র্শিক

র্শিক শব্দের আভিধানিক অর্থ- অংশীদারিত্ব, অংশীবাদ, সংমিশ্রণ, মিলানো, সমকক্ষ করা, অংশী স্থির করা, সমান করা, ভাগাভাগি, সম্পৃক্ত করা প্রভৃতি। ইংরেজীতে Poytheism (একাধিক উপাস্যে বিশ্বাস), Sharer, Partner, Associate।
তাওহীদের বিপরীত সকল কর্মই র্শিক। শরীয়াহ্’র পরিভাষায় র্শিক হলো আল্লাহ্ পাকের নাম, সত্তা, গুণাবলী, ক্ষমতা ও অধিকারে গায়রুল্লাহ্ (আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য যে কোন সৃষ্ট বস্তু) কে অংশীদার সাব্যস্ত করা বা এসবে গায়রুল্লাহ্’র অংশ আছে মনে করা।
আল্লাহ্’র সাথে অংশীদার স্থাপন ক্ষমার অযোগ্য সবচেয়ে ঘৃণ্য অপরাধ। তাওহীদের বিপরীতে শিরকের উপমা হচ্ছে: আলো আর অন্ধকার, দৃষ্টিহীন আর দৃষ্টিমান, পবিত্র আর অপবিত্র, রহমত আর লানত, জান্নাত আর জাহান্নাম। র্শিক এমন এক বিকলত্ব যার কথা বলার শক্তি পর্যন্ত রহিত। আল্লাহ্ বান্দাহ্’র সব ধরনের গুনাহ ইচ্ছা হলে মাফ করে দিতে পারেন, কিন্তু তওবা ছাড়া র্শিক নিয়ে মৃত্যু বরণ করলে সে গুনাহ কোনক্রমেই ক্ষমা করবেন না। এমন ব্যক্তির অপরাধ শুধু ক্ষমার অযোগ্যই নয়, তার কোন প্রকার আমল-ই আল্লাহ্’র নিকট গ্রহনযোগ্য হবে না। এ কারণেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মাহ্’র উদ্দেশ্যে কঠোরভাবে হুশিয়ারী উচ্চারণ করে বলেছেন, “আল্লাহ্’র সাথে কাউকে শরীক করবে না, যদিও এজন্য তোমাকে হত্যা করে ফেলা হয় অথবা আগুনে পুড়িয়ে ভষ্মিভূত করে ফেলা হয়।” [মিশকাত:বাবুল কাবায়ের, মু’য়ায বিন জাবাল (রাযিআল্লাহু আনহু বর্ণিত)]
এ প্রসঙ্গে কুরআনুল কারীমে ইরশাদ হয়েছে-
“স্মরণ করো যখন লুকমান নিজের ছেলেকে উপদেশ দিচ্ছিল, সে বললো, ‘হে পুত্র! আল্লাহ্’র সাথে কাউকে শরীক করো না। নিশ্চয়ই র্শিক হচ্ছে সবচেয়ে বড় জুলুম’।” (সূরা লুকমান ৩১:১৩)
“আসলে তো নিরাপত্তা ও নিশ্চিন্ততা তাদেরই জন্য এবং সত্য-সরল পথে তারাই পরিচালিত যারা ঈমান এনেছে এবং যারা নিজেদের ঈমানকে জুলুম (র্শিক) এর সাথে মিশ্রিত করেনি।” (সূরা আন’আম ৬:৮২)
র্শিকমুক্ত বান্দাহকে আল্লাহ্ সবচেয়ে বেশী মুহাব্বাত করেন। যার নমুনা আমরা দেখতে পাই মহান আল্লাহ্’র তাওহীদের পতাকাবাহী সর্বশেষ নাবী ও রাসূল হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণীতে। বিখ্যাত সাহাবী আবু যার (রাযিআল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেছেন, ‘আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে এ কথা বলতে শুনেছি, “মহামহিম আল্লাহ্ তা’য়ালা বলেছেন, “যে ব্যক্তি আমার দিকে হেঁটে আসে আমি তার দিকে দৌড়ে অগ্রসর হই। আর যে ব্যক্তি দুনিয়া ভর্তি গুনাহ নিয়ে আমার কাছে হাজির হয়, অথচ আমার সাথে কাউকে শরীক স্থির করে নি, তাহলে আমি অনুরূপ দুনিয়া পরিমাণ মাগফিরাত নিয়ে তার দিকে এগিয়ে আসি”। (সহীহ মুসলিম হা/৬৬৪১, বা.ই.সে)
কর্ম ও আচরনের ভিত্তিতে র্শিক বিভিন্ন ধরনের হতে পারে। এর মধ্যে র্শিকে আকবার বা বড় র্শিক (যা সরাসরি তাওহীদের পরিপন্থী) হচ্ছে আল্লাহ পাকের ক্ষমতা, অধিকার ও কার্যাবলীতে র্শিক। কার্যক্ষেত্রে আল্লাহ্’র সার্বভৌম ক্ষমতায়, আইন প্রণয়নে, ইবাদাতে কাউকে তাঁর সমকক্ষ নির্ধারণ করে নেয়া, অতঃপর আল্লাহ্’র মতই গায়রুল্লাহ্র দাসত্ব, আইনের আনুগত্য ও উপাসনা করা এসবই র্শিকে আকবার। তবে র্শিকে আকবার এর মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক র্শিক হচ্ছে আল্লাহ্’র সার্বভৌমত্বে অংশীদার সাব্যস্তের মাধ্যমে তাঁর রুবুবিয়্যাতে র্শিক অর্থাৎ হুকুম ও বিধান প্রবর্তনের ক্ষেত্রে আল্লাহ্’র পরিবর্তে গায়রুল্লাহ্কে অধিকার দেয়া বা হিস্যাদার মনে করা। অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় র্শিক হচ্ছে র্শিকে আকবারের মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক, মানুষ হয়ে মানুষের স্বার্বভৌমত্ব মেনে নেয়া ও মানব রচিত মনগড়া হুকুম ও বিধান দ্বারা রাষ্ট্র পরিচালনা হচ্ছে সবচেয়ে বড় জুলুম। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ ফরমান-
“তাঁকে বাদ দিয়ে তোমরা যাদের উপাসনা করছো তারা শুধুমাত্র কতকগুলো নাম ছাড়া আর কিছুই নয়, যে নামগুলো তোমরা ও তোমাদের বাপ-দাদারা রেখেছো, আল্লাহ্ এগুলোর পক্ষে কোন দলিল-প্রমাণ পাঠাননি। আইন-বিধান জারি করার অধিকার একমাত্র আল্লাহ্’রই। তোমরা তাঁকে ছাড়া আর কারো গোলামী করবে না। এটিই সরল সঠিক জীবনবিধান; কিন্তু অধিকাংশ মানুষই তা জানে না।” (সূরা ইউসূফ ১২:৪০)
অর্থাৎ আল্লাহ্’র যমীনে মূর্তি পূজা, মাজার পূজা যেমন র্শিক, তেমন আল্লাহ্দ্রোহী শক্তির আইন-বিধান প্রনয়ণের অধিকার ও তা মান্য করাও র্শিক। তবে এটা ঠিক যে, একশ্রেণীর পোষা আলিম আছেন যারা র্শিক-বিদ’আত বলতে মাজার-কবর-তাবিজের বাইরে কিছু দেখতে পান না। তবে যারা মূর্তি পূজা, কবর-মাজার পূজা করাকে র্শিকে আকবর বলে অভিহিত করে থাকেন, অথচ আল্লাহ্দ্রোহী শক্তির আইন-বিধান প্রনয়ণের অধিকার ও তা মান্য করাকে র্শিক বলে আখ্যায়িত করেন না এবং মূর্তি পূজারী, মাজার পূজারীকে মুশরিক মনে করেন, কিন্তু তাগুতী শক্তি তথা মানব রচিত আইনের প্রণেতা, রক্ষক ও অনুসারীদের র্শিককারী-মুশরিক মনে করেন না, তারা প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ্’র কিতাব কুরআনের প্রকৃত জ্ঞান লাভ করতে পারেননি। ফলে তারা ইসলামকেও পরিপূর্ণরূপে গ্রহণ করেননি। মূর্তি পূজা, মাজার পূজা নিঃসন্দেহে র্শিক; কিন্তু এ কথাতো চিরন্তন সত্য যে, মানুষের তৈরী মূর্তি বা কবর-মাজারের মৃত ব্যক্তি তাদের পূজা-উপাসনা করার জন্য কাউকে বাধ্য করে না, করতে পারে না, সে কোন আইন প্রণয়ন করে না, করার ক্ষমতাও রাখে না, কোন হুকুম-বিধানও দেয় না বা দেয়ার ক্ষমতা রাখে না বরং ব্যক্তি বা গোষ্ঠী তার নিজের ইচ্ছায় মুর্তি বা কবর-মাজারে পূজা-উপাসনার মাধ্যমে র্শিকে লিপ্ত হয়। অপরদিকে তাগুতী শক্তি তথা মানব রচিত আইনের প্রণেতা, রক্ষক ও অনুসারীরা মানুষের সার্বভৌমত্বের নামে আল্লাহ্’র বিধানের বিপরীতে নিজেরাই আইন-বিধান প্রণয়ন করে তার আনুগত্য করার মাধ্যমে র্শিকে লিপ্ত হচ্ছে এবং জাতির মানুষকে সেই র্শিক-কুফরীতে লিপ্ত হতে বাধ্য করছে। অর্থাৎ রাষ্ট্র পরিচালনায় যদি আল্লাহ্’র সার্বভৌমত্ব, হুকুম ও বিধান চালু থাকতো তবে রাষ্ট্র অনুমোদন না দিলে মানুষ ইচ্ছা করলেই মূর্তি পূজায় লিপ্ত হতে পারতো না, কবর কে মাজার বানিয়ে গায়রুল্লাহ্’র নিকট মাথা নত করতে পারতো না। মোটকথা রাষ্ট্রীয় অনুমোদন ব্যতিরেখে প্রকাশ্যে কেউ গায়রুল্লাহ্’র উপাসনা করতে সাহস পেতো না।
আল্লাহ্ কে যেরূপ ভালবাসা উচিত, ভয় করা উচিত, তাঁর উপর যেরূপ তাওয়াক্কুল করা উচিত গায়রুল্লাহ্ কে সেরূপ ভালোবাসা, ভয় করা ও তাওয়াক্কুল করা র্শিক। যেমন গায়রুল্লাহ্ কর্তৃক নির্যাতিত হবার ভয়, আক্রান্ত হবার ভয়, রিযিক বন্ধ হবার ভয়, জান-মালের ক্ষতি হবার ভয় প্রভৃতি। (তবে মৃত্যুর ভয়, আখিরাতে হিসাব-নিকাশের ভয়, চোর ডাকাতের ভয়, হিংস্র জন্তু-জানোয়ারের ভয় র্শিক নয়)। আল্লাহ্ তা’আলা ফরমান-
“তোমরা তাদেরকে ভয় করো না বরং আমাকে ভয় করো, যাতে করে আমি তোমাদের ওপর আমার নি’য়ামত পূর্ণ করে দিতে পারি এবং এই আশায় যে, আমার এই নির্দেশের আনুগত্যের ফলে তোমরা সঠিক সাফল্যের পথের সন্ধান লাভ করতে পারো।” (সূরা আল রাকারাহ ২:১৫০)
“আর তোমরা আল্লাহ্’র উপরই ভরসা (তাওয়াক্কুল) করো, যদি তোমরা (সত্যিকার অর্থে) মু’মিন হয়ে থাকো।” (সূরা মায়িদাহ ৫:২৩)
র্শিকের মধ্যে এমন কিছু ছোট র্শিক আছে যা তাওহীদের পূর্ণতার পরিপন্থী। এগুলো একসময় মানুষকে বড় শির্কের দিকে নিয়ে যায়। যেমন আল্লাহ্ ছাড়া অন্যের নামে শপথ করা। কোন আমলের কাঠামো ও মুখের কথায় গায়রুল্লাহ্ কে আল্লাহ্’র সমকক্ষ সাব্যস্ত করা অথবা কথায় ও কাজে আল্লাহ্’র পাশাপাশি গায়রুল্লাহ্ কে তুষ্ট রাখার চেষ্টা করা। যেমন: লৌকিকতা, দুনিয়ার মানুষ থেকে সুনাম ও যশ লাভের আশা, দুনিয়া লাভের উদ্দেশ্যে আমল করা, গায়েব জানে মনে করে পীর-ফকিরের দরবারে যাওয়া, সামর্থ থাকা সত্ত্বেও বুজুর্গী প্রকাশের উদ্দেশ্যে মানুষ আল্লাহ্ ওয়ালা বলবে এই আকাঙ্খায় তালিযুক্ত, ছেঁড়া-ফাড়া পোশাক পরিধান করা, হাতে তাসবীহ নিয়ে ঘোরা প্রভৃতি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “যে কুলক্ষণ গ্রহণ করলো, সে র্শিক করলো।” তিনি আরও বলেন, “যে গণকের কাছে গিয়ে তার কথায় বিশ্বাস করলো সে মুহাম্মাদের উপর যা অবতীর্ণ হযেছে তার সাথে কুফরী করলো।” (মুসনাদে আহমাদ, মুসলিম)
সাহাবী মাহমুদ বিন লবীদ (রাযিআল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: “আমি তোমাদের উপর সব চেয়ে বেশী ভয় পাই ছোট শির্কের। সাহাবারা জিজ্ঞাসা করলেন- হে আল্লাহ্’র রাসূল! ছোট শির্ক কি? তিনি বললেন: তা হল রিয়া বা লোক দেখানো কাজ।” (মুসনাদে আহমাদ)
আবার এমন কিছু র্শিক আছে যা ইচ্ছা, সংকল্প ও নিয়্যাতের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। যেমন লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে ও প্রসিদ্ধি অর্জনের জন্য কোন আমল করা। অর্থাৎ আল্লাহ্’র নৈকট্য অর্জন করা যায় এমন কোন কাজ করে তা দ্বারা মানুষের প্রশংসা লাভের ইচ্ছা করা। যেমন সুন্দর ভাবে নামায আদায় করা, কিংবা সদকা করা এ উদ্দেশ্যে যে, মানুষ তার প্রশংসা করবে, অথবা সশব্দে যিকির-আযকার পড়া ও সুকণ্ঠে তেলাওয়াত করা যাতে তা শুনে লোকজন তার গুণগান করে। যদি কোন আমলে রিয়া তথা লোক দেখানোর উদ্দেশ্য সংমিশ্রিত থাকে, তাহলে আল্লাহ্ তা বাতিল করে দেন। ইহা কখনো ছোট, আবার কখনো বড় র্শিকে পরিনত হয়। হযরত জাবির (রাযিআল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বের হলেন, অতঃপর বললেন: “হে লোকসকল! তোমরা নিজেদেরকে গোপন র্শিক থেকে রক্ষা করো, তারা জিজ্ঞাসা করলো- হে আল্লাহ্’র রাসূল! গোপন র্শিক কি? তিনি বললেন- কোনে ব্যক্তি সালাত আদায় করার জন্য দাড়ালো, অতঃপর সালাতকে সুন্দর করে আদায় করলো, কেননা সে দেখেছে মানুষ তার প্রতি লক্ষ্য করছে। এটাই হলো গোপন শিরক।” (সুনানে বাইহাকী)
আবু হুরায়রা (রাযিআল্লাহু আনহু) বর্ণনা করেন, তিনি রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কে বলতে শুনেছেন: “কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম এমন এক ব্যক্তির ব্যপারে ফয়সালা হবে যে শহীদ হয়েছিল। তাকে আনা হবে এবং তাকে যেসব সুযোগ সুবিধা দেওয়া হয়েছিল তা পেশ করা হবে। সে তা চিনতে পারবে। আল্লাহ তা’য়ালা তাকে জিজ্ঞেস করবেন,“আমি যে সমস্ত নিয়ামত তোমাকে দিয়েছিলাম, তার বিনিময়ে তুমি কি কাজ করেছ?” সে বলবে, আমি আপনার পথে লড়াই করে শহীদ হয়েছি। তিনি বলবেন, তুমি মিথ্যা বলছ। বরং তুমি এজন্য লড়াই করেছ যে, লোকেরা তোমাকে বীর বাহাদুর বলবে! আর তা বলাও হয়েছে। অতঃপর তার সম্বন্ধে নির্দেশ দেওয়া হবে এবং তাকে উপুড় করে টেনে নিয়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। অতঃপর আরেক ব্যক্তিকে নিয়ে আসা হবে, সে ইলম অর্জন করেছে, তা লোকদের শিক্ষা দিয়েছে আর কুরআন পাঠ করেছে। তাকে উপস্থিত করা হবে এবং তাকে দেওয়া সুযোগ সুবিধা গুলোও তার সামনে তুলে ধরা হবে। সে তা দেখে চিনতে পারবে। তুমি তোমার নিয়ামতের কি সদ্ব্যাবহার করেছ? সে বলবে আমি ইলম অর্জন করেছি, লোকদের তা শিক্ষা দিয়েছি এবং আপনার সন্তুষ্টির জন্য কুরআন পাঠ করেছি। আল্লাহ্ বলবেন, তুমি মিথ্যা কথা বলছ। বরং তুমি এই উদ্দেশ্যে বিদ্যা অর্জন করেছিলে যে, লোকেরা তোমাকে আলেম বা বিদ্বান বলবে, এবং কুরআন এই জন্য পাঠ করেছিলে যে, তোমাকে ক্বারী বলা হবে। আর তা বলাও হয়েছে। অতঃপর তার সম্বন্ধে নির্দেশ দেওয়া হবে এবং তাকে উপুড় করে টেনে নিয়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। অতঃপর আরেক ব্যক্তিকে আনা হবে, তাকে আল্লাহ্ অজস্র ধন দৌলত দান করেছেন এবং নানা প্রকারের ধন স¤পদ দিয়েছেন। তাকে দেওয়া সুযোগ সুবিধা গুলোও তার সামনে তুলে ধরা হবে। সে তা দেখে চিনতে পারবে। আল্লাহ জিজ্ঞেস করবেন, তোমার এ স¤পদ দ্বারা তুমি কি কাজ করেছ? সে বলবে, যেখানে ব্যায় করলে আপনি সন্তুষ্ট হবেন এমন কোন খাত আমি বাদ দেইনি বরং সেখানেই খরচ করেছি আপনার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে। মহান আল্লাহ বলবেন, তুমি মিথ্যা বলছ। বরং তুমি এই জন্য দান করেছ যে, লোকেরা তোমাকে দাতা বলবে। আর তা বলাও হয়েছে। অতঃপর তার সম্বন্ধে নির্দেশ দেওয়া হবে এবং তাকে উপুড় করে টেনে নিয়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।” (সহীহ মুসলিম, হা/৪৭৭১, ই.ফা.বা)
র্শিক কেন এত জঘণ্যতম, ভয়াবহ, ক্ষমার অযোগ্য মহা-অপরাধ?
উপরোল্লিখিত আলোচনা থেকে এ কথা স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, র্শিক হচ্ছে মহান রব্ব আল্লাহ্’র সাথে কাউকে অংশীদারিত্বের আকীদাহ পোষণ করা। র্শিকের মাধ্যমে আল্লাহ্’র নিরঙ্কুশ সার্বভৌমত্ব ক্ষুন্ন করা হয়। র্শিকের মাধ্যমে আল্লাহ্’র সমস্ত শান-মান কে অস্বীকার করা হয়। এ সকল কারণেই র্শিক ক্ষমার অযোগ্য জঘন্যতম অপরাধ। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-
“তারা (র্শিককারীরা) আল্লাহ্’র যথোচিত সম্মান করে না। (তাঁর অসীম ক্ষমতার অবস্থা এই যে,) কিয়ামতের দিন সমগ্র পৃথিবী থাকবে তাঁর হাতের মুঠোয় এবং আকাশমন্ডলী ভাঁজ করা থাকবে তাঁর ডান হাতে। পবিত্র মহান তিনি। তারা যাকে শরীক করে তিনি তা থেকে অনেক উর্দ্ধে।” (সূরা যূমার ৩৯:৬৭)
বিশ্ব-জাহানের মহান রব্ব, সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ্ তা’আলা যে সকল বিষয়কে নিজের জন্য খাস করেছেন যেমন হুকুম-বিধান দেয়া, হালাল-হারাম নির্ধারণ করা, কুরআন ও সুন্নাহ মোতাবেক বিচার ফয়সালা করা, তাঁর নাযিল করা আইন-সংবিধান দিয়ে সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনা করা ইত্যাদি বিষয়ে মানুষের তৈরি মনগড়া আইন-বিধান ও সংবিধান’কে মেনে নিয়ে আল্লাহ্’র সাথে শরীক করাকে তিনি সহ্য করে যাচ্ছেন, এ ধরনের খেলো, যুক্তি বিরুদ্ধ চিন্তা মুসলিম নামধারী অনেকেরই মন-মগজে বাসা বেঁধে আছে। আসলে কোনটি যুক্তিগ্রাহ্য, কোনটি অযৌক্তিক, কোনটি গ্রহণীয়, কোনটি বর্জনীয় তা স্বাভাবিক জ্ঞান-বুদ্ধি দ্বারা আমরা ঠিকই বুঝতে পারি কিন্তু নফ্সের তাড়নায় দুনিয়াবী স্বার্থান্ধতার কারণে নানারূপ টালবাহানা করি। আমাদের এ চরিত্র আল্লাহ পাক তাঁর কালামে প্রকাশ করে দিলেন এভাবে-
“বরং মানুষ নিজেই তার নিজের স¤পর্কে চক্ষুমান। যদিও সে নানারূপ ওজর-আপত্তি পেশ করে।” (সূরা ক্বিয়ামাহ ৭৫:১৪-১৫)
স্পষ্ট জেনে রাখুন, যদি কোন ব্যক্তি, কোন নেতা, পন্ডিত বা আলেমের কথায় আল্লাহ্’র হারাম করা যে কোন কিছুকে হালাল মনে করে কিংবা আল্লাহ্’র হালাল করা কোন কিছুকে হারাম মনে করে তবে যার কথাকে সে আল্লাহ’র হুকুমের উপরে স্থান দিল সে নেতা, পন্ডিত বা আলেম তার রব্ব বা সার্বভৌম আইনদাতা-বিধানদাতা’য় পরিণত হবে। (দেখুন তাফসীর সূরা তওবা ৯:৩১ এবং আদি ইবনে হাতেম রাযিআল্লাহু আনহু বর্ণিত হাদীস, সহীহ তিরমিযী)। মাআরেফুল ক্বোরআন, সংক্ষিপ্ত তাফসীর, পৃ.১২৪৪-এ উল্লেখ আছে : “যে ব্যক্তি আল্লাহ্ তা’য়ালার আনুগত্যের মোকাবেলায় অন্য কারও আনুগত্য অবলম্বন করে, তাকেই তার উপাস্য বলা হবে।” ফলাফল হিসেবে উভয় ক্ষেত্রেই আল্লাহ্’র সাথে শরীক স্থাপন করার কারণে ঐ ব্যক্তি মুশরিকে পরিণত হবে আর খালেছ তাওবা ব্যতীত মৃত্যু বরণ করলে যার পরিণতি চিরস্থায়ী জাহান্নাম।
তবে কেউ যদি বলে, অনেকেই অজ্ঞতার কারণে আল্লাহ্’র সাথে শরীক হয় এমন অনেক কাজকে র্শিক না জেনে, না বুঝে করে থাকে, এক্ষেত্রে তাদেরকে মুশরিক বলাটা বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে। আসলেই এটা বাড়াবাড়ি কি-না চলুন যুক্তি প্রয়োগ করে দেখি। আমারা সবাই জানি যে, সায়ানাইড একটি মারাত্মক বিষাক্ত পদার্থের নাম, যা খেলে মানুষ মারা যায়। এখন সায়ানাইড নামক বস্তুটি যে বিষ, এটা কেউ না যেনে যদি সেবন করে, তাহলে কি লোকটির অজ্ঞতা বিষের বিষক্রিয়া হতে তাকে রক্ষা করতে পারবে? সবাই বলবেন, এক্ষেত্রে অজ্ঞতা লোকটিকে তো রক্ষা করবেই না, বরং অজ্ঞতার কারণে প্রতিষেধক নিতে বিলম্ব হওয়ার কারণে লোকটি স্বাভাবিকের চেয়ে আরো দ্রুততম সময়ে বিষক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু বরণ করবে। সুতরাং কারো জানা বা না জানার কারণে যেমন বিষের বিষক্রিয়ার কোন তারতম্য হয় না, তদ্রূপ অজ্ঞতার কারণে কেউ আল্লাহ্’র সাথে শরীক করে বসলে, তার অজ্ঞতা তাকে ইসলাম থেকে বের হয়ে মুশরিকে পরিণত হওয়াকে ঠেকাতে পারে না।
তবে আমাদের সমাজে র্শিক কে বিভিন্ন শ্রেণীতে বিভক্ত করার মাধ্যমে তা যত হালকা করেই দেখা হোক না কেন, আল্লাহ্ পাকের নিকট ছোট হোক বা বড়, সকল ধরনের র্শিক-ই যুলুম, যুলমুন আযীম-চুড়ান্ত পর্যায়ের যুলুম, যার চেয়ে বড় যুলুম আর দুনিয়ার বুকে হতে পারে না! তাইতো কালামে পাকে এবং সহীহ হাদীস গ্রন্থে বলা হয়েছে:
“ আল্লাহ্ তাঁর সাথে র্শিক করার গুনাহ মাফ করবেন না। র্শিক ছাড়া অন্যান্য যে সব গুনাহ রয়েছে সেগুলো যাকে ইচ্ছা মাফ করে দিবেন।” (সূরা নিসা ৪:৪৮)
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাযিআল্লাহু আনহু) থেকে বর্নিত, তিনি বলেন আমি জিজ্ঞেস করলাম,“হে আল্লাহ্’র রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম), সবচেয়ে বড় পাপ কোনটি?” রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, “আল্লাহ্’র সাথে শরীক করা, অথচ আল্লাহ্ই তোমাকে সৃষ্টি করেছেন।” (সহীহ বুখারী, মুসলিম:কিতাবুল ঈমান, হা/১৬৬, বা.ই.সে)
হযরত জাবির বিন আবদুল্লাহ (রাযিআল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,“বান্দাহ্’র জন্য সর্বদাই ক্ষমা রয়েছে যতক্ষণ পর্যন্ত (আল্লাহ্ ও তাঁর বান্দাহ’র মাঝে) হিযাব বা পর্দা পতিত না হয়।” বলা হলো, “হে আল্লাহ্’র রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)! হিযাব বা পর্দা কি?” তিনি বললেন,“আল্লাহ্’র সাথে শরীক করা।” (মুসনাদে আহমদ, তাফসীর ইবনু কাছীর ১ম খন্ড ৬৭৮ পৃ.)
তবে দুনিয়ায় বেঁচে থাকা অবস্থায়, যদি কেউ র্শিক করার পর তার অপরাধের ভয়াবহতা উপলব্ধি করতে পারে, অতঃপর কৃত অপরাধের জন্য খালেছ ভাবে তওবা করে তাওহীদ গ্রহণ করে, তবে মহান রব্ব আল্লাহ্ তাঁর অনুতপ্ত বান্দাহ্ কে রহমতের ছায়াতলে অবশ্যই ঠাঁই দিবেন, এতটুকু আশা আমরা করতেই পারি!
আমাদের সমাজের অধিকাংশ মানুষ আমল সম্পর্কে যতটা সচেতন, র্শিক সম্পর্কে তার এক শতাংশও সচেতন নয়। যেমন কেউ কবিরা গুনাহ (সালাত আদায় না করা, বিশেষ করে জামাতে সালাত আদায় না করা) করলে তাকে খুবই খারাপ নজরে দ্যাখে; কিন্তু র্শিক করলে নিজস্ব অজ্ঞতার কারণে তার বিরুদ্ধে কোন সাবধান, সতর্ক ও প্রতিবাদ বাণী উচ্চারিত হয় না বললেই চলে। যেমন একজন নামাযী ব্যক্তি নামাযে প্রত্যেক তাকবীরে আল্লাহ্’র বড়ত্ব, শ্রেষ্ঠত্ব ও সার্বভৌমত্ব ঘোষণা করে, সে এটাও জানে, আইন-বিধান দানের ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহ্’র। এটা জেনেও সে নিজে আইন রচনা করল কিংবা যে সকল ব্যক্তিবর্গ নিজস্ব মনগড়া আইন রচনা করলো তাদেরকে এবং তাদের তৈরি করা আইনকে মানলো। অতঃপর মানুষের তৈরি করা আইনের কাছে বিচার ফয়সালা চাওয়া র্শিকে আকবর জেনেও তাগুতের আদালতে বিচার ফয়সালার জন্য গেলো, তবে সে মুশরিকে পরিণত হবে। এক্ষেত্রে ‘আল্লাহ্-ই আমাদের একমাত্র আইনদাতা-বিধানদাতা’ অন্তরে এ বিশ্বাস তার কাফির-মুশরিক হওয়াকে আটকাতে পারবে না। কারণ অন্তরের খবর একমাত্র আল্লাহ্ জানেন। আমরা তাকে যাচাই করবো তার মুখের ঘোষণা এবং আমলের দ্বারা। অতএব কেউ অন্তরে বিশ্বাসের দোহাই দিয়ে যদি মুখে কিংবা কাজে র্শিক ও কুফরীর পথ অবলম্বন করে তবে সে তো ইসলামের গন্ডির বাইরে চলে গেল আর এই অবস্থায় কারো মৃত্যু হলে তার মৃত্যুতো র্শিক ও কুফরীর উপরই হলো অর্থাৎ কাফির-মুশরিক অবস্থায় মৃত্যু হলো। যেমন আল্লাহ ফরমান-
“এখন টাল-বাহানা করিও না। তোমরা ঈমান গ্রহণের পর কুফরী করেছ …।” (সূরা আত-তওবা ৯:৬৬)।
“তারা আল্লাহ্’র নামে কসম খেয়ে খেয়ে বলে, আমরা ও কথা বলিনি, অথচ নিঃসন্দেহে তারা কুফরী বাক্য বলেছে এবং ইসলাম গ্রহনের পর কুফরী অবলম্বন করেছে।” (সূরা আত-তওবা ৯:৭৪)
তবে কাউকে যদি জোর করে অত্যাচার করতে করতে মৃত অবস্থায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং তখন অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে তার মুখ থেকে অন্তরের বিশ্বাসের বিপরীত কোন কুফর কথা বের হয় বা র্শিকী কাজ সংঘটিত হয় যা কিনা রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর সাহাবী আম্মার ইবনে ইয়াসীর (রাযিআল্লাহু আনহু) এর সাথে করা হয়েছিল, তবে আশা করা যায় তাকে আল্লাহ মাফ করে দিবেন। তবে এক্ষেত্রেও যারা র্শিক ও কুফরী করার চেয়ে মৃত্যুকে বেছে নেন, তবে মহান রব্বের নিকট তার তাকওয়ার মান অবশ্যই অত্যন্ত মজবুত ও উচ্চ মাকামে পৌঁছে যাবে।
র্শিকের পরিনতি যে কতটা ভয়াবহ তার প্রকৃক রূপ লেখনির ভাষা দ্বারা যথাযথভাবে প্রকাশ করা কারো পক্ষেই সম্ভব নয়। তথাপিও সংক্ষেপে বলতে গেলে বলতে হয়: যারা ঈমান ও তাওহীদ এর পরিবর্তে কুফর ও র্শিক নিয়ে মৃত্যু বরণ করবে তারা চির জাহান্নামী হবে। পক্ষান্তরে ঈমানদার ব্যক্তি যদি তাওহীদের উপর থেকে কবীরা গুনাহ করে বিনা তওবায় মৃত্যু বরণ করে, তবে আশা করা যায় মেয়াদী সাজা পেলেও সে চিরস্থায়ী জাহান্নামী হবে না। অর্থাৎ অন্তরে যদি র্শিকমুক্ত ঈমান থাকে তবে আশা করা যায়, আমলে যত ত্রুটিই থাক না কেন, আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালার মাগফিরাত একসময় তাকে জাহান্নাম থেকে সে বের করবেই। (দেখুন সহীহ মুসলিম হা/৬৬৪১, বা.ই.সে)। (অবশ্য এ সম্পর্কে আল্লাহ্ই ভালো জানেন, কারণ তিনিই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী)। র্শিক হচ্ছে দু’নিয়ায় আযাব-গযব আর মৃত্যুর পর আখিরাতে চিরস্থায়ী জাহান্নামের বাহন। এ প্রসঙ্গে হযরত জাবির (রাযিআল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত এক হাদীসে তিনি বলেন, “এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট এসে জিজ্ঞেস করলো, হে আল্লাহ্’র রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জান্নাত ও জাহান্নাম ওয়াজিবকারী বস্তু দু’টি কি কি? তিনি বললেন: যে ব্যক্তি আল্লাহ্’র সাথে কাউকে শরীক না বানিয়ে মৃত্যু বরণ করলো সে জান্নাতী। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ্’র সাথে কাউকে শরীক বানিয়ে মৃত্যু বরণ করলো সে জাহান্নামী।” (সহীহ মুসলিম:কিতাবুল ঈমান, হা/১৭৭, বা.ই.সে)
র্শিকের পরিণতি বা ফলাফল যে কতটা ভয়াবহ হতে পারে তা আমরা কুরআনের কয়েকটি আয়াতের দিকে লক্ষ্য করলেই বুঝতে পারবো ইনশাআল্লাহ্:
র্শিক ক্ষমার অযোগ্য মহাপাপ:
কালামুল্লাহয় সুস্পষ্ট ইরশাদ হয়েছে-
“ আল্লাহ্ তাঁর সাথে র্শিক করার গুনাহ মাফ করবেন না। র্শিক ছাড়া অন্যান্য যে সব গুনাহ রয়েছে সেগুলো যাকে ইচ্ছা মাফ করে দিবেন।” (সূরা নিসা ৪:৪৮)
র্শিককারীর সকল আমল আল্লাহ্ ধ্বংস করে দিবেন:
“যদি তুমি র্শিক করো, তাহলে তোমার সকল আমল বিনষ্ট হয়ে যাবে এবং তুমি হবে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভূক্ত।” (সূরা যুমার ৩৯:৬৫)
“কিন্তু যদি তারা কোন র্শিক করে, তাহলে তারা যত আমলই করুক না কেন তা ধ্বংস হয়ে যাবে।” (সূরা আনআ’ম ৬:৮৮)
র্শিককারীর জন্য জান্নাত হারাম:
“যে ব্যক্তি আল্লাহ্’র সাথে কাউকে শরীক করেছে তার ওপর আল্লাহ্ জান্নাত হারাম করে দিয়েছেন এবং তার আবাস হবে জাহান্নাম। আর এ ধরনের জালিমদের কোন সাহায্যকারী নেই।” (সূরা মায়িদাহ ৫:৭২)
র্শিককারী ধ্বংস ও বিপর্যয়ে পতিত হয়:
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা বলেন-
“একনিষ্ঠভাবে আল্লাহ’র বান্দা হয়ে যাও, তাঁর সাথে কাউকে শরীক করো না এবং যে ব্যক্তি আল্লাহ’র সাথে শরীক করে সে যেন আকাশ থেকে পড়ে গেলো। এখন হয় তাকে পাখি ছোঁ মেরে নিয়ে যাবে অথবা বাতাস তাকে এমন জায়গায় নিয়ে গিয়ে ছুঁড়ে দেবে যেখানে সে ছিন্নভিন্ন হয়ে যাবে।” (সূরা হাজ্জ ২২:৩১)
র্শিক দ্বীনকে খন্ড-বিখন্ড করে দেয়:
“তোমরা একনিষ্ঠভাবে তাঁর অভিমুখী হয়ে শুধুমাত্র তাঁকেই ভয় করো, আর সালাত কায়েম করো এবং এমন মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যেয়ো না, যারা তাদের দ্বীনে মতভেদ সৃষ্টি করেছে এবং বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে গেছে। প্রত্যেক দলই নিজ নিজ মতবাদ নিয়ে উল্লসিত হয়ে আছে।” (সূরা রুম ৩০:৩১-৩২)
র্শিককারী-মুশরিক অপবিত্র:
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা ফরমান-
“হে ঈমানদারগণ! নিশ্চয়ই র্শিককারীরা অপবিত্র।” (সূরা তাওবাহ ৯:২৮)
র্শিককারীরা সৃষ্টির অধম:
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা ফরমান-
“আহলে কিতাব ও মুশরিক কাফেররা জাহান্নামের আগুনে স্থায়ীভাবে থাকবে। তারাই সৃষ্টির অধম।” (সূরা বাইয়্যেনাহ ৯৮:৬)
র্শিকের কারণে উম্মাহ দলে-উপদলে বিভক্ত হয়ে আযাব-গযবের সম্মুখীন:
“(হে মুহাম্মাদ!) আপনি জিজ্ঞেস করুন, জল-স্থলের গভীর অন্ধকারে কে তোমাদের বিপদ থেকে উদ্ধার করে ? কার কাছে তোমরা কাতর কণ্ঠে ও গোপনে প্রার্থণা করো? কার কাছে বলে থাকো, এ বিপদ থেকে আমাদের উদ্ধার করলে আমরা অবশ্যই আপনার শোকরগুজারী করবো? বলুন, আল্লাহ্ তোমাদের এ থেকে এবং প্রতিটি দুঃখ-কষ্ট থেকে মুক্তি দেন। এরপরও তোমরা অন্যদেরকে তাঁর সাথে শরীক করো। বলুন, তিনি ওপর দিক থেকে অথবা তোমাদের পদতল থেকে তোমাদের ওপর কোন আযাব নাযিল করতে অথবা তোমাদেরকে বিভিন্ন দলে-উপদলে বিভক্ত করে এক দলকে আর এক দলের শক্তির স্বাদ গ্রহণ করিয়ে দিতে সক্ষম। দেখুন, আমি কিভাবে বারবার বিভিন্ন পদ্ধতিতে আমার নিদর্শনসমূহ তাদের সামনে পেশ করছি, হয়তো তারা এ সত্যটি অনুধাবন করবে।” (সূরা আনআ’ম ৬:৬৩-৬৫)
র্শিককারীরা আল্লাহ্ তা’য়ালার মাসজিদ রক্ষণাবেক্ষণকারী ও খাদেম হওয়ার অযোগ্য:
কালামে পাক-এ আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালা ফরমান-
“মুশরিকরা যোগ্যতা রাখে না আল্লাহ্ তা’য়ালার মাসজিদ রক্ষণাবেক্ষণকারী ও খাদেম হওয়ার, যখন তারা নিজেরাই নিজেদের কুফরীর সাক্ষ্য দিচ্ছে। এদের সমস্ত আমল বরবাদ হয়ে গেছে এবং এদেরকে চিরকাল জাহান্নামে থাকতে হবে।” (সূরা আত তাওবা ৯:১৭)
এখানে যদিও কথাগুলো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সময়কালে মুশরিকদের উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে এবং এর মাধ্যমে আল্লাহ্’র ঘর কাবা ও মসজিদে হারামের রক্ষণাবেক্ষণ ও খিদমতের ক্ষেত্রে তাদের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে তথাপিও তাৎপর্যের দিক দিয়ে এই আয়াতের হুকুম সর্বক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, অর্থাৎ এক আল্লাহ্’র উপাসনা করার জন্য যেসব মাসজিদ তৈরী করা হয়েছে সেগুলোর মুতাওয়াল্লী, রক্ষণাবেক্ষণকারী ও খাদেম এমন ধরনের লোক হতে পারে না যারা আল্লাহ পাকের নাম, সত্তা, গুণাবলী, ক্ষমতা ও অধিকারের ক্ষেত্রে গায়রুল্লাহকে শরীক করে।
র্শিককারীদের মাগফিরাতের জন্য দোয়া করা নিষিদ্ধ:
কালামে পাকের অপর এক আয়াতে আল্লাহ্ ফরমান-
“নাবী ও ঈমানদারদের জন্য এটা সংগত নয় যে, তারা র্শিককারীদের জন্য মাগফিরাতের দোয়া করবে, এমনকি যদি তারা তাদের ঘনিষ্ট আত্মীয়-স্বজনও হয়, যখন একথা সুস্পষ্ট হয়ে গেছে যে, তারা জাহান্নামেরই উপযুক্ত।” (সূরা আত তাওবা ৯:১১৩)
তবে আত্মীয় কাফির হোক বা মু’মিন, তার সামাজিক অধিকার অবশ্যই প্রদান করতে হবে। বিপদগ্রস্ত মানুষকে সকল অবস্থায় সাহায্য দিতে হবে। অভাবীকে যে কোন সময় সহায়তা দান করতে হবে। রুগ্নের সেবা ও অসহায়ের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শনের ব্যাপারে কোন ত্রুটি দেখানো যাবে না। ইয়াতীমের মাথায় অবশ্যি স্নেহের হাত বুলাতে হবে। এসব ব্যাপারে তারা আল্লাহ্’র সৃষ্টি এ কথা বিবেচনায় রেখে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে।
বান্দাহর হৃদয়ে যখন তাওহীদ পূর্ণতা লাভ করে তখন আল্লাহ তা’য়ালা বান্দাহর অন্তরে ঈমানের প্রতি ভালোবাসা দান করেন এবং তার অন্তরে তাওহীদকে সুসজ্জিত করেন। র্শিক, কুফর ও নাফরমানিকে তার জন্য ঘৃণার বস্তু বানিয়ে দেন। সাথে সাথে তাকে হিদায়াত প্রাপ্ত লোকদের অন্তর্ভুক্ত করেন। যার ভবিষ্যত গন্তব্য চিরস্থায়ী সুখের স্থান জান্নাত।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s