রাসূল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে আল কুরআন

রাব্বি আ’উযুবিকা মিন হামাজাতিশ শায়াতিন। বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।

দয়াময় মায়াময় মহান রব্ব আল্লাহ্’র নামে শুরু। যাবতীয় প্রশংসা যাঁর তরে নিবেদিত। অগণিত সালাত ও সালাম হযরত রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর পরিবার-পরিজন, সহচর ও অনুসারীগণের প্রতি। অতঃপর বক্তব্য এই যে, মহান আল্লাহ্ বারী তায়ালা বলেন-
‘তোমরা আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আন।’ (সূরা আল ফাত্’হ:৯)
‘ঈমানদার তারাই, যারা আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনে, অতঃপর তাতে কোনরূপ সন্দেহ পোষণ করে না এবং আল্লাহ্’র পথে জান ও মাল দ্বারা জিহাদ করে। মূলত তারাই সত্যনিষ্ঠ্য।’ (সূরা আল হুজুরাত:১৫)
‘হে মু’মিনগণ! তোমরা আল্লাহ্’র আনুগত্য কর এবং রাসূলের আনুগত্য কর; আর তোমাদের কর্মফল বিনষ্ট করো না।’ (সূরা মুহাম্মদ : ৩৩)
অর্থাৎ, আল্লাহ্’র প্রতি ঈমান আনার পর তাঁর রাসূল মুহাম্মদের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রতি ঈমান আনতে হবে। এবং সে ঈমান অবশ্যই পরিপূর্ণ সন্দেহমুক্ত হতে হবে। আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রতি ঈমান আনার পর, আল্লাহ পাকের পাশাপাশি তাঁর রাসূলেরও সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আনুগত্য করতে হবে। তবে রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পরিপূর্ণ এতায়াত, আনুগত্য ও অনুসরণের পূর্বশর্তই হচ্ছে তাঁর সম্পর্কে সঠিক ও সু-ধারণা পোষণ করা এবং তাঁকে মানতে গিয়ে কোন বিষয়ে বাড়াবাড়ি ও অতিরঞ্জিত না করা। এ প্রসঙ্গে হযরত আব্দুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস রাযিআল্লাহু আনহু রাযিআল্লাহু আনহু বর্ণিত একখানা হাদীসে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন- ‘আমার প্রশংসা করতে গিয়ে বা মর্যাদা বাড়াতে গিয়ে বাড়াবাড়ি কিংবা অতিরঞ্জিত করবে না, যেমনভাবে খৃষ্টানরা ঈসা ইবনে মারইয়াম সম্বন্ধে করেছে। আমিতো এক বান্দা মাত্র! তাই বলো- [মুহাম্মদ] আল্লাহ্’র বান্দা ও তাঁর রাসূল।’ [ইবনে আব্বাস রাযিআল্লাহু আনহু হাদীসটি হযরত উমর রাযিআল্লাহু আনহু-কে মিম্বরে বসে বলতে শুনেছেন; বুখারী, মুসলিম]। অর্থাৎ, খৃষ্টানরা যেরূপ হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম সম্পর্কে সীমাহীন বাড়াবাড়ি আর ভুল ও ভ্রান্ত ধারণা পোষণ করার কারণে আল্লাহ্ পাকের রোষানলে পতিত হয়েছে এবং আল্লাহ্ পাক কর্তৃক কাফির ও মুশরিক সাব্যস্ত হয়েছে, হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ব্যাপারে মুসলমানদেরকেও তদনরূপ অসত্য ও অতিরঞ্জিত প্রশংসার দ্বারা সীমালঙ্ঘন করা হতে বিরত থাকতে হবে। এক কথায় রাসূলুল্লাহ্’র সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মোবারক জীবন ও চরিত্র সম্পর্কে এমন কোনো বিশ্বাস পোষণ ও প্রচার করা জায়িয নয় যা তাঁর প্রকৃত মর্যাদাকে ক্ষুন্ন করে, তাঁর সম্পর্কে মানুষের মনে বিভ্রান্তির জন্ম দেয়, সর্বোপরি কুরআন ও সুন্নাহ্’র সাথে যা সাংঘর্ষিক বলে বিবেচিত হতে পারে। কুরআনুল কারীমে রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সম্পর্কে মহান আল্লাহ্ সুব্হানাহু ওয়া তায়ালা সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন-
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মা’ছুম (নিষ্পাপ-নিষ্কলঙ্ক) ছিলেন। শুধুমাত্র নবুওয়ত প্রাপ্তির পরে নয় বরং ভূমিষ্ঠ হওয়ার পরক্ষণ হতেই তিনি নিষ্পাপ ছিলেন। যেহেতু তিনিই ছিলেন আল্লাহ্ পাক কর্তৃক প্রেরিত সর্বশেষ এবং সর্বশ্রেষ্ঠ নবী ও রাসূল সেহেতু আল্লাহ্ রাব্বুল ইযযত তাঁর প্রিয় হাবীব মুহাম্মদ মুস্তফাকে সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জন্মক্ষণ হতে মৃত্যুর ঠিক পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত কিঞ্চিত সময়ের জন্যও কোনো গুনাহ্’র কাজে জড়িত হতে দেননি। তাঁর প্রতি আল্লাহ্ পাকের ‘ইসমত’ (পাপমুক্ত অবস্থা) সংরক্ষণ মুহূর্তের জন্যেও হারিয়ে যায়নি বরং তা দৃঢ় হতে আরও অধিকতর দৃঢ় হয়েছে। এজন্যই স্বয়ং আল্লাহ্ বারী তায়ালা কুরআনুল কারীমে বিাভন্ন আয়াতে উদাত্তভাবে ঘোষণা করছেন-
‘তোমাদের সঙ্গী (মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পথভ্রষ্ট হননি, এমনকি গোমরাহ্ও হননি।’ (সূরা আন নাজম : ২)
‘এবং নিঃসন্দেহে তাঁরা (অর্থাৎ নবী-রাসূলগণ) আমার নির্বাচিত সর্বোত্তম ব্যক্তিবর্গের অন্তর্ভুক্ত।’ (সূরা সা’দ : ৪৭)
আল্লাহ্ পাক আরও ঘোষণা করেন-
‘(হে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম!) তোমার প্রতি আল্লাহ্’র দয়া ও অনুগ্রহ না থাকলে তাদের একদল তোমাকে পথভ্রষ্ট করতে চাইত-ই; কিন্তু তারা নিজেদেরকে ব্যতীত আর কাউকেও পথভ্রষ্ট করতে সক্ষম হবে না এবং তোমার কোনোই অনিষ্ট সাধন করতে পারবে না। আল্লাহ্ আপনার প্রতি আসমানী কিতাব ও প্রজ্ঞা অবতীর্ণ করেছেন এবং আপনাকে এমন বিষয় শিক্ষা দিয়েছেন যা আপনি আগে জানতেন না। আপনার প্রতি আল্লাহ্’র করুনা অসীম।’ (সূরা আন নিসা : ১১৩)
‘নিশ্চয়ই আমার প্রিয় বান্দাদের উপর শয়তানের কোনই অধিকার নেই। আর কর্মবিধায়ক হিসেবে তোমার প্রতিপালকই যথেষ্ট।’ (সূরা বনী ইসরাঈল : ৬৫)
তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নবুওয়ত ও নিষ্পাপত্ব পরস্পর অবিচ্ছেদ্য। কারণ, তিনি সর্বদাই মহান আল্লাহ্ পাকের হিফাজতে ছিলেন। মহান আল্লাহ্ পাকের এই হিফাজত নিদ্রায়-জাগরণে কোনো সময় এক মুহূর্তের জন্যও রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়নি। আর এটিই উম্মতে মুহাম্মদীর সর্বসম্মত মত বা ইজমা।
রাসূলুল্লাহ্ হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মানুষ ছিলেন। হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন রক্ত-মাংসের দেহধারী একজন মানুষ। তবে এ মত সম্পর্কে আজ অবধি যেমন বিভ্রান্তি ও বিতর্ক সৃষ্টি করা হচ্ছে, তাঁর নবুওয়ত প্রাপ্তির সময়ও তা তেমনই ছিলো। শুধু পার্থক্য এতোটুকু যে, নবুওয়ত প্রাপ্তির সময় এ সম্পর্কে বিতর্ক সৃষ্টি ও বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়েছিলো কাফির, মুশরিক, ইয়াহুদী ও খৃষ্টানদের পক্ষ থেকে, আর আজ স্বয়ং উম্মতে মুহাম্মদীর মাঝেই কতিপয় দল এ নিয়ে বাড়াবাড়ি করে ফিতনা ছড়াচ্ছে। রাসূলে আকরামের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রতি এদের ধারণা সম্পর্কে আল্লাহ্ পাকের পক্ষ থেকে ইরশাদ হয়েছে-
‘যখন তাদের নিকট আসে সুস্পষ্ট পথ-নির্দেশ (হিদায়াত), তখন লোকদেরকে ঈমান আনা হতে বিরত রাখে তাদের এই উক্তি- আল্লাহ্ কি একজন মানুষকে রাসূল হিসেবে পাঠিয়েছেন?’ (সূরা বনী ইসরাঈল : ৯৪)
‘তারা বলে, এ কেমন রাসূল যে আহার করে এবং হাটে-বাজারে যাতায়াত করে; তাঁর নিকট কোনো ফেরেশতা কেন অবতীর্ণ হলো না, যে তাঁর সঙ্গে সতর্ককারীরূপে থাকতো?’ ( সূরা আল ফুরকান : ৭ )
রাসূল মুহাম্মদের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মানুষ হওয়া সম্পর্কে প্রশ্ন উত্থাপনকারীদের অজ্ঞতা ও ভ্রান্তি নিরসন কল্পে কালামে পাকের অন্যত্র মহান আল্লাহ্ দৃঢ়তার সাথে ঘোষণা করেন-
‘(হে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম!) বলো, আমার প্রতিপালক পবিত্র মহান। আমিতো হচ্ছি কেবল একজন মানুষ, একজন রাসূল।’ (সূরা বনী ইসরাঈল : ৯৩)
‘বলো, আমিতো তোমাদের মতো একজন মানুষ-ই; আমার প্রতি শুধু ওহী নাযিল হয় যে, তোমাদের ইলাহ্ একমাত্র ইলাহ্।’ (সূরা আল কাহ্ফ : ১১০)
আল্লাহ্ পাক আরও ঘোষণা করেন-
‘বলো, আমিতো তোমাদের মতো একজন মানুষ; শুধু আমার প্রতি ওহী নাযিল হয় যে, তোমার ইলাহ্্ই একমাত্র ইলাহ্্।’ (সূরা হা-মীম-আসসাজদা : ৬)
‘লোকদের নিকট এটা কি বিস্ময়ের ব্যাপার যে, আমি তাদের মধ্য হতে একজন মানুষের নিকট ওহী প্রেরণ করেছি এই মর্মে যে, তুমি মানুষকে সতর্ক কর এবং মু’মিনদেরকে সুসংবাদ দাও যে, তাদের জন্য তাদের প্রতিপালকের নিকট আছে উচ্চ মর্যাদা! কাফিররা বলে, এতো এক সুস্পষ্ট জাদুকর।’ (সূরা ইউনুস : ২)
রাসূল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উম্মী ছিলেন। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জাগতিক বস্তুগত ধ্যান-ধারণাসমৃদ্ধ শিক্ষাগ্রহণ ও অক্ষর জ্ঞান হতে সম্পূর্ণ মুক্ত ছিলেন। কিন্তু উম্মীয়াৎ সাধারণ মানুষের জন্য ত্রুটির ও অমর্যাদার কারণ হলেও রাসূলুলল্লাহ্’র সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জন্য তা ছিলো বিশেষ গুণস্বরূপ। কারণ, উম্মী হয়েও তিনি ধারণ করেছিলেন আল-কুরআনের ন্যায় এক বিশাল জ্ঞান-ভাণ্ডার সম্বলিত আসমানী কিতাব; উম্মী হয়েও তিনি ছিলেন পৃথিবীর সকল শিক্ষকের শিক্ষক। এ ছাড়াও উম্মীয়াৎ ছিলো নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জন্য আল্লাহ্ পাক প্রদত্ত এক সার্বক্ষণিক মু’জিযা ও হিকমতস্বরূপ। যারা উম্মী নাবী মুহাম্মদের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অনুসরণ করবে তারাই সফলকাম। এ সম্পর্কে আল্লাহ্ পাক বলেন-
‘যারা অনুসরণ করে বার্তাবাহক উম্মী নাবীর, যাঁর সম্পর্কে তারা তাওরাত, ঈঞ্জীল এবং যা তাদের নিকট রয়েছে তাতে লেখা দেখতে পায়… আর তারাই সফলকাম।’ (সূরা আল আ’রাফ : ১৫৭)
রাসূলুল্লাহ্’র উম্মীয়াৎ সম্পর্কে আল্লাহ্ পাক আরও ইরশাদ করেন-
‘হে নাবী! আপনি (কুরআন নাযিল হওয়ার) পূর্বে কোনো কিতাব পড়েননি, নিজ হাত দ্বারা কোনো কিছু লিখেনওনি। কেননা যদি আপনি তা করতেন তবে বাতিলপন্থীরা সন্দেহে পড়ে যেতো।’ (সূরা আল আনকাবুত : ৪৮)
নাবী আল মুক্বাফফী, নাবী আল আক্বেব, নাবী আল খাতেম, নাবী আল আখির হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হচ্ছেন দুনিয়ার বুকে আল্লাহ্ পাক কর্তৃক প্রেরিত সর্বশেষ নাবী ও রাসূল। হযরত মুহাম্মদ মুস্তফার সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পরে নতুন কোনো নবী ও রাসূল দুনিয়ার বুকে আগমন করবেন না। এমনকি কাদিয়ানীদের অনুর্বর ভাড়াটে মস্তিষ্কপ্রসূত তথাকথিত যিল্লি নবী, বুরুজী নবী, উম্মতী নবী, শরিয়তবিহীন নবী প্রভৃতি নিত্য-নতুন শব্দ ও ফর্মুলা উপস্থাপন করেও নবুওয়তের সন্ধান পাওয়া যাবে না। এ প্রসঙ্গে স্বয়ং আল্লাহ্ পাক সাক্ষ্য দিচ্ছেন-
‘মুহাম্মদ তোমাদের মধ্যে কোনো পুরুষের পিতা নন; বরং সে আল্লাহ্’র রাসূল এবং শেষ নবী। আল্লাহ্ সর্ববিষয়ে সর্বজ্ঞ।’ (সূরা আল আহযাব : ৪০)
নবী করীম মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর ওফাতের নিকটবর্তী সময়ে আরাফাত ময়দানে মুসলিম মিল্লাতের এক বৃহৎ সমাবেশে দ্বীন ইসলাম, ইসলামী শরীয়াহ্, ধর্মীয় আকীদাহ্ ও হুকুম-আহ্কাম সম্পর্কিত এক আবেগপূর্ণ ভাষণ দেন। নাবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ভাষণের এক পর্যায়ে দ্বীনের পরিপূর্ণতা সম্পর্কে বলছিলেন। এমন সময় আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীনের নিকট হতে দ্বীন ইসলামকে পরিপূর্ণ করে দেয়া সংক্রান্ত ওহী নাযিল হলো। মহান আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীনের পক্ষ হতে ঘোষিত হলো-
‘তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে মৃত জীব, রক্ত, শুকরের মাংস, যেসব জন্তু আল্লাহ্ ছাড়া অন্যের নামে উৎসর্গ করা হয়, যা কণ্ঠরোধে মারা যায়, যা আঘাত লেগে মারা যায়, যা উচ্চস্থান থেকে পতনের ফলে মারা যায়, যা শিং-এর আঘাতে মারা যায়, যাকে হিংস্র জন্তু ভক্ষণ করেছে কিন্তু যাকে তোমরা যবেহ করেছ। যে পশু যজ্ঞবেদীতে যবেহ (বলি দান) করা হয় এবং যা ভাগ্য নির্ধারক শর (তীর) দ্বরা বন্টন করা হয়। এসব গোনাহ্’র কাজ। আজ কাফিররা তোমাদের দ্বীন থেকে নিরাশ হয়ে গেছে। অতএব তাদেরকে ভয় করো না বরং আমাকে ভয় কর। আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম এবং তোমাদের উপর আমার নেয়ামত পূর্ণ করে দিলাম আর দ্বীন (ধর্ম) হিসেবে ইসলামকে তোমাদের জন্য মনোনীত করলাম। অতএব যে ব্যক্তি তীব্র ক্ষুধায় কাতর হয়ে পড়ে; কিন্তু কোন গোনাহর প্রতি প্রবণতা না থাকে, তবে নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তায়ালা ক্ষমাশীল।’ (সূরা আল মায়িদাহ্ : ৩)
যেহেতু আল্লাহ্ পাক দ্বীনকে ‘শেষনবী’র আকীদাহ্ অর্থাৎ ‘মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সর্বশেষ নবী ও রাসূল’ এই আকীদাহ্ প্রতিটি মুসলমানের জন্যই অনস্বীকার্য। খতমে নবুওয়তের এই আকীদাহকে অস্বীকার করলে কিংবা এ আকীদার প্রতি কোনো মুসলমান সন্দেহ পোষণ করলে কিংবা এ আকীদাহ্ অস্বীকারকারীকে মুসলমান গণ্য করলে কিংবা এ আকীদাহ্ অস্বীকারকারীকে কাফির গণ্য না করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ঈমান চলে যাবে।
দুনিয়া ও আখিরাত নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জন্য সৃষ্টি করা হয়নি। ‘(হে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম!) আপনি না হলে আমি আসমান যমিন বা মহাবিশ্ব সৃষ্টি করতাম না’ কিংবা ‘আপনাকে সৃষ্টি না করলে আল্লাহ্ পাক কোনো কিছুই সৃষ্টি করতেন না’। বিভিন্ন বক্তার বক্তব্যে এবং কিছু কিছু সীরাত গ্রন্থে-প্রবন্ধে দালিলিক প্রমান ছাড়াই এ ধরনের বক্তব্য উপস্থাপিত হতে দেখা যায়। ‘অথচ আল্লামা সাগানী, মোল্লা আলী ক্বারী, শায়খ আব্দুল হাই লাখনবী সহ অন্যান্য মুহাদ্দিস একবাক্যে কথাটিকে বানোয়াট ও ভিত্তিহীন বলে উল্লেখ করেছেন। কারণ এই শব্দ ও বাক্য কোনো হাদীসের গ্রন্থে কোনো প্রকার সনদে বর্ণিত হয়নি।’ [দেখুন হাদীসের নামে জালিয়াতি : ড. খোন্দকার আ.ন.ম. আব্দুল্লাহ্ জাহাঙ্গীর, পৃ. ২৪৭] অনেকে আবার সনদ উদ্ধার করতে ব্যর্থ হয়ে এ বাক্যটিকে হাদীসে কুদ্সী বলে উল্লেখ করে থাকেন। অথচ স্বয়ং আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা কুরআনুল কারীমে দ্ব্যর্থহীনভাবে সুস্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছেন-
‘আমি মানুষ ও জ্বিন জাতিকে সৃষ্টি করেছি একমাত্র আমার ইবাদাত করার জন্য।’ (সূরা যারিয়াত ৫১:৫৬)
‘আর নিশ্চয়ই আখিরাত ও দুনিয়া আমারই জন্য।’ (সূরা লাইল:১৩)
অর্থাৎ আল্লাহ্ পাক এ বিশ্বজগতের সকল কিছু সৃষ্টি করেছেন একমাত্র তাঁরই জন্য; তাঁরই ইবাদত ও গোলামী করার জন্য; তাঁর কোনো সৃষ্টিকে উদ্দেশ্য করে নয়।
কালামে পাকে আল্লাহ্ বারী তায়ালা ইরশাদ করেন-
‘অতএব (হে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম!) আপনি পালনকর্তার সৌন্দর্য স্মরণ করুন এবং সেজদাকারীদের অন্তর্ভূক্ত হয়ে যান এবং আপনার রব্বের ইবাদত করতে থাকুন যতক্ষণ না আপনার মৃত্যু এসে উপস্থিত হয়।’ (সূরা আল হিজর : ৯৮-৯৯)
অর্থাৎ, আখেরী নবী মুহাম্মদকে সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহ্ পাক সৃষ্টিই করেছেন তাঁর বাণী দুনিয়ার বুকে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য এবং তাঁর ইবাদত করার জন্য। সুতরাং মহান আল্লাহ্ পাকের বাণীর সাথে সামঞ্জস্যহীন এবং সাংঘর্ষিক কোনো বাক্য বা বক্তব্যকে হাদীসে কুদসী হিসেবে উপস্থাপন করে রাসূল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মর্যাদা বৃদ্ধির চেষ্টা কোন মতেই গ্রহণযোগ্য নয় ।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রকৃত গায়েব জানতেন না। মহান আল্লাহ্ পাক রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে প্রিয় বান্দা হিসেবে অনুগ্রহপূর্বক যা কিছু অবলোকন করিয়েছেন এবং যে সকল বিষয়ে অবগত করেছেন তা ব্যতীত অপরাপর কোনো বিষয় বা গায়েব সম্পর্কে তিনি অবহিত নন বা ছিলেন না। এ প্রসঙ্গে স্বয়ং আল্লাহ্ পাক ইরশাদ করেছেন-
‘(হে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম!) বলুন, আমি জানি না তোমাদের প্রতিশ্র“ত বিষয় আসন্ন না আমার  এর জন্য কোন মেয়াদ স্থির করে রেখেছেন। তিনি হচ্ছেন গায়েব সম্পর্কে জ্ঞাত। অন্য কারও নিকট তা তিনি প্রকাশ করেননি। তবে, রাসূলদের মধ্যে কাউকে কাউকে খুশী হয়ে জানিয়েছেন। তখন তিনি তার অগ্রে ও পশ্চাদে প্রহরী নিযুক্ত করেন যাতে আল্লাহ্ তায়ালা জেনে নেন যে, রাসূলগণ তাঁদের পালনকর্তার পয়গাম পৌঁছেছিলেন কি-না। রাসূলগণের কাছে যা আছে, তা তাঁর জ্ঞান গোচর। তিনি সবকিছুর সংখ্যার হিসাব রাখেন।’ (সূরা জিন : ২৫-২৮)
মূলতঃ গায়েব বলতে যা বুঝায় তা জানেন একমাত্র আল্লাহ্। তিনিই আ’লিমুল গ্বাইব। এটি তাঁর একটি সিফাত। আর আল্লাহ্ পাকের সিফাতে অন্য কাউকে সহযোগী বা অংশীদার সাব্যস্ত করা র্শিক। রাসূল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রকৃত গায়েব সম্পর্কে অবগত ছিলেন না এবং আল্লাহ্’র এ ঘোষনা সম্পর্কে যারা সন্দেহ পোষণ করছে বা বিভ্রান্তিতে আছে তাদের উদ্দেশ্যে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আল্লাহ্ পাক নিঃসংকোচে সুস্পষ্টরূপে ঘোষণা করতে বলেছেন-
‘(হে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম!) আপনি বলুন, আল্লাহ্ ব্যতীত নভোমণ্ডল ও ভূ-মণ্ডলে কেউ গায়েবের খবর জানে না এবং তারা জানে না যে, তারা কখন পুনরুজ্জীবিত হবে।’ (সূরা আন নমল : ৬৫)
অপর এক আয়াতে আবারও সুস্পষ্টরূপে ঘোষণা করতে বলেন-
‘(হে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম!) বলুন, আমি তোমাদেরকে এ কথা বলিনা যে, আমার নিকট আল্লাহ্’র ধন-ভাণ্ডার আছে। গায়েব সম্বন্ধেও আমি অবগত নই; এবং তোমাদেরকে একথাও বলিনা যে আমি ফেরেশতা; আমার প্রতি যে ওহী আসে আমি কেবল তারই অনুসরণ করি। বলুন, অন্ধ ও চক্ষুষ্মান কি সমান? তোমরা কি অনুধাবন কর না?’ (সূরা আল আন’আম : ৫০)
আল্লাহ্ পাক আরো ঘোষণা করতে বলেন-
‘বলো, আল্লাহ্ যা ইচ্ছা করেন তা ব্যতীত আমার ভালো-মন্দের উপরও আমার কোনো অধিকার নেই। আমি যদি গায়েব জানতাম তবে তো আমি বহুবিধ কল্যাণই লাভ করতে পারতাম এবং কোনো অকল্যাণই আমাকে স্পর্শ করতে পারতো না। আমি কেবল মু’মিন সম্প্রদায়ের জন্য সতর্ককারী ও সুসংবাদবাহী।’ (সূরা আল আ’রাফ : ১৮৮)
‘(হে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম!) বলো, আমিতো তোমাদেরকে  বলি না যে, আল্লাহ্’র ধন-ভাণ্ডার আমার নিকট রয়েছে, একথাও বলি না যে, আমি গায়েবের খবর জানি এবং এও বলিনা যে, আমি একজন ফেরেশতা; আর তোমাদের দৃষ্টিতে যারা লাঞ্ছিত আল্লাহ্ তাদের কোন কল্যাণ দান করবেন না। তাদের মনের কথা আল্লাহ্ ভাল করেই জানেন। সুতরাং এমন কথা বললে আমি অন্যায়কারী হবো।’ (সূরা হুদ : ৩১)
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সদা-সর্বদা সর্বত্র হাযির-নাযির নন। একমাত্র মহান আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা সদা-সর্বদা-সর্বত্র হাযির-নাযির। এটি একমাত্র তাঁরই সিফাত। তাঁর এই সিফাতে অন্য কাউকে অংশীদার সাব্যস্ত করা র্শিক। এ প্রসঙ্গে কালামে পাকে ইরশাদ হয়েছে- ‘…আমি মানুষের গ্রীবাস্থিত ধমনী অপেক্ষাও নিকটতর।’ (সূরা কাফ : ১৬)
‘তোমরা যেদিকেই মুখ ফিরাওনা কেন সেদিকেই আল্লাহ্ বিরাজমান। নিশ্চয় আল্লাহ্ সর্বব্যাপী সর্বজ্ঞ।’ (সূরা আল বাক্বারা : ১১৫)
‘তিনি নভোমণ্ডল ও ভূ-মণ্ডল সৃষ্টি করেছেন ছয়দিনে, অতঃপর তিনি আরশের উপর সমাসীন হয়েছেন। একমাত্র তিনিই জানেন যা কিছু ভূমিতে প্রবেশ করে ও যা কিছু ভূমি হতে বের হয় এবং আকাশ হতে যা কিছু পতিত হয় ও যা কিছু আকাশে উত্থিত হয়। তোমরা যেখানেই থাকনা কেন, তিনি তোমাদের সাথে আছেন; তোমরা যা কিছু করো আল্লাহ্ তা জানেন।’ (সূরা আল হাদীদ : ৪)
হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নবুওয়ত ও রিসালাত সার্বজনীন। অর্থাৎ হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পূর্ববর্তী নবী-রাসূলগণ যেমন বিশেষ একটি গোত্র, সম্প্রদায়, জাতি, ধর্ম ও দেশের জন্য প্রেরিত হয়েছিলেন তিনি তদ্রুপ না হয়ে জাতি-ধর্ম-বর্ণ-গোত্র-দেশ নির্বিশেষে সকলের জন্য প্রেরিত হয়েছিলেন। আল্লাহ্ পাক তাঁকে সমগ্র বিশ্ব মানবতার হিদায়াত ও কল্যাণের জন্য প্রেরণ করেছিলেন। তাই একথা বলা তাঁর শানে বেয়াদবী হবে যে, তিনি শুধুমাত্র মুসলমান ও ইসলাম ধর্মানুসারীদেরই জন্য প্রেরিত হয়েছিলেন এবং তিনি একমাত্র মুসলিমদেরই নাবী ও রাসূল। রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম গোটা মানবজাতির জন্যই রহমত ও সুসংবাদ বয়ে নিয়ে এসেছেন। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সার্বজনীনতা তথা বিশ্বজনীতার সম্পর্কে স্বয়ং আল্লাহ্ পাক কুরআনের একাধিক স্থানে ঘোষণা দিয়েছেন-
‘… (হে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম!) আমিতো আপনাকে গোটা মানবজাতির জন্যই রাসূল হিসেবে প্রেরণ করেছি। আর আল্লাহ্ সব বিষয়েই যথেষ্ট-সব বিষয়ই তাঁর সম্মুখে উপস্থিত।’ (সূরা আন নিসা : ৭৯)
‘আমিতো তোমাকে বিশ্বজগতের প্রতি কেবল রহমতস্বরূপ প্রেরণ করেছি।’ (সূরা আল আম্বিয়া : ১০৭)
‘আমিতো তোমাকে সমগ্র মানবজাতির প্রতি সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপেই প্রেরণ করেছি। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা জানে না।’ (সূরা সাবা : ২৮)
‘কতো মহান তিনি (আল্লাহ্) যিনি তাঁর বান্দার প্রতি ফুরকান অবতীর্ণ করেছেন যাতে সে বিশ্বজগতের জন্য সতর্ককারী হতে পারে।’ (সূরা আল ফুরকান : ১)
‘তিনিই (আল্লাহ্) উম্মীদের মধ্য হতে তাদের জন্য রাসূল প্রেরণ করেছেন …এবং তাদের অন্যান্যদের জন্যও যারা এখনও (ভূমিষ্ঠ হয়নি এবং) তাদের (উম্মীদের) সাথে মিলিত হয়নি। আল্লাহ্ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।’ (সূরা আল জুমু’আ : ২-৩)
বিশ্ব মানবতার হিদায়াত ও কল্যাণের বাণী সম্বলিত সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ স্বয়ংসম্পূর্ণ মহাগ্রন্থ আল-কুরআন রাসূলে আকরাম হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর রচিত নয়। তিনি অন্য কারো সহযোগিতায়ও এই কুরআন রচনা করিয়ে নেননি। বরং আল্লাহ্ পাক হযরত জিবরাইল আলাইহিস সালাম মারফত ওহীর মাধ্যমে তিল তিল করে ধীরে ধীরে পরিপূর্ণ বিশুদ্ধতার সাথে এই আসমানী কিতাব তাঁর রাসূল মুহাম্মদের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উপর নাযিল করেছেন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ পাক ইরশাদ করেন-
‘(হে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম!) আমি তোমার প্রতি কুরআন অবতীর্ণ করেছি ক্রমে ক্রমে।’ (সূরা দাহর : ২৩)
‘আমি তোমার নিকট উত্তম কাহিনী বর্ণনা করছি; ওহীর মাধ্যমে তোমার নিকট এই কুরআন অবতীর্ণ করে।’ (সূরা ইউসুফ : ৩)
কুরআন যদি আসমানী কিতাব হয়ে থাকে তবে পূর্ণাঙ্গ কুরআন একবারে নাযিল হলো না কেন? সন্দেহবাদীদের এ অবান্তর প্রশ্নের জবাবে কালামুল্লাহতে ইরশাদ হয়েছে-
‘(মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে উদ্দেশ্য করে) কাফিররা বলে, সমগ্র কুরআন তার নিকট একবারে অবতীর্ণ হলো না কেন? (জবাবে আল্লাহ্ পাক বলেন,) এভাবে আমি (কুরআন) অবতীর্ণ করেছি তোমার হৃদয়কে তা দ্বারা মজবুত করার জন্য আর তাই তা ক্রমে ক্রমে স্পষ্টভাবে আবৃত্তি করেছি।’ (সূরা আল ফুরকান : ৩২)
দীর্ঘ ২২ বৎসর ৫ মাস ১৪ দিন সময় লেগেছে পরিপূর্ণ কুরআন অবতীর্ন হতে। আর এতেই কাফির ও সন্দেহবাদীরা বলতে থাকে এত দীর্ঘ সময় ধরে মুহাম্মদ নিজেই কুরআন রচনা করেছে। অবিশ্বাসীদের এহেন আচরণে আল্লাহ্ পাক স্বয়ং চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিলেন-
‘তবে কি তারা বলে, এটি সে নিজে রচনা করেছে? বরং এটি তোমার প্রতিপালকের নিকট হতে আগত সত্য যাতে আপনি এমন এক সম্প্রদায়কে সতর্ক করেন, যাদের কাছে আপনার পূর্বে কোন সতর্ককারী আসেনি। সম্ভবত এরা সুপথ প্রাপ্ত হবে।’ (সূরা আস্ সাজদা : ৩)
‘তবে কি তারা বলে সে নিজে এটি উদ্ভাবন করেছে? (হে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম!) বলো যদি আমি নিজে এটি উদ্ভাবন করে থাকি তবে তোমরাতো আল্লাহ্’র শাস্তি হতে আমাকে কিছুতেই রক্ষা করতে পারবে না।’ (সূরা আল আহফাক : ৮)
‘তারা কি বলে এই কুরআন তাঁর নিজের রচনা? বরং তারা মিথ্যাবাদী। যদি তারা সত্যবাদী হয়ে থাকে তবে এর অনুরূপ কোন রচনা উপস্থিত করুক।’ (সূরা আত্ তুর : ৩৩-৩৪)
‘তারা কি বলে তুমি নিজে এটি (কুরআন) রচনা করেছ? বলো, তোমরা যদি সত্যবাদী হয়ে থাকো তবে এর অনুরূপ দশটি স্বরচিত সূরা এনে দেখাও।’ (সূরা হুদ : ১৩)
‘তারা কি বলে যে, এটি (কুরআন) রচনা করেছ? বলো, তবে তোমরা এর অনুরূপ একটি সূরা এনে দেখাও।’ (সূরা ইউনুস : ৩৮)
সুব্’হানআল্লাহ্! আল্লাহ্ পাকের এ চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করার মত কোন মাখলুক অদ্যবধি পাওয়া যায়নি, যাবেও না কিয়ামত পর্যন্ত ইনশা-আল্লাহ্।
পরিশিষ্ট : মহামহিমান্বিত আল্লাহ্ আযযা ওয়া জাল্লা ওয়া বারাকা তাঁর হাবীব রাসূল মুহাম্মদ মুস্তফা, আহমাদ মুজতবা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে যে সীমাহীন উচ্চ মর্যাদা ও মর্তবা দান করেছেন তা আল কুরআনের পাতায় পাতায় সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত আছে এবং সহীহ হাদীস শরীফে তা আরও বিশদভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। আর এসবই আমাদের মতো শেষ জামানার উম্মতদের জন্য যথেষ্ট। সুতরাং অতি ভক্তি প্রদর্শন করতে গিয়ে তাঁর মর্যাদা ও মর্তবা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে কুরআনুল কারীমের সুস্পষ্ট আয়াত ও ঘোষণাকে অস্বীকার করে, বিকৃত করে, ভ্রান্ত তাফসীর করে, জাল-বানোয়াট ও মনগড়া কাহিনীর অবতারণা করে ইয়াহুদী ও খৃষ্টানদের ন্যায় সীমালঙ্ঘনকারী হওয়া কখনো-ই ঈমানের পরিচায়ক হতে পারে না। বরং আমাদের উচিত হবে আল্লাহ্ পাক তাঁর হাবীব রাসূল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর যে মর্যাদা নির্ধারণ করে দিয়েছেন তার ভিত্তিতে তাঁকে সম্মান প্রদর্শন করা। তাই আসুন আমরা সবাই মহান আল্লাহ্ পাকের দরবারে প্রার্থণা করি-
আল্লাহুম্মা আরিনাল হাক্কা হাক্কান, ওয়ার যুকনা এত্তেবায়াহু ওয়া হাব্বীবহু ইলাইনা, ওয়া আরিনাল বাতিলা বাতিলান ওয়ার যুকনা এজতিনাবাহু। ওয়া কাররিহ্’হু ইলাইনা; ওয়ার যুকনা এত্তেবায়া হাদিঈ রাসূলি রাব্বিল ‘আলামীন!
”হে আল্লাহ্! আমাদের হক্বকে হক্ব হিসেবেই বুঝতে দিন আর আমাদের এই তাওফিক দিন যাতে তা অনুসরণ করতে পারি। আর তা আমাদের নিকট প্রিয় করে দিন। আর বাতিলকে বাতিল বলে বুঝতে দিন এবং তা থেকে বিরত থাকার তাওফিক দান করুন। আর তা আমাদের নিকট অপছন্দনীয় করুন। আর আমাদেরকে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হিদায়াত অনুসরণ করার তাওফিক দিন যিনি রাব্বুল ‘আলামীনের রাসূল।

সুম্মা আমীন।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s