রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি ঈমান ও আনুগত্য

বিতাড়িত অভিশপ্ত শয়তানের কুমন্ত্রনা হতে আমার মহান রব্বের নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করে
অতিশয় মেহেরবান দাতা ও দয়ালু আল্লাহ’র নামে শুরু করছি।

মহান রব্বের পক্ষ থেকে ফরমান জারী হয়েছে-
‘তোমরা ঈমান আন আল্লাহ্’র উপর, তাঁর রাসূলের উপর এবং যে নূর (কুরআন) আমি সৃষ্টি করেছি সেই নূরের (কুরআনের) উপর।’ [সূরা আত্ তাগাবুন : ৮]

ইমামুল আম্বিয়া ওয়াল মুরসালীন, সাইয়্যেদুল মুরসালীন, খাতামুন্নাবীয়্যিন, আখেরী রাসূল হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নবুওয়ত ও রিসালাত যেহেতু পবিত্র কুরআনুল করীমের সুস্পষ্ট আয়াত, সহীহ্ হাদীসে রাসূল এবং প্রকাশ্য ও জাজ্বল্যমান মু’জিযাসমূহ দ্বারা অকাট্যভাবে প্রমাণিত, সেহেতু তাঁর প্রতি ঈমান আনা এবং আল্লাহ্’র পক্ষ থেকে তিনি যেসব হুকুম-আহ্কাম নিয়ে এসেছেন সেসব হুকুম-আহ্কাম ও যাবতীয় বিষয়াবলীকে সত্য বলে স্বীকার করা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য ফরয ও একান্ত অপরিহার্য কর্তব্য। মহান আল্লাহ্ রাব্বুল ইয্যত কালামে পাকে ইরশাদ করেছেন- ‘[হে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম!] আপনি ঘোষণা করে দিন, হে লোক সকল! আমি তোমাদের সকলের প্রতি আল্লাহ্ পাকের পক্ষ হতে রাসূল হিসেবে প্রেরিত  হয়েছি। সমস্ত আসমান-যমীন যাঁর অধীন, তিনি ব্যতীত অন্য কেহ ইবাদতের যোগ্য নয়। তিনিই জীবন দান করেন, তিনিই শক্তি দান করেন। অতএব, (তোমরা) আল্লাহ্’র উপর, তাঁর উম্মী নবীর উপর ঈমান আন, যিনি ঈমান এনেছেন আল্লাহ্’র উপর, আল্লাহ্’র আহ্কামের উপর। আর তোমরা তাঁর অনুসরণ কর, তাহলে তোমরা সঠিক পথপ্রাপ্ত হবে।’ [সূরা আল আরাফ : ১৫৮]
অর্থাৎ আমাদের ঈমান তখনই দৃঢ় হবে, সহীহ্ হবে এবং গ্রহণযোগ্য হবে, যখন আল্লাহ্ তায়ালার উপর ঈমান আনার পাশাপাশি তাঁর প্রিয় হাবীব, উম্মতের কাণ্ডারী, হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উপরও ঈমান আনবো এবং তাঁকে সর্বশ্রেষ্ঠ নবী, সর্বশেষ নবী ও রাসূল হিসেবে বিশ্বাস করবো। এ থেকে কোন একটি কম-বেশী হলে সে ঈমান মহাবিচারক আল্লাহ্’র নিকট ঈমান বলেই গণ্য হবে না। যারা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উপর ঈমান আনবে না, তাদের প্রতি কালামে পাকে ইরশাদ হয়েছে- ‘যে সকল ব্যক্তি আল্লাহ্’র উপর এবং তাঁর রাসূল (মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর উপর ঈমান আনবে না, আমি (সে) কাফিরদের জন্য জাহান্নাম প্রস্তুত করে রেখেছি।’ (সূরা আল ফাত্’হ : ১৩)

উল্লিখিত আয়াতটিতে এ কথাই স্পষ্ট ব্যক্ত হয়েছে যে, রাসূল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উপর ঈমান আনা ফরয। এমনকি যতক্ষণ পর্যন্ত তাঁর প্রতি ঈমান আনা না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ্ পাকের প্রতি ঈমান আনার বিষয়টিও ঈমান হিসেবে গণ্য হবে না। আর তাই রাসূল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি ঈমান না আনা ব্যক্তি কাফির হিসেবেই পরিগণিত হবে এবং এরূপ ব্যক্তির জন্যই উল্লিখিত আয়াতে জাহান্নামের কঠোর শাস্তি ঘোষণা করা হয়েছে। অর্থাৎ যারা শুধুমাত্র মহান আল্লাহ্ পাকের প্রতি ঈমান এনেছে কিন্তু রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি ঈমান আনেনি, তারা যদি বংশগতভাবে নিজেদেরকে মুসলিম বলে দাবী করে, মুসলিম নাম রাখে এবং সরকারী কাগজপত্রে নিজেদেরকে মুসলিম হিসেবে উল্লেখ করে থাকে, তবুও তারা কাফির হিসেবেই পরিগণিত হবে। এ প্রসঙ্গে হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে উমার রাযিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন- নবী করীম সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘আমাকে আল্লাহ্ তা’য়ালার পক্ষ হতে আদেশ করা হয়েছে যে, মানুষ যে পর্যন্ত সাক্ষ্য না দিবে আল্লাহ্ ব্যতীত আর কোন মা’বুদ-দাসত্ব, আইনের আনুগত্য ও উপাসনা পাওয়ার সত্তা নাই এবং যে পর্যন্ত আমার প্রতি ঈমান না আনবে, সালাত কায়েম না করবে, যাকাত আদায় না করবে, সে পর্যন্ত আমি যেন তাদের সাথে যুদ্ধ করতে থাকি। আর যখন তারা এগুলোর প্রতি ঈমান আনবে, তখন আমার পক্ষ থেকে তাদের জান ও মাল নিরাপদ থাকবে। তবে ইসলামের বিধান অনুযায়ী যদি এগুলো পাওনা হয়ে যায়, তাহলে ভিন্ন কথা। (যেমন: বিনা কারণে কতল করা, বিবাহিত হওয়া সত্ত্বেও যিনা-ব্যভিচার করা প্রভৃতি অপরাধের শাস্তি)। আর তাদের প্রকৃত হিসাব আল্লাহ্ পাক নিবেন।’ [সহীহ্ মুসলিম, বুখারী]

অপর এক হাদীসে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন- ‘আমাকে আদেশ করা হয়েছে লোকদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে থাকার জন্য, যতক্ষণ পর্যন্ত না তারা সাক্ষ্য দিবে যে, আল্লাহ্ ছাড়া কোন মা’বুদ-দাসত্ব, আইনের আনুগত্য ও উপাসনা পাওয়ার সত্তা নাই এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহ্’র রাসূল। তারা যখন এই সাক্ষ্য দিবে, তখন আমার হাত (যুদ্ধ) থেকে তাদের জান ও মাল নিরাপদ থাকবে।’ (শরহে শিফা)
সুতরাং রাসূলের সহীহ্ হাদীস দ্বারাও এ কথা অকাট্যভাবে প্রমাণ হয়ে গেল যে, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উপর ঈমান আনা ব্যতীত আল্লাহ্’র উপর ঈমান আনয়ন গ্রহণযোগ্য নয় কারণ যে ব্যক্তি আল্লাহ্’র প্রিয় হাবীব সাইয়্যেদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন্নাবীয়্যিন, রাসূলুল্লাহ্ হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামকে আল্লাহ্’র রাসূল বলে স্বীকার করে না, সে তো তাঁর উপর নাযিলকৃত কিতাব আল-কুরআন ও শরীয়তের যাবতীয় আহ্কামকেও স্বীকার করে না। তাই এরূপ ব্যক্তি সর্বাবস্থায়ই কাফির ও যিন্দিক হিসেবে গণ্য হবে। এই সকল কাফির-যিন্দিকের উদ্দেশ্যে হযরত আবু হুরায়রা রাযিআল্লাহু আনহু কর্তৃক বর্ণিত এক হাদীসে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন- ‘সেই পবিত্র মহান সত্তার কসম, যাঁর হাতে আমার প্রাণ, এই উম্মতের মধ্যে যদি কেউ চাই সে ইয়াহুদী হোক কিংবা নাসারা- আমার রিসালাতের (রাসূল হবার) সংবাদ শুনে অতঃপর আমার প্রতি এবং আমার উপর নাযিলকৃত শরীয়তের প্রতি ঈমান না এনে মারা যাবে, সে নির্ঘাত জাহান্নামী হবে।’ [মিশকাত শরীফ]

অর্থাৎ রাসূল মুহাম্মদের সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম নবুওয়ত ও রিসালাতের উপর ঈমান আনা ফরয ও জরুরী। আর হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম আনীত শরীয়ত ব্যতীত অন্য কোন শরীয়ত কস্মিনকালেও কারো জন্য কোন প্রকারে গ্রহণযোগ্য হবে না।

আলোচিত কুরআন-হাদীসের বাণী থেকে এ কথা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হলো যে, রাসূল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উপর ঈমান আনা ফরয। এবং এর অন্যথা হলে প্রস্তুত রয়েছে জাহান্নামের কঠিন ও ভয়াবহ শাস্তি । তবে একটি কথা সর্বাগ্রে জানা থাকা প্রয়োজন যে, মহান আল্লাহ্ তায়ালার পর রাসূলুল্লাহ্’র সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম উপর ঈমান আনা ফরয এর অর্থ কি? অনেক অতি বুঝনেওয়ালাগণ অবশ্য বলে থাকেন যে, মহান আল্লাহ্ তায়ালার পাশাপাশি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম এর উপর ঈমান আনার অর্থ হচ্ছে- আমাদের চাওয়া-পাওয়া, বিপদ-আপদ, বালা-মুসিবত প্রভৃতিতে আল্লাহ্ যেমন সাহায্য করে থাকেন, ঠিক তদরূপ রাসূল মুহাম্মদও সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম সাহায্য করতে সক্ষম (নাউযুবিল্লাহ!)।
মূলত আল্লাহ্’র রাসূলের সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম প্রতি ঈমান আনয়নের অর্থ হচ্ছে- মানুষ তাঁকে এবং তাঁর নবুওয়ত ও রিসালাতকে এই মর্মে সত্য ও অকাট্য বলে বিশ্বাস করবে যে, আল্লাহ্ তায়ালা তাঁকে মাখলুকের প্রতি নবী ও রাসূল হিসেবে প্রেরণ করেছেন সেই সঙ্গে তিনি যে শরীয়ত তথা ধর্মীয় বিধি-বিধান নিয়ে আগমন করেছেন সেসব সম্পর্কেও অন্তরে বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে এবং এও বিশ্বাস করতে হবে যে, তিনি যে সকল আদেশ-নিষেধ বর্ণনা করেছেন সবই হক্ব ও সত্য। তবে শুধুমাত্র বাহ্যিকভাবে কিংবা অন্তরে বিশ্বাস স্থাপন করলেই তাকে ঈমান বলা যাবে না, এর গ্রহণযোগ্যতার জন্য আন্তরিক বিশ্বাসের পাশাপাশি এগুলো পালনের ব্যাপারে দৃঢ় ও অটল সংকল্প একান্ত জরুরী ও অপরিহার্য। কারণ কালামে পাকে ইরশাদ হয়েছে- ‘এইসব লোকেরা বলে যে, আমরা ঈমান এনেছি; (হে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম!) আপনি বলে দিন যে, তোমরা ঈমানতো আনোইনি বরং বলো যে, আমরা আনুগত্য স্বীকার করেছি এবং তোমাদের অন্তরে এখন পর্যন্ত ঈমান প্রবেশ করেনি। আর যদি তোমরা আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশ মান্য কর, তবে আল্লাহ্ তোমাদের আমলসমূহ থেকে বিন্দুমাত্র হ্রাস করবেন না। নিঃসন্দেহে আল্লাহ্ পরম দয়ালু, মহাক্ষমাশীল। পূর্ণ মু’মিন তারাই, যারা আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান এনেছে; অতঃপর এত কোন সন্দেহ পোষণ করেনি। অধিকন্তু স্বীয় ধন-সম্পদ ও জীবন দ্বারা আল্লাহ্’র পথে জিহাদ করেছে। মুলত তারাই সত্যনিষ্ঠ্য।’ (সূরা আল হুজুরাত : ১৪-১৫)
এ প্রসঙ্গে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুল মুত্তালিব (রাযিআল্লাহু আনহু) থেকে একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে। তিনি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছেন, যে ব্যক্তি আল্লাহ্ কে রব্ব, ইসলামকে দ্বীন এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামকে রাসূল হিসেবে পেয়ে সন্তুষ্ট হয়েছে এবং আন্তরিকতার সাথে মেনে নিয়েছে সে প্রকৃত ঈমানের স্বাদ গ্রহণ করেছে। (সহীহ মুসলিম, অনুচ্ছেদ-১২, হা-৫৯, বা.ই.সে)
অর্থাৎ যদি সামান্যতম শোবা-সন্দেহও অন্তরে বিদ্যমান থাকে, তবে ঈমান সহীহ্ হবে না। আর শুধুমাত্র মুখে স্বীকার বা সাক্ষ্য প্রদান করলেই ঈমান সহীহ্ হবে না বরং অন্তরের পূর্ণ বিশ্বাস ও দৃঢ়তা থাকতে হবে। কারণ শুধুমাত্র মুখে স্বীকার ও সাক্ষ্য প্রদানকে কুরআনে নিফাক তথা ঈমানের ছদ্মাবরণে কুফর বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। মহান আল্লাহ্ রাব্বুল ইয্যত বলেছেন- ‘যখন আপনার নিকট এই মুনাফিকরা আসে, তখন তারা বলে, আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, নিঃসন্দেহে আপনি আল্লাহ্’র রাসূল। এ কথাতো আল্লাহ্ জানেন যে, আপনি আল্লাহ্’র রাসূল এবং আল্লাহ্ সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, এই মুনাফিকগণ মিথ্যুক।’ [সূরা মুনাফিকুন:১]

অর্থাৎ ঐসকল লোক কসম খেয়ে রাসূল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামকে আল্লাহ্’র রাসূল বলে মৌখিক স্বীকৃতি দিলেও অন্তরে দৃঢ় বিশ্বাস না থাকার দরুন তারা আল্লাহ্ পাক কর্তৃক মিথ্যাবাদী মুনাফিক সাব্যস্ত হয়েছে। আর আখিরাতে মুনাফিকগণের শাস্তি কাফিরদের চেয়েও জঘন্য ও ভয়াবহ হবে। আল্লাহ্ পাক এদের শাস্তি সম্পর্কে ঘোষণা করেছেন- ‘নিঃসন্দেহে মুনাফিকগণ জাহান্নামের নিম্নস্তরে নিক্ষিপ্ত হবে এবং আপনি কখনো  তাদের কোন সাহায্যকারী পাবেন না।’ (সুরা আন নিসা : ১৪৫)

অতএব, রাসূল মুহাম্মাদের সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম উপর ঈমান আনা তখনই সহীহ্ বলে গণ্য হবে, যখন তাঁকে আল্লাহ্’র রাসূল হিসেবে মৌখিক সাক্ষ্য দেয়ার পাশাপাশি অন্তরে দৃঢ় বিশ্বাস সংরক্ষিত থাকবে এবং তাঁর প্রতি নাযিলকৃত কুরআন ও শরীয়তের যাবতীয় বিধি-বিধানকে বিনা শোবা-সন্দেহে মেনে নেয়া হবে। ইমামুল মুরসালীন, সাইয়্যেদুল মুরসালীন, খাতামুন্নাবীয়্যিন রাসূল মুহাম্মদের সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম প্রতি সহীহ্ ও গ্রহণযোগ্যরূপে ঈমান আনার পর আমাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব ও কর্তব্য হচ্ছে তাঁর আনুগত্য করা। অর্থাৎ আল্লাহ্’র প্রেরিত রাসূল হিসেবে যে সকল শরীয়তের হুকুম-আহ্কাম তিনি বর্ণনা করেছেন, সেসব বিনা বাক্য ব্যয়ে মেনে নেয়া এবং তাঁর প্রত্যেকটি কথা ও কাজের উপর আমল করা। কারণ, তাঁর অনুকরণ, অনুসরণ ও আনুগত্য করা প্রকৃতপক্ষে কুরআনের আনুগত্য করারই নামান্তর। হাদীস শরীফে এসেছে, হযরত আয়িশা রাযিআল্লাহু আনহু বলেছেন- ‘তাঁর [রাসূল মুহাম্মদের সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম] চরিত্র ছিল আল-কুরআন।’ পবিত্র কুরআনুল করীমে ইরশাদ হয়েছে- ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য কর এবং তাঁর নির্দেশ মান্য করা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ো না।’ [সূরা আল আনফাল:২০]

আরও ইরশাদ হয়েছে- ‘(হে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম!) আপনি বলে দিন, তোমরা আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য কর।’ [সূরা আল ইমরান : ৩২]

অর্থাৎ যারা আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে ঈমানদার হয়েছে, তাদের পরবর্তী কাজ হচ্ছে, রাসূলের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করা, তাঁর আদেশ-নিষেধ-নির্দেশ নত শিরে মেনে নেয়া এবং তা হতে কখনো বিচ্যুত না হওয়া। কুরআন পাকে আল্লাহ্ রাব্বুল ইযযত আরও ইরশাদ করেন- ‘যে ব্যক্তি রাসূলের আনুগত্য করলো, সে অবশ্যই আল্লাহ্’র আনুগত্য করলো আর যে বিমুখতা প্রকাশ করলো, আমি তার জন্য (হে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম!) আপনাকে রক্ষণাবেক্ষণকারী নিযুক্ত করে পাঠাইনি।’ (সূরা আন নিসা : ৮০)

উল্লিখিত আয়াতটির মূল বক্তব্য হচ্ছে, যে কাজে-কর্মে জীবনের সকল ক্ষেত্রে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লামকে অনুসরণ করে, সে মূলত আল্লাহ্’র হুকুমকেই অনুসরণ করে। কেননা, রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম যে সকল হুকুম আহ্কাম প্রচার করেছেন, তার প্রকৃত হুকুমদাতা তো স্বয়ং আল্লাহ্ তায়ালা; আর যেহেতু ঐসকল হুকুম-আহ্কাম কখনও প্রত্যক্ষ ওহী (কুরআন) আবার কখনও পরোক্ষ ওহীর (সুন্নাহ্) মাধ্যমে তাঁকে জানিয়ে দেয়া হয়, সেহেতু রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আনুগত্য প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীনেরই আনুগত্য। এজন্য যারাই নিঃসঙ্কোচে, দ্বিধাহীন চিত্তে আখেরী রাসূল, ইমামুল মুক্তাক্বীন মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করবে, তাদের জন্য মহান আল্লাহ্ পাক রেখেছেন মস্তবড় পুরস্কার। এ সম্পর্কে কুরআনুল কারীমে ইরশাদ হচ্ছে- ‘আর যারা আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করবে, তারা ঐ সকল লোকের সঙ্গে (অর্থাৎ নবী, সিদ্দিকীন, শহীদ ও সৎকর্মপরায়ণদের সঙ্গে) থাকবে যাদেরকে আল্লাহ্ পুরস্কৃত করেছেন তারা খুবই ভাল সঙ্গী।’ (সূরা আন্ নিসা : ৬৯)

তাহলে যারা আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করবে, তারা পরকালে আম্বিয়া আলাইহিস সালাম, সিদ্দিকীন, শহীদ, সৎকর্মপরায়ণদের সাথে জান্নাতে অবস্থান করবে, তাদের সান্নিধ্যে জান্নাতে ভোগ-বিলাস উপভোগ করবে। একজন ঈমানদারের জন্য এর চেছে বড় নিয়ামত ও পুরস্কার আর কিইবা হতে পারে! মহান আল্লাহ্্ রাব্বুল ইয্যত তার প্রিয় হাবীবের আনুগত্যকারী বান্দাদের জন্য আরও পুরস্কার ঘোষণা করেছেন- ‘এবং তাঁর (মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম-এর) ইত্তেবা কর, যাতে তোমরা হিদায়াত পেতে পার।’ [সূরা আল আ’রাফ : ১৫৮]।

আল্লাহ্ পাক আরও ইরশাদ করেন- ‘যদি তোমরা রাসূলের আনুগত্য কর, তাহলে হিদায়াতপ্রাপ্ত হবে।’ [সূরা আর নুর : ৫৪]

মহান আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন রাসূল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আনুগত্য করার প্রতিদানে স্বীয় মহব্বত ও মাগফিরাতের ওয়াদা করেছেন। কুরআন পাকে এসেছে- ‘হে রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম! আপনি বলে দিন, যদি তোমরা আল্লাহ্্ তায়ালার প্রতি মহব্বত রাখ, তবে আমার ইত্তেবা কর। আল্লাহ্ তায়ালা তোমাদেরকে মহব্বত করবেন, তোমাদের গুনাহ্সমূহ ক্ষমা করে দিবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তায়ালা অতিশয় ক্ষমাশীল ও দয়ালু।’ (সূরা আল ইমরান : ৩১)

সবচেয়ে বড়কথা, বর্তমানে আমরা যে যামানায় বাস করছি, তা ফিৎনা-ফাসাদে পরিপূর্ণ। এই ফিৎনা-ফাসাদের যুগে যদি আমরা রাসূলুল্লাহ্্ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সুন্নাতের উপর অটল থাকতে পারি, তবে আমাদের জন্য রয়েছে আরও বিশেষ কিছু নিয়ামত যা অন্য কোন নবী-রাসূলের উম্মতগণ পায়নি। হাদীস শরীফে হযরত আবূ হুরায়রা রাযিআল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত আছে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেনÑ ‘ফিৎনা-ফাসাদের যামানায় আমার উম্মতের যে ব্যক্তি আমার সুন্নতকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরবে (এবং তদনুযায়ী আমল করবে), তার জন্য একশত শহীদের সওয়াব রয়েছে।’ [মিশকাত শরীফ]

তবে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি আনুগত্যের পুরস্কার আমরা তখনই আশা করতে পারি, যখন পরিপূর্ণ মু’মিন হিসেবে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবো। কারণ রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন- ‘তোমাদের কেউ (পরিপূর্ণ) মু’মিন হতে পারবে না, যতক্ষণ তার ইচ্ছা ও আকাঙ্খা আমার আনীত শরীয়তের ও আহ্কামের অনুসারী ও অনুগত না হবে।’ [মিশকাত শরীফ]

আরও ইরশাদ করেন- ‘তোমাদের কেউ পূর্ণ মু’মিন হতে পারবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না আমি তার নিকট পিতা, সন্তান এবং অপরাপর সকল মানুষের চেয়ে অধিকতর প্রিয় হই।’ [বুখারী]

রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রতি ঈমান আনয়নকারী ও তাঁর আনুগত্যকারী ঈমানদারগণকে আখিরাতে আল্লাহ্ তা’য়ালার নিকট হতে পুরস্কারপ্রাপ্ত হতে দেখে কাফির, মুনাফিক ও যালিমরা আফসোসে চিৎকার ও আর্তনাদ শুরু করে দিবে। যেমন কুরআন পাকে ইরশাদ হয়েছেÑ ‘এ কাফির-যালিমরা জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবার সময় চিৎকার করে বলবে : হায় আফসোস! আমরা যদি আল্লাহ্’র হুকুম মেনে চলতাম। হায়! আমরা যদি তাঁর রাসূলের অনুসরণ করতাম!’ (সূরা আল আহযাব : ৬৬)
কুরআনে অপর এক আয়াতে এসেছে- ‘সেদিন যালিমরা (আফসোসে) হাত কামড়াতে কামড়াতে বলবে, হায় আফসোস! কতই না ভালো হতো, যদি আমরা (দুনিয়াতে) রাসূলের অনুগত হয়ে তাঁর দেখানো পথে চলতাম!’ [সূরা আল ফুরকান : ২৭]।

অর্থাৎ যে ব্যক্তি দুনিয়ার বুকে ভোগ-বিলাসে মত্ত থাকবে এবং পরিপূর্ণরূপে রাসূলের সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম আনুগত্য না করবে, তার আখিরাতে শুধু আফসোস আর নিজ হাত কামড়ানো ছাড়া কিছুই করার থাকবে না।

সাইয়্যেদুল মুরসালীন, ইমামুল মুরসালীন, খাতামুন্নাবীয়্যিন রাসূল মুহাম্মদের সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম প্রতি ঈমান ও আনুগত্যের প্রতিদানস্বরূপ মহান আল্লাহ্ রাব্বুল ইয্যত যে মহা নিয়ামত ও পুরস্কারের ওয়াদা করেছেন, তার সম্মুখে দুনিয়াবী ধন-দৌলত, আরাম-আয়েশ কোন মূল্যই রাখে না। নিশ্চয়ই আমাদের জন্য আল্লাহ্’র সর্বশেষ রাসূল মুহাম্মদের সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম মধ্যেই রয়েছে উত্তম আদর্শ, যা অনুসরণের মাধ্যমে আল্লাহ্’র সন্তুষ্টি ও পরকালে মুক্তির আশা করা যায়। অতএব, মহান আল্লাহ্ সুব্হানাহু ওয়া তায়ালা আমাদের সবাইকে তাঁর প্রিয় রাসূল মুহাম্মদের সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম প্রতি পরিপূর্ণ ঈমান আনার ও আনুগত্য করার তাওফীক দান করুন। আমীন।

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s