও যারা শির্ক ও কুফরী করার চেয়ে মৃত্যু কে বেছে নেন, তবে মহান রব্বের নিকট তার তাকওয়ার মান অবশ্যই অত্যন্ত মজবুত ও উচ্চ মাকামে পৌঁছে যাবে।
শির্কের পরিনতি যে কতটা ভয়াবহ তা ভাষা দ্বারা প্রকাশযোগ্য নয়। তথাপিও সংক্ষেপে বলতে গেলে বলতে হয়: যারা ঈমান ও তাওহীদ এর পরিবর্তে কুফর ও শির্ক নিয়ে মৃত্যু বরণ করবে তারা চির জাহান্নামী হবে। পক্ষান্তরে ঈমানদার ব্যক্তি যদি কবিরা গুনাহ করে বিনা তওবায় মৃত্যু বরণ করে, তবে জাহান্নামে গেলেও সেখানে তারা চিরস্থায়ী হবে না। অর্থাৎ অন্তরে যদি র্শিকমুক্ত ঈমান থাকে তবে আশা করা যায়, আমলে যত ত্রুটিই থাক না কেন, আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার মাগফিরাত একদিন না একদিন তাকে জাহান্নাম থেকে সে বের করবেই। (দেখুন সহীহ মুসলিম হা/৬৬৪১, বা.ই.সে)। (অবশ্য এ সম্পর্কে আল্লাহ্ই ভালো জানেন, কারণ তিনিই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী)। এবার র্শিকের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি পরিণতি বা ফলাফল সম্পর্কে কুরআনের ভাষ্য পাঠকদের খিদমতে পেশ করছি:
শির্ককারীর সকল আমল আল্লাহ্ ধ্বংস করে দিবেন:
“যদি তুমি র্শিক করো, তাহলে তোমার সকল আমল বিনষ্ট হয়ে যাবে এবং তুমি হবে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভূক্ত।” (সূরা যুমার ৩৯:৬৫)
“কিন্তু যদি তারা কোন র্শিক করে, তাহলে তারা যত আমলই করুক না কেন তা ধ্বংস হয়ে যাবে।” (সূরা আনআ’ম ৬:৮৮)
শির্কক্ষমার অযোগ্য পাপ:
কালামুল্লাহয় সুস্পষ্ট ইরশাদ হয়েছে-
“আল্লাহ্ তাঁর সাথে র্শিক করার গুনাহ মাফ করবেন না। র্শিক ছাড়া অন্যান্য যে সব গুনাহ রয়েছে সেগুলো যাকে ইচ্ছা মাফ করে দিবেন।” (সূরা নিসা ৪:৪৮)
শির্ককারীর জন্য জান্নাত হারাম:
“যে ব্যক্তি আল্লাহ্’র সাথে কাউকে শরীক করেছে তার ওপর আল্লাহ্ জান্নাত হারাম করে দিয়েছেন এবং তার আবাস হবে জাহান্নাম। আর এ ধরনের জালিমদের কোন সাহায্যকারী নেই।” (সূরা মায়িদাহ ৫:৭২)
শির্ককারী ধ্বংস ও বিপর্যয়ে পতিত হয়:
আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-
“একনিষ্ঠভাবে আল্লাহ’র বান্দা হয়ে যাও, তাঁর সাথে কাউকে শরীক করো না এবং যে ব্যক্তি আল্লাহ’র সাথে শরীক করে সে যেন আকাশ থেকে পড়ে গেলো। এখন হয় তাকে পাখি ছোঁ মেরে নিয়ে যাবে অথবা বাতাস তাকে এমন জায়গায় নিয়ে গিয়ে ছুঁড়ে দেবে যেখানে সে ছিন্নভিন্ন হয়ে যাবে।” (সূরা হাজ্জ ২২:৩১)
শির্কদ্বীনকে খন্ড-বিখন্ড করে দেয়:
“তোমরা একনিষ্ঠভাবে তাঁর অভিমুখী হয়ে শুধুমাত্র তাঁকেই ভয় করো, আর সালাত কায়েম করো এবং এমন মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যেয়ো না, যারা তাদের দ্বীনে মতভেদ সৃষ্টি করেছে এবং বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে গেছে। প্রত্যেক দলই নিজ নিজ মতবাদ নিয়ে উল্লসিত হয়ে আছে।” (সূরা রুম ৩০:৩১-৩২)
শির্ককারী-মুশরিক অপবিত্র:
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা ফরমান-
“হে ঈমানদারগণ! নিশ্চয়ই র্শিককারীরা অপবিত্র।” (সূরা তাওবাহ ৯:২৮)
শির্ককারী অর্থাৎ মুশরিকরা সৃষ্টির অধম:
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা ফরমান-
“আহলে কিতাব ও মুশরিক কাফেররা জাহান্নামের আগুনে স্থায়ীভাবে থাকবে। তারাই সৃষ্টির অধম।” (সূরা বাইয়্যেনাহ ৯৮:৬)
র্শিকের কারণে উম্মাহ দলে-উপদলে বিভক্ত হয়ে আযাব-গযবের সম্মুখীন:
“(হে মুহাম্মাদ!) আপনি জিজ্ঞেস করুন, জল-স্থলের গভীর অন্ধকারে কে তোমাদের বিপদ থেকে উদ্ধার করে ? কার কাছে তোমরা কাতর কণ্ঠে ও গোপনে প্রার্থণা করো? কার কাছে বলে থাকো, এ বিপদ থেকে আমাদের উদ্ধার করলে আমরা অবশ্যই আপনার শোকরগুজারী করবো? বলুন, আল্লাহ্ তোমাদের এ থেকে এবং প্রতিটি দুঃখ-কষ্ট থেকে মুক্তি দেন। এরপরও তোমরা অন্যদেরকে তাঁর সাথে শরীক করো। বলুন, তিনি ওপর দিক থেকে অথবা তোমাদের পদতল থেকে তোমাদের ওপর কোন আযাব নাযিল করতে অথবা তোমাদেরকে বিভিন্ন দলে-উপদলে বিভক্ত করে এক দলকে আর এক দলের শক্তির স্বাদ গ্রহণ করিয়ে দিতে সক্ষম। দেখুন, আমি কিভাবে বারবার বিভিন্ন পদ্ধতিতে আমার নিদর্শনসমূহ তাদের সামনে পেশ করছি, হয়তো তারা এ সত্যটি অনুধাবন করবে।” (সূরা আনআ ম ৬:৬৩-৬৫)
শির্ককারীরা আল্লাহ্ তা’য়ালার মাসজিদ রক্ষণাবেক্ষণকারী ও খাদেম হওয়ার অযোগ্য:
কালামে পাক-এ আল্লাহ্ সুব্হানাহু ওয়া তা’য়ালা ফরমান- “মুশরিকরা যোগ্যতা রাখে না আল্লাহ্ তা’য়ালার মাসজিদ রক্ষণাবেক্ষণকারী ও খাদেম হওয়ার, যখন তারা নিজেরাই নিজেদের কুফরীর সাক্ষ্য দিচ্ছে। এদের সমস্ত আমল বরবাদ হয়ে গেছে এবং এদেরকে চিরকাল জাহান্নামে থাকতে হবে।” (সূরা আত তাওবা ৯:১৭)
এখানে যদিও কথাগুলো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সময়কালে মুশরিকদের উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে এবং এর মাধ্যমে আল্লাহ্’র ঘর কাবা ও মসজিদে হারামের রক্ষণাবেক্ষণ ও খিদমতের ক্ষেত্রে তাদের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে তথাপিও তাৎপর্যের দিক দিয়ে এই আয়াতের হুকুম সর্বক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, অর্থাৎ এক আল্লাহ্’র উপাসনা করার জন্য যেসব মাসজিদ তৈরী করা হয়েছে সেগুলোর মুতাওয়াল্লী, রক্ষণাবেক্ষণকারী ও খাদেম এমন ধরনের লোক হতে পারে না যারা আল্লাহ পাকের নাম, সত্তা, গুণাবলী, ক্ষমতা ও অধিকারের ক্ষেত্রে গায়রুল্লাহকে শরীক করে। তারপর তারা নিজেরাই যখন কার্যক্ষেত্রে পরিপূর্ণরূপে তাওহীদের দাওয়াত গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছে এবং পরিস্কার বলে দিয়েছে: আমরা সলাত, সিয়াম, হজ্জ, যাকাত প্রভৃতি আমল এক আল্লাহ্’র জন্য নির্দিষ্ট করলেও নিজেদের সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় নিজেদের মনগড়া আইন-বিধান ও কর্তৃত্বের পরিবর্তে এক আল্লাহ্’র সার্বভৌমত্ব, আইন-বিধান ও কর্তৃত্ব মেনে নিতে রাযী নই সেক্ষেত্রে একমাত্র আল্লাহ্’র ইবাদত করার জন্য যে মাসজিদ তৈরী করা হয়েছে তার মুতাওয়াল্লী কিংবা খাদেম হবার অধিকার তারা পাবে কোথা থেকে! সুতরাং এক্ষেত্রে আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে, এক আল্লাহ্’র উপাসনার স্থান মাসজিদ কে র্শিককারী মুতাওয়াল্লী ও খাদেমদের নিকট হতে পবিত্র রাখা এবং মাসজিদ থেকে র্শিককারীদের পাট একেবারে চুকিয়ে দিয়ে সেখানে চিরকালের জন্য তাওহীদবাদীদের অভিভাবকত্ব প্রতিষ্ঠিত করার জন্য মুসল্লীদের উদ্বুদ্ধ করা।
শির্ককারী অর্থাৎ মুশরিকদের মাগফিরাতের জন্য দু’আ করা নিষিদ্ধ:
কালামে পাকের অপর এক আয়াতে আল্লাহ্ ফরমান- “নাবী ও ঈমানদারদের জন্য এটা সংগত নয় যে, তারা র্শিককারীদের জন্য মাগফিরাতের দোয়া করবে, এমনকি যদি তারা তাদের ঘনিষ্ট আত্মীয়-স্বজনও হয়, যখন একথা সুস্পষ্ট হয়ে গেছে যে, তারা জাহান্নামেরই উপযুক্ত।” (সূরা আত তাওবা ৯:১১৩)
অর্থাৎ মুশরিকদের মাগফিরাতের জন্য দু’আ করা ও ক্ষমা প্রার্থনা করা নিষিদ্ধ। যদিও তারা নিজ পরিবারের অর্ন্তভূক্ত এবং নিকট আত্মীয় হয়। এটি নাবী ও ঈমানদারদের প্রতি আল্লাহ্ পাকের সুস্পষ্ট নির্দেশ। এর পরও আবেগতাড়িত হয়ে কয়েকজন নাবী ও রাসূল স্বীয় আত্মীয়দের মাগফিরাতের জন্য দু’আ ও ক্ষমা প্রার্থনা করার অনুমতি চেয়ে মহান রব্ব আল্লাহ্’র নিকট দরখাস্ত করলে তিনি তা মঞ্জুর করেন নি।
যেমন- ১. নূহ (আলাইহিস সালাম) তাঁর ছেলের জন্য অনুমতি পান নি।
২. ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) তাঁর পিতার জন্য অনুমতি পান নি।
৩. লূত (আলাইহিস সালাম) তাঁর স্ত্রীর জন্য অনুমতি পান নি।
৪. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর মাতা আমেনা এবং চাচা আবু তালিবের মাগফিরাতের জন্য দু’আ করা ও ক্ষমা প্রার্থনা করার অনুমতি পান নি। এমন কি তাঁকে নিষেধ করা হয়েছে।
দলিল দেখুন:
০১. নূহ (আলাইহিস সালাম), ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) ও লূত (আলাইহিস সালাম) এর ঘটনা কুরআনে বর্ণিত হয়েছে।
“আর নূহ (আলাইহিস সালাম) তাঁর রব্বকে ডেকে বললেন- হে রব্ব! আমার পুত্র তো আমার পরিজনদের অন্তর্ভুক্ত; আর আপনার ওয়াদাও নিঃসন্দেহে সত্য। আর আপনিই সর্বাপেক্ষা বড় ও উত্তম ফয়সালাকারী। জবাবে (রব্বের পক্ষ থেকে) বলা হলো: হে নূহ! নিশ্চয় সে তোমার পরিবারভুক্ত নয়। নিশ্চই সে দুরাচার! সুতরাং আমার কাছে এমন দরখাস্ত করবে না, যার মূল খবর তোমার অজানা। আমি তোমাকে উপদেশ দিচ্ছি যে, তুমি জাহিলদের দলভুক্ত হবে না। নূহ (আলাইহিস সালাম) সঙ্গে সঙ্গে আরয করলেন: হে আমার রব্ব! যে বিষয় আমার জানা নেই সে বিষয়ে দরখাস্ত করা হতে আমি আপনার নিকট পানাহ্ চাই। আপনি যদি আমাকে ক্ষমা না করেন, দয়া না করেন, তাহলে আমি ধ্বংশ হয়ে যাবো।” (সূরা হূদ ১১:৪৫-৪৭)
০২. “আর ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) তাঁর পিতার জন্য যে মাগফিরাতের দু’আ করেছিল, তা ছিল সে ওয়াদার কারণে যা সে তাঁর পিতার নিকট করেছিল। অতঃপর যখন তাঁর কাছে এ কথা প্রকাশ পেল যে, তাঁর পিতা আল্লাহ্’র দুশমন, তখন সে তার সাথে সপর্ক ছিন্ন করে নিলেন। নিঃসন্দেহে ইব্রাহীম ছিলেন বড় কোমল হৃদয়, পরম ধৈর্যশীল।” (সূরা আত তাওবা ৯:১১৪)
০৩. “আল্লাহ্ কাফিরদের ব্যাপারে নূহ ও লূত (আলাইহিস সালাম)-এর স্ত্রীদেরকে দৃষ্টান্তরূপে পেশ করেছেন। তারা ছিল আমার দু’জন নেক বান্দাহ্’র গৃহে। কিন্তু তারা তাদের স্বামীদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল। ফলে নূহ ও লূত তাদেরকে আল্লাহ্ তা’আলার কবল থেকে রক্ষা করতে পারল না এবং তাদেরকে বলে দেয়া হয়েছে: যাও জাহান্নামীদের সাথে তোমরাও জাহান্নামে প্রবেশ করো।” (সূরা আত্-তাহরিম ৬৬:১০)
“অতপর আমার প্রেরিত ফিরিশতাগণ যখন লূতের কাছে আগমন করল, তখন তাদের আগমনের কারণে সে খুবই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ল এবং তার মন সংকীর্ণ হয়ে গেল। তারা বলল, ভয় করবেন না এবং দুশ্চিন্তাও করবেন না। আমরা আপনাকে ও আপনার পরিবারবর্গকে রক্ষা করবই- আপনার স্ত্রী ব্যতীত, সে পিছনে পরে থাকা লোকদের মধ্যে গণ্য।” (সূরা আল-আনকাবুত ২৯:৩৩)
০৪. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মাতার ঘটনা সহিহ মুসলিম শরীফে বর্ণিত হয়েছে। হাদিস সহিহ্। মাতার জন্য মাগফিরাতের অনুমতি বিষয়ে দলিল: সহিহ মুসলিম, ৩য় খন্ড, কিতাবুস সালাত, হাদিস নং ২১৩০-২১৩১, পৃষ্ঠা ৩৩৯-৩৪০, বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার কর্তৃক প্রকাশিত।
হযরত আবু হুরায়রা (রাযিআল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর মায়ের কবর যিয়ারত করতে গেলেন। তিনি কাঁদলেন এবং আশে-পাশের সবাইকে কাঁদালেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আমি আমার রব্বের নিকট মায়ের জন্য ইস্তিগফারের অনুমতি চাইলাম; কিন্তু আমাকে অনুমতি দেয়া হলো না। আমি তাঁর কবর যিয়ারত করার জন্য তাঁর নিকট অনুমতি চাইলে আমাকে অনুমতি দেয়া হলো। অতএব তোমরা কবর যিয়ারত কর। কেননা কবর যিয়ারত তোমাদেরকে মৃত্যুর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। (২১৩০-২১৩১ নং হাদিস দু’টির বক্তব্য প্রায় একই)
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর চাচা আবু তালিবের মাগফিরাতের জন্য দু’আ করতে থকাকালীন আল্লাহ্ ফরমান- “নাবী ও ঈমানদারদের জন্য এটা সংগত নয় যে, তারা র্শিককারীদের জন্য মাগফিরাতের দোয়া করবে, এমনকি যদি তারা তাদের ঘনিষ্ট আত্মীয়-স্বজনও হয়, যখন একথা সুস্পষ্ট হয়ে গেছে যে, তারা জাহান্নামেরই উপযুক্ত।” (সূরা আত তাওবা ৯:১১৩)
যেখানে সৃষ্টির সেরা মানুষের মাঝে সেরা, সকল নাবী ও রাসূলদের নেতা হয়েও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজ মাতা ও চাচা আবু তালিবের ঈমানের জিম্মাদার হতে পারেননি, তাঁদের মাগফিরাতের জন্য দু’আ করা ও ক্ষমা প্রার্থনা করার অনুমতি পাননি; সেক্ষেত্রে তাঁর উম্মতের কতটুকু অনুমতি আছে তা কি আমরা অনুধাবণ করছি কেউ?
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মহান রব্ব আল্লাহ’র দাসত্ব ও আনুগত্যের জন্য কত বড় ত্যাগ স্বীকার করেছেন তার এক অনন্য উজ্জল দৃষ্টান্ত এ হাদিস দু’টি। মহান আল্লাহ্ বলেছেন, তাঁদের মাগফিরাতের জন্য দু’আ ও ক্ষমা প্রার্থনা করতে পারবেন না, ব্যাস তিনি দু’আ করেন নি। বিনা প্রশ্নে, বিনা যুক্তিতে আল্লাহ্’র আদেশ মেনে নিয়েছেন। আল্লাহু আক্বার। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এই সুন্নাহ্’ই হচ্ছে মু’মিনদের জন্য অনুসরণীয় আদর্শ। আর এই সুন্নাহ্ অনুসরণকারী মু’মিনদের সম্পর্কেই ইরশাদ হয়েছে:
“মু’মিনদের বক্তব্য কেবল এ কথাই, যখন তাদের মধ্যে ফয়সালা করার জন্যে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের দিকে তাদেরকে আহবান করা হয়, তখন তারা বলে: আমরা শুনলাম এবং মেনে নিলাম। আর এ ধরনের লোকেরাই সফলকাম। আর সফলকাম তারাই যারা আল্লাহ্ ও রাসূলের হুকুম মেনে চলে এবং আল্লাহ্কে ভয় করে এবং তাঁর নাফরমানী করা থেকে দূরে থাকে ৷” (সূরা আন নূর ২৪:৫১-৫২)
মূলতঃ কোন ব্যক্তির জন্য ক্ষমার আবেদন জানানোর অনিবার্য অর্থ হচ্ছে- আমরা তার প্রতি সহানুভূমিশীল এবং তাকে ভালবাসি। আমরা তার অপরাধকে মাগফিরাতযোগ্য মনে করি। যারা ঈমানদারদের অন্তর্ভুক্ত, কোনরূপ শির্কে লিপ্ত হয়নি এবং শুধুমাত্র আমলী গোনাহগার তাদের ক্ষেত্রে এ দু’টি কথাই ঠিক । কিন্তু যে ব্যক্তি কথা কিংবা কর্ম দ্বারা প্রকাশ্যে শির্ক করেছে তার প্রতি সহানুভুতিশীল হওয়া, তাকে ভালবাসা এবং তার এ মহা-অপরাধকে ক্ষমাযোগ্য মনে করা যে শুধু নীতিগতভাবে ভুল তাই নয় বরং এর ফলে আমাদের নিজেদের ঈমানও সন্দেহযুক্ত হয়ে পড়ে। আর যদি শুধুমাত্র আমাদের আত্মীয়-স্বজন বলে আমরা তাকে মাফ করে দিতে চাই তাহলে এর অর্থ দাঁড়ায়, আমাদের কাছে আত্মীয়তার সম্পর্ক আল্লাহ্’র প্রতি ঈমানের দাবীর তুলনায় অনেক বেশী মূল্যবান এবং আল্লাহ ও তাঁর দ্বীনের প্রতি আমাদের ভালবাসা শির্ক মুক্ত, নির্ভেজাল ও শর্তহীন নয়। এছাড়াও আল্লাহ্’র সাথে শির্ককারী বিদ্রোহীদের সাথে আমরা যে মায়া-মহব্বতের সম্পর্ক জুড়ে রেখেছি তার ফলে আমরা চাচ্ছি, আল্লাহ নিজেও যেন এ সম্পর্ক গ্রহণ করেন এবং আমাদের এ আত্মীয়কে অবশ্যই ক্ষমা করে দেন, যদিও এ একই অপরাধ করার কারণে অন্যান্য অপরাধীদেরকে তিনি জাহান্নামের শাস্তি দিয়ে থাকেন। বস্তুত এ সমস্ত চিন্তা-চেতনা একনিষ্ঠ ঈমানদারের জন্য শোভনীয় নয় কেননা এক্ষেত্রে ঈমানের দাবী ছিলো- আল্লাহ্ ও তাঁর দ্বীনের প্রতি আমাদের ভালবাসা হবে শির্ক মুক্ত, নির্ভেজাল হবে, আল্লাহ্’র বন্ধু হবে আমাদের বন্ধু এবং তাঁর শত্রু হবে আমাদের শত্রু। এখানে আরো এতটুকু বুঝে নিতে হবে যে, আল্লাহদ্রোহী শির্ককারীদের প্রতি যে সহানুভূতি নিষিদ্ধ করা হয়েছে তা কেবলমাত্র এমন পর্যায়ের সহানুভূতি যা দ্বীনের ব্যাপারে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়। অন্যদিকে মানবিক সহানুভূতি এবং পার্থিব সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে আত্মীয়তা ও রক্ত সম্পর্ক এবং স্নেহ-সম্প্রীতিপূর্ণ ব্যবহার এসব নিষিদ্ধ নয় বরং প্রশংসনীয়। আত্মীয় কাফির হোক বা মু’মিন, তার সামাজিক অধিকার অবশ্যই প্রদান করতে হবে। বিপদগ্রস্ত মানুষকে সকল অবস্থায় সাহায্য দিতে হবে। অভাবীকে যে কোন সময় সহায়তা দান করতে হবে। রুগ্নের সেবা ও অসহায়ের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শনের ব্যাপারে কোন ত্রুটি দেখানো যাবে না। ইয়াতীমের মাথায় অবশ্যি স্নেহের হাত বুলাতে হবে। এসব ব্যাপারে তারা আল্লাহ্’র সৃষ্টি এ কথা বিবেচনায় রেখে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে।
বান্দাহর হৃদয়ে যখন তাওহীদ পূর্ণতা লাভ করে তখন আল্লাহ্ তা’য়ালা বান্দাহর অন্তরে ঈমানের প্রতি ভালোবাসা দান করেন এবং তার অন্তরে তাওহীদকে সুসজ্জিত করেন। শির্ক, কুফর ও নাফরমানিকে তার জন্য ঘৃণার বস্তু বানিয়ে দেন। সাথে সাথে তাকে হিদায়াত প্রাপ্ত লোকদের অন্তর্ভুক্ত করেন।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s