হুদাইবিয়ার সন্ধি সম্পর্কে গণতান্ত্রিক ইসলামী দলগুলোর বিভ্রান্তি

আল্লাহ্’র প্রেরীত সর্বশেষ নাবী ও রাসূল হলেন হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম । তার মতাদর্শ ছিল ইসলাম, রাষ্ট্র ছিল মদীনায় এবং প্রধান শত্রু ছিল মক্কার কুরাইশ সম্প্রদায়। কুরাইশদের অন্যতম মিত্র খাইবার গোত্র মদীনায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর রাষ্ট্রের সাথেই বসবাস করতো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একথা জানতেন যে, আর যত যা-ই হোক; কুরাইশরা তাঁর সাথে নিষিদ্ধ মাসে যুদ্ধে লিপ্ত হবে না। সুতরাং, যদি তিনি নিষিদ্ধ এই চার মাসের কোন সময়ে হজ্জ্ব করতে মক্কায় যান, তাহলে কুরাইশরা বিপদে পড়ে যাবে। কারণ, তারা না পারবে তাকে যুদ্ধ করে সরিয়ে দিতে, আর তিনিও নাছোড়বান্দার মতো কাবা ভ্রমণ করতে না দিলে সে স্থান ত্যাগ না করার হুমকি দিবেন। ফলশ্র“তিতে যা হবে, তা হচ্ছে একটি শান্তিচুক্তি না যুদ্ধবিরতি চুক্তি। আর যদি সেটা কোনোভাবে বেশ কিছুদিনের মেয়াদে বাড়িয়ে নেয়া যায়, তাহলেই কুরাইশরা নির্জীব হয়ে যাবে। তার পরে আসল যে সুবিধাটা মুসলিমরা পাবে সেটা হচ্ছে, খাইবারের ইহুদীরা একা হয়ে যাবে এবং খুব সহজেই খাইবারের ইহুদীদের উপর অভিযান চালানো যাবে।
হিজরি ৬ষ্ঠ সনের জিলকদ মাস। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পূর্বপরিকল্পনা মাফিক চৌদ্দশত (১৪০০) সাহাবী এবং ৭০টি উট নিয়ে মক্কা অভিমুখে রওয়ানা দিলেন উমরা পালন করার জন্য। মক্কার কাছাকাছি উসফান নামক স্থানে পৌছার পর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সংবাদ পান যে, মুসলমানদের মক্কার দিকে আসার খবর পেয়ে কুরাইশরা তাদের বীর যোদ্ধা খালিদ বিন ওয়ালিদ এবং আবু জাহেল তনয় ইকরামার নেতৃত্বে ২০০ অশ্বারোহী সহ এক বাহিনী পাঠাচ্ছে তাদের মক্কা আগমন রোধ করার জন্য। কুরাইশদের যুদ্ধ প্রস্তুতির খবর পেয়ে সংঘাত এড়ানোর জন্য এবং কুরাইশদের মনে ভীতির সঞ্চার করার জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম গৎবাঁধা সরল পথ দিয়ে মক্কায় না এসে বনু আসলাম গোত্রের এক ব্যাক্তির সহায়তায় এক বিকল্প দুর্গম পথ দিয়ে হুদাইবিয়া উপত্যকার দিকে এগিয়ে যেতে থাকেন। সানিয়াতুল মুরার নামক স্থানে গিয়ে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উট থেমে যায় এবং সেখানে তিনি যাত্রাবিরতির নির্দেশ দেন। অপরদিকে কুরাইশদের পক্ষ থেকে সামরিক অভিযানের হুমকি আসতে থাকে। একপর্যায়ে কুরাইশদের পক্ষ থেকে সুহায়ল ইবনে আমরকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নিকট দূত হিসাবে পাঠানো হয়। তার নিকট থেকে মুসলমানদের মক্কা আগমণের উদ্দেশ্য এবং মুসলমানদের হাবভাবে তারা নিশ্চিত হলো যে, মুসলমানরা যুদ্ধ নয় বরং কা’বা তাওয়াফ করতেই মক্কা এসেছে। তবুও নেহায়েৎ দাম্ভিকতার কারণেই কুরাইশরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে কা’বা তাওয়াফ করা থেকে বিরত রাখলো। যেহেতু মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে হজ্জ্ব করতে দেয়া হবে না, এবং সে তা করতে না দিলে নিষিদ্ধ মাসে যুদ্ধের অবতারণা করতে পারে, তাই কুরাইশরা ভাবলো এটাই মহা সুযোগ। এবারে নিজেদের ইচ্ছামতো একটি যুদ্ধবিরতি বা শান্তিচুক্তি করে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উপর কিছুটা ঝাল মিটানো যাবে। যদিও এখানেই তারা মহা ভুলটা করে বসলো, তবুও আপাতদৃষ্টিতে তারা ভাবলো মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বাঁটে ফালানো গেল। অবশেষে সন্ধির ব্যপারে উভয়পক্ষের মতৈক্য প্রতিষ্ঠিত হলে শেষ পর্যন্ত সেখানে একটি সন্ধিচুক্তি লিপিবদ্ধ হয়। যা ইতিহাসে হুদাইবিয়া সন্ধি নামে পরিচিত।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাহাবীদের অনেকেই তাঁর এহেন কাজে অবাক হচ্ছিলেন এবং মনে মনে ভাবছিলেন তিনি কুরাইশদের দেয়া সকল শর্ত মেনে চুক্তির মাধ্যমে সমঝোতা করছেন কি না। তারা এজন্যও অবাক হলেন যে, যেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সারা জীবনে সমঝোতার ধার ধারেননি তিনি কি করে এই কাজটা করতে পারলেন। তবে কি মতাদর্শ হিসেবে ইসলাম এতোটাই ঠুনকো যে এটাকে অন্য মতাদর্শের সাথে সমঝোতা করে চলতে হবে? অথচ আল্লাহ তা’য়ালা বলেছেন, “তিনি তার রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)কে হিদায়াত (কুরআন) ও সত্য দ্বীন (মতাদর্শ-জীবন ব্যবস্থা) দিয়ে প্রেরণ করেছেন যেন তা অন্যান্য দ্বীনের উপর কর্তৃত্ব লাভ করতে পারে যদিও মুশরিকরা তা অপছন্দ করে।” [সূরা আছ-ছফ ৬১:০৯]
চলুন আপাতত চোখ বুলিয়ে নেয়া যাক রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সাথে করা হুদাইবিয়ার প্রান্তে এই যুদ্ধবিরতি-শান্তি চুক্তির ধারাগুলোর দিকে, কী লিখা ছিলো তাতে এবং এগুলো কি আদৌ সমঝোতা ছিলো নাকি কুরাইশদের জন্য ফাঁদ ছিল। হুদাইবিয়া সন্ধিচুক্তির ধারাসমুহ হচ্ছে :
(১) মুসলমানগণ এ বছর উমরা হজ্জ না করেই মদীনায় ফিরে যাবে।
(২) আগামী বছর উমরার জন্য এসে তারা তিন দিন মক্কায় অবস্থান করতে পারবে।
(৩) মুসলমানরা কোষবদ্ধ তলোয়ার নিয়ে আসবে, অন্য কোন অস্ত্র আনবে না এবং তাদের অবস্থানকালে কুরাইশরা মক্কা ত্যাগ করে অন্যত্র চলে যাবে।
(৪) কুরাইশ এবং মুসলমানরা চুক্তিতে বর্ণিত সময়ে পরস্পরের মধ্যে সকল প্রকার যুদ্ধ ও হানাহানি হতে বিরত থাকবে।
(৫) কুরাইশদের মধ্যে কেউ যদি অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া মদীনায় আসে তবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে মক্কায় তার অভিভাবকের কাছে ফিরিয়ে দিতে বাধ্য থাকবেন। পক্ষান্তরে, মুসলিমদের কেউ মক্কায় আসলে তাকে কুরাইশরা মদীনায় ফিরিয়ে দিতে বাধ্য থাকবে না।
(৬) আরবের যেকোন গোত্রের লোক মুসলমানদের বা কুরাইশদের সাথে সন্ধিসূত্রে আবদ্ধ হতে পারবে।
(৭) চুক্তির মেয়াদকাল দশ বছর। তবে যেকোনো পক্ষ থেকে শর্ত ভঙ্গ ঘটলে এ চুক্তির সমাপ্তি ঘটবে। [সূত্র: সীরাতে ইবনে হিশাম]
আপেক্ষিক দৃষ্টিতে আমরা তো বটেই উপস্থিত সাহাবীদের কাছেও ব্যাপারটি এক প্রকার মাথা নিচু করে তাদের সকল প্রস্তাব মেনে নেয়াই মনে হচ্ছিল। কিন্তু একটু গভীরভাবে খুঁটিয়ে দেখলে আমরা দেখব যে, এই সন্ধিচুক্তি মুসলমানদের পক্ষ থেকে কুরাইশদেরকে নির্জীব করে দেয়ার একটি সূক্ষ্ণ চাল মাত্র। কিভাবে? সেটা একটু নীচে চোখ বুলালেই বুঝতে পারবেন আশা করি।
১) সেই বছর মুসলমানদের হজ্জ্ব করা ব্যতীতই ফিরে যেতে হলো। কিন্তু এটাকে কি পরাজয় বলা যায়? হজ্জ্ব তো মুসলমানরা পরের বছরেই করতে পারবে। আর এ বছরই হজ্জ করতে হবে এটাতো আল্লাহ্র নির্দেশও ছিলনা। সুতরাং প্রকৃত ব্যাপারটি ছিলো হজ্জ্ব করার উদ্দেশ্যে এসে কুরাইশদেরকে সন্ধিচুক্তি করাতে বাধ্য করানো, শুধু হজ্জ্ব করা নয়।
২) সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই চুক্তির ফলে কুরাইশদের সাথে তাদের মিত্র খাইবারের ইহুদীদের যুদ্ধচুক্তির সমাধি ঘটে (যখন সে যুদ্ধ মুসলমানদের বিরুদ্ধে হয়)। এর ফলে খাইবারের ইহুদীরা একা হয়ে পড়ে এবং প্রায় মাসখানিক পরেই খুব সহজেই মুসলিমরা খাইবার বিজয় করে।
৩) যেহেতু পুরো হুদাইবিয়া চুক্তির প্রারম্ভের পূর্বের মুহূর্তে মুসলিমদের আচার-আচরণ ছিল খুবই শিষ্ট এবং শান্তিপূর্ণ আর অন্যদিকে কুরাইশদের আচরণ ছিলো দাম্ভিকতাপূর্ণ ফলে, আরব উপত্যকার অধিকাংশ গোত্রের অধিবাসীর মত মুসলিমদের পক্ষে চলে যায় যা তাদের মনে ইসলামকে গ্রহণ করার একটি অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করে।
৪) এই চুক্তি এবং খাইবারের ইহুদীদের সাথে অভিযান শেষে মুসলিমরা বিভিন্ন রাষ্ট্রে ইসলামের দাওয়াত পৌছানোর কাজে আত্মনিয়োগ করতে পারে নির্বিঘ্ন। কারণ,আপাতত তাদের মাথা থেকে বড়সড় কোনো যুদ্ধের পরিকল্পনা এবং প্রস্তুতির তাগিদ ছিল না। পারস্য, রোম এবং মিশরের রাষ্ট্রপ্রধানদের কাছে পাঠানো ঐতিহাসিক চিঠিসমূহ এই সময়েই শুরু করা হয়।
৫) কোনো কুরাইশ মদীনায় আসলে সে ইসলাম নামক জীবন ব্যবস্থার বাস্তব জীবনে প্রতিফলনের স্বরূপ দেখে মুগ্ধ হয়ে ইসলাম গ্রহণ করার সুবর্ণ সুযোগ পেত।পরবর্তীতে সে মক্কায় ফিরে গেলে সেখানেও সে ইসলামের বাণী এবং কোরআনের শাসনের সুফল বর্ণণা করে ইসলামের উপকার করতে পারত।
৬) কোনো মুসলমান মক্কায় গেলে সে সেখানে ইসলামের বাণী বহন করতে পারতো। এর ফলে, মক্কার লোকেরাও ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হবার সুযোগ পেল।
হুদাইবিয়ার পরেই আল্লাহ নাজিল করেন- “আমি আপনাকে মহাবিজয় দান করলাম” [সূরা ফাতহ ৪৮:০১]
৫ এবং ৬ নং ব্যাখ্যা দেখে কারো মনে হতেই পারে যে, জীবন বাজি রেখে ইসলামের দাওয়াত দেয়ার সুযোগ নিশ্চিত করা, এটা কেমন বিজয়!! কিন্তু বাস্তবে চিন্তা করে দেখুন, একজন মুসলিমের জীবনের আদর্শ  যদি হয় জীবনে সর্বাবস্থায় আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন, তাহলে কি তার পক্ষে দাওয়াতের কাজে বের হওয়া, জিহাদে বের হওয়া কিংবা একা কোনো কাফির রাষ্ট্রে দূত হিসেবে গমন করা কোনো সমস্যা? আরেকটি বিষয় উল্লেখ না করলেই নয়, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বা সাহাবীরা কখনো মুসলিম রক্ষার জন্য ইসলামকে বিসর্জন দেননি। আমরা যদি একথা মনে করে থাকি যে, আমরা ইসলাম আঁকড়ে ধরার কারণে মারা গেলে কিংবা আহত হলে ইসলাম এগিয়ে নিবে কে, তবে তা হবে ভয়ঙ্কর রকমের ভুল ধারণা। ইসলাম রক্ষার দায়িত্ব না আপনার, না আমার। এর দায়িত্ব নিয়েছেন স্বয়ং আল্লাহ্ রাব্বুল আ’লামীন। আমরা গুটিকয়েক লোক এর মাধ্যম হিসেবে নিজেদেরকে কাজে লাগাতে পারলে আল্লাহ্’র কাছে পরকালে এর জন্য আমরা হয়তো নিজেদের পক্ষে কিছু প্রমাণ নিয়ে যেতে পারবো, এর বেশি উচ্ছসিত হবার মত কিছুই না। কিন্তু, ইসলামের দাওয়াত দেওয়া, ইসলাম প্রতিষ্ঠা করার জন্য কাজ করা প্রভৃতি প্রতিটি কাজই ইসলামের মধ্যে থেকে আমাদের চেষ্টা করতে হবে। সেক্যুলার ব্যবস্থায় ঢুকে গিয়ে আমরা সেক্যুলারিজমেরই বদনাম করে ইসলাম আনবো একথাটা বাস্তবে কেন, কল্পনাতেও সম্ভব না।
এবারে আশা যাক আমাদের মূল ধারার আলোচনায়। আমাদের আশেপাশে অনেকেই আছেন যারা কিছু সাধারণ ব্যাধিতে আক্রান্ত। তারা ভেবে বসে আছেন যে, ইসলামকে টিকিয়ে রাখতে হলে কুফরের সাথে সমঝোতা অবলম্বন করা ছাড়া উপায় নেই। তারা আরো ভাবেন যে, ইসলাম রক্ষার জন্য একটু ইসলাম বিসর্জন করে হলেও মুসলিমদের জান বাঁচানো উচিত। এবং সবচেয়ে কষ্টের ব্যাপার হচ্ছে উনারা তাদের এই সকল দৃষ্টিভঙ্গির (viewpoint) পক্ষে উদাহরণ (reference) হিসেবে সেই হুদাইবিয়া সন্ধিকে টেনে আনেন যেই সন্ধির নাম শুনলে কাফিররা আজও অনুশোচনা করতে থাকে, তারা এমন ভুল কিভাবে করলো, যে সন্ধির মাধ্যমে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর দূরদর্শিতা এবং ইসলামের পররাষ্ট্রনীতি কতটা কার্যকারী তার প্রমাণ মেলে। উনারা প্রকৃতপক্ষে তিনটি জায়গায় ভুল করে থাকেন এই হুদাইবিয়া সন্ধির ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে।
১) প্রমাণ করেন যে, ইসলাম কুফরের সাথে সমঝোতা ছাড়া টিকতে পারে না।
২) প্রমাণ করেন যে, ইসলামে বিপদের সময়ে কাফিরদের ব্যবস্থায় অংশগ্রহণ করা যায়।
৩) প্রমাণ করেন যে, ইসলামকে টিকিয়ে রাখার জন্য সরাসরি প্রচলিত কুফরী ব্যবস্থার বিরোধীতা না করে কিছুটা ছাড় দিয়ে হলেও একটু একটু করে ইসলাম আনতে পারলে ক্ষতি কী?

বিতর্কে না গিয়ে জবাব হিসেবে তিনটি ঘটনাপ্রবাহ পেশ করছি জ্ঞানীরা বুঝতে পারবেন ইনশা আল্লাহ!
১) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিভিন্ন গোত্রের গোত্রপ্রধানের কাছে মাক্কী জীবনে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য নুসরাহ বা সহায়তা প্রার্থনা করেন। এদের মধ্যে কেবল মদীনার আউস এবং খাজরাজ গোত্র ব্যতীত সকলেই সমঝোতার নামে কিছু না কিছু শর্ত জুড়ে দেন। অর্থাৎ, ইসলাম ও কুফর সহাবস্থান করার শর্ত। কিন্তু, এদের কারো থেকেই তিনি সহায়তা গ্রহণ করননি। এই ঘটনা এটাই প্রমাণ করে যে, ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য ইসলাম-কুফরের সহাবস্থান থেকে আস্তে আস্তে একসময় ইসলাম আসবে এই নীতি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বর্জন করেছেন।
২) একথা না বললেই নয় যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে মক্কায় তাওহীদের বাণী প্রচারের প্রথম থেকেই কাফিররা তাকে শত প্রলোভন দেখিয়ে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব বা একাত্ববাদ প্রচার থেকে দূরে সরাতে চেয়েছে। তারা তাকে মক্কার সবচেয়ে সুন্দরী রমণী, কা’বা গৃহের চাবি, অঢেল সম্পত্তি এমনকি দার-উন-নাদওয়া এর পদে বসানোর মতো লোভনীয় প্রস্তাবও দিয়েছিল। জবাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছিলেন, “আমার এক হাতে সূর্য এবং আরেক হাতে চন্দ্র এনে দিলেও আমি সত্য প্রচার হতে বিমুখ হবো না।” যখন তাকে ওয়ালীদ ইবনে মুগীরা, উমাইয়া ইবন খালফ বলেন, “আসেন আমরা পরস্পরের মধ্যে শান্তিচুক্তি করি যে, এক বছর আল্লাহর ইবাদত করবো আর এক বছর দেব-দেবীর পূঁজা করবো।” তখন আল্লাহ নাজিল করেন যে, “তোমাদের (কাফিরদের) দ্বীন (ও কর্মফল) তোমাদের জন্য, আমাদের দ্বীন (ইসলাম) আমাদের জন্য।” [সূরা কাফিরুন ১০৯:০৬]। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন এই প্রস্তাব পেয়েছিলেন তখন মক্কায় মুসলমানদের অবস্থা ছিল চরম দুর্বিষহ।
৩) ‘ইসলামকে টিকিয়ে রাখার জন্য সরাসরি কুফরী ব্যবস্থার বিরোধীতা না করে একটু একটু করে ইসলাম আনতে পারলে ক্ষতি কী?’ যুক্তি খারাপ নয়, তবে বাস্তবতার নিরীখে যুক্তিদাতারা গণতন্ত্র, ব্যাংকিং, শেয়ার বর্জন করা তো দূরের কথা, বরং ইসলামের সাথে লিঙ্ক করে এসব কুফরী মতবাদের ইসলামী সংষ্করণ (Version) বের করে রীতিমত নিজেদের অনিচ্ছায় ইসলামের জায়গায় কুফরের উপকার করে চলছেন। আমরা ভুলে যাই কেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তো কখনো দার-উন-নাদওয়ায় গিয়ে একটু একটু করে ইসলাম আনেননি! তিনি তো কা’বার মূর্তির গায়ে কখনও হাতও বুলাননি, সমঝোতা তো দূরের কথা। আমাদের এত দুশ্চিন্তা করার কোনো কারণ নেই যে, আমাদের মৃত্যু হলে ইসলামের কী হবে? বরং, আমাদের বুঝা উচিত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ৩১৩ জন সাহাবী যখন বদরের যুদ্ধে তিনগুণ সমর সজ্জিত কাফির বাহিনীর সামনে উপনীত হন, তারা কি চিন্তা করেছিলেন যে আমরা মারা গেলে ইসলাম রক্ষা কে করবে? হযরত আবুবকর রাদিআল্লাহু আনহু যখন ইসলামের প্রথম খলীফা হন, তখন কিছু লোক যাকাত দিতে অস্বীকার করে। আবার ইয়েমেনের মুসাইলামাতুল কাযযাব নিজেকে নবী দাবী করে। কাফির পরাশক্তিগুলো সোচ্চার হয়ে উঠে ইসলামের বিরুদ্ধে। ওসামা বিন জায়েদ রাদিআল্লাহু আনহু এর নেতৃত্বে তখন একদল বাহিনী অভিযানে বের হয়েছিল। তখন কিছু সাহাবী বললেন, “এখন তো মদীনা সামলানোই কঠিন হয়ে পড়েছে, ওসামা রাদিআল্লাহু আনহু বাহিনীকে ফিরিয়ে আনলে হয় না?” কিছু সাহাবী বললেন, “যারা যাকাত দিতে অস্বীকার করে, তারা তো নামাজও পড়ে।” তখন আবুবকর রাদিআল্লাহু আনহু বলেন, “জেনে রাখো, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে বাহিনী রওয়ানা করিয়েছেন তার ক্ষণিক বিলম্বও আমি হতে দিব না, আর যারা যাকাত আর নামাজের মধ্যে পার্থক্য করে, যাকাত দিতে অস্বীকার করে, তাদের বিরুদ্ধে আমি যুদ্ধ ঘোষণা করলাম। জেনে রাখো, ইসলামের সামান্য ক্ষতিও আমি আবু বকর বেঁচে থাকতে হতে দিব না, প্রয়োজনে ইসলাম রক্ষার্থে আমার মত শত আবুবকর প্রাণ দিবে। তবুও মুসলিমদের রক্ষার স্বার্থে আমরা ইসলামের কোনো ছাড় দিবো না।”

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জীবন ইতিহাস (সীরাতুন্নবী) হতে ইসলাম প্রতিষ্ঠার বিভিন্ন হিকমত বা কৌশল সম্পর্কে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা থাকার পরও হুদাইবিয়ার সন্ধি সম্পর্কে গণতান্ত্রিক ইসলামী দলগুলোর ভ্রান্ত ধারণা (Misconception) মনকে ব্যথিত করে। আমাদের বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইসলামী দলগুলোর নেতা কর্মীদের যখন গণতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ বা জাতীয়তাবাদী দলগুলোর সাথে জোট বাঁধা বা আপোষ করার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করা হয়, তখন তারা হুদাইবিয়ার সন্ধির কথা বলেন এবং এই সন্ধির দোহাই দিয়ে কুফরি শক্তির সাথে আপোস বা জোট করার ব্যপারটাকে বৈধতা দান করেন। যদিও তাদের অনেককেই হুদাইবিয়ার সন্ধিতে কী বলা হয়েছে বা এটি কী ধরনের সন্ধি সে ব্যপারে জিজ্ঞেস করে কোন সদুত্তর পাইনি। যাই হোক হুদাইবিয়ার সন্ধির বিষয়বস্তুগুলো যেহেতু পূর্বেই আলোচনা করেছি সেহেতু সন্ধিটির কতিপয় বিশেষত্ব আসুন একবার দেখে নেই।

হুদাইবিয়ার সন্ধিটি ছিল মুলতঃ

  1. দু’টি রাষ্ট্রের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তি।
  2. একটি পররাষ্ট্র চুক্তি।
  3. এটি ইসলামী রাষ্ট্র মদীনা কর্তৃক সম্পাদিত হয়েছিল।
  4. এই সন্ধিচুক্তি ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়নি।
  5. এই চুক্তিতে কোন হারাম বিষয় বা শর্ত ছিলো না। কেননা সন্ধিটি আল্লাহ্ রাব্বুল আ’লামীন ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর ইচ্ছায় সম্পাদিত হয়েছিল।
  6. এই চুক্তির ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উমার রাদিআল্লাহু আনহুকে বলেছিলেন, আমি আল্লাহর বান্দা ও রাসূল। আমি তাঁর নির্দেশ কখনও লঙ্ঘন করবো না আর তিনিও আমাকে কখনও বিপথগামী করবেন না।  [সীরাতে ইবনে হিশাম]

সন্ধিচুক্তির ধরণই বলে দিচ্ছে, গণতন্ত্র বা কুফরি মতবাদের সন্ধিচুক্তির সাথে হুদাইবিয়ার মত মহান চুক্তির কোন তুলনাই হতে পারে না।

সুতরাং যে সব সন্ধিচুক্তি বা জোট দ্বারা গণতন্ত্র, নারী নেতৃত্বকে বৈধতা দেয়া হয়, জাতীয়তাবাদী বা ধর্মনিরপেক্ষ সরকারকে ক্ষমতায় বসানো হয় তা শরীয়তের অকাট্য দলিল দ্বারা নিশ্চিতভাবে শির্ক ও কুফর। এ প্রসঙ্গে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর হাদীস হলো-

“মুসলিমদের মধ্যে চুক্তি বৈধ, যদি চুক্তিতে এমন কোন শর্ত না থাকে, যা হালালকে হারাম করে বা হারামকে হালাল করে।” [তিরমিজী]

সুতরাং কতিপয় শায়খ, মুফতি বা মুফাসসির দ্বারা এসব চুক্তি বা জোট গঠিত হলেই তা যে বৈধ হবে এমন ভাবার কোন অবকাশ নেই। তাই কাউকে অন্ধ অনুকরণ করে নয় বরং কুরআন হাদিস ও ইসলামী মূলনীতি সমূহ কী বলে সেদিকে লক্ষ্য রেখেই ইসলামী রাজনীতি করা উচিত।

এখন কেউ হয়তো বলতে পারেন- যেই চুক্তিতে আল্লাহর রাসূলের নাম কেটে মুহাম্মদ ইবনে আব্দুল্লাহ লেখার মত “আপাত আপোষ” করা হয় সেই চুক্তিকে নিছক পররাষ্ট্র-নীতির মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া চরম মতলববাজী অথবা ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি বিদ্বেষ প্রসূত কথা নয় কি? সুতরাং ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো যখন গণতান্ত্রিক পন্থায় চলমান কুফর-ভিত্তিক ব্যাবস্থায় ঢোকে তখন তারাও এই “আপাত আপোষ” টাই করে। আর আল্লাহ্ হুদাইবিয়ার সন্ধীর “আপাত আপোষ” এর পর অসংখ্য সাহাবীর মনভংগ দেখে যেমন এটাকে “ফাতহুম মুবিন” বলেছিলেন সেরকম ভাবেই কোনো ইসলামী রাজনৈতিক দল যদি তাদের উদ্দেশ্যের প্রতি সৎ থাকে তাহলে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রবেশের মাধ্যমে তারা যে “আপাত আপোষ” করেছে তাও “ফাতহুম মুবিন”-এ পরিণত হবে।

জবাবে বলতে হয়- এ কথা হয়তো মেনে নেয়া যেতো যদি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হুদাইবিয়ার সন্ধির আপোষ চুক্তিটা শাসন ক্ষমতায় যাওয়ার পূর্বে করতেন। কিন্তু শাসন ক্ষমতায় যাওয়ার আগে তাঁকে আপোষের আহবান করা হলে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। বনু আমির (আমির বিন সা‘সা’আহ্) গোত্র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর শাসন কর্তৃত্ত্ব মেনে নিতে রাজী ছিল শুধু একটি শর্তের বিনিময়ে- তা ছিল রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর পর তাদের গোত্র থেকে শাসক নিয়োগ দেয়া নিশ্চিত করতে হবে। [সূত্র: আর রাহীকুল মাখতুম, অধ্যায়: ব্যক্তি এবং গোষ্ঠীকে ইসলামের দাওয়াত প্রদান, তাওহীদ পাবলিকেশন্স]

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে যখন এই ধরণের শর্তযুক্ত সমঝোতা প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিলো তখন মক্কায় মুসলমানদের অবস্থা কী পরিমাণ বর্ণনাতীত দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল তার কিছুটা বর্ণনা এ ভাবেই দিয়েছেন প্রখ্যাত লেখক নঈম সিদ্দিকী তাঁর ঐতিহাসিক সিরাত গ্রন্থ ‘মানবতার বন্ধু মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)’ বইতে-

‘‘ইসলামের অগ্রগতি ও বড় বড় প্রভাবশালী ব্যক্তির ইসলাম গ্রহণের দৃশ্য দেখে দিশেহরা হয়ে ওঠে প্রতিপক্ষ। নবুওয়তের সপ্তম বছরের মুহররম মাসে মক্কার সব গোত্র ঐক্যবদ্ধ হয়ে বনু হাশেম গোত্রকে বয়কট করার চুক্তি সম্পাদন করলো। চুক্তিতে স্থির করা হলো যে, বনু হাশেম গোত্র যতক্ষণ মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে তাদের হাতে সমর্পণ না করবে এবং তাকে হত্যা করার অধিকার না দেবে, ততক্ষণ কেউ তাদের সাথে কোন আত্মীয়তা রাখবে না, বিয়ে শাদির সম্পর্ক পাতাবে না, লেনদেন ও মেলামেশা করবে না এবং কোন খাদ্য ও পানীয় দ্রব্য তাদের কাছে পৌঁছাতে দেবে না। আবু তালিবের সাথে একাধিকবার কথাবার্তার পরও আবু তালিব রাসূল মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে নিজের অভিভাবকত্ব থেকে বের করতে প্রস্তুত হননি। আর তার কারণে বনু হাশেমও তার সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করতে পারেনি। এই কারণে হতাশ হয়ে তারা ঐ চুক্তি সম্পাদন করে। গোত্রীয় ব্যবস্থায় এ সিদ্ধান্তটা ছিল অত্যন্ত মারাত্মক এবং চূড়ান্ত পদক্ষেপ। সমগ্র বনু হাশেম গোত্র অসহায় অবস্থায় ‘শিয়াবে আবু তালেব’ নামক উপত্যকায় আটক হয়ে গেল। এই আটকাবস্থার মেয়াদ প্রায় তিন বছর দীর্ঘ হয়। এই সময় তাদের যে দুর্দশার মধ্য দিয়ে কাটে তার বিবরণ পড়লে পাষাণও গলে যায়। বনু হাশেমের লোকেরা গাছের পাতা পর্যন্ত চিবিয়ে এবং শুকনো চামড়া সিদ্ধ করে ও আগুনে ভেজে খেতে থাকে। অবস্থা এত দূর গড়ায় যে, বনু হাশেম গোত্রের নিষ্পাপ শিশু যখন ক্ষুধার যন্ত্রণায় কাঁদতো, তখন বহু দূর পর্যন্ত তার মর্মভেদী শব্দ শোনা যেত। কুরাইশরা এসব কান্নার শব্দ শুনে আনন্দে আত্মহারা হয়ে যেত। সমগ্র বনু হাশেম গোত্র একমাত্র ইসলামী আন্দোলনের নেতা মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কারণে এহেন বন্দিদশায় নিক্ষিপ্ত হলো। বয়কট এমন জোরদার ছিল যে, একবার হজরত খাদিজার ভাতিজা হাকিম বিন হিযাম তার ভৃত্যকে দিয়ে কিছু গম পাঠিয়ে দিচ্ছিলেন। পথিমধ্যে আবু জাহেল তা দেখে গম ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করলো। ঠিক এ সময় আবুল বুখতারিও এসে গেল এবং তার মধ্যে একটু মানবিক সহানুভূতি জেগে উঠলো। সে আবু জাহেলকে বললো, আরে ছেড়ে দাও না। এ ছাড়া হিশাম বিন আমরও লুকিয়ে লুকিয়ে কিছু গম পাঠাতো।”

এভাবেই পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব, মানবতার দরদী বন্ধু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এবং তাঁর সহচরদের উপর হয়েছিল অবর্ণনীয় জুলুম ও নির্যাতন। সহ্য করতে হয়েছে কারাবরণ, দেশান্তর, এমনকি হত্যার মতো জঘন্য কাজটিও সংঘটিত হয়েছে আল্লাহ্র মনোনীত এই ব্যক্তিদের কারো কারো জীবনে। কিন্তু তাঁরা প্রত্যেকেই তাঁদের রব্বের প্রতি মানুষকে আহ্বানের দায়িত্ব পালনে ছিলেন সদা অটল ও অবিচল। পৃথিবীর সকল কুফুরী শক্তিও তাঁদের টলাতে পারেনি একমাত্র প্রকৃত রব্ব মহান আল্লাহ্ রাব্বুল আ’লামীনের প্রতি মানুষকে দাওয়াত দেওয়া থেকে। এই অবর্ণনীয় অসহনীয় অবস্থায়ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বনু আমির গোত্র সহ মক্কার কাফিরদের কোন ঈমান ও ইসলাম বিরোধী শর্ত মেনে নিয়ে আপোষ রফা করতে রাজী হননি।

মদীনা মুসলিমদের আয়ত্বে আসার পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেটাকে আল্লাহ্ প্রদত্ত জীবন বিধান ইসলাম অনুযায়ী পরিচালনা করেছেন। অধিকাংশ জনগণের মত বা তাদের কোন প্রাণের দাবীর জন্য তিনি অপেক্ষা করেন নি। ইহুদীরাও মদীনার খিলাফাতের অন্তর্ভূক্ত ছিলো। আর ইহুদীদের সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর চুক্তিতে বর্তমানের কুফরের সাথে আপোষকামী ইসলামপন্থীদের বিভিন্ন চুক্তির সমর্থন পাওয়া যায় না। কারণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর চুক্তি অনুযায়ী তিনি ছিলেন সর্বে সর্বা, ইসলাম ছিলো বিজয়ী, যে কোন ব্যাপারে মতভেদ-বিবাদ হলে আল্লাহ্’র আইন অনুযায়ী তা মীমাংসা হতো। আর বর্তমানে যে সব চুক্তি-সনদ সাক্ষরিত হয় তাতে ইসলামের বা আল্লাহ্’র আইনের কোন অংশতো থাকেই না বরং অপর পক্ষের দয়ার উপর ঐসকল ইসলামপন্থীরা টিকে থাকেন। আর আপোস রফার পর প্রায় সকল যৌথ সিদ্ধান্ত হয় গণতান্ত্রিক রীতি-নীতি অনুযায়ী, তাতে দ্বীন-ইসলামের দিকে ভ্রুক্ষেপ না করে প্রাধান্য দেয়া হয় নিজেদের খেয়াল-খুশীকে, যার কোন বৈধতা ইসলামে নেই।

সুতরাং পরিশেষে এটুকুই বলতে চাই- ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর গণতান্ত্রিক পন্থায় চলমান কুফর-ভিত্তিক ব্যবস্থায় ঢোকার ক্ষেত্রে হুদাইবিয়ার সন্ধি কোনভাবেই উদাহরণ বা দলিল হতে পারে না।

আসলে অন্তর্দৃষ্টি দ্বারা দলিল-প্রমানকে বুঝতে হয়, মহান রব্বের কালামের চর্চা দ্বারা তাক্ওয়া অর্জন করতে হয় আর মুহাব্বাত ও আনুগত্যের মাধ্যমে ইবাদাত করতে হয়।

আল্লাহ আমাদেরকে তাঁর দ্বীন-ইসলাম প্রতিষ্ঠায় সহীহ্ বুঝ দান করুন। আমীন ইয়া রাব্বুল আ’লামীন।

2 thoughts on “হুদাইবিয়ার সন্ধি সম্পর্কে গণতান্ত্রিক ইসলামী দলগুলোর বিভ্রান্তি

  1. Afsun

    আপনি বোধহয় একটি বিষয় উল্লেখ করতে ভুলেগেছেন, এই শর্তানুযায়ী বনু খোজা‘আ গোত্র মুসলমানদের সাথে চুক্তিবদ্ধ হলো আর বনু বকর গোত্র মৈত্রী স্থাপন করলো কুরাইশদের সঙ্গে। আসলে মুসলমানরা বনু খোজা‘আ গোত্রের সাথে কেন চুক্তিবদ্ধ হলো? মদীনার আউস এবং খাজরাজ গোত্রের সাথে মুসলমানদের সন্ধি কেমন ছিল?

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s