হযরত সায়ীদ বিন আমের আল জুমাহী (রাযিআল্লাহু আনহু)

হযরত সায়ীদ বিন আমের আল জুমাহী (রাযিআল্লাহু আনহু) : অভাব-অনটনের মাধ্যমে জীবন যাপন করাকে প্রাধান্য দেওয়ার বিরল দৃষ্টান্ত।

১ম ঘটনা: হযরত উমর (রাযিআল্লাহু আনহু) এর খেলাফত কালে তিনি (উমর) হযরত যয়ীদ  বিন আমের আল জুমাহী (রাযিআল্লাহু আনহু) কে হিমসের গভর্নর করে পাঠালেন। কিছুদিন পর হিমসের একটি প্রতিনিধি দল ওমর (রাযিআল্লাহু আনহু) এর সাথে সাক্ষাৎ করে অভাবী লোকদের একটি তালিকা দিলেন। সেই তালিকায় সায়ীদ বিন আমের নাম দেখে ওমর (রাযিআল্লাহু আনহু) জিজ্ঞাসা করলেন:
“কে এই সায়ীদ বিন আমের?
উত্তরে তারা বললেনঃ
“তিনি আমাদের গভর্নর।”
একথা শুনে হযরত ওমর (রাযিআল্লাহু আনহু) আশ্চার্যান্বিত হলেন এবং আবার প্রশ্ন করলেন:
“আমাদের গভর্নর কি অভাবী?”
তারা বললেনঃ “নিশ্চয়ই। আল্লাহর শপথ! আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আমাদের গভর্নরের পরিবারে দীর্ঘ সময় এমনও অতিবাহিত হয় যখন তাদের রান্না করার কিছুই থাকেনা এবং চুলায় আগুন জ্বলে না।”
এ কথা শুনে ওমর (রাযিআল্লাহু আনহু) এর চোখের পানিতে দাঁড়ি মোবারক ভিজে গেল।
তিনি সায়ীদের জন্য এক হাজার স্বর্ণমাদ্রার একটি থলি পাঠালে, সায়ীদ তা গরীবদের মাঝে বিতরন করে দিলেন।
দ্বিতীয় ঘটনাঃ কিছুদিন পর হিমসের সার্বক অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য হযরত ওমর (রাযিআল্লাহু আনহু) হিমসে গেলেন। সেখানকার জনগণ ওমর (রাযিআল্লাহু আনহু) এর নিকট ৪টি অভিযোগ দিলেন সায়ীদ (রাযিআল্লাহু আনহু) এর ব্যাপারে।
১ম অভিযোগ: “সায়ীদ (রাযিআল্লাহু আনহু) প্রত্যেহ অফিসে বিলম্বে আসে।”
এ অভিযোগের উত্তর সায়ীদ (রাযিআল্লাহু আনহু) এর কাছে ওমর (রাযিআল্লাহু আনহু) জানতে চাইলে তিনি বলেনঃ
“আমার বিলম্বে অফিসে আসার কারন হলো- আমার ঘরে কোন চাকরাণী নেই। তাই আমাকে রুটি তৈরী করে, গোসল সেরে অফিসে আসতে সামান্য দেরি হয়।”
দ্বিতীয় অভিযোগ: “রাতের বেলা কোন প্রয়োজনে গভর্নরকে ডাকলেন তিনি আমাদের ডাকে সাড়া দেন না।”
এ অভিযোগের জবাবে সায়ীদ (রাযিআল্লাহু আনহু) বললেনঃ “আমি দিনকে রাষ্ট্রীয় কার্য ও জনসাধারণের খেদমতের জন্য এবং রাতকে ইবাদাতের জন্য নির্দিষ্ট করে নিয়েছি। তাই রাত্রি বেলা কেউ আসলে তাদের ডাকে সাড়া দিতে পারি না বলে আমি দুঃখিত।
তৃতীয় অভিযোগ: “সায়ীদ (রাযিআল্লাহু আনহু) মাসে এক দিন তার কার্যালয়ে অনুপসি’ত থাকেন।”
হযরত সায়ীদ (রাযিআল্লাহু আনহু) এই অভিযোগের জবাবে বললেন: “আমীরূল মুমেনীন আমার কোন কাজের লোক না থাকায় মাসে একবার আমাকে বাজার করতে হয়। এছাড়া পড়নের এই পোশাক ছাড়া আমার আর কোন পোশাক নেই, যা ঐদিনই বাজার শেষে পরিস্কার করতে হয়। কাপড় শুকাতে দেরি হওয়ার ফলে আর অফিসে আসার সুযোগ থাকে না।”
চতুর্থ অভিযোগ: “মাঝে মাঝে সায়ীদ বেহুশ ও অজ্ঞান হয়ে যান। ফলে তার পাশের লোকদের চিনতে পারেন না।”
এর উত্তরে তিনি বলেন: মুশরিক থাকা অবস্থায় মক্কার জনসমুদ্রের মাঝে হযরত খুবাইব (রাযিআল্লাহু আনহু) কে মক্কায় কাফিররা টুকরো টুকরো করছিল এবং বলছিল- হে খুবাইব তুমি কি রাজী আছ ? তোমাকে ছেড়ে মুহাম্মদ (সা:) কে হত্যা করি। তার সেই শাহাদাতের নির্মম দৃশ্য মনে পড়লে আমি বেহুশ হয়ে যাই। আর কাউকে চিনতে পারি না।
হযরত আব্বাস (রাযিআল্লাহু আনহু) ঘটনাটি বর্ণনা করলেন এভাবেঃ আমি একদিন মসজিদে নববীতে বসে ছিলাম। আরো বহুলোক ফারুকে আযমের কাছে বসা ছিল। তখন এক যুবতী এসে আমীরুল মুমিনীনকে সালাম দিল। তিনি সালামের জবাব দিয়ে জানতে চাইলেন তোমার কিছু বলার আছে? সে বলল হ্যাঁ আমার পেটে জন্ম নেয়া এ বাচ্চাটি আপনার। তিনি বললেন আমি তো তোমাকে চিনিই না। যুবতীটি কেঁদে ফেলে বললো সন্তানটি আপনার নয়, আপনার ছেলের। তিনি জানতে চাইলেন ,হালাল পথে না হারাম পথে? সে বললো , আমার দিক হালাল কিন্তু তার দিক থেকে হারাম ছিল। উমার (রাযিআল্লাহু আনহু) ঘটনাটি পরিষ্কার করে বলতে বললেন। সে বললোঃ বেশ কিছু দিন আগে আমি একদিন বনী নাজ্জারের এক বাগানের কাছ দিয়ে যাচ্ছিলাম। তখন আপনার ছেলে আবু শামা মদ্যপ অবস্থায় আমার কাছে এসে তার কামনা চরিতার্থ করার প্রস্তাব দিল এবং আমাকে জোর করে বাগানের দিকে টেনে নিয়ে বাসনা চরিতার্থ করলো। আমি বেহুশ হয়ে পড়েছিলাম। আমি এ ঘটনাটি গোপন রেখেছিলাম। এক সময় আমি পেটে বাচ্চার অস্তিত্ত্ব টের পেলাম। ফলে আমি অন্যত্র চলে গেলাম। সেখানে আমার এ শিশু জন্ম নিয়েছে। আপনি আমার ও তার ব্যাপারে আল্লাহর নির্দেশিত বিধান প্রয়োগ করুন। খলিফা উমর (রাযিআল্লাহু আনহু) সাথে সাথে ঘোষককে লোক জমায়েত হওয়ার ঘোষনা দিতে বললেন। মসজিদে লোক সমবেত হল। তিনি বললেন আপনারা কেউ কোথাও যাবেন না,আমি এখনি আসছি। তারপর তিনি আমাকে বললেন আপনি আমার সাথে আসুন। সেখান থেকে তিনি ঘরে এসে হেঁকে বললেন , আবু শাহমা কি ঘরে আছে? জবাবে বলা হল সে আহার করতে বসেছে। তিনি ভেতরে প্রবেশ করে বললেন হে ,আমার সন্তান! আহার সেরে নাও, এটাই হয়তো তোমার শেষ আহার। আব্বাস (রাযিআল্লাহু আনহু) বলেন , আমি দেখতে পেলাম যে, সাথে সাথে ছেলের চেহারা বিবর্ণ হয়ে গেল এবং কাঁদতে কাঁদতে হাতের লোকমা  পড়ে গেল। তিনি বললেন হে আমার সন-ান! বলতো আমি কে? সে বললো আপনি আমার পিতা ও আমিরুল মুমিনীন। তিনি বললেন আমার কি তোমার আনুগত্য লাভের অধিকার আছে? সে বললো হ্যা দুভাবে আপনি আনুগত্য লাভের অধিকারী। পিতা ও আমিরুল মুমিনীন হিসাবে। তখন তিনি বললেন তোমার নবী ও তোমার পিতার দাবির প্রেক্ষিতে বল , তুমি কি ইহুদিদের পাল্লায় পড়ে মদ পান করেছিলে? সে বললো হ্যা তবে আমি তওবা করেছি। তিনি বললেন আমার প্রিয় সন্তান! তুমি কি বনী নাজ্জারের বাগানে গিয়েছিলে এবং সেখানে এক যুবতীর সাথে পাপাচারে লিপ্ত  হয়েছিলে? এ প্রশ্ন শুনে আবু শাহমা চুপ হয়ে গেল ও কাঁদতে লাগল। তিনি বললেনঃ বেটা লজ্জার কিছু নেই, সত্য বল। আল্লাহ সত্যবাদীকে ভালোবাসেন। সে বললো, হ্যা তবে আমার দ্বারা তা হয়েছে। তবে আমি সেজন্য অনুতপ্ত হয়ে তওবা করেছি। হযরত ফারুকে আযম সাথেসাথে তাকে গ্রেপ্তার করলেন এবং তার জামা ধরে টেনে মসজিদে নিয়ে গেলেন। আবু শাহমা তখন কেঁদে কেঁদে বলছিল, হে আমার পিতা! তরবারী দিয়ে আমাকে কেটে টুকরা টুকরা করে ফেলুন, মানুষের সামনে নিয়ে আমাকে লজ্জা দিবেননা। উমার (রাযিআল্লাহু আনহু) তখন বলেন তুমি  কি এ আয়াত পড়নি: “আর তাদের দুজনের এ দন্ড দানের সময় মুমিনদের একদল লোক উপসি’ত থেকে তা প্রত্যক্ষ করবে”।
অতঃপর উমার (রাযিআল্লাহু আনহু) তাকে টেনে নিয়ে আসহাবে রাসুলের সামনে হাজির করলেন এবং  বললেন যুবতীটি সত্য বলেছে এবং আবু শাহমা তা স্বীকার করেছে। তারপর তিনি তার দাস আফলাহকে বললেন একে শক্ত হাতে ধর এবং দোররা মার। একাজে বিন্দুমাত্র শৈথিল্য দেখাবেনা। আফলাহ কাঁদতে কাঁদতে বললো একাজ আমি করতে পারবো না। তিনি বললেন আফলা!আমার আনুগত্য মানে রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর আনুগত্য। তাই আমি যা নির্দেশ দেই তাই কর। ইবনে আব্বাস বললেন , তিনি আবু শাহমাকে দিয়ে তার জামা খোলালেন। তা দেখে সবাই জোরে জোরে কান্না জুড়ে দিল। আবু শাহমা সকাতরে বললো হে আমার পিতা !আমার প্রতি দয়া করুন। উমারও কান্না জড়িত কন্ঠে বললেন তোমার রব তোমার প্রতি দয়া করবেন। আমি তোমাকে এজন্য দন্ড দিচ্ছি যেন আমাদের পরয়ারদিগার তোমার ও আমার উভয়ের উপর দয়া করেন। তারপর তিনি আফলাহকে দোররা মারার নির্দেশ দিলেন। সে মারা শুরু করলো। আবু শাহমা করুণ স্বরে কাতরাতে লাগলেন। আফলাহ যখন সত্তর দোররায় পৌছলেন তখন আবু শাহমা বললেন ঃহে আমার পিতা ! মাকে এক ঢোক পানি পান করান। তিনি বললেন হে আমার পুত্র! যদি আমার রব তোমাকে কবুল করেন তাহলে মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তোমাকে হাওজে কাওসারের পানি পান করাবেন। তারপর আর কখনো তোমার পানির পিপাসা লাগাবনা। তারপর  তিনি আফলাকে লক্ষ্য করে নির্দেশ দিলেন মারতে থাক। যখন আশি দোররায় পৌছল তখন আবু শাহমা বললেন হে আমার পিতা !আসসালামুয়ালায়কা। উমার (রাযিআল্লাহু আনহু) বললেন ওয়ালাইকাস সালাম। যদি তোমার সাথে মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর দেখা হয় তাহলে তাকে আমার সালাম পৌছিয়ে বলবে,আমি তাকে কোরআন পড়তে তার উপর আমল করতে এবং তার দন্ডবিধি বাস-বায়ন করতে দেখে এসেছি। তারপর বললেন আফলাহ মারতে থাক। যখন নব্বই দোরার মারা হল তখন আবু শাহমা নিশ্চুপ ও নিস্তেজ হয়ে গেল। ইবনে আব্বাস (রাযিআল্লাহু আনহু) বলেন: রাসুলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাহাবীগণ বললেন ,যে কয় দোররা বাকি রয়েছে তা পরে মারুন। উমার (রাযিআল্লাহু আনহু)বললেন পাপের কাজে যখন দেরি করা হয়নি তখন দন্ডদানে দেরি করা হবে কেন? আফলাকে তিনি দোররা মারতে বললেন। শেষ দোররাটি যখন মারা হল তখন আবু শাহমা চিৎকার করে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো। ফারুকে আযম তখন তার মাথাটি নিজের কোলে তুলে নিয়ে কেঁদে কেঁদে বললেন: সত্যের জন্য তোর মুত্যু হল। তুই শেষ দন্ডটিও নিয়ে মরেছিস। তোর বন্ধু বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন এমনকি তোর বাপও তোকে বাচাতে পারলোনা।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s