মানুষ কিভাবে মানুষের রব্ব হয়ে যায়?

মানুষ আবার মানুষের রব্ব হয় কী করে? আমরা তো জানি আল্লাহ্ই একমাত্র রব্ব, রাব্বুল আ’লামীন। অথচ দেখুন আল কুরআনে আল্লাহ্ রাব্বুল আ’লামীন নিজেই বলেছেন-
“তারা আল্লাহর পরিবর্তে তাদের আলেম ও দরবেশদেরকে (পীর ও নেতৃস্থানীয় ধর্মীয় ব্যক্তিবর্গকে) রব্ব হিসেবে গ্রহণ করেছে।” (সূরা তওবা ৯:৩১)অন্য আয়াতে আল্লাহ্ রাব্বুল আ’লামীন তাঁর নবীকে দাওয়াতী পদ্ধতি শিক্ষা দিতে গিয়েও বলছেন –
“(হে নবী!) বলো, হে আহলে কিতাবরা! এসো এমন একটি কথার ওপর আমরা একমত হই, যে ব্যাপারে তোমাদের ও আমাদের মাঝে কোন বিরোধ নেই। তা হলো- আমরা আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কারো বন্দেগী ও দাসত্ব করবো না। তার সাথে কাউকে শরীক করবো না। আর আমরা আল্লাহর পরিবর্তে অন্য কাউকে রব্ব হিসেবে গ্রহণ করবো না।” (সূরা আলে-ইমরান ৩:৬৪)তাহলে সরাসরি কুরআনের আয়াত থেকে আমরা জানতে পারলাম যে, মানুষ মানুষকে রব্ব বানিয়ে নেয় বা নিতে পারে।তাই আসুন আমরা জানতে চেষ্টা করি, মানুষ কিভাবে মানুষের রব্ব হয়ে যায়? কোন বৈশিষ্ট্য, গুণাবলী ও ক্ষমতা মানুষের হাতে তুলে দিলে মানুষকেই রব্বের আসনে বসিয়ে দেয়া হয়?কারণ এ সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা না থাকার ফলে এই জঘন্যতম অপরাধ যদি আমরা কেউ করে বসি, তাহলে যত নেক আমলই করি না কেন তা কোনো কাজে আসবে না এবং কোনো ইবাদতই কবুল হবে না। এ ব্যাপারে কেয়ামতের দিন কোনো ওজর-ওজুহাত-আপত্তি চলবে না, জানতাম না বলেও পার পাওয়া যাবে না। কেননা, আল্লাহ্ রাব্বুল আ’লামীন এ সম্পর্কে স্পষ্ট করে কুরআনে বলে দিয়েছেন-

“আর (হে নবী!) লোকদেরকে স্মরণ করিয়ে দাও সেই সময়ের কথা, যখন তোমার রব্ব বনী আদমের পৃষ্ঠদেশ থেকে তাদের সন্তানদের বের করলেন এবং তাদেরকেই তাদের নিজেদের ব্যাপারে সাক্ষী রেখে জিজ্ঞেস করলেন, আমি কি তোমাদের একমাত্র রব্ব নই? তারা সবাই বললো- হ্যাঁ, আমরা সাক্ষ্য দিলাম (যে আপনিই আমাদের একমাত্র রব্ব)। এই সাক্ষ্য আমি (আল্লাহ্) এ জন্যই নিলাম, হয়তো কিয়ামতের দিন তোমরা বলে বসবে যে, আমরা আসলে বিষয়টি সম্পর্কে জানতামই না। অথবা তোমরা হয়তো বলে বসবে যে, আমরা তো দেখেছি আমাদের বাপ-দাদারা পূর্বে থেকেই এই শিরকি কর্মকান্ড করে আসছে (সুতরাং আমরা তো অপরাধী না, কারণ) আমরা তো তাদের পরবর্তী বংশধর মাত্র! তারপরও কি তুমি পূর্ববর্তী ভ্রান্ত ও বাতিলপন্থীদের কৃতকর্মের দরুন আমাদেরকে শাস্তি দিবে?” (সূরা আরাফ ৭:১৭২-১৭৩)

অর্থাৎ আল্লাহ্ রাব্বুল আ’লামীন কুরআনের মাধ্যমে আমাদের জানিয়ে দিয়েছেন যে, রব্বের ব্যাপারে কোনো অজুহাত চলবে না, জানতাম না বলেও কোন লাভ হবে না। তাই আসুন আমরা কুরআনের উপস্থাপিত বাস্তব ঘটনার আলোকে বুঝতে চেষ্টা করি কিভাবে মানুষ মানুষের রব্ব হয়ে যায়। কেননা কুরআনের আলোকে বুঝতে চেষ্টা করলে আমাদের জন্য বিষয়টি নির্ভুলভাবে বোঝা অনেক সহজ হয়ে যাবে। এক্ষেত্রে একটি বিষয় আলোচনার প্রারম্ভেই জেনে রাখা প্রয়োজন যে, কুরআনে যখন কোন ব্যক্তি বা জাতির ইতিহাস তুলে ধরা হয় তখন বুঝতে হবে ইতিহাস বা গল্প শোনানোই এখানে উদ্দেশ্য নয়, বরং ব্যক্তি কিংবা জাতি কী কাজ করেছিলো এবং এর ফলে তাদের কী পরিণতি হয়েছে তা পর্যালোচনার মাধ্যমে ঐ কাজের পুনরাবৃত্তি থেকে উম্মতে মুহাম্মদীকে সতর্ক করাই মূল উদ্দেশ্য। আর একটি বিষয় মনে রাখতে হবে যে, কোরআনে যখনই কোন চরিত্রের উল্লেখ হবে, বুঝতে হবে এ ধরনের চরিত্র কেয়ামত পর্যন্ত পৃথিবীতে থাকবে।

কুরআনের আলোকে মানুষ কিভাবে মানুষের রব্ব হয়ে যায় তা খতিয়ে দেখতে গিয়ে মানব জাতির অতীত ইতিহাসেই শুধু নয় বর্তমান বিশ্বেও অসংখ্য (মিথ্যা) রব্বের পদচারণা আমরা সচরাচর দেখতে পাই। তবে তারা শুধু মুখ দিয়ে বলে না যে, আমরা তোমাদের রব্ব।

রব্ব দাবী করা বলতে মূলতঃ কী দাবী করা হয় তা যদি আমরা সত্যিই বুঝতে চাই তাহলে কিছুক্ষণের জন্য আমাদেরকে ফিরে যেতে হবে ফেরাউনের ইতিহাসের দিকে। কারণ সে যে প্রকাশ্যে নিজেকে রব্ব ঘোষণা করেছিলো তা কুরআন সুস্পষ্ট ভাষায় তুলে ধরেছে-

“দেশবাসীকে জমায়েত করে সে ভাষণ দিলো, অতঃপর সে বললো, আমিই তোমাদের সবচেয়ে বড় রব্ব।” (সূরা নাযিয়াত ৭৯: ২৩-২৪)

এখন কথা হলো, ফেরাউন নিজেকে রব্ব বলতে কী বুঝিয়েছে? সে কি দাবী করেছিলো যে, সে আসমান যমীন সৃষ্টি করেছে? সে মানুষের জন্ম-মৃত্যুর মালিক? সে বিশ্বজাহানের পালনকর্তা? সে মানব জাতিকে সৃষ্টি করেছে কিংবা পাহাড়-পর্বত যমীনের বুকে গেড়ে যমীনকে সে স্থিতিশীল করে রেখেছে? না, এমন দাবী সে কখনো করেনি। সে যদি এমন দাবী করতো তাহলে তার সংগী-সাথীরাই তাকে পাগল বলে উড়িয়ে দিতো। বরং সে নিজেও জাহান্নামের ভয়াবহ আযাব থেকে মুক্তি পেয়ে জান্নাত লাভের আশায় বিভিন্ন পূঁজা-পার্বনে অংশ নিতো। তারও অনেক ধরনের ইলাহ্, মা’বুদ বা উপাস্য ছিলো। কুরআন থেকেই এর প্রমাণ দেখে নিন-

“ফেরাউনের জাতির নেতারা (ফেরাউনকে) বললো, আপনি কি মূসা ও তার দলবলকে রাজ্যে বিপর্যয় সৃষ্টির সুযোগ দিবেন আর তারা আপনাকে ও আপনার ইলাহ্দের এভাবে বর্জন করে চলবে?” (সূরা আরাফ ৭: ১২৭)

দেখুন আয়াত সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করছে যে, ফেরাউনেরও অনেক ইলাহ্ বা উপাস্য ছিলো। তাহলে তার রব্ব দাবী বলতে আসলে কী বুঝায়? রব্ব বলে সে কী দাবী করেছিলো? ফেরাউন সহ পৃথিবীর কোন তাগুতী শক্তিই আসমান-যমীন, গ্রহ-নক্ষত্র, মানব জাতিসহ সৃষ্টি জগতের কোনো সৃষ্টির স্রষ্টা বলে নিজেকে উপস্থাপন করেনি, কোনদিন দাবী তোলেনি। মক্কার কাফির-মুশরিকরাও এসবের সৃষ্টিকর্তা যে আল্লাহ্ এটা সর্বান্তঃকরণে মানতো। যেমন আল কুরআনে বর্ণিত-

“জিজ্ঞাসা কর, এই পৃথিবী এবং এর মধ্যে যারা আছে তারা কার? তারা নিশ্চয়ই বলবে আল্লাহর। বলো, তবুও কি তোমরা শিক্ষা গ্রহণ করবে না? জিজ্ঞাসা কর, কে সপ্ত আকাশ এবং মহা আরশের অধিপতি? তারা বলবে আল্লাহ্। বলো, তবুও কি তোমরা ভয় করবে না? জিজ্ঞাসা কর, যদি তোমরা জেনে থাকো সকল কিছুর কর্তৃত্ব কার হাতে? আর কে তিনি যিনি আশ্রয় দান করেন এবং যার উপরে আশ্রয়দাতা নেই? তারা নিশ্চয়ই বলবে এ বিষয়টিতো আল্লাহর জন্যই নির্ধারিত। বলো, তবুও তোমরা বিভ্রান্ত হচ্ছো কোথা থেকে?” (সূরা মু’মিনুন ২৩:৮৪-৮৯)

‘‘তাদেরকে জিজ্ঞেস করো, কে তোমাদের আকাশ ও পৃথিবী থেকে রিযিক দেয়? কে তাদের দৃষ্টি শক্তি এবং শ্রবণ শক্তির মালিক? কে জীবিতকে মৃত আর মৃতকে জীবিত করেন? কে চালাচ্ছে এই বিশ্ব ব্যবস্থাপনা? তারা নিশ্চয়ই বলবে, আল্লাহ্। অতঃপর বলো, তবুও কি তোমরা (সত্যের বিরোধী পথে চলার ব্যাপারে) সতর্ক হচ্ছো না? সেই আল্লাহ্ই তো তোমাদের প্রকৃত রব্ব। কাজেই সত্যের পরে গোমরাহী ও বিভ্রান্তি ছাড়া আর কী বাকি আছে? সুতরাং তোমরা কোনদিকে চালিত হচ্ছো? (সূরা ইউনূছ: ১০:৩১-৩২)

সূরা মু’মিনুনের আয়াতসমূহে যে প্রশ্ন করা হয়েছে তার অর্থ হচ্ছে, কে তোমাদের ওপর এমন যাদু করে দিয়েছে, যার ফলে এসব কথা জানা সত্ত্বেও প্রকৃত সত্য তোমরা অনুধাবন করতে পারছো না? কার যাদু তোমাদেরকে এমন উদভ্রান্ত করে দিয়েছে, যার ফলে যে মালিক নয় তাকে তোমরা মালিক বা মালিকের শরীক হিসেবে দেখছো এবং যারা কোনো কর্তৃত্বের অধিকারী নয় তাদেরকে তোমরা আসল কর্তৃত্বের অধিকারীর মতো বরং তাঁর চাইতেও বেশী বন্দেগীর হকদার মনে করছো? কে তোমাদের চোখে আবরণ ফেলে দিয়েছে? সারা বিশ্ব-জগতের একচ্ছত্র অধিপতি আল্লাহ্ তোমাদেরকে তাঁর জিনিসগুলো কিভাবে ব্যবহার করেছো সেকথা কখনো জিজ্ঞেস করবেন না কিংবা তাঁর রাজত্বের মধ্যে তোমরা নিজেদের রাজত্ব চালাবার অথবা অন্যদের রাজত্ব মেনে নেবার অধিকার কোথা থেকে লাভ করলে সে কথা কখনো জিজ্ঞেস করবেন না এটা তোমরা কিভাবে নিশ্চিত হলে?

মক্কার কাফির-মুশরিকরা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে যাদুকর বলে অপবাদ বা তোহমত দিয়েছিলো। আয়াতের প্রশ্নের শব্দাবলীর মধ্যে এ বিষয়বস্তুটিই ফুটে উঠেছে যে, হে নিবোর্ধের দল! যিনি তোমাদেরকে আসল সত্যটি (তোমাদের স্বীকৃতি অনুযায়ী যা আসল সত্য হওয়া উচিত তা) বললেন, তিনি তো তোমাদের চোখে যাদুকর আর যারা রাতদিন তোমাদেরকে সত্য বিরোধী কথা বলে বেড়ায় এমনকি যারা তোমাদেরকে সুস্পষ্ট বুদ্ধি ও যুক্তি বিরোধী, অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণ বিরোধী, তোমাদের নিজেদের স্বীকৃত সত্য বিরোধী প্রকাশ্য মিথ্যা ও ভিত্তিহীন কথায় বিশ্বাসী করে দিয়েছে তারাই যে আসল যাদুকর তাদের সস্পর্কে তোমাদের মনে কখনো এ সন্দেহ জাগে না!

লক্ষ্য করে দেখুন, আয়াতগুলোতে সাধারণ লোকদেরকে সম্বোধন করা হয়েছে। তাদেরকে এ কথা বলা হচ্ছে না যে, তোমরা কোন দিকে চলে যাচ্ছো? বরং বলা হচ্ছে, তোমরা কোন দিকে চালিত হচ্ছো? এ থেকে সুস্পষ্টভাবে বুঝা যাচ্ছে যে, এমন কিছু বিভ্রান্তকারী ব্যক্তি বা দল আছে যারা লোকদেরকে সঠিক পথ, সরল পথ, প্রকৃত কল্যাণের পথ থেকে সরিয়ে নিয়ে ভুল ও ভ্রান্ত পথের দিকে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তাই মানুষকে সাবধান ও সতর্ক করে জানানো হচ্ছে, তোমরা অন্ধ হয়ে ভুল ও ভ্রান্ত পথ প্রদশর্নকারীদের পেছনে ছুটে যাচ্ছো কেন? নিজেদের বিবেক-বুদ্ধি ব্যবহার করে চিন্তা করছো না কেন যে, প্রকৃত সত্য যখন প্রকাশিত, তখন তোমাদেরকে কোন দিকে চালিত করা হচ্ছে?

কুরআনে এরূপ আরো অসংখ্য আয়াত আছে যা প্রমাণ করে যে, কাফির-মুশরিকরা সৃষ্টিকর্তা, রক্ষাকর্তা (জন্ম-মৃত্যুর মালিক), পালনকর্তা, শৃংখলাবিধানকারী, পূর্ণতাদানকারী ও রিযিকদাতা হিসাবে আল্লাহকে মানতো এবং বিশ্বাস করতো, সুতরাং সমস্যাটা কোথায়? আল্লাহ্ রাব্বুল আ’লামীনের প্রতি এতো বিশ্বাস থাকার পরও কেন তারা কাফির-মুশরিক? কেন তাদের জন্য জাহান্নাম অবধারিত? ফেরাউন তাহলে নিজেকে রব্ব বলার মাধ্যমে কী দাবী করেছিলো? নমরূদ নিজেকে রব্ব বলার মাধ্যমে কী দাবী করেছিলো? ফেরাউন মুসা আলাইহিস সাল্লামের সাথে আর নমরূদ ইবরাহীম আলাইহিস সাল্লামের সাথে কী হিসেবে নিজেদেরকে রব্ব দাবী করে তর্কে লিপ্ত হয়েছিলো? এই প্রশ্নগুলো শুনে হয়তো অনেকে বিভ্রান্তিতে পড়ে যাবেন। কিন্তু বিভ্রান্ত হওয়ার কিংবা অন্ধকারে হাতড়ে মরার কোনো প্রয়োজনই নেই। সরাসরি আল্লাহ্ রাব্বুল আ’লামীনের কালাম কুরআনই আমাদেরকে স্পষ্ট করে জানিয়ে দিচ্ছে যে, ফেরাউনের দাবী ছিল সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে সার্বভৌমত্বের দাবী। সারা পৃথিবীতে নয় তার দাবী ছিল কেবল মিশরের শাসন ক্ষমতার উপর নিরংকুশ আধিপত্যের দাবী। তার দাবী ছিলো মিশরের সাধারণ জনগণের জন্য তার ইচ্ছানুযায়ী যেমন খুশী তেমন আইন-কানুন ও মূল্যবোধ নির্ধারনের ক্ষমতার দাবী। দেখুন কুরআন কী বলেছে-

“ফেরাউন তার জাতির উদ্দেশ্যে (এক) ভাষণ দিলো। সে বললো, মিশরের সার্বভৌমত্ব কি আমার নয়? তোমরা কি দেখছো না যে, এই নদীগুলো আমার (রাজত্বের) অধীনেই বয়ে চলছে।” (সূরা যুখরুফ ৪৩:৫১)

“এসব বলে সে তার জাতিকে ভীতসন্ত্রস্ত করে তুললো, এক পর্যায়ে তারা তার আনুগত্য মেনেও নিলো। এটি প্রমাণ করে যে, নিঃসন্দেহে তারা নিজেরাও ছিলো এক পাপীষ্ঠ জাতি।” (সূরা যুখরুফ ৪৩:৫৪)

কুরআনের আয়াতগুলো এবং বাস্তব প্রেক্ষাপট যদি আমরা চিন্তা করি তাহলে নিশ্চয়ই বুঝতে পারি যে, আল্লাহ্ রাব্বুল আ’লামীনের পরিবর্তে কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা দলের সার্বভৌমত্ব মেনে নেয়া মানেই হলো তাকে বা তাদেরকে রব্ব স্বীকার করে নেয়া। কারণ অন্য কারো সার্বভৌমত্ব মেনে নেয়া মানেই হলো আল্লাহর সার্বভৌমত্ব অস্বীকার করে আইন-কানুন রচনা করার অধিকারসহ নিরংকুশ শাসন কর্তৃত্ব তাদের হাতে তুলে দেয়া।

যেহেতু মানুষের পক্ষে বাস্তবতার নিরিখে সৃষ্টিকর্তা, রক্ষাকর্তা (জন্ম-মৃত্যুর মালিক), পালনকর্তা, রিযিকদাতা হিসাবে রব্ব হওয়া সম্ভব নয়, তাই এখানে বুঝতে হবে যে, দুনিয়ার ভোগ-বিলাসের প্রতি চরম আকর্ষণ, দ্বীন সম্পর্কে অজ্ঞতা, জ্ঞানের স্বল্পতা, একগুয়েমীতা প্রভৃতি বিভিন্ন কারণে অনেক সময় মানুষ কোনো কোনো মানুষকে এমন স্থানে বসিয়ে দেয়, এমন ক্ষমতা মানুষের হাতে তুলে দেয়; যার কারণে একান্তভাবে আল্লাহর জন্য সংরক্ষিত সার্বভৌম ক্ষমতার আসনে মানুষকে বসিয়ে রব্ব বানিয়ে ফেলে। অপরদিকে কিছু মানুষ ব্যক্তিগত কিংবা দলীয়ভাবে ক্ষমতা লাভের পর নিজ বা দলীয় প্রভাব-প্রতিপত্তির মাধ্যমে অবশিষ্ট লোকেদের উপর আল্লাহর আইনের পরিবর্তে নিজস্ব মনগড়া আইন-বিধান চাপিয়ে দেয়। এই যে আল্লাহর জন্য খাস সার্বভৌম ক্ষমতা যার দ্বারা আইন-বিধান দানের নিরংকুশ কর্তৃত্ব বুঝায় তা মানুষ নিজের হাতে তুলে নেওয়ার কারণে আল্লাহ্ রাব্বুল আ’লামীন কুরআনে এসব লোকদেরকে রব্বের দাবীদার বলে ঘোষণা করেছেন। মূলতঃ ঐসকল লোকজনও কিন্তু মানুষের উপর মানুষের সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতেই নিজেদেরকে জাতির মানুষের রব্ব দাবী করেছিলো। ফেরাউন, নমরূদ, শাদ্দাদ, আবু জাহেল-আবু লাহাব গং যাদের মানুষের উপর মানুষের সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে রব্ব দাবীর সাক্ষ্য দিচ্ছে কোরআন ও হাদীস। আর এভাবেই নিজেদের কর্মকান্ডের দ্বারা মানুষ আল্লাহর রবুবিয়্যাতে শিরক করার মাধ্যমে নিজেদের জন্য চিরকালীন জাহান্নাম কিনে নেয়। অথচ এই লোকগুলোর ভেতরে হয়তো এমন মানুষও আছে যারা নামায পড়ে, রোযা রাখে, হজ্জ করে, যাকাত দেয়, দাঁড়ি আছে, সুন্নাতী লিবাস আছে, একান্ত নিষ্ঠার সাথে তাসবীহ্ জপে, এমনকি তাহাজ্জুদ, এশরাক, আওয়াবীন নামাযও পড়ে।

জাতির মানুষ কিভাবে আল্লাহর পরিবর্তে মানুষকে রব্ব বানিয়ে নিয়েছিলো তা আমরা সরাসরি আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক সূরা তাওবার একটি আয়াতের করা তাফসীরের আলোকে একেবারে স্পষ্ট করে বুঝতে পারবো ইনশাআল্লাহ্। হযরত আদী ইবনে হাতেম (রাদিআল্লাহু আনহু) রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে এসে ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন খৃস্টান। ইসলাম গ্রহণ করার সময় তিনি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে কয়েকটি প্রশ্ন করেন। তিরমিযী শরীফে হযরত আদী ইবনে হাতেম (রাদিআল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত হয়েছে- “আমি একবার রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে এসে দেখলাম তিনি সূরা তাওবার ইত্তাখাজু আহবারাহুম ওয়া রূহবানাহুম আরবাবাম মিনদুনিল্লাহি (অর্থাৎ ‘তারা আল্লাহর পরিবর্তে তাদের আলেম ও দরবেশদেরকে রব্ব বানিয়ে নিয়েছে’) আয়াতটি তিলাওয়াত করছেন। তখন আমি প্রশ্ন করলাম, কুরআনের এ আয়াতটিতে আমাদের বিরুদ্ধে আলেম ও দরবেশদেরকে রব্ব বানিয়ে নেবার যে দোষারোপ করা হয়েছে তার প্রকৃত তাৎপর্য কী? জবাবে তিনি বলেন, তোমাদের আলেম ও দরবেশদেরকে তোমরা (শাব্দিক অর্থে) পূঁজা-উপাসনা করতে না ঠিকই; কিন্তু তারা যখন নিজেদের বুদ্ধি-বিবেচনায় মনগড়াভাবে কোনো কিছুকে হারাম বলতো তোমরা সেগুলোকে হারাম বলে মেনে নিতে এবং তারা যেগুলোকে হালাল বলতো তোমরা সেগুলোকে হালাল বলে মেনে নিতে, একথা কি সত্য নয়! জবাবে আমি বললাম, হ্যাঁ, একথা তো ঠিক, আমরা অবশ্যই এমনটি করতাম। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, এটিই তো হচ্ছে তোমাদের আলেম ও দরবেশদেরকে রব্ব বানিয়ে নেয়া।তাফসীরে ইবনে কাসীরে ইমাম আহমাদ রাহিমাহুল্লাহ্, ইমাম তিরমিযী রাহিমাহুল্লাহ্ ও ইমাম ইবনে জারীর রাহিমাহুল্লাহ্’র সূত্রে আদী ইবনে হাতিম রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত আছে, তার কাছে ইসলামের দাওয়াত আসার পর প্রথমে তিনি সিরিয়ায় পালিয়ে গিয়েছিলেন, পরে যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর কাছে তিনি এলেন তখন তার গলায় রৌপ্য নির্মিত একটি ক্রুশ ঝুলানো ছিলো। ঐ সময় রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পবিত্র যবান হতে ইত্তাখাজু আহ্বারাহুম ওয়া রূহ্বানাহুম এ আয়াতটি উচ্চারিত হচ্ছিল। তখন আদী রাদিআল্লাহু আন্হু বলেন, আহলে কিতাবরা (ইয়াহুদী-খৃষ্টানরা)-তো আলেম ও দরবেশদের (তথা ধর্মীয় নেতাদের) পূঁজা-উপাসনা করেনি! রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তা সত্য। তবে তারা তাদের আলেম ও দরবেশদের হারামকৃত বিষয়কে হারাম এবং হালালকৃত বিষয়কে হালাল বলে নির্বিচারে মেনে নিতো। এটাই তাদের আলেম ও দরবেশদেরকে পূঁজা-উপাসনা-ইবাদাতের শামিল।সুতরাং রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ভাষ্য থেকে জানা গেল যে, আল্লাহর কিতাবের সনদ ছাড়াই যারা নিজস্ব বুদ্ধি-বিবেচনায় মানব জীবনের জন্য হালাল ও হারামের সীমানা নির্ধারণ করে তারা আসলে নিজেরাই আল্লাহর কর্তৃত্ব ও সার্বভৌমত্বের মর্যাদায় সমাসীন হয়। আর যারা শরীয়াতের বিধি-বিধান রচনার ক্ষেত্রে কারো এ অধিকারকে স্বীকার করে নেয় তারা কার্যত তাদেরকেই নিজেদের রব্বে পরিণত করে।সার্বভৌম ক্ষমতার মিথ্যা দাবীদার হয়ে বর্তমান তাগুতী (সীমালঙ্ঘনকারী) সরকার ব্যবস্থায় এর উদাহরণ দেখুন, ১. মদ, ২. জুয়া, ৩. লটারী, ৪. সুদ, ৫. যিনা-ব্যভিচারসহ এমন আরো অসংখ্য বিষয় রয়েছে, যেগুলো আল্লাহ্ রাব্বুল আ’লামীন কঠোর ভাবে অবৈধ (হারাম) ঘোষণা করেছেন, পক্ষান্তরে, তারা এগুলোকে বৈধতার (হালাল) সার্টিফিকেট দিয়েছে। দন্ডবিধির বিষয়টি দেখুন- চুরি-ডাকাতির দন্ড, যিনা-ব্যভিচারের দন্ড, সন্ত্রাস দমন আইন, বিবাহ বিধিসহ আরো অনেক বিষয়ে আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীন যে বিধান আল-কুরআনের মাধ্যমে ঘোষণা করেছেন, তা বাদ দিয়ে তারা নিজেদের মনমতো দন্ডবিধি প্রণয়ন করেছে এবং করছে। এই অধিকার তারা পেলো কোথা থেকে? কে দিলো তাদেরকে এই অধিকার? সমাজ ও রাষ্ট্রের মানুষই তাদেরকে এ অধিকার দিয়েছে। এই অধিকার দেয়ার মাধ্যমে সমাজের মানুষ সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে মানুষকেই রব্ব স্বীকার করে নিয়েছেন। সুতরাং যারা এদেরকে সমর্থন, রক্ষনাবেক্ষণ, সম্মান এবং প্রতিষ্ঠিত করার জন্য আমরণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে তাদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য হচ্ছে-
আপনারা সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য করুন! আল্লাহকে ভয় করুন! ঐ দিন (শেষ বিচার দিবস) আসার পূর্বেই নিজেদের চিন্তা, চেতনা ও আমলকে শুধরে নিন, যেদিন কেউ কারো সাহায্য করবে না এবং প্রত্যেককে তার নিজ নিজ কর্ম সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে এবং তওবা করে আল্লাহর মনোনীত জীবন ব্যবস্থা-দ্বীন ইসলামে ফিরে আসুন। কেননা আল্লাহ্ রাব্বুল আ’লামীন ঈমান আনার পূর্বে শর্ত দিয়েছেন এসব তাগুতরুপী সরকার-শাসক সহ সকল প্রকার তাগুতকে অস্বীকার করার এবং এসব শয়তানী মতাদর্শকে ছুড়ে ফেলে দিয়ে একমাত্র ইসলামকে সেখানে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য। (দ্র: সূরা বাকারা ২:২৫৬ সংশ্লিষ্ট তাফসীর)কুরআনের আয়াতের আলোকে তাওহীদ এবং শিরকের সংজ্ঞা নির্ধারণে ইসলামের আইন-কানুন ও আক্বীদা-বিশ্বাস একই গুরুত্ব বহন করে। আইন-কানুন আক্বীদা-বিশ্বাসেরই বাস্তব রূপ। এই মৌলিক সত্যটি কুরআনের আয়াতসমূহ থেকে এবং কুরআনের বর্ণনাভংগি থেকে সূর্যের আলোর মতো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অথচ শত শত বছর ধরে মুসলমানদের মনে বিরাজমান ধর্ম সংক্রান্ত বিশ্বাস থেকে এই সত্যটিকে অত্যান্ত সূক্ষ্ণ ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। এমনকি পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত এতোদূর গড়িয়েছে যে, ইসলামের শত্রুরা তো দূরের কথা, এর উৎসাহী ভক্তরা পর্যন্ত শাসন ক্ষমতা ও সার্বভৌমত্বকে ইসলামী আক্বীদা-বিশ্বাস থেকে বিচ্ছিন্ন একটা ব্যাপার বলে মনে করতে আরম্ভ করেছে। ইসলামের খুঁটিনাটি আমলের জন্য তারা যেমন উতলা ও আবেগে আপ্লুত হয়, রাষ্ট্রীয় শাসন ক্ষমতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য কিছুতেই তেমন হয় না। তারা মনে করে রাজনীতি যারা করে রাষ্ট্রীয় শাসন ক্ষমতা ও সার্বভৌমত্ব নিয়ে চিন্তা করবে তারা, এটা ইসলামের কোন বিষয় নয়। তাদের ধারণা নামাযী-আমলদার লোক চিন্তা করবে কিভাবে নিজেকে গুনাহ্ থেকে বাঁচিয়ে ঈমান নিয়ে মৃত্যুবরণ করা যায়, রাষ্ট্র, সমাজ কিভাবে চলবে, রাজনীতি-সমাজনীতি কিরূপ হবে এসব নিয়ে ভাবনার মাঝে কোন কল্যাণ নেই। ইসলামের ছোটখাটো আমল-আখলাক থেকে বিচ্যুতিকে যেমন তারা বিচ্যুতি গণ্য করে, ইসলামের রাজনৈতিক, সাংবিধানিক ও রাষ্ট্রীয় বিধান থেকে বিচ্যুতিকে তারা সে ধরনের বিচ্যুতি বলেই গন্য করে না। অথচ ইসলাম এমন একটা জীবন বিধান, যার আক্বীদা-বিশ্বাস, আমল-আখলাক, চরিত্র ও আইন-কানুনে কোন বিভাজন নেই। কিছু কুচক্রী মহল সুপরিকল্পিত পন্থায় শত শত বছর ধরে এর মধ্যে বিভাজন ঢুকানোর চেষ্টা করেছে এবং অনেকটা সফলও হয়েছে। এরই ফলে ইসলামের রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক ক্ষমতা তথা আল্লাহর সার্বভৌমত্ব সংক্রান্তমৌলিক বিষয়টি তুচ্ছ ও ঐচ্ছিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে। শুধু সাধারণ মানুষ নয়, ইসলামের সবচেয়ে আবেগাপ্লুত ভক্তরাও আজকাল রাজনৈতিক বিষয়গুলোকে কম গুরুত্বপূর্ণ ও ঐচ্ছিক বিষয় ভাবতে শুরু করেছে। বিশ্বজগতে আল্লাহর তাওহীদ বিরোধী শক্তিসমূহ সুপরিকল্পিত ও সূক্ষ্ণ ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে মানব জীবনের প্রতিটি দিক-বিভাগ থেকে আল্লাহ্র সার্বভৌমত্বকে দূরে রাখার জন্য আল্লাহর মনোনীত একমাত্র দ্বীন (জীবন ব্যবস্থা) ইসলামের পরিবর্তে আধুনিক, যুগোপযোগী, কল্যাণকর ব্যবস্থার নামে আল্লাহ্ প্রদত্ত ব্যবস্থার বিপরীতে রাজতন্ত্র, সামরিকতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, একনায়কতন্ত্র ও গণতন্ত্র নামক প্রভৃতি শিরকী ও কুফরী শাসন ব্যবস্থার উদ্ভব ঘটিয়েছে। এইসব তন্ত্র-মন্ত্রের জনকরা-ই নিপূঁণ কৌশলে সমাজ ও রাষ্ট্রের আইন-বিধান প্রণয়নের ক্ষমতা ও নিরংকুশ কর্তৃত্ব কুক্ষিগত করার মাধ্যমে মানুষের জ্ঞাতে-অজ্ঞাতে তাদের প্রকৃত ও একমাত্র রব্ব আল্লাহর সার্বভৌমত্বকে অস্বীকার ও অমান্য করে তাদের রব্ব হয়ে যায়। এসব আল্লাহ্দ্রোহী শক্তির শাসন মেনে নেওয়ার কারণে মানুষ যে আল্লাহর রবুবিয়্যাতে শিরক-এ লিপ্ত হয়ে নিজেদের জন্য জান্নাত হারাম করে জাহান্নামেই স্থায়ী আবাস গড়ছে এটা তাদের মন-মগজে কোন চিন্তার উদ্রেগ পর্যন্ত করছে না। তারা মনে করছে আমিতো নামায পড়ছি আল্লাহর জন্য, রোযা রাখছি আল্লাহর জন্য, হজ্জ করছি আল্লাহর জন্য, কালেমা পড়েছি ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্’ সুতরাং আমি র্শিক করলাম কিভাবে? আমিতো ইবাদাতে (নামায, রোযা, হজ্জ, যাকাত প্রভৃতি পালনে) আল্লাহ্র হুকুমের বিরোধীতা করছি না! আর ইসলামী আইন-কানুন সেটাও মান্য করতাম কিন্তু সমাজ ও রাষ্ট্রের কর্তারা আমাদের উপর মানব রচিত আইন-বিধান চাপিয়ে দেয়ার কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না। যেহেতু সমাজ-রাষ্ট্রে বসবাস করছি সেহেতু শান্তি-শৃংখলা রক্ষার্থে এর আইন না মেনে উপায় কি! কথাগুলো সাধারণ বিবেচনায় মানুষের নিকট বাস্তবসম্মত ও যুক্তিযুক্ত মনে হলেও ইসলামী শরীয়াহর দৃষ্টিতে তা মূর্খতা ও জাহেলিয়্যাত। কারণ সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ্ ও তাঁর মনোনীত একমাত্র জীবন ব্যবস্থা ইসলাম সম্পর্কে চরম অজ্ঞতার ফলেই সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় মানব রচিত শিরকী ও কুফরী তথা তাগুতী বা সীমালংঘনমূলক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত আছে। যা আল্লাহর রবুবিয়্যাতে সুস্পষ্ট শিরক এবং আল্লাহর চরম অবাধ্যতা। আর এ ব্যবস্থা মেনে নেয়ার পরিণতি দুনিয়ায় সীমাহীন দূর্ভোগ-অশান্তি আর আখিরাতে নিশ্চিত জাহান্নাম। এ ব্যবস্থা মেনে যারা নামায পড়ছে, রোযা রাখছে, হজ্জ করছে তারা অবশ্যই শিরক নিয়েই এসব আমল করছেন। আর সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় মানুষকে সার্বভৌমত্ব, আইন-বিধান ও কর্তৃত্বের মালিক মেনে মানুষের মনগড়া আইনের আনুগত্য করার মাধ্যমে আল্লাহর পরিবর্তে মানুষেরই দাসত্ব করছেন।

ঈমান সম্পর্কে বর্তমানে মুসলিম উম্মাহর অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে দেখা গিয়েছে যে, অধিকাংশ মানুষই ঈমানের মূল কালেমা ও তার অর্থ সম্পর্কে অজ্ঞ। একমাত্র আল্লাহ্ রাব্বুল আ’লামীন যার প্রতি করুনা করেছেন, আর শিরক থেকে রক্ষা করেছেন, সে ছাড়া অধিকাংশ লোকই শিরকে নিমজ্জিত আছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। আর শিরক সমূহের মধ্যে শিরকে আকবর তথা সবচেয়ে বড় শিরক হচ্ছে- আল্লাহর সার্বভৌমত্বে অংশীদার সাব্যস্তের মাধ্যমে তাঁর রবুবিয়্যাতে শিরক। মুসলিম সমাজে যারা মূর্তিপূঁজা, মাজার পূঁজা করাকে শিরকে আকবর বলে অভিহিত করে থাকেন, অথচ আল্লাহদ্রোহী শক্তির শাসন মান্য করাকে শিরক বলে আখ্যায়িত করেন না এবং মূর্তি পূজারী, মাজার পূঁজারীকে মুশরিক মনে করেন, কিন্তু তাগুতী শক্তি তথা মানব রচিত আইনের প্রণেতা, রক্ষক ও অনুসারীদের মুশরিক মনে করেন না, তারা প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ্র কিতাব কুরআনের প্রকৃত জ্ঞান লাভ করতে পারেননি। ফলে তারা ইসলামকেও পরিপূর্ণরূপে গ্রহণ করেননি। কারণ মানুষের তৈরী মূর্তি বা কবর-মাজারের মৃত ব্যক্তি তাদের পূঁজা-উপাসনা করার জন্য কাউকে বাধ্য করে না, করতে পারে না, সে কোন আইন প্রণয়ন করে না, করার ক্ষমতাও রাখে না, কোন হুকুম-বিধানও দেয় না বা দেয়ার ক্ষমতা রাখে না বরং ব্যক্তি বা গোষ্ঠী তার নিজের ইচ্ছায় মুর্তি বা কবর-মাজারে পূজাঁ-উপাসনার মাধ্যমে শিরকে লিপ্ত হয়। অপরদিকে তাগুতী শক্তি তথা মানব রচিত আইনের প্রণেতা, রক্ষক ও অনুসারীরা মানুষের সার্বভৌমত্বের নামে আল্লাহর বিধানের বিপরীতে নিজেরাই আইন-বিধান প্রণয়ন করে তার আনুগত্য করার মাধ্যমে শিরকে লিপ্ত হচ্ছে এবং জাতির মানুষকে সেই শিরক-কুফরীতে লিপ্ত হতে বাধ্য করছে। এই সরল-সহজ ব্যাখ্যা বাস্তবে চোখের সামনে থাকার পরও যাদের র্শিক-কুফর বুঝতে অসুবিধা হয় তাদের উচিত যেভাবে আল্লাহ্ রাব্বুল আ’লামীন কুরআন নাযিল করেছেন, সেই ভাবেই তা পড়া এবং অর্থ বুঝে তা মান্য করা। প্রকৃতপক্ষে তারা রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ঘটনাবহুল রাজনৈতিক জীবনকে পর্যবেক্ষণ করেন না। যদি পর্যবেক্ষণ করতেন তবে অবশ্যই বুঝতেন- রাষ্ট্রীয় শিরক হচ্ছে সবচেয়ে বড় শিরক, মানুষের স্বার্বভৌমত্ব ও মানব রচিত মনগড়া রাষ্ট্রব্যবস্থা হচ্ছে সবচেয়ে বড় কুফুরী, রাজতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র, স্বৈরতন্ত্র সহ সকল তন্ত্রই আল্লাহর কাছে পরিত্যাজ্য দ্বীন, আল্লাহর কাছে একমাত্র গ্রহণযোগ্য দ্বীন হচ্ছে ইসলাম।

যারা সামান্য পার্থিব স্বার্থ, স্বেচ্ছাচারিতা ও বিলাসিতার জন্য আল্লাহ্র দেয়া একমাত্র সংবিধান কুরআন এবং তার ব্যাখ্যা হাদীসের কাছে পূর্ণাঙ্গ আত্মসমর্পন না করে প্রয়োজনে কুরআন থেকে কিছু নেয়া আবার নিজেরাও কিছু আইন রচনা করা, রাজতন্ত্র কায়েম করা, গণতন্ত্র কায়েম করা, রাষ্ট্রের মধ্যে নিজেদের স্বার্বভৌমত্ব কায়েম করে রাখার জন্য দমন-পীড়ন অব্যাহত রাখা, রাষ্ট্রীয় প্রশাসন ও বিচার বিভাগকে নিজেদের ইচ্ছা অনুযায়ী ব্যবহার করা, আল্লাহর সার্বভৌমত্বের প্রতিনিধিত্বকারী নেতার নেতৃত্বে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব, আইন-বিধান ও কর্তৃত্বের ভিত্তিতে সমাজ ও রাষ্ট্রে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করে সমগ্র মুসলিম ভূখন্ডকে একটি ইসলামিক রাষ্ট্র তথা খিলাফতের অধীনে ঐক্যবদ্ধ করার পরিবর্তে নিজেরা সার্বভৌমত্বের মালিক হয়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র্র রাষ্ট্রের অধিপতি হয়ে থাকা, কাফির-মুশরিকদের থেকে সস্পর্ক ছিন্ন করার মহান আল্লাহর সুস্পষ্ট ঘোষণাকে লংঘন করে তাদের সাথে বন্ধুত্ব কায়েম করা, তাদেরকে নিজেদের অভিভাবক সাব্যস্ত করা, প্রিয়নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর মৃত্যু শয্যায় শায়িত শেষ ওয়াসিয়াত লংঘন করে জাজিরাতুল আরব-এ আমেরিকার মানবতার দুশমনদের আশ্রয় দেয়া প্রভৃতি ইসলাম বিরোধী প্রকাশ্য কুফরী কর্মে লিপ্ত গাদ্দার, মুনাফিক আর জালিম শাসকদের এমন কাজ কর্মের বিরোধীতা যারা করেন না উল্টো নিজেদেরকে মডারেট মুসলিম দাবী করেন তারা মূলতঃ আল্লাহর সার্বভৌমত্ব কী জিনিস তাই বোঝেন না।

বাস্তবতা এই যে, অধিকাংশ মানুষই আল্লাহর রবুবিয়্যাত কী? আল্লাহর সার্বভৌমত্ব-ই বা কী? এর গুরুত্ব, মর্যাদা ও দাবীই বা কী? এর ঘোষণা দানের মাধ্যমে কী তারা স্বীকার করে নিয়েছে, আর কী অস্বীকার করেছে সে সম্পর্কে কোন ধারণাই রাখে না। তারা দাবী করছে আমরা মুসলিম আমরা আল্লাহ্ ছাড়া আর করো ইবাদাত করি না অথচ তারা বাস্তবিকভাবে আল্লাহর পাশাপাশি অন্য অনেক কিছুর ইবাদাত করছে। আল্লাহ্ রাব্বুল আ’লামীন বলেন-
“অনেক মানুষ আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে, কিন্তু সাথে সাথে শিরকও করে।” (সূরা ইউসুফ ১২:১০৬)

বর্তমানে এ আয়াতের বাস্তবতায় দেখছি অধিকাংশ মানুষ মুখে ঈমানের দাবী করা সত্বেও বাস্তব জীবনে কর্মের ক্ষেত্রে তারা আল্লাহর সার্বভৌমত্ব এবং আল্লাহর সাথে শিরক করছে। বর্তমান সময়ের অধিকাংশ মুসলিমই এ ভুল ধারণা করে যে, ইসলামের সাক্ষ্য ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্’ কালেমাটি মুখে উচ্চারণ করলে অথবা মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহন করলে ও লালিত পালিত হলে এবং একটি মুসলিম নামধারণ করলেই ঈমানদার মুসলিম হওয়া যায়। তার কাজকর্ম, জীবন-যাপন পদ্ধতি যাই হোক না কেন। অথচ এটি ইয়াহুদী-খ্রিষ্টানদের একটি আক্বীদা। কারণ তারা সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত ধর্মীয় পরিচয় বহন করলেও জীবন-যাপনে স্রষ্টা প্রদত্ত গাইড বুক (আসমানী কিতাব) অনুসরণ না করে নিজস্ব মনগড়া আইন-বিধান, পদ্ধতি ও জীবন ব্যবস্থা অনুসরণ করে। তারা মানুষের ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনের সকল ক্ষেত্রে মানুষের সার্বভৌমত্ব, আইন-বিধান ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মানুষ হয়েও মানুষের রব্ব হয়ে বসে।

অধিকাংশ ইসলামী দাওয়া সেন্টার এবং দ্বীনের দাওয়াতী কাজে নিয়োজিত বিভিন্ন দলের ভাইয়েরা ঈমানের দাওয়াতের ক্ষেত্রে তাওহীদের কথা বলেন, আল্লাহর একত্ববাদের কথা বলেন; কিন্তু প্র্যাকটিক্যাল (বাস্তব) ক্ষেত্রে শুধুমাত্র তাওহীদুল উলুহিয়্যাহ্ অর্থাৎ ইবাদাতের তথা নামায, রোযা, হজ্জ, যাকাত প্রভৃতি ক্ষেত্রে আল্লাহর একত্ববাদের উপরই প্রাধান্য দেন, আর সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে মানব রচিত ব্যবস্থা ও মানুষের মনগড়া আইনের আনুগত্য করে চলছেন। কারণ এতে আল্লাহদ্রোহী, আল্লাহর সীমালঙ্ঘণকারী গোষ্ঠী (তাগুত) নারাজ হয় না আর জান-মালের ক্ষতির আশংকা নেই বললেই চলে। যুগ যুগ ধরে ইসলামের কালেমা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্’ কে দলীল বিহীনভাবে ঈমানের মূল কালেমা বলে চালিয়ে দিচ্ছেন তারা। অপরদিকে আল্লাহর রবুবিয়্যাতে তাওহীদের ক্ষেত্রে আল্লাহ্-ই একমাত্র সৃষ্টিকর্তা, রক্ষাকর্তা (জন্ম-মৃত্যুর মালিক), পালনকর্তা, শৃংখলাবিধানকারী, পূর্ণতাদানকারী ও রিযিকদাতা এটা প্রচার করলেও ‘আল্লাহর জমীনে সার্বভৌমত্ব, আইন-বিধান ও নিরংকুশ কর্তৃত্ব একমাত্র আল্লাহর, মানুষের নয়’ এ সম্পর্কে তারা হয় না জানার, না বুঝার কারণে মৌনতা অবলম্বন করেন কিংবা খন্ডিত ব্যাখ্যা দেন। দেখুন আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, দ্বীনের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তাঁর সাহাবীরা যখন কালেমা এবং তাওহীদের দাওয়াত দিতেন, শিরকের বিপক্ষে কথা বলতেন তখন পুরো সমাজ তাদের উপর ক্ষোভে ফেটে পড়তো। চরম জুলুম নির্যাতন শুরু হতো। ইট-পাথর তো সামান্য, এমনকি নির্যাতন করতে করতে অনেককে শহীদ করে দেওয়া হতো। স্বয়ং রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে পর্যন্ত রক্তাক্ত হতে হয়েছে। কিন্তু আজ যারা তাওহীদের কথা বলেন, কালেমার দাওয়াত দেন কিংবা র্শিকের বিরুদ্ধে কঠোর ভূমিকা পালন করছেন বলে প্রচার করেন তাদেরকে কেউ মারে না। তাদেরকে কেউ বিরোধীতা করে না, রক্তাক্ত করে না। তাদের উপর রাষ্ট্র কিংবা সমাজপতিদের ক্রোধ আসে না। বরং তাদের জন্য রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সাহায্য সহায়তার দ্বার উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। মাসে মাসে বেতনও দেয়া হয়। মোটা বোনাস আসে। আর উপহার উপঢৌকনের জোয়ার শুরু হয়।

এর কারণ কী? স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন জাগে- তারা কি আসলে সঠিক তাওহীদের পূর্ণাঙ্গ দাওয়াত দিচ্ছেন, না আংশিক? তারা কি আসলে রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তার সাহাবীদের দাওয়াতের থেকে উল্লেখযোগ্য কোন অংশ বাদ দিচ্ছেন? যার কারণে তাদের উপর কুফরী শক্তি সন্তুষ্ট হচ্ছে, তাগুতী রাষ্ট্রও সহায়তা করছে!

আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কী দাওয়াত দিলেন মক্কার লোকদেরকে যার পরিণতিতে সহচরগণ সহকারে তাঁকে প্রিয় মাতৃভূমি মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করতে হয়েছিলো? কী দাওয়াত তিনি দিলেন আবু লাহাব, আবু জাহেল গংকে যে কারণে তারা রাসূলকে মারার পরিকল্পনা পর্যন্ত করেছিলো? দেখুন কুরআন কী বলে-
“তোমাদের কী হলো যে, তোমরা আল্লাহর প্রতি ঈমান আনছো না? অথচ রাসূল তোমাদেরকে রব্বের প্রতি ঈমান আনার জন্য দাওয়াত দিচ্ছেন; আর আল্লাহতো (রব্বের ব্যাপারে মানুষকে দুনিয়ায় পাঠানোর) পূর্বেই তোমাদের নিকট থেকে প্রতিশ্রুতি নিয়েছেন; যদি তোমরা সত্যিই ঈমানদার হও (তবে আল্লাহকে একমাত্র রব্ব মেনে সেই প্রতিশ্রুতি পূর্ণ কর)।’’ (সূরা আল হাদীদ ৫৭:৮)

“যাদেরকে তাদের ঘর-বাড়ী থেকে অন্যায়ভাবে বহিস্কার করা হয়েছে শুধু এই কারণে যে, তারা বলেছিল- রাব্বুনাল্লাহ্ (আল্লাহ্ই আমাদের একমাত্র রব্ব)।…। আল্লাহ্ নিশ্চয়ই তাদেরকে সাহায্য করবেন, যারা আল্লাহকে সাহায্য করে। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ পরাক্রমশালী শক্তিধর।” (সূরা আল-হাজ্জ ২২:৪০)

অর্থাৎ তৎকালীন আবু লাহাব, আবু জাহেল গং নিয়ন্ত্রিত জাহেলিয়্যাতের ভিত্তিতে গঠিত সমাজ ব্যবস্থায় আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সকল মানুষকে মানুষের সার্বভৌমত্বের দাসত্ব থেকে বের হয়ে একমাত্র আল্লাহ্র সার্বভৌমত্বকে মেনে কেবলমাত্র তাঁরই দাসত্ব, তাঁরই আইনের আনুগত্যের অঙ্গীকার করার দাওয়াত দিয়েছিলেন। যার পরিণতিতে উক্ত সমাজের আইন-বিধান প্রণয়ন ও নিরংকুশ কর্তৃত্বের ভিত্তিতে রব্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত আবু লাহাব, আবু জাহেল গং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর সহচরদের প্রতি খর্গ হস্ত হয়ে জুলুম-নিপীড়ন ও হত্যার ষড়যন্ত্র শুরু করে দেয় এবং পরিণতিতে আল্লাহ্ রাব্বুল আ’লামীনের নির্দেশে সহচরগণ সহকারে রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রিয় মাতৃভূমি মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করেন। দুনিয়াবী জান-মালের ক্ষতির ভয় না করে আল্লাহকে একমাত্র রব্ব মেনে ঈমানের উপর দৃঢ় থেকেছেন। মূলতঃ যারাই আল্লাহকে একমাত্র রব্ব বলে স্বীকার করে নিবে এবং এ দাবীর প্রতি দৃঢ়-অটল থাকবে তারাই প্রকৃত ঈমানদার এবং তাদেরকে সুসংবাদ দিয়েই আল্লাহ্ রাব্বুল আ’লামীনের পক্ষ থেকে ইরশাদ হচ্ছে-
‘‘নিশ্চয়ই যারা ঘোষণা করেছে- রাব্বুনাল্লাহ্ (আল্লাহ্ই আমাদের একমাত্র রব্ব-সার্বভৌমত্ব, আইন-বিধান ও নিরংকুশ কর্তৃত্বের একমাত্র মালিক), অতঃপর তার উপরে অবিচল থেকেছে, নিশ্চয়ই তাদের কোন ভয় নেই এবং তারা চিন্তিত হবে না। তারাই জান্নাতের অধিকারী! তারা তথায় চিরকাল থাকবে। আর এটা হচ্ছে তাদের সেই কাজের বিনিময় যা তারা পৃথিবীতে করেছিলো।’’ (সূরা আহক্বাফ ৪৬:১৩,১৪)

আরও ইরশাদ হচ্ছে-
‘‘নিশ্চয়ই যারা ঘোষণা করেছে- রাব্বুনাল্লাহ্ (আল্লাহ্ই আমাদের একমাত্র রব্ব-সার্বভৌমত্ব, আইন-বিধান ও নিরংকুশ কর্তৃত্বের একমাত্র মালিক), অতঃপর এ ঘোষণার উপর অটল (দৃঢ় ও স্থির) থেকেছে, নিশ্চিত তাদের কাছে ফিরিশতারা আসে এবং বলে, তোমরা ভয় করো না, চিন্তিত হয়ো না এবং সেই জান্নাতের সুসংবাদ শোন, যার প্রতিশ্রুতি তোমাদেরকে দেয়া হয়েছে।’’ (সূরা হা-মীম সেজদাহ ৪১: ৩০)

সুবহানাল্লাহ্! আলহামদুলিল্লাহি রাব্বিল আ’লামীন!

কিন্তু সবচেয়ে দুঃখজনক ব্যাপার হলো, ইসলামের দরদী ভক্তদের কেউ কেউ প্রচলিত জাহিলিয়্যাত তথা তাগুতী রাষ্ট্র ব্যবস্থার কিছু কিছু আইন, পদক্ষেপ ও কথাবার্তা সম্পর্কে মাঝে মধ্যে খুঁত ধরেন যে, অমুক কাজ ইসলাম বিরোধী। কোথাও কোথাও কিছু ইসলাম বিরোধী আইন বা বিধি ব্যবস্থা দেখে তারা রেগে যান। তাদের ভাব দেখে মনে হয়, ইসলাম যেন পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়েই আছে, তাই অমুক অমুক ত্রুটি তার পূর্ণতার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে আছে। এই সকল দ্বীনদরদী (!) ব্যক্তি তাদের অজ্ঞতার কারণে অজান্তেই ইসলামের ক্ষতি সাধন করে থাকেন। তাদের সেই মূল্যবান শক্তিকে তারা এসব অহেতুক কাজে অপচয় করেন, অথচ তা ইসলামের মৌলিক আক্বীদা বিশ্বাস প্রতিষ্ঠায় ব্যয় করা যেতো। এসব কাজ দ্বারা তারা আসলে জাহেলী সমাজ-রাষ্ট্রের পক্ষেই সাফাই গান। কেননা, এর দ্বারা বোঝা যায় যে, ইসলাম তো এখানে কায়েম আছেই, কেবল অমুক অমুক ত্রুটি শুধরালেই তা পূর্ণতা লাভ করবে। অথচ এখানে সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় সার্বভৌম ক্ষমতা অর্থাৎ আইন প্রনয়ন, শাসন ও বিচার ফয়সালার সর্বময় চূড়ান্ত ক্ষমতা ও এখতিয়ার যতক্ষণ মানুষের হাত থেকে পরিপূর্ণভাবে ছিনিয়ে এনে আল্লাহর জন্যই ন্যাস্ত না হবে, ততক্ষণ ইসলামের অস্তিত্ব বলতেই এখানে কিছু নেই। কারণ সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে অন্যের সার্বভৌমত্ব মেনে নেয়ার অর্থই হলো আল্লাহর সার্বভৌমত্বকে অস্বীকার করা, আল্লাহর সাথে শিরক করা। যা মূলতঃ আল্লাহকেই অস্বীকার করার শামিল। আর যেখানে গোটা জাতি শিরকে নিমজ্জিত হয় সেখানে ইসলামের অস্তিত্ব কিভাবে থাকে? এটি কাফির-মুশরিকদের এমন এক সূক্ষ্ণ-ষড়যন্ত্র, যার মাধ্যমে আল্লাহকে কার্যত অস্বীকার করা সত্ত্বেও সাধারণ মানুষ তা বুঝতে পারে না। আপনি লক্ষ্য করলে দেখতে পাবেন, তারা বলে না তোমরা ইসলাম ছাড়ো, তারা বলে, গণতন্ত্র (জনগণের আইন) গ্রহণ কর, কেননা তারা ভালো করেই জানে, গণতন্ত্র গ্রহণ অর্থই হলো ইসলামকে বর্জন করা।

মনে রাখতে হবে যে, সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব বহাল থাকলেই এবং আল্লাহকে সার্বভৌমত্বের একমাত্র মালিক স্বীকার করে একমাত্র নিরংকুশ আইনদাতা মানলেই ইসলামের অস্তিত্ব থাকে। আল্লাহর সার্বভৌমত্ব বজায় না থাকলে সেখানে ইসলামের অস্তিত্ব এক মুহুর্তও থাকতে পারে না। বলার অপেক্ষা রাখেনা যে, আজকের পৃথিবীতে সমাজ ও রাষ্ট্রে মানব জাতির জন্য কল্যাণকর সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত ব্যবস্থা ইসলাম প্রতিষ্ঠিত না থাকার কারণে, আল্লাহর যমীনে আল্লাহদ্রোহী তাগুতী শক্তি রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব ও প্রভুত্বের ওপর ভাগ বসাচ্ছে আর নামাযী, দাড়ী-টুপিওয়ালা, তাসবীহ্ ওয়ালা লোকরা তাদেরকে সমর্থন দেয়া থেকে শুরু করে সরকারের অধীনে বিভিন্ন পদ গ্রহণ করে তাদের সহায়তা করে বৈষয়িক ফায়দা লুটছে।

এই শাসক শ্রেণী তাদের আইন প্রণয়নের ক্ষমতা নিশ্চিত করছে এবং স্বরাষ্ট্র, পররাষ্ট্র, অর্থনীতি, সমাজ, পরিবার তথা সাধারণ মানুষের জীবন, সহায় সম্পদ ও তাদের মধ্যে বিবাদমান বিষয়ে নিজেদের খেয়ালখুশী মতো বিধি নিষেধ প্রয়োগ করছে। এটাই সেই সমস্যা যার সমাধান, সংশোধন ও মোকাবেলা করার জন্য কুরআন নাযিল হয়েছে এবং সে আইন ও বিধি নিষেধ প্রনয়ণ ও প্রয়োগের ক্ষমতাকে দাসত্ব ও প্রভুত্বের সাথে সম্পৃক্ত করেছে এবং স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছে যে, এর আলোকেই সিদ্ধান্ত আসবে কে মুসলিম? কে অমুসলিম? কে মু’মিন? ও কে কাফির?

ইসলাম’এর অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখার জন্য প্রথম যে লড়াই হয়েছিলো, তা নাস্তিকতার বিরুদ্ধে পরিচালিত লড়াই ছিলনা। এ লড়াই সামাজিক ও নৈতিক উচ্ছৃংখলতার বিরুদ্ধেও ছিল না। কেননা এসব হচ্ছে ইসলাম প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ের পরবর্তী লড়াই। বস্তুতঃ ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য ঈমানদার মুসলিমগণ সর্বপ্রথম যা করেছে তা ছিলো- সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনা সহ জীবনের সর্বক্ষেত্রে সার্বভৌমত্বের অধিকারী কে হবে সেটা স্থির করার জন্য দাওয়াতের মাধ্যমে চেতনার জগতে আন্দোলন সৃষ্টির লড়াই। আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কায় থাকা অবস্থাতে এ লড়াইয়ের সূচনা করেছিলেন। সেখানে তিনি মানুষের ঈমান ও আক্বীদা-বিশ্বাসের ভিত্তিতে ঈমানদার নারী-পুরুষদেরকে তাঁর নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ রাখার কাজ করেছিলেন, সমাজ ও রাষ্ট্রে আইন প্রয়োগের চেষ্টা করেননি। তখন কেবল মানুষের মনে এই বিশ্বাস বদ্ধমূল করার চেষ্টা করেছেন যে, সার্বভৌমত্ব তথা প্রভুত্ব ও সর্বময় ক্ষমতা এবং আইন বা হুকুম জারির ক্ষমতা ও শর্তহীন আনুগত্য লাভের অধিকার একমাত্র আল্লাহ্ রাব্বুল আ’লামীনের, অন্য কারো নয়।

কোন মানুষ এই সার্বভৌমত্বের দাবী করতে পারে না এবং কেউ দাবী করলে ঈমানদার মুসলিমরা জীবন গেলেও সেই দাবী মেনে নিবে না। মক্কায় অবস্থান কালে মুসলিমদের মনে যখন এই আক্বিদা দৃঢ়ভাবে বদ্ধমূল হলো, তখন আল্লাহ্ রাব্বুল আ’লামীন ঈমানদার মুসলিমদেরকে রাষ্ট্রীয় শাসন ক্ষমতা তথা খিলাফাত দানের মাধ্যমে তা বাস্তবে প্রয়োগের সুযোগ দিলেন মদিনায়।

সুতরাং আজকালকার ইসলামের একনিষ্ঠ ও আবেগোদ্দীপ্ত ভক্তরা ভেবে দেখুন, তারা ইসলামের প্রকৃত মর্ম উপলব্ধি করেছেন কি না? যারা একমাত্র আল্লাহর গোলামী করে এবং মানুষকে রব্ব-এর আসনে তথা সার্বভৌমত্ব, আইন-বিধান ও নিরংকুশ কর্তৃত্বের মালিকের আসনে বসায় না তারাই মুসলিম। এই বৈশিষ্ট্যই তাদেরকে দুনিয়ার সকল জাতি ও গোষ্ঠির উর্ধ্বে স্বতন্ত্র মর্যাদা দান করে এবং দুনিয়ার সকল জাতির জীবন যাপন পদ্ধতির মধ্য থেকে তাদের জীবন পদ্ধতির স্বকীয়তার নির্দেশ করে।

উপরোক্ত বৈশিষ্ট্য তাদের মধ্যে থাকলে তারা ঈমানদার মুসলিম, নচেৎ তারা কাফির, মুশরিক বা অমুসলিম, চাই তারা যতই নিজেদের মুসলিম বলে দাবী করুক না কেন।

সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে মানবরচিত সকল ব্যবস্থায় মানুষ মানুষকেই সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক মেনে নেয়ার মাধ্যমে আল্লাহ্র আসনে বসায়। কারণ সার্বভৌম ক্ষমতাকে কেন্দ্র করেই সকল তন্ত্রের উদ্ভব হয়েছে আর প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ্ ব্যতীত কেউ সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক হতে পারে না। সকল মানুষই যেহেতু সৃষ্টিকর্তা, রক্ষাকর্তা (জন্ম-মৃত্যুর মালিক), পালনকর্তা, শৃংখলাবিধানকারী, পূর্ণতাদানকারী ও রিযিকদাতা হিসেবে আল্লাহ্কে রব্ব মানতে বাধ্য সেহেতু বিভিন্ন তন্ত্রের (গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, রাজতন্ত্র প্রভৃতি) ধারক-বাহকরা মানুষের ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবন পরিচালনায় মানুষের সার্বভৌমত্বের মিথ্যা শ্লোগান দিয়ে আল্লাহ্র আইন-বিধান প্রণয়নের নিরংকুশ ক্ষমতা কুক্ষিগত করার মাধ্যমে মিথ্যা রব্ব হয়ে বসে। কোন দেশে সর্বোচ্চমানের গণতন্ত্র, রাজতন্ত্র কিংবা সর্বনিম্ন মানের স্বৈরতন্ত্র- যা-ই থাকুক সর্বত্র সার্বভৌমত্বের এই একই অবস্থা। প্রভূত্বের সর্বপ্রথম বৈশিষ্ট্য হলো মানুষকে গোলাম বানানোর অধিকার এবং মানুষের জন্য আইন-কানুন, মূল্যবোধ ও মানদন্ড রচনার অধিকার দখল করা। ঘোষিত, অঘোষিত, লিখিত যেভাবেই হোক, মানবরচিত সকল ব্যবস্থায় একটি মানবগোষ্ঠী কোন না কোন আকারে এই সার্বভৌমত্বের অধিকারী হওয়ার দাবীদার। এতে করে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর লোকেরা অবৈধভাবে সার্বভৌম ক্ষমতার আসনে আসীন হয়ে পড়ে। এই নির্দিষ্ট গোষ্ঠীটি বাদ বাকী দেশবাসীর দন্ডমূন্ডের কর্তা হয়ে তাদের জন্য আইন-কানুন, রীতি-নীতি, মূল্যবোধ ও মানদন্ড নির্ধারণ করে। কুরআনের আয়াতে একেই বলা হয়েছে মানুষকে মানুষের রব্ব বানিয়ে নেয়া। এভাবেই বর্তমান বিশ্বের সকল দেশের সাধারণ জনগণ তাদের শাসক শ্রেণীর ইবাদত-আনুগত্য-দাসত্ব করে, যদিও তারা তাদের উদ্দেশ্যে রুকু-সিজদা করে না।

সার্বভৌমত্ব তথা প্রভুত্ব ও সর্বময় ক্ষমতা, আইন-বিধান বা হুকুম জারির ক্ষমতা এবং নিরংকুশ কর্তৃত্বের মালিক একমাত্র আল্লাহ্ রাব্বুল আ’লামীনকে মেনে নেয়া হলেই আল্লাহকে রব্ব মানা হয়। মূলতঃ এটাই আল্লাহর প্রতি ঈমান এবং আল্লাহ্ প্রদত্ত একমাত্র জীবন ব্যবস্থা ইসলাম’এর মূল বিষয়। এ বিষয়টি বাদ দিলে ইসলাম’এর কোন অস্তিত্বই থাকে না। দুনিয়ার সকল নবী ও রাসূলগণ আল্লাহ্ প্রদত্ত একমাত্র জীবন ব্যবস্থা ইসলাম নিয়েই এসেছিলেন। আল্লাহ্ রাব্বুল আ’লামীন মানুষকে মানুষের দাসত্ব থেকে মুক্ত করে তার নিজের দাসত্বের অধীন করার জন্য এবং মানুষকে যুলুম থেকে মুক্ত করে আল্লাহর ন্যায়বিচারের ছায়াতলে আশ্রয় দানের জন্যই নবীদেরকে যুগে যুগে ইসলামী বিধান সহকারে পাঠিয়েছেন। যারা তা অগ্রাহ্য করে, তারা মুসলিম নয়, তা সে যতই সাফাই গেয়ে নিজেকে মুসলিম প্রমাণ করার চেষ্টা করুক না কেন এবং তাদের নাম আব্দুর রহমান, আব্দুর রহিম যাই হোক না কেন। কারণ আল্লাহর প্রতি ঈমানের ঘোষণা হলো- রাব্বুনাল্লাহ্!-আল্লাহ্ই আমাদের একমাত্র রব্ব-সার্বভৌম ক্ষমতার একমাত্র মালিক, আইনদাতা-বিধানদাতা ও নিরংকুশ কর্তা, অন্য কেউ নয়!

এখন আমরা যারা মুসলিম পরিচয় নিয়ে বেঁচে থাকতে চাই, পরিপূর্ণ ঈমান নিয়ে মৃত্যুবরণ করতে চাই, মৃত্যুর সময় আল্লাহর প্রতিশ্রুতি ফেরেশতাদের নিকট থেকে ভীত ও চিন্তিত না হওয়ার সান্তনা এবং জান্নাতের সুসংবাদ শুনতে চাই তাদের জন্য সর্বপ্রথম করণীয় হচ্ছে- আল্লাহর রাসূল হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’এর অবর্তমানে বর্তমান বিশ্ব মানবজাতি যখন সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে মানুষের সার্বভৌমত্ব, আইন-বিধান ও কর্তৃত্ব গ্রহণ করে র্শিকে নিমজ্জিত তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’এর অনুসরণ ও অনুকরণে আল্লাহর সার্বভৌমত্বের প্রতিনিধিত্বকারী ঈমানদার নেতা ও আমীরের আহ্বানে সাড়া দিয়ে আল্লাহকে একমাত্র রব্ব অর্থাৎ আল্লাহকে জীবনের সর্বক্ষেত্রে সার্বভৌমত্ব, আইন-বিধান ও নিরংকুশ কর্তৃত্বের একমাত্র মালিক হিসেবে মেনে নিয়ে ‘রাব্বুনাল্লাহ্’ বলে ঈমানের ঘোষণা দিয়ে তার উপর দৃঢ়-অটল-অবিচল থাকা। এবং ঈমানের দাবী পূরণে আমীরের আনুগত্যে থেকে অর্থ ও সময় ব্যয়ের মাধ্যমে সমাজ ও রাষ্ট্রে ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য চূড়ান্ত চেষ্টা করা। এটাই আল্লাহর ক্ষমা ও জান্নাত লাভের উপায়।

সুতরাং আমরা যারা দুনিয়াতে দূর্ভোগ-অশান্তি এবং আখিরাতে জাহান্নামের ভয়াবহ অগ্নি থেকে মুক্তি চাই, সমাজ ও রাষ্ট্রে মানুষের উপর মানুষের সার্বভৌমত্বের মিথ্যা দাবীদারদের কবল থেকে বের হয়ে প্রকৃত ঈমান নিয়ে বাঁচতে চাই তাদের উদ্দেশ্যে শেষ দু’টি কথা-

আল্লাহ্ রাব্বুল আ’লামীন মানব জাতির জন্য কল্যাণকর ও পরিপূর্ণ মনোনীত একমাত্র জীবন ব্যবস্থা (দ্বীন) ইসলাম’এর প্রথম ও প্রধান মৌলিক বিষয় হচ্ছে তাওহীদ। তাওহীদ হচ্ছে- আল্লাহকে একমাত্র রব্ব ও ইলাহ্ হিসেবে মান্য করা এবং তাঁরই ইবাদত করা। তাওহীদ ব্যতীত ঈমান কল্পনা করা যায় না। রবুবিয়্যাতে তাওহীদ অর্থাৎ আল্লাহর জমীনে সার্বভৌমত্ব, আইন-বিধান ও নিরংকুশ কর্তৃত্ব একমাত্র আল্লাহর, মানুষের নয়। এটাই আল্লাহর প্রতি ঈমানের মূল বিষয় এবং আল্লাহর সাথে মানুষের সম্পর্ক গড়ার মূল ভিত্তি। আর আল্লাহর রবুবিয়্যাতে তাওহীদের মাধ্যমে আল্লাহর প্রতি ঈমানের ঘোষণা হচ্ছে- রাব্বুনাল্লাহ্ অর্থাৎ আল্লাহ্ই আমাদের একমাত্র রব্ব- সার্বভৌম ক্ষমতার একমাত্র মালিক, আইনদাতা, বিধানদাতা ও নিরংকুশ কর্তা, অন্য কেউ নয়। আল্লাহকে একমাত্র রব্ব হিসেবে মেনে নেওয়ার নামই ঈমান এবং এর ঘোষণা রাব্বুনাল্লাহ্-ই মূলতঃ ঈমানের মূল কালেমা। আর আল্লাহর রবুবিয়্যাতে তাওহীদের ফলশ্রতি হচ্ছে আল্লাহর উলুহিয়্যাতে তাওহীদ অর্থাৎ দাসত্ব, আইনের আনুগত্য ও উপাসনা একমাত্র আল্লাহ, অন্য কারো নয়। উলুহিয়্যাতে তাওহীদের অঙ্গীকার হচ্ছে- আশহাদু আল্লা-ইলাহা-ইল্লাল্লাহ্- আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, নেই কোন ইলাহ্ (মা’বুদ)-দাসত্ব, আইনের আনুগত্য ও উপাসনা পাওয়ার অধিকারী সত্ত্বা একমাত্র আল্লাহ্ ব্যতীত। এটা মূলতঃ ইসলাম পালনের অঙ্গীকার। আর এটা হচ্ছে ইসলাম’এর কালিমা। হাদীসের ভাষায় এরই দাওয়াত হচ্ছে

ইয়া আইয়্যুহান্নাসু ক্বুলু লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু তুফলিহু।
-হে লোকসকল! বলো- ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্’ [নেই কোন ইলাহ্ (মা’বুদ)-দাসত্ব, আইনের আনুগত্য ও উপাসনা পাওয়ার অধিকারী সত্ত্বা একমাত্র আল্লাহ্ ব্যতীত] তবেই সফলকাম হবে।

আল্লাহ্ উলুহিয়্যাতে তাওহীদের বাস্তবায়ন হচ্ছে- আল্লাহ্ রাব্বুল আ’লামীনের মনোনীত সর্বশেষ নবী ও রাসূল হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নেতৃত্বের শর্তহীন আনুগত্য। যার অংগীকার হচ্ছে- আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ্ অর্থাৎ আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর রাসূল-শর্তহীন আনুগত্য, অনুকরণ ও অনুসরণ পাওয়ার অধিকারী একমাত্র নেতা, অন্য কেউ নয়।

পরিপূর্ণ আন্তরিক উপলব্ধি, বিশ্বাস ও জ্ঞানের ভিত্তিতে ‘রাব্বুনাল্লাহ্’ ঘোষণা এবং ‘আশহাদু আল্লা-ইলাহা-ইল্লাল্লাহ্ ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ্’ জ্ঞানের ভিত্তিতে বুঝে উচ্চারণের মাধ্যমে ইসলাম পালন এবং বাস্তবায়নের অংগীকার করার নামই ঈমান ও ইসলাম। শুধুমাত্র এ বিষয়টিকে বিনা তর্কে এবং যুক্তিতে মেনে নিলেই একজন ব্যক্তির অবস্থান আল্লাহ্ রাব্বুল আ’লামীনের মনোনীত একমাত্র দ্বীন (জীবন ব্যবস্থা) ইসলাম-এ স্বীকৃত হবে। এর ব্যতিক্রম হলে ধরে নিতে হবে উক্ত ব্যক্তির অবস্থান ইসলামে নয় জাহিলিয়্যাতে তথা শিরক ও কুফরীতে।

উল্লেখ্য যে, সূরা নিসার ৫৯নং আয়াত অনুযায়ী মানুষের সার্বভৌমত্ব আইন-বিধান ও কর্তৃত্ব অস্বীকার করে আল্লাহর সার্বভৌমত্বেও প্রতিনিধিত্বকারী ঈমানদার নেতা ও আমীরের আনুগত্য করা আল্লাহ্ ফরয করে দিয়েছেন। কাজেই বর্তমানে এমন আমীরের আনুগত্যে থাকা ব্যতীত কারো পক্ষে ঈমান ও ইসলামে থাকা সম্ভব নয়। অতএব আসুন, আমরা ঈমানের ঘোষণা দিয়ে ইসলামের অংগীকার করে ইসলামী সমাজের আমীরের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হই এবং সমাজ ও রাষ্ট্রে ইসলাম প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে অর্থ ও সময় ব্যয়ের মাধ্যমে চূড়ান্ত চেষ্টা করি। নিজে বাঁচি, জাতিকে বাঁচাই।

যেহেতু জন্মসূত্রে ঈমানদার মুসলিম হওয়া সম্ভব নয় সেহেতু জ্ঞানের ভিত্তিতে বুঝে আল্লাহকে একমাত্র রব্ব-সার্বভৌমত্ব, আইন-বিধান ও নিরংকুশ কর্তৃত্বের মালিক জেনে ও মেনে ঈমানের ঘোষণা দিয়ে ঈমান আনতে হবে। ঈমান না এনে ইসলামে প্রবেশ করা সম্ভব নয়। ইসলামে প্রবেশ না করলে মুসলিম হওয়া সম্ভব নয়। আর মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ করার পরিণাম যে কী পরিমান ভয়াবহ তা কল্পনা করা অসম্ভব। অতএব, হে আল্লাহ্! সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনাসহ জীবনের সকল ক্ষেত্রে আপনিই যে একমাত্র রব্ব এই মহাসত্য আমাদেও সকলকে জানার, চেনার ও তা পালন করার তৌফিক দান করুন এবং বাতিলকে বাতিল হিসেবে চেনার ও তা থেকে দূরে থাকার তৌফিক দান করুন। হে আল্লাহ্! সমস্ত তাগুতী শক্তির ষড়যন্ত্রকে ধ্বংস করে দিন। মানব রচিত শিরকী ও কুফরী ব্যবস্থা তথা জাহেলিয়্যাতের ভিত্তিতে গঠিত অভিশপ্ত সমাজকে ইসলামী সমাজে রূপান্তরের তৌফিক দান করুন। আপনিই তো আমাদের একমাত্র রব্ব! দয়া করে আমাদেরকে আপনার প্রকৃত হিদায়াত বুঝার প্রয়োজনীয় জ্ঞান, বুদ্ধি ও চেতনা দান করুন। আর দুনিয়াতে দূর্ভোগ-অশান্তি ও আখিরাতে জাহান্নামের ভয়াবহ অগ্নি থেকে মুক্তি লাভের পথে চলার জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান, সামর্থ্য ও শক্তি দান করুন! আমীন, ইয়া রাব্বুল আ’লামীন।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s