মদীনায় মুসলিমদের খিলাফাত লাভের সংক্ষিপ্ত ধারাবাহিক ইতিহাস

১. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নবুওয়ত লাভের পর আল্লাহ পাকের নির্দেশ অনুযায়ী তিন বছর নিজ আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবদের মাঝে ঈমান ও ইসলামের দাওয়াত দেয়া শুরু করেন। তিনি তাদেরকে জাহিলিয়্যাত ত্যাগ করে আল্লাহ কে একমাত্র রব্ব-সার্বভৌম মালিক, সার্বভৌম আইনদাতা-বিধানদাতা ও নিরংকুশ কর্তা মেনে রাব্বুনাল্লাহ্ ঘোষণা, আল্লাহ কে একমাত্র ইলাহ্-দাসত্ব, আইনের আনুগত্য ও উপাসনা পাওয়ার একমাত্র সত্তা মানার অঙ্গীকার করে ‘আশহাদু আল্লা-ইলাহা-ইল্লাল্লাহ’ সাক্ষ্য এবং মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে একমাত্র রাসূল-শর্তহীন আনুগত্য, অনুকরণ, অনুসরণ পাওয়ার একমাত্র আদর্শিক নেতা মানার অঙ্গীকার করে ‘আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ্’ সাক্ষ্য দানের মাধ্যমে ঈমান এনে ইসালামে প্রবেশের আহ্বান জানান।
২. ঈমান ও ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দেয়ার জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজ বংশীয় বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে একটি সভা করেন; এই সভায় কেউই তাঁর আদর্শ মেনে নেয়নি, এ সভাতে একজনই ইসলাম গ্রহণ করেন, তিনি হলেন আলী রাযিআল্লাহু আনহু। ইসলাম গ্রহণকারী তৃতীয় ব্যক্তি ছিলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অন্তরঙ্গ বন্ধু আবু বকর রাযিআল্লাহু আনহু। এভাবেই প্রথম পর্যায়ে তিনি ঈমান ও ইসলামের দাওয়াত ও প্রচারের কাজ শুরু করেন। এই প্রচার ছিল সীমিত আকারে।
৩. তিন বছর ব্যক্তি পর্যায়ে দাওয়াত দেয়ার পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রকাশ্যে গণ পর্যায়ে ইসলামের প্রচার শুরু করেন।
৪. প্রকাশ্যে গণ পর্যায়ে ইসলামের দাওয়াত প্রচারের শুরুতেই কুরাইশরা বিভিন্ন উপায়ে চেষ্টা করতে লাগলো রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)কে ইসলামের দাওয়াত ও তাবলীগ হতে ফিরিয়ে রাখতে। স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় কাজ না হওয়ায় তারা উপহাস, ঠাট্টা-তামাশা, ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ, গালাগালি, অশালীন অপবাদ, শারীরিক ও মানষিক নির্যাতন, অবর্ণনীয় কষ্ট-ক্লেশ দেয়াকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা শুরু করে।
৫. রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)কে ইসলামের দাওয়াত ও তাবলীগ হতে ফিরিয়ে রাখতে চাচা আবু তালিবের নিকট কুরাইশদের প্রতিনিধি দল প্রেরণ।
৬. কুরাইশদের পক্ষ হতে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে ইসলামের দাওয়াত ও তাবলীগ হতে ফিরে আসার বিনিময়ে তাঁকে মক্কার সবচেয়ে সুন্দরী রমণী, কা’বা গৃহের চাবি, অঢেল স¤পত্তি এমনকি দার-উন-নাদওয়া’য় (কাফির-মুশরিকদের সংসদে) সদস্য পদ দানের মতো বিভিন্ন উপহার উপঢৌকন প্রদানের লোভনীয় প্রস্তাবও দিয়েছিল। জবাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছিলেন, “আমার এক হাতে সূর্য এবং আরেক হাতে চন্দ্র এনে দিলেও আমি সত্য প্রচার হতে বিমুখ হব না।” যখন তাকে ওয়ালীদ ইবনে মুগীরা, ওমাইয়া ইবন খলফ বলেন, “আসেন আমরা পরস্পরের মধ্যে শান্তিচুক্তি করি যে, এক বছর আল্লাহর ইবাদাত করবো আর এক বছর দেব-দেবীর পূঁজা করবো।” তখন আল্লাহ নাজিল করেন যে, “তোমাদের (কাফিরদের) দ্বীন (ও কর্মফল) তোমাদের জন্য, আমাদের দ্বীন (ইসলাম) আমাদের জন্য।” [সূরা কাফিরুন ১০৯:০৬]। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন এই প্রস্তাব পেয়েছিলেন তখন মক্কায় মুসলমানদের অবস্থা ছিল চরম দুর্বিষহ। প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হওয়ায় কাফির-মুশরিকরা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে হত্যার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলো।
৭. চরম নির্যাতনের মুখে নবুওয়তের পঞ্চম বর্ষের মধ্যভাগে কিছু মুসলিম হিযরত করলেন আবিসিনিয়ায়।
৮. অন্যায় জুলুম নিপীড়ন সহ্য করতে না পেরে দ্বিতীয় দফায় ৮২/৮৩ জন পুরুষ ও ১৮/১৯ জন নারী আবিসিনিয়ায় হিযরত করলেন।
৯. বাদশাহ নাজাশীর দরবারে কুরাইশ প্রতিনিধি দল। বাদশার নিকট হিযরত করে আসা মুসলিমদেরকে তাদের হাতে তুলে দেওয়ার আহ্বান। মুসলিমদের সাথে আলোচনা পূর্বক কুরাইশদের উক্ত প্রস্তাব নাজাশী কর্তৃক প্রত্যাখ্যান।
১০. এরপর যে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাটি ঘটে তা হল উমার ইবনুল খাত্তাবের ইসলাম গ্রহণ। আরব সমাজে উমার রাযিআল্লাহু আনহু-এর বিশেষ প্রভাব থাকায় তার ইসলাম গ্রহণ ইসলাম প্রচারকে খানিকটা সহজ করে।
১১. এরপর একসময় নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর চাচা হামযা রাযিআল্লাহু আনহু ইসলাম গ্রহণ করেন। তার ইসলাম গ্রহণে আরবে মুসলিমদের আধিপত্য কিছুটা হলেও প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু মক্কায় মুসলিমদের উপর কুরাইশ মুশরিকদের নির্যাতনের মাত্রা কমলো না।
১২. নবুওয়তের সপ্তম বৎসরের মুহাররম মাসে মক্কার সকল গোত্রের কাফির-মুশরিকরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে বনু হাশেম গোত্রকে বয়কট করার চুক্তি সম্পাদন করলো। চুক্তিতে স্থির করা হলো যে, বনু হাশেম গোত্র যতক্ষণ মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে তাদের হাতে সমর্পণ না করবে এবং তাকে হত্যা করার অধিকার না দেবে, ততক্ষণ কেউ তাদের সাথে কোন আত্মীয়তা রাখবে না, বিয়ে-শাদির সম্পর্ক পাতাবে না, লেনদেন ও মেলামেশা করবে না এবং কোন খাদ্য ও পানীয় দ্রব্য তাদের কাছে পৌঁছাতে দেবে না। আবূ তালিবের সাথে একাধিকবার কথাবার্তার পরও আবূ তালিব রাসূল মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে নিজের অভিভাবকত্ব থেকে বের করতে প্রস্তুত হননি। আর তার কারণে বনু হাশেমও তার সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করতে পারেনি। এই কারণে হতাশ হয়ে তারা ঐ চুক্তি সম্পাদন করে। গোত্রীয় ব্যবস্থায় এ সিদ্ধান্তটা ছিল অত্যন্ত মারাত্মক এবং চূড়ান্ত পদক্ষেপ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও মুসলিমগণ সহ সমগ্র বনু হাশেম গোত্র অসহায় অবস্থায় ‘শিয়াবে আবূ তালিব’ নামক উপত্যকায় বন্দী হয়ে গেল।
১৩. তিন বৎসর পর নবুওয়তের দশম বৎসর মুহাররম মাসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বক্তব্যের সত্যতা অনুযায়ী বিশেষ অঙ্গীকার নামার অধিকাংশ পোকায় খেয়ে ফেলার পর তা ছিন্ন করার মাধ্যমে আল্লাহ পাক তাদেরকে এ বন্দী দশা থেকে মুক্তির ব্যবস্থা করেন।
১৪. গিরি সঙ্কট থেকে মুক্তি লাভের ছয় মাসের মাথায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পিতৃব্য চাচা আবূ তালিব মৃত্যু বরণ করেন।
১৫. চাচা আবূ তালিব মৃত্যুর দু’মাস (মতান্তরে মাত্র তিন দিন) পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রিয় সহধর্মীনি উম্মুল মু’মিনীন হযরত খাদিজাতুল কুবরা (রাযিআল্লাহু আনহু) ইন্তেকাল করেন।
১৬. এমন এক পরিস্থিতিতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কায় ইসলামের প্রসারের ব্যাপরে অনেকটাই হতাশ হয়ে পড়েন। হতাশ হয়ে নবুওয়তের দশম বছর শাওয়াল মাসে তিনি মক্কা বাদ দিয়ে এবার ইসলাম প্রচারের জন্য তায়েফ গমন করলেন। কিন্তু সেখানে ইসলাম প্রচার করতে গিয়ে চূড়ান্ত অপমান, ক্রোধ ও উপহাসের শিকার হলেন।
১৭. ইতোমধ্যে মদীনার বেশকিছু লোক ইসলামের প্রতি উৎসাহী হয়ে উঠেন। এদের মধ্যে ছয়জন ইসলাম গ্রহণ করে। তারা মূলতঃ হজ্জ্ব করতে এসে ইসলামের দাওয়াত পেয়েছিল।
১৮. আকাবার শপথ অনুষ্ঠিত হয়। এর ফলেই মদীনায় ইসলাম প্রতিষ্ঠার উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি হয় এবং একসময় মদীনার ১২ টি গোত্রের নেতারা একটি প্রতিনিধিদল প্রেরণের মাধ্যমে রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে মদীনায় আসার আমন্ত্রণ জানায়। তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে নিরাপত্তা দানের প্রতিশ্র“তি দেন। বিশিষ্ট সিরাতকার ইবনে ইসহাক বর্ণিত, “যখন লোকজন বায়াতের জন্য সমবেত হলেন, তখন হযরত আব্বাস বিন উবাদাহ বিন নাযলাহ (রাযিআল্লাহু আনহু) বললেন, তোমারা কি জানো, তোমরা তাঁর সাথে কোন্ কথার উপর বায়াত করতে যাচ্ছ? সবাই উত্তর দিলো, হ্যাঁ জানি। হযরত আব্বাস বললেন, “তোমরা লাল ও কালো লোকদের বিরুদ্ধে জান্নাতের বিনিময়ে যুদ্ধ করার ব্যাপারে তাঁর হাতে বায়াত করতে যাচ্ছ। যদি তোমাদের এ রকম ধারণা হয় যে, যখন তোমাদের ধন-স¤পদ নিঃশেষ হয়ে যাবে, তোমাদের অভিজাত নেতৃস্থানীয় লোকদের হত্যা করা হবে, তখন তোমরা তাঁর সঙ্গ ছেড়ে যাবে, তবে এখনই তাঁকে পরিত্যাগ করো। কেননা তাঁকে নিয়ে যাবার পর, যদি তোমরা তাঁকে ছেড়ে যাও তাহলে তা হবে তোমাদের ইহকাল ও পরকালের জন্য চরম বেইজ্জতির ব্যাপার।” [আর রাহীকুল মাখতুম, পৃ. ১৯৫, তাওহীদ পাবলিকেশন্স]
দেখা যাচ্ছে, এ শপথ ইসলাম গ্রহণ করার শপথ ছাড়াও যুদ্ধের সম্ভাবনা মাথায় নিয়েও রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে মদীনা নিয়ে যাওয়ার শপথ ছিলো। দেখুন মুসনাদে আহমদ-এ বর্ণিত নীচের হাদিসটি-
হযরত জাবির (রাযিআল্লাহু আনহু) বর্ণিত, “সমবেত ৭০ জন লোক বায়াতের জন্য উঠলে, তাদের মধ্যে সবচেয়ে কম বয়সী আসয়াদ ইবনে যুরারা (রাযিআল্লাহু আনহু) রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর হাত ধরে বললেন, ইয়াসরিববাসী একটু থামো। আমরা তাঁর কাছে উটের বুক শুকানো দূরত্ব অতিক্রম করে এই বিশ্বাস নিয়ে এসেছি যে, তিনি আল্লাহর রাসূল। আজ তাকে মক্কা থেকে নিয়ে যাওয়ার অর্থ হচ্ছে, সমগ্র আরবের সাথে শত্রুতা, তোমাদের বিশিষ্ট নেতাদের নিহত হওয়া ও তলোয়ারের ঝনঝনানি। কাজেই এসব যদি সহ্য করতে পারো তবেই তাঁকে নিয়ে যাও। তোমাদের এ কাজের বিনিময় আল্লাহর কাছে রয়েছে। আর যদি নিজের প্রাণ তোমাদের কাছে প্রিয় হয়ে থাকে, তবে তাঁকে এখানেই ছেড়ে যাও। এটা হবে আল্লাহর কাছে তোমাদের অধিক গ্রহণযোগ্য ওযর”।
১৯. এই আমন্ত্রণে মুসলিমরা মক্কা থেকে হিজরত করে মদীনায় চলে যায়। সবশেষে মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও আবু বকর (রাযিআল্লাহু আনহু) ৬২২ ঈসায়ী সালে মদীনায় হিজরত করেন। বর্ণিত আছে: “মদীনায় প্রবেশের পূর্বে নবীজী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কুবা’তে চারদিন (সোমবার-বৃহস্পতিবার) অবস্থান করেন। আর এ সময়ের মধ্যেই মসজিদে কুবা’র ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করলেন এবং তাতে সালাতও আদায় করলেন। তাঁর নবুওয়ত প্রাপ্তির পর এটাই হচ্ছে সর্বপ্রথম মসজিদ যার বুনিয়াদ তাকওয়ার উপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। পঞ্চম দিন জুমু’আ বার তিনি আল্লাহর নির্দেশে সওয়ারীতে আরোহন করেন। তখন আবু বকর (রাযিআল্লাহু আনহু) তাঁর পিছনে আরোহনকারী ছিলেন। কুবা থেকে রওয়ানা হওয়ার আগে তিনি তাঁর মাতুল গোত্র বনু নায্যারদেরকে সংবাদ প্রেরণ করেছিলেন। ফলে তারা তরবারী ধারণ করে উপস্থিত হলেন। তিনি তাদেরকে সাথে নিয়ে মদীনা অভিমূখে রওয়ানা হলেন।” [যাদুল মা’আাদ, ২য় খন্ড, পৃ.৫৪-৫৫, সীরাতে ইবনে হিশাম, ১ম খন্ড, পৃ.৪৯৪; আর রাহীকুল মাখতুম, পৃ.২১৭, তাওহীদ পাবলিকেশন্স]
২০. নবীজী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর আগমনের পর মুসলিমরা ক্রমান্বয়ে চারদিক থেকে এসে মদীনায় জমায়েত হচ্ছিল। পূর্বের মতোই দাওয়াত ও তাবলীগের কাজ জোরদার গতিতে চলতে থাকে।
২১. মক্কা থেকে যারা হিজরত করেছিল তারা এবং মদীনার মুসলিমগণের মধ্যে খিলাফত প্রতিষ্ঠার চেতনা সৃষ্টি হয়। নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মুসলিমদের মধ্যে বিশেষ ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক স্থাপন করান। অতঃপর শুধু মুসলিমদের নিজেদের মধ্যে পৃথক সহযোগীতার অংগীকার করান এবং তাদেরকে “অন্য সকল মানুষ থেকে পৃথক এক মানব গোষ্ঠী বা উম্মাহ” হিসেবে অভিহিত করেন। [আর রাহীকুল মাখতুম, পৃ.২২৯-২৩১, তাওহীদ পাবলিকেশন্স]
মুসলিমদের বাইরে তিনি ইহুদীদের সাথে চুক্তিতে আবদ্ধ হন। যাতে ০১ নং ধারায় উল্লেখ ছিলো যে, বনু আওফের ইহুদীরা মুসলিমদের সাথে মিলেমিশে একই উম্মতের মতো থাকবে। কিন্তু উভয় সম্প্রদায়ের লোকেরাই স্বাধীনভাবে নিজ নিজ ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানসমূহ পালন করতে পারবে। এটা তাদের নিজেদের অধিকার হিসেবে গণ্য হবে। ঠিক তেমনিভাবে তাদের সঙ্গে যারা সম্পর্কিত তাদের এবং তাদের দাস-দাসীদের বেলায়ও গণ্য হবে। বনু আওফ ছাড়া অন্য ইহুদীদের ক্ষেত্রেও তা প্রযোজ্য হবে। তাছাড়াও ০৯ নং ধারায় উল্লেখ ছিলো: চুক্তিবদ্ধ পক্ষগুলো নতুন সমস্যা কিংবা ঝগড়া-ফ্যাসাদে জড়িয়ে পড়ার উপক্রম হলে আল্লাহর আইন অনুযায়ী রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার মীমাংসা করবেন। [আর রাহীকুল মাখতুম, পৃ.২৩৬, তাওহীদ পাবলিকেশন্স, ইবনে হিসাম, ১ম খন্ড, পৃঃ ৫০৩-৫০৪]
অর্থাৎ মদীনা মুসলিমদের আয়ত্বে আসার পর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সেটাকে ইসলাম অনুযায়ী পরিচালনা করেন। জনগণের কোন প্রাণের দাবীর জন্য তিনি অপেক্ষা করেন নি। ইহুদীরাও মদীনার খিলাফতের অন্তর্ভূক্ত ছিলো। আর ইহুদীদের সাথে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর চুক্তিতে বর্তমানের অনেক আপোষকামী ইসলামপন্থীদের বিভিন্ন চুক্তির সমর্থন পাওয়া যায়না। কারণ রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর চুক্তি অনুযায়ী তিনি ছিলেন সর্বেসর্বা, ইসলাম ছিলো বিজয়ী, যে কোন ব্যাপারে মতভেদ-বিবাদ হলে আল্লাহর আইন অনুযায়ী তা মীমাংসা হতো আর বর্তমানে যে সব চুক্তি-সনদ সাক্ষরিত হয় তাতে ইসলামের/আল্লাহর আইনের কোন অংশতো থাকেই না বরং অপর পক্ষের দয়ার উপর ইসলাম পন্থীরা টিকে থাকেন। আর অধিকাংশ/সকল যৌথ সিদ্ধান্ত হয় অনৈসলামিক রীতি-নীতি অনুযায়ী, যাতে দ্বীন ইসলামের দিকে ভ্র“ক্ষেপও করা হয় না কিংবা নিজেদের খেয়াল-খুশীকেই প্রাধান্য দেয়া হয়, যার কোন বৈধতা ইসলামে নেই।
২২. রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)কে রাষ্ট্রনায়ক করে মদীনায় একটি খিলাফত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবী ওঠে। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর মদীনায় আসা এটাই প্রমাণ করে যে, মুসলিমরা মদীনার নেতৃত্ব নিতে এসেছেন। এটা শুধুমাত্র মদীনার জনগণের প্রাণের দাবী হয়ে থাকলে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তলোয়ারসহ বনু নাযযারদেরকে মদীনায় প্রবেশ করার সময় সাথে রাখতেন না। বরং তাঁর এ ধরনের প্রবেশ এটাই প্রমাণ করে যে, জণগণের প্রাণের দাবীর পাশাপাশি (অধিকাংশ জণগণ বলতে চাইলে যে কাউকে দলীল-প্রমাণ হাজির করতে হবে) শক্তি-সামর্থের মাধ্যমে মুসলিমরা মদীনার কর্তৃত্বে আসেন। স্বভাবতই রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হন, তাদের নেতা/আমীর/খলিফা।
২৩. অতঃপর মদীনার আনসার এবং মুহাজির সহ সকল স্তরের জনগণকে নিয়ে একটি ইসলামী খিলাফত গঠিত হয়। এই খিলাফতে শুধু মুসলিমরা ছিলেন না, মদীনার অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরাও ছিলেন। আর এটাকে হয়তো ঐ আনসার এবং মুহাজিরদের ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠির বিপ্লব বলা যায়, যার মাঝে জনসমর্থন ও সশস্ত্র শক্তির সমন্বয় ছিলো।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s