ইসলাম ও আমরা : প্রেক্ষিত বাংলাদেশ

আদম শুমারীর হিসেব-নিকেষ বলছে আমাদের এই দেশ-বাংলাদেশ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্টদের দেশ অর্থাৎ দেশের অধিকাংশ মানুষ মুসলিম (১০০জনে প্রায় ৯০জন)। আমাদের স্রষ্টা প্রদত্ত আকল বা জ্ঞান বলছে কোন দেশ যদি মুসলিম প্রধান দেশ হয় তবে স্বাভাবিকভাবেই সে দেশে আল্লাহ্’র সার্বভৌমত্ব এবং দ্বীন রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে পরিপূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকার কথা। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আমাদের দেশের মুসলিম নামধারী শাসক আর শাসিতদের দ্বীনের অবস্থা এতটাই নাজুক যে, মুসলিম দাবী করার পরও সমাজ বা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সালাত কায়েম নেই, যাকাত আদায় হচ্ছে না আর সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় পারিবারিক ও উত্তরাধিকার সম্পর্কিত মুসলিম আইনের আংশিক প্রয়োগ ব্যতীত সকল ক্ষেত্রে ইসলামী আইন-বিধান অনুপস্থিত। প্রকৃতপক্ষে নামধারী ৯০% মুসলিমের মধ্যে অধিকাংশই ব্যক্তিগত সালাত, সিয়াম, হজ্জ, যাকাত প্রভৃতি ইবাদাতের বাইরেও ইসলাম যে কিয়ামত পর্যন্ত সমগ্র মানব জাতির জন্য ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে একটি চির আধুনিক যুক্তিগ্রাহ্য পরিপূর্ণ দ্বীন-জীবন ব্যবস্থা সে সম্পর্কে ন্যূনতম ধারণাই রাখেন না।
অপ্রিয় হলেও সত্য যে, কাগজে কলমে বাংলাদেশ এখন একটি সেক্যুলার দেশ (গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, বাঙালী জাতীয়তাবাদ এই রাষ্ট্রের মৌলনীতি)। আবার এ কথাও বলা হয়ে থাকে যে এটি প্রায় ৯০% মুসলমানের দেশ, এ দেশের মানুষ ধর্মপ্রাণ। এই সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী দুই উপাধির মাঝে সমন্বয় সাধন করতে গেলে যে চিত্রটি ফুটে উঠে, তাই আসলে আমাদের দেশের বাস্তব অবস্থা। নামধারী ৯০% মুসলমানের দেশকে সেক্যুলার করা সম্ভব হয়েছে সুদীর্ঘ সময় ধরে শুদ্ধ ইসলামিক জ্ঞানের চর্চা থেকে দেশের মানুষকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বিচ্ছিন্ন রাখার সুচিন্তিত পরিকল্পনা সফল হওয়ায়। অন্যদিকে, একইসাথে দেশের মানুষ তথাকথিত ধর্মভীরু হওয়ায় যে কোন ব্যবসা বা মতবাদ, তা ইসলামের সাথে যতটা সাংঘর্ষিকই হোক না কেন ইসলামিকভাবে প্যাকেট করে বাজারজাত করা হলে তাতে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হওয়া যায় নিশ্চিতভাবে। ফলশ্রুতিতে এখন শূন্য (ক্ষেত্রবিশেষে মাইনাস) জ্ঞান নিয়েও যে টপিক নিয়ে উদ্দাম আলোচনায় মত্ত হওয়া যায় তা হল ইসলাম। জেনে, বুঝে, দল নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে ইসলাম পালন করার চেষ্টা এখন নিতান্তই ক্ষুদ্র, ব্যক্তিগত উদ্যোগের মাঝে সীমাবদ্ধ। আর সেই সাথে যে কোন ধরণের বিভ্রান্ত মতবাদ প্রচার করার জন্য বাংলাদেশ এখন উত্তম Fishing Ground-এ পরিণত।
এমতাবস্থায় যখন দেখি খুব কাছের মানুষগুলো অনুরূপ কোন কৌশল/প্রচেষ্টার ফাঁদে পা দিয়ে ঈমান হারাচ্ছে (In the eye of ALLAH), অথচ তা উপলব্ধিও করতে পারছে না, তখন যে প্রবল কষ্টের অনুভূতি হয়, তার তাড়না থেকেই এই লেখার অবতারণা। একজন মুসলিম এই দুনিয়ায় তার ক্ষণস্থায়ী আবাসকালে সবকিছু হারাতে পারে অর্থ, খ্যাতি, সন্তান, সংসার। কিন্তু যা কখনো হারায় না বা হারাতে পারে না, তা হলো জীবনের উদ্দেশ্য (Goal)। কি করছি, কেন করছি-এ সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা থাকালে, যে কোন পরিস্থিতিতেই সে অবিচল থাকতে পারে । এই অবিচলতা তাকে এনে দেয় অনাবিল মানসিক প্রশান্তি। শান্তির এই বিষয়টি ইসলামের সাথে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত। অপরপক্ষে যখন ঐশী জ্ঞানের পূর্ণাংগ চিত্রের সাথে সে সম্পূর্ণ ভাবে অপরিচিত থাকে, তখন নানা অতৃপ্তি, হাহাকার তাকে পেয়ে বসে। শান্তির খোঁজে যে কোন কিছুকেই অবলম্বন করতে সে দ্বিধাবোধ করে না। আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষের অবস্থাই এখন এমন।
“আসলে সকল ধর্মের মর্মকথা একই, পার্থক্য শুধু অভিব্যক্তিতে বা বাহ্যিক প্রকাশে বা Rituals-এ” এই কথা যদি সত্যি হত, তবে মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর মিশনের কোন প্রয়োজনই ছিল না। মক্কার পৌত্তলিকরা সবাই আল্লাহ’কে মানতো। আবু জাহেল, আবু লাহাব সবাই আল্লাহ’য় বিশ্বাস করতো কথায় কথায় আল্লাহ’কে নিয়ে শপথ করতো। কিন্তু তবু আমরা তাদের কাফির ও মুশরিক বলে থাকি এবং কাফির ও মুশরিকের সাথে কিছুতেই মুসলিমদের প্রেম-প্রীতি, সহ-অবস্থান, সামাজিকতা বা নির্বিচার মেলামেশা যে সম্ভব নয়, সে কথা পবিত্র কুরআনের বহু আয়াতে সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত রয়েছে। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর বহু হাদীসেও মুসলিমদের সাবধান করে দেওয়া হয়েছে।
আমাদের বাংলাদেশের মানুষের নিকট ইসলামের ব্যাখ্যা আর আরবদের ইসলামের ব্যাখ্যা এক না। ইসলামের রাজনৈতিক জন্ম ও বিকাশ আরব ভুখন্ডে। এর কারণ আরবীয়রা সবসময়ই ইসলামকে দুনিয়া এবং আখিরাত এই দুই স্বার্থের অনুকূল দ্বীন হিসাবেই গন্য করেছে। রাজনীতি যেহেতু পার্থিব স্বার্থের বিষয় তাই তাদের ব্যাখ্যাতে রাজনীতি ইসলাম-এর জরুরী অঙ্গ। দুনিয়াবী (পার্থিব) স্বার্থে ইসলাম-এর ব্যবহার আরবীয়দের কাছে বক ধার্মিকতা না, কিন্তু আমাদের কাছে বক ধার্মিকতা। এর কারণ আমাদের ‘ধর্ম’ শব্দটা সম্পর্কে ধারণা। আমাদের প্রায় সকলের ধর্ম চর্চার প্রধান উদ্দেশ্যই হচ্ছে পার্থিব স্বার্থ ত্যাগ করে নির্মোহ হয়ে উঠা। আমাদের প্রায় সকলের কাছে ইসলাম মানে মাসজিদ, দরগাহ আর খানকার চার দেয়ালের মাঝে সীমাবদ্ধ ইবাদাত-বন্দেগী সমৃদ্ধ একটা ধর্ম। যে কারণে আমরা নাবী-রাসুলগণকে উপস্থাপন করি পার্থিব স্বার্থহীণ আধ্যাত্মিক ধর্মগুরু হিসাবে। আরবদের কাছে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আধ্যাত্মিকতার পাশাপাশি একজন রাজনৈতিক নেতা, আদর্শ সফল রাষ্ট্রনায়ক, অন্যদিকে আমাদের কাছে তিনি হেরা গুহায় ধ্যানমগ্ন অপার্থিব জ্ঞানসম্পন্ন মহাপুরুষ। আমাদের বাংলাদেশের ইসলামে কি তাইলে রাজনীতি নাই? আলবৎ আছে। তবে সেই রাজনীতি এই অঞ্চলের দীর্ঘদিনের সেক্যুলার, সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী রাজনীতির সাথে একাকার হয়ে গেছে, তার ধারাবাহিক বিকাশ হয়ে গেছে। একটা উদাহরণ দিলেই বাংলার মুসলমানদের রাজনীতির ধরনটা বুঝতে পারবেন: ফকির মজনু শাহ, মুসা শাহ কিংবা করিম শাহ এর রাজনীতি হলো বাংলার মুসলমানদের রাজনীতি যেটিকে পলিটিক্যাল ইসলাম বলার উপায় নাই। কারণ মজনু শাহ ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে হিন্দু মুসলিম ঐক্যের চেষ্টায় রানী ভবানির কাছে যেই চিঠি লিখছিলেন তাতে স্পষ্ট দেখা যায় যে, তিনি হিন্দু রানীকে নিজের শাসক মেনে নিয়েছেন। আবার করিম শাহ এবং তার ছেলে টিপু শাহ যেই পাগলা তরিকা এবং রাজনীতি করেছে ব্রিটিশ রাজ ও জমিদারদের বিরুদ্ধে তাতে দেখবেন যে, হিন্দু, মুসলিম, আদিবাসী একাকার হয়ে গেছে এবং এদের ধর্ম বিশ্বাসও মিলে মিশে একাকার হয়ে গেছে। অন্যদিকে আবার মীর নিসার আলী তিতুমীর ছিলেন পলিটিকাল ইসলামিস্ট, তিনি আরব থেকে এটা শিখে এসেছিলেন। মজনু শাহ কিংবা করিম শাহ ব্রিটিশরা বিধর্মী খ্রিষ্টান, তাগুত বলে তাদের বিরোধীতা করেন নি, করেছেন তাদের শোষন-বঞ্চনার কারণে। কিন্তু তিতুমীর ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে রাজনীতি করতে গিয়ে তাদের শাসনকে তাগুতী-কুফরী শাসন ব্যবস্থা বলে চিহ্নিত করেছেন এবং সেই সুবাদে এর বিরোধীতা করেছেন।
কিছুদিন পূর্বে মুসলিমদের নিকট সবচেয়ে প্রিয় ও সম্মানিত গ্রন্থ কুরআন শরীফ-এর অবমাননা করা নিয়ে অনেক কিছুই হলো। মানুষের ঘর পুড়লো। মুর্তি ভাঙা হলো। যারা ঘর পুড়িয়েছেন তাদেরকে যেমন গ্রেফতার করা হয়েছে তেমনি কুরআন শরীফ অবমাননার অভিযোগেও লোকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তবে কুরআন শরীফ-এর অবমাননা ঠিক কিভাবে, কোন কোন কারণে হয় বিষয়টা বুঝা দরকার। আমরা কুরআন শরীফ শব্দটা শুনলে আমাদের চোখের সামনে যেই দৃশ্যটা চোখে ভেসে উঠে তা হলো- ঘরের উঁচু কোন নিরাপদ স্থানে রাখা মোটা একটা আরবী বই। যে বইটা বেশিরভাগ সময় একটা মোটা কাভার বা গিলাফে মোড়ানো থাকে। বাঙালি মুসলমানের ঘরে বইটা থাকে, কাভারে মোড়ানো, কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই ধুলি জমা। নিতান্তই প্রয়োজন ছাড়া পড়া হয় না বিধায়, ধুলো-ময়লা কাভারে/গিলাফে লাগে, কুরআনের গায়ে লাগে না, তাই এর অবমাননা হচ্ছে না বলে ধারণা করা হচ্ছে। আমার মতো অধিকাংশ বাংলাদেশিই আরবী বুঝেন না, যদিওবা অনেকেই আরবী বানান করে, সুর করে পড়া শিখেছেন, তাও আবার কুরআন খতম দিয়ে লক্ষ-কোটী সওয়াব লাভের আশায়, কিন্তু অর্থ শিখেন নাই। অর্থ জানলে কী কল্যাণ হবে সে সম্পর্কে ধারণা না থাকার কারণে শেখার তাকিদও নাই। অর্থ ছাড়াই ভাষা শিক্ষার মতো আজব একটা বিষয় বাংলাদেশের বাঙালি মুসলমানদের কালচারে আছে, আর আরবী ভাষায় কুরআন শিক্ষা এর মাঝে অন্যতম। ভাষা জ্ঞান না থাকার কারণে আমাদের জীবনে এর দাবী আর গুরুত্ব আমরা অনুধাবন করতে ব্যর্থ হচ্ছি। কুরআনকে সংবিধান-সমাজ ও রাষ্ট্র্র পরিচালনার আইন-বিধান সম্বলিত গ্রন্থ জ্ঞান করে মধ্যযুগে আরব দুনিয়ায় নানান রাষ্ট্র কাঠামো তৈরি হয়েছিলো। এইসব রাষ্ট্রে কুরআন বলতে মোটা কাভার/গিলাফে মোড়া মোটাসোটা আরবী বই ভাবা হতো না। এইসব রাষ্ট্রে কুরআন ছিলো আল্লাহ’র জীবন্ত বাণী, শরীয়াহ’র ভিত্তি, আল্লাহ প্রদত্ত আইন-বিধান সম্বলিত গ্রন্থ। বাংগালী অধ্যুষিত বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র কুরআনকে অদ্যবধি সংবিধান হিসাবে গ্রহণ করে নাই। এর কারণ, কাগজ-পত্রে মুসলিম পরিচয় উপস্থাপন করে গর্ববোধ করলেও আমাদের সিংহভাগই মূলতঃ পশ্চিমা সেক্যুলার ভাবাদর্শে উজ্জিবিত। মুসলিম পরিচয়ে সেক্যুলার ভাবাদর্শ গ্রহণে আমাদের তেমন কোন সমস্যাও হয় নাই। কারণ বাঙালি মুসলমানের কালচার পীর-মুর্শিদ নির্ভর কালচার। অপ্রীতিকর হলেও সত্য যে, মানুষের মুখের বাণী এবং আল্লাহ’র মুখের বাণীর ফারাক চিন্তা করার মতো লোক আমাদের দেশে কখনোই খুব বেশি ছিল না। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ আমাদের দেশে তাই মানুষের লেখা সংবিধান রাষ্ট্রের ভিত্তি হওয়ায় বাঙালি মুসলমানের কোন সমস্যা হয় নাই। তবে আজব ব্যাপার হচ্ছে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের মুসলিম নামধারী জনগণ সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় কুরআনকে গ্রহণ না করলেও তা পুরোপুরি বর্জন করে নাই। কুরআনকে অন্তত কাভারে/গিলাফে পেচানো মোটা কাভারের পবিত্র একটা বই হওয়ার মর্যাদা দিয়েছে, যা অযু অবস্থায় হাত দিয়ে ধরতে হবে, মাটিতে পরে গেলে বা পা লাগলে সালাম করতে হবে, কপালে ঠেকিয়ে চুমু দিতে হবে এবং মাঝে মাঝে না বুঝে তোতাপাখির মতো তা আবৃতি করতে হবে। কেউ যদি এই গ্রন্থটিতে পা লাগায়, ফেসবুকে লাথি দেয়ার ছবি দেয় অথবা পুড়িয়ে দেয় বা ফেসবুকে পোড়ানোর ছবি দেয় তাহলে এই গ্রন্থটির অবমাননা হয়েছে এমনটা বাঙালি মুসলমানরা ধরে নিয়েছে। কিন্তু আল্লাহ পাকের সুস্পষ্ট নির্দেশ থাকার পরও কুরআনকে সংবিধান হিসাবে গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানানোতে কুরআনের কোন অবমাননা হয় না এমন একটা বাড়তি সুবিধা বাংলাদেশ রাষ্ট্র দিয়ে থাকে।
কুরআন যদি রাষ্ট্রে আল্লাহ প্রদত্ত আইন-বিধান তথা সংবিধান হয়ে উঠে তবে সেই রাষ্ট্রে কোন নারী রাষ্ট্রপ্রধান/প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন না, দুর্নিতীবাজ, লুটেরা, মুনাফিক, দুশ্চরিত্র লম্পট, বেঈমান প্রমুখ ব্যক্তিরাও রাষ্ট্রপ্রধান/প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন না। কুরআনকে তাই মুসলিম নামধারী রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ আল্লাহ প্রদত্ত আইন হিসাবে সংবিধানের মর্যাদা দিতে রাজি না। তাদের দলের লোকজনও এতে রাজী হবেন না। এরা যেহেতু সবাই পুজিবাদী সমাজে বস্তুবাদী ধ্যান-ধারণা নিয়ে বাস করে, তার সুযোগ সুবিধা গ্রহণ করে, সূদ নির্ভর অর্থনীতি যেহেতু তাদের শাসক শ্রেণী প্রতিষ্ঠিত করেছে তাই কুরআনকে আল্লাহ প্রদত্ত আইন হিসাবে সংবিধান এর মর্যাদা দেয়া সম্ভব না, সেটা তাদের শ্রেণী চরিত্র বিরোধী হবে। মধ্যবিত্ত বাঙালি মুসলমানদের মাঝেও তার শাসকশ্রেণীর এই চরিত্র বর্তমান। এমনকি তাদের প্রতিনিধিত্বকারী ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোও এই একি চরিত্র বহন করে। কারণ মুখে এরা কুরআনকে আল্লাহ প্রদত্ত সংবিধান হিসাবে স্বীকৃতি দিলেও নাজায়েয নারী নেতৃত্ব মেনে নেয়, মানুষের সার্বভৌমত্বভিত্তিক গণতান্ত্রিক পদ্ধতির রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করে।
আমাদের দেশের নামধারী মুসলমানদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হচ্ছে- পশ্চিমের কাছে তাদের মানসিক দাসত্ব। তারা ইসলাম শিখতে চায় পশ্চিম থেকে, গণতন্ত্রও পশ্চিম থেকে শিখতে চায়, আবার প্রগতিশীলতাও। তাদের মতে ইসলাম থাকে মদিনায়, মদনগঞ্জে ইসলাম নাই। সুতরাং মদনগঞ্জের নাম পরিবর্তন করে মাদনীনগর অথবা রসূলপুর রাখলে সেখানে ইসলাম চলে আসবে। তাই একাত্তুরের মুক্তিযুদ্ধের পরে সংখ্যাগরিষ্ট মুসলমানের দেশে আল্লাহ প্রদত্ত কুরআন সংবিধানের পরিবর্তে মানব রচিত সংবিধানই জাতির মানুষ মেনে নিয়েছিলো। ফলাফল একাত্তুরের আগে উপনিবেশ, পরে নয়া উপনিবেশ। উপনিবেশ আমাদের তাবৎ গোজামিল, অবক্ষয়, নোঙরামি আর সুবিধাবাদী সমঝোতা এবং ঐক্যমতের মূল ভিত্তি। উপনিবেশের কারণে আমাদের ইসলাম মদিনায় থাকে আর প্রগতিশীলতা থাকে ইংল্যান্ড, জার্মানি, ফ্রান্স বা সোভিয়েত রাশিয়ায় এবং কারো কারো জন্যে আমেরিকায়।
বাংলাদেশে কি কখনও ইসলামকে রাজনৈতিক ভিত্তিতে প্রতিষ্টিত করা হয়েছে? -পুরোপুরি উপনিবেশিক ব্যবস্থার উপরে বসে আছে পুরো সমাজ – সেখানে ইসলামকে রাজনীতির অনুসংগ হিসাবে দেখার কি কোন সুযোগ আছে? কার্যত এখনও বাংলাদেশের রাজনৈতিক, সামাজিক আর সংস্কৃতিক নেতৃত্বে আছে উপনিবেশের দাসরা – যারা তাদের মগজের ভিতরে দাসত্বকে ধারণ করে আছে। যাকে আমরা বাঙালী সংস্কৃতি বলে চালানো চেষ্টা করছি – তাতো শুধু পশু-পাখির মুখোশ পড়ে প্রভাত ফেরী আর ১লা বৈশাখ উদযাপনের মাঝেই আটকে আছে।
ইসলাম পার্থিব এবং পরলৌকিক বিষয়গুলোকে সমান গুরুত্ব দিয়েছে। যদিও বাংলাদেশের মিলাদ আর জানাযা নির্ভর ইসলাম চর্চার কারণে আমরা হয়তো সেটুকু জানার সুযোগ পাচ্ছি না। কুরআনের ২য় সুরা বাকারা’র ২য় লাইনেই গায়েবের (অদেখা বিষয়ের) উপর ঈমান আনার কথা বলার পরই বলা হয়েছে অর্থনৈতিক বিষয়ের কথা। অথচ আফসোস – দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া – সেলফে রাখা কুরআন খুলিয়া
আমাদের দেশে লক্ষ লক্ষ আলেম-উলামা, হাজার হাজার মসজিদ-মাদরাসা থাকার পরও মানুষ আমল সম্পর্কে যতটা সচেতন, চিন্তাশীল, যতটা আবেগপ্রবণ, ঈমান ও ইসলাম সম্পর্কে তার এক শতাংশও দেখা যায় না। আমাদের দেশে তাগুতী শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত থাকার পরও ইসলামের দরদী ভক্তদের কেউ কেউ প্রচলিত জাহিলিয়্যাত তথা তাগুতী রাষ্ট্র ব্যবস্থার কিছু কিছু আইন, পদক্ষেপ ও কথাবার্তা সম্পর্কে মাঝে মধ্যে খুঁত ধরেন যে, সরকারের অমুক কাজ ইসলাম বিরোধী। কোথাও কোথাও কিছু ইসলাম বিরোধী আইন বা বিধি ব্যবস্থা দেখে তারা রেগে যান। তাদের ভাব দেখে মনে হয়, ইসলাম যেন পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়েই আছে, তাই অমুক অমুক ত্রুটি তার পূর্ণতার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে আছে। মূলতঃ তাগুতকে অস্বীকার করে তাওহীদ গ্রহণ করার মাধ্যমে ঈমানদার হতে হয়। তাগুতকে অস্বীকার/বর্জন করার ধরণ হলো: আল্লাহ ছাড়া অন্য সবকিছুর সার্বভৌমত্ব, আইন-বিধান ও কর্তৃত্ব অস্বীকার করা, আল্লাহ ছাড়া অন্য সবকিছুর দাসত্ব, আইনের আনুগত্য ও উপাসনা (ইবাদাত) বাতিল বলে বিশ্বাস করা, তা ত্যাগ করা, ঘৃণা ও অপছন্দ করা, এবং যারা তা করবে তাদের অস্বীকার করা, তাদের সাথে আল্লাহ’র বিধানের ভিত্তিতে শত্রুতা পোষণ করা। সুতরাং একজন মানুষকে আল্লাহ’র নিকট ঈমানদার মুসলিম হিসেবে পরিগণিত হতে হলে তার তাওহীদ, র্শিক ও তাগুত সম্পর্কে প্রকৃত জ্ঞান ও উপলব্ধি থাকতে হবে। আল্লাহ’র রুবুবিয়্যাতে তাওহীদ, উলুহিয়্যাতে তাওহীদ সম্পর্কে না জানলে যেমন ঈমান গ্রহণ করা যায় না তদরূপ র্শিক ও তাগুত না চিনলে ঈমান আনার পূর্বশর্ত পূরণ করা যায় না।
আমাদের দেশের তাগুতের সমর্থক আলিমগণ কর্তৃক মুসলিম জনগণকে বিভ্রান্ত করার প্রচেষ্টা সত্বেও দ্বীনের অপরিহার্য দাবী এই যে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাই সার্বভৌম ক্ষমতার একমাত্র মালিক এবং আইন-বিধান প্রণয়নের অধিকার একমাত্র তাঁরই। তিনিই সিদ্ধান্ত দিতে পারেন কোনটি হক্ব (গ্রহণযোগ্য) আর কোনটি বাতিল (পরিত্যাজ্য) এবং মানুষ কিভাবে তাদের জীবন পরিচালনা করবে। আমরা দুনিয়াতে এসেছি একমাত্র আল্লাহ্’র সার্বভৌমত্বের গোলামী করার জন্য এবং আমাদেরকে অবশ্যই তাঁর অধিকার সম্পর্কে বুঝতে হবে অতঃপর একমাত্র তাঁরই আইন বা হুকুম মানার মাধ্যমে আমাদের সকল আনুগত্যকে তাঁর দিকে ফিরিয়ে দিতে হবে।
বাংলাদেশ সহ গোটা বিশ্বে মুসলিম উম্মাহর পুনরুত্থানের পথে সবচেয়ে বড় বাধার প্রাচীর হলো তাগুত ও র্শিক সম্পর্কে অজ্ঞতা। অর্থাৎ বর্তমান সময়ের প্রতিষ্ঠিত তাগুত ও র্শিককে চিহ্নিত করতে না পারা। সকল সমস্যার মূল হলো এই তাগুত আর র্শিককে চিনতে না পারার সমস্যা। আল্লাহ্’র আইনের মুকাবিলায় মানুষকে আইন প্রণয়নের অবৈধ ক্ষমতা প্রদান, অত্যাচারী শাসকগণ কর্তৃক সেই আইন প্রণয়নের ক্ষমতা প্রয়োগ ও জনগণকে তাদের আইন মানার জন্য নির্দেশ দান হলো সেই বিষ যা ইসলামের মূল, কান্ড ও শাখা-প্রশাখাকে ধ্বংস করে চলেছে।
আমাদের দেশের অধিকাংশ আলেম যারা মানুষের শত্রুতার ভয়ে অথবা তাদের চাকরী চলে যাওয়ার ভয়ে অথবা রুটি-রুজিতে আঘাত আসার ভয়ে অথবা শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক জুলুম নির্যাতনের শিকার হওয়ার ভয়ে কিংবা নিজেদের সামাজিক অবস্থান নষ্ট হয়ে যাওয়ার ভয়ে জাতির মানুষকে প্রকৃত ঈমান-ইসলামের দাওয়াত দেন না আর তাগুত ও র্শিকের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কোন আন্দোলন দুরে থাক স্পষ্ট করে কোন কথাই বলেন না। আবার একশ্রেণীর পোষা আলিম আছেন যারা র্শিক-বিদ’আত বলতে মাজার-কবর-তাবিজের বাইরে কিছু দেখতে পান না। মূর্তি পূজা, কবর-মাজারে সিজদাহ্ করা অবশ্যই র্শিক। কিন্তু অজ্ঞতার কারণে মানুষের তৈরী মূর্তির পূজা, অন্ধ আবেগে মৃত মানুষের কবর-মাজারে সিজদাহ্ দেয়াকে যারা র্শিকে আকবর বলে অভিহিত করে থাকেন, অথচ আল্লাহ্দ্রোহী শক্তির আইন-বিধান প্রনয়ণের ক্ষমতা ও তা মান্য করাকে র্শিক বলে আখ্যায়িত করেন না এবং মূর্তি পূজারী, মাজার পূজারীকে মুশরিক মনে করেন, কিন্তু তাগুতী শক্তি তথা মানব রচিত আইনের প্রণেতা, রক্ষক ও অনুসারীদের র্শিককারী-মুশরিক মনে করেন না, তারা প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ্’র কিতাব কুরআন ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সুন্নাহর প্রকৃত জ্ঞান লাভ করতে পারেননি। যদ্বারা বুঝা যায় ঈমানদার দাবী করা সত্বেও তারা ইসলামকে পরিপূর্ণরূপে গ্রহণ করেননি। দুনিয়াবী স্বার্থ ক্ষুন্ন হওয়ার ভয়ে যারা কুরআন ও সুন্নাহর ফায়সালা জানা থাকা সত্বেও তদনুযায়ী আমল (কাজ) করেন না, তাদের সম্পর্কে হাদীসে বর্ণিত হয়েছে-
“হযরত বুরাইদা (রাযিআল্লাহু আনহু) তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, নাবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: “তিন ধরনের বিচারক রয়েছে। এক শ্রেণী জান্নাতে যাবে এবং দু’শ্রেণী জাহান্নামে যাবে। যে জান্নাতে যাবে সে ব্যক্তিতো এমন, যে হক্বকে (সত্যকে) জানার পর তদনুযায়ী বিচার-ফয়সালা করবে। পক্ষান্তরে যে বিচারক হক্বকে হক্ব হিসেবে জানার পরও স্বীয় বিচার-ফয়সালায় জুলুম করবে সে জাহান্নামে যাবে। আর যে ব্যক্তি অজ্ঞতাবশতঃ হক্বের জ্ঞান ছাড়াই ভুল বিচার করবে সেও জাহান্নামে যাবে।” [আবু দাউদ-অনুচ্ছেদ/৩৮৬-হা/৩৫৩৫-ই.ফা.বা, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ, তিরমিযী]

মহান রব্ব আল্লাহ্ সুস্পষ্ট ভাষায় ফরমান জারী করে দিয়েছেন-
“নিশ্চয়ই আল্লাহ্’র নিকট একমাত্র মনোনীত দ্বীন হচ্ছে ইসলাম।” (সূরা আল ইমরান ৩:১৯)
অর্থাৎ ইসলামকে মহান রব্ব আল্লাহ্ মনোনীত করলেন একমাত্র গ্রহণযোগ্য দ্বীন-জীবন ব্যবস্থা হিসেবে। অর্থাৎ কি ব্যক্তিগত জীবনে, কি সামাজিক জীবনে বা রাষ্ট্রীয় জীবনে সকল ক্ষেত্রেই ব্যবস্থা (SYSTEM) হিসেবে আল্লাহ্’র নিকট গ্রহণযোগ্য হচ্ছে একমাত্র ইসলাম। তাই যদি কেউ নিজস্ব ধ্যান-ধারণাপ্রসূত কোন বিষয়কে ইসলামের বিকল্প বা পরিপূরক হিসেবে ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে প্রতিষ্ঠিত করতে চায় তবে সে স্পষ্টতঃই পথভ্রষ্টদের দলে শামিল বলে গণ্য হবে। আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের জিম্মাদারী থেকেও সে/তারা সম্পূর্ণ মুক্ত হয়ে যাবে। কারণ, আল্লাহ্ রাব্বুল ইয্যত সুষ্পষ্ট ঘোষণা করেছেন-
“যে লোক ইসলাম ছাড়া অন্য কোন দ্বীন-জীবন ব্যবস্থা তালাশ করে, কস্মিণকালেও তা গ্রহণ করা হবে না এবং আখেরাতে সে হবে ক্ষতিগ্রস্ত।” (আল ইমরান ৩:৮৫)

অথচ আফসোস! হায় আফসোস! আমাদের ঈমান আজ ভাইরাসে আক্রান্ত। যে কারণে আল্লাহ্ তায়ালার ঘোষণাও আমাদের মনকে ভীত করছে না, করছে না গোমরাহী মুক্ত। মানব সৃষ্ট ধ্যান-ধারণা তাই আজ আমাদের পথ ও পাথেয়। লাগামহীন মুনাফেকী আচরণ আজ আমাদের একমাত্র সম্বল। আজ আমরা কিয়ামত দিবসে আল্লাহ্’র নিকট নিজ নিজ কৃতকর্মের হিসেব দেয়া নিয়ে ততটা চিন্তিত নই যতটা চিন্তিত দুনিয়ার ভোগ বিলাসের উপাদান ধন-সম্পদ আহরণ করা নিয়ে। তাগুতের অন্যায়-অত্যাচার, জোর-জুলুম-শোষণের বিরূদ্ধে কিংবা শিরক-কুফরীর বিরূদ্ধে আজ আমাদের কণ্ঠ আর গর্জে ওঠে না। জিহাদকে আজ সন্ত্রাস মনে হয়। এর চেয়ে বরং ভালো লাগে গায়ে আতর মেখে, চোখে সুরমা দিয়ে, মাথায় পাগড়ি বেঁধে, হাতে মেসওয়াক আর শরীরে এ্যারাবিয়ান জুব্বা চড়িয়ে নফসের ইসলাহ’র নামে মাসজিদ, খানকা, দরগার চার দেয়ালের মাঝে দিন গুজরান করতে। আজ আমাদের সম্মুখে অসংখ্য বান্দার হক্ব, আল্লাহ্’র হক্ব, ফরজ-ওয়াজিব আদায় হওয়ার প্রতীক্ষায় পড়ে আছে অথচ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মুস্তাহাব সম বিষয় নিয়ে নিজেদের মধ্যে বাহাস-মুনাজারা, লাঠালাঠি করে আপন মুসলমান ভাইয়ের খুন ঝরাতে দ্বিধাবোধ করছি না। যেমন ইবাদাত কবুলের পূর্বশর্ত শিরকমুক্ত ঈমান আর ঈমানের পূর্বশর্ত তাগুতকে অস্বীকার-অমান্য করা অথচ এই দুই পূর্বশর্ত পুরণ করার দিকে ভ্রুক্ষেপ না করে একদল আছেন যারা সহীহ সালাতের নামে তাদের গ্রহণকৃত হাদীসের আলোকে ‘সশব্দে আমীন’, রাউফুল ইয়াদা’ঈন, বুকে হাত বাঁধা প্রভৃতি নিয়ে বাহাসের ডাক দিয়ে যাচ্ছেন, আরেকদল আছেন যারা ঈমানের পূর্বশর্ত সম্পর্কে ধারণাই রাখেন না অথচ আমল সহীহ করার জন্য ঘুরে ঘুরে মানুষকে ওজু, গোসল ও সালাতের তালিম দেন এবং বাড়ীর পাশে মাসজিদ থাকা সত্তেও দুর-দুরান্তের মাসজিদে মাসজিদে চিল্লা দেওয়ার জন্য মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেন। আমাদের দেশে আবার কিছু ইসলামী দল আছে, যারা সমাজ ও রাষ্ট্রের মানুষ ঈমানে আছে না শিরকে, ইসলামে আছে না জাহিলিয়্যাতে, সেদিকে তারা কোন দৃষ্টিপাত করেন না। অথচ তাদের মধ্যে কেউবা ডাকেন জিহাদের দিকে, কেউবা ডাকেন ইসলামী রাষ্ট্র গঠনের দিকে, কেউবা ডাকেন খিলাফত পুনঃপ্রতিষ্ঠার দিকে। তাদের কর্মকান্ড দেখে মনেই হয় না যে কুরআনে এরূপ কোন আয়াত আছে:
“যে ব্যক্তি আল্লাহ্’র সাথে কাউকে শরীক করেছে তার ওপর আল্লাহ জান্নাত হারাম করে দিয়েছেন এবং তার আবাস হবে জাহান্নাম। আর এ ধরনের জালিমদের কোন সাহায্যকারী নেই।” (সূরা মায়িদাহ ৫:৭২)
“যদি তুমি র্শিক করো, তাহলে তোমার আমল বিনষ্ট হয়ে যাবে এবং তুমি হবে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভূক্ত।” (সূরা যুমার ৩৯:৬৫)
“কিন্তু যদি তারা কোন র্শিক করে, তাহলে তারা যত আমলই করুক না কেন তা ধ্বংস হয়ে যাবে।” (সূরা আনআ’ম ৬:৮৮)

সুতরাং দেখা যাচ্ছে আল্লাহ্’র নিকট আমাদের কোন কাজ কবুল হওয়ার এবং তাঁর নিকট হতে বিশেষ সাহায্য পাওয়ার মূল শর্তই হচ্ছে পরিপূর্ণ তাওহীদ গ্রহণ করা অর্থাৎ বিশ্বাস বা কর্মে র্শিক মুক্ত থাকা।
ইবাদাত কবুল হওয়ার পূর্বশর্ত হালাল রুজী। হারাম আহার দ্বারা বেড়ে উঠা শরীর জাহান্নামের ইন্ধন হবে। অথচ রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত প্রত্যেকটি প্রতিষ্ঠান সুদ-ঘুষে আপাদমস্তক জর্জরিত। রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রভাবে সামাজিক জীবনেও সুদ-ঘুষ-জুয়ার মাধ্যমে উপার্জিত ঘৃণ্য আয়কে বৈধ মনে করা হচ্ছে। ইচ্ছায় অনিচ্ছায় দেশের মানুষ সুদ-ঘুষ-জুয়ার ন্যায় হারাম উপার্জনে লিপ্ত হতে বাধ্য হচ্ছে। দেশে সরকারী-বিরোধী দল, বামপন্থী, এন.জি.ও-কাদিয়ানী-মিশনারী প্রভৃতি বহুমুখী আক্রমণে প্রকৃত ইসলামী মূল্যবোধ আজ বিপন্ন; কিন্তু তা নিয়ে আমাদের মুসলিম নামধারীদেও বিন্দুমাত্র মাথা ব্যথা নেই। কারণ, আমরাতো প্রকৃত দ্বীন দরদী নই, সুন্নাতী লেবাসের অনুরক্ত অকুণ্ঠ দুনিয়া পূজারী। যে কারণে মুসলিম দাবী করার পরও কিছুদল ব্যস্ত গলাবাজিসমৃদ্ধ সুন্নাহ্’র পরিপন্থী ইসলামী আন্দোলন নিয়ে, আর কিছু দল ব্যস্ত হারাম গণতন্ত্রকে ইসলামের মোড়কে জনগণের সম্মুখে উপস্থাপন করে নিজেদের আখের গোছাতে। এরই ফাঁকে কিন্তু তথাকাথিত গণতন্ত্রী, প্রগতিবাদী, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী, জাতিয়তাবাদী, বামপন্থী, সমাজতন্ত্রী, কাদিয়ানী, নাস্তিকরা কিন্তু ঠিকই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার মসনদ দখলে নিয়ে নিয়েছে। তারা তথাকথিত মুসলমানদের ন্যায় এতটা বোকা নয় যে, নিজেদের মধ্যে মারামারি, কাটাকাটি করে অন্যকে গদি দখলের সুযোগ করে দিবে। তারা অন্ততঃ এটুকু বুঝতে পেরেছে যে আল্লাহ্ যদি বর্তমান তুরস্কের মতো পরিস্থিতির সৃষ্টি না করেন তবে সহসাই এদেশের মুসলমানদের মোহমুক্তি ঘটবে না, কাজেই যতদিন সম্ভব রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অংশীদার হয়ে  নিজের আখের গুছিয়ে নিতে দোষ কি! সুতরাং আজ আমরা এদেশের মুসলমানরা যে ইসলামকে ধারণ করে আছি একে অন্ততঃ মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ইসলাম বলা চলে না কারণ এর সাথে কুরআনী শিক্ষার কোন মিল খুঁজে পাওয়া সত্যিই দুষ্কর। বরং একে বলা চলে রাজতন্ত্রী, ধনিক-বণিক, হারামখোর শাসক, শোষক শ্রেণী ও তাদের দক্ষিণা ভোগীদের কবর জিয়ারত, জন্ম বার্ষিকী, মৃত্যু বাষিকী, খতমে ইউনুস, খতমে খাজেগান, ঝাড়ফুঁক, তাবিজ-কবজ, মাইকে শবীনা খতম, আতর-সুরমা, ফার্সী-আরবী নাম, সুন্নতে খত্’না, চল্লিশা-কুলখানী মার্কা সমাজের পরগাছাদের হালুয়া-রুটির ইসলাম।
আল্লাহ্ তাঁর রাসূল মুহাম্মাদকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদের জন্য রহমত ও মুক্তির দূত হিসেবে প্রেরণ করেছেন। অথচ আমরা কি তাঁর সমুচিত কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করতে পেরেছি? তাঁর আনীত কুরআন যে মৌল-মানবিক ও আর্থ-সামাজিক বিষয়াবলীর ভিত্তিতে একটি সফল বিপ্লব পরিচালনার রূপরেখা আমাদের সম্মুখে রেখে গেছে তার মাধ্যমে একটি সমৃদ্ধ ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা কি আমরা কায়েমের উদ্যোগ নিয়েছি? -প্রশ্নগুলো স্বগতোক্তি ধরনের শুনালেও এর উত্তর আমাদের সবারই জানা। তাই হয়তো জনৈক মনীষী বলেছিলেন-‘মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আজ আমাদেরকে দেখলে নির্ঘাৎ কাফের বলতেন আর আমরা তাঁকে দেখলে পাগল বলতাম।’
রাসূলুল্লাহ্’র (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আবির্ভাবকালীন আরব জাহানের অবস্থার সাথে আমাদের বর্তমান অবস্থার কি কোন তফাৎ আছে? আমাদের বর্তমান অবস্থাকে যদি খুব বেশী উন্নততর পর্যায় থেকেও বিবেচনা করা হয়, তবে তা হবে রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ভাষায় তৃতীয় শ্রেণীর ঈমানদারের ন্যায়, যারা ইসলাম বিরোধী শাসকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে শহীদ হওয়ার বদলে ঈমান ও জান রক্ষার দোহাই দিয়ে জিহাদের ময়দান থেকে পলায়নী মনোভাব অর্থাৎ বৈরাগ্য গ্রহণ করেন। আজ আমাদের মাঝে যদিওবা কিছুসংখ্যক রাজনৈতিক দল ইসলামকে একমাত্র জীবন বিধানরূপে রাষ্ট্রীয় জীবনে প্রতিষ্ঠা করার সংগ্রামে রত কিন্তু তাদেরও অধিকাংশই বাগদাদী, দামেস্কী, ইরানী, কুয়েতী ও সৌদী তথা রাজতন্ত্রী শাসক ও শোষক শ্রেণীর অর্থানুকূল্যে ও স্বার্থানুকূল্যে নিয়ন্ত্রিত তথাকথিত ইসলামের তল্পিবাহক। এরা একদিকে যেমন ইসলামী খিলাফতের কথা বলছে অপরদিকে তেমনি ঐসব রাজতন্ত্রী শোষকদের কপোলে কপোল ঘষে ধন্য হচ্ছে। এই যখন শতকরা ৯০ ভাগ মুসলিম অধ্যুষিত দেশের জনগণের অবস্থা তখন ঈমান ও মুসলিম জাতির হেফাজতে দেশের হক্বপন্থী আলেম, পীর-মাশায়েখদের এগিয়ে আসা ছিল একান্ত জরুরী। অথচ তারাও সঠিক দায়িত্ব পালনে পুরোপুরি ব্যর্থ হচ্ছেন। যে কারণে দেশে আজ মুসলমানদের জন্য গোদের উপর বিষ ফোঁড়ার মতো অর্ধশতাধিক লক্ববধারী (উপাধিধারী) পীরের আবির্ভাব ঘটছে, কেউবা গ্যারান্টি সহকারে ক্বালব যিন্দা করে দিচ্ছে, জিকির-আয্কারের নামে নেশা-ভাং খেয়ে লম্ফ-ঝম্ফ করা তরিকা পয়দা হচ্ছে, শরীয়ত-মারেফতের নামে কবর পূজা, পীর পূজা, পীরের মাজার পূজা, পীরের কবর তাওয়াফ করা, পীরের নামে মানত করা, সওয়াবের আশায় পশু ছেড়ে দেয়া, পীরের পা চাটা, আঙ্গুল চোষা, পীরকে বিপদে-আপদে স্মরণ করা, পীর গায়েব জানেন বলে বিশ্বাস রাখা, দিলে দিলে নামায পড়া, মেয়েদের মতো লম্বা চুল ও জট রেখে ফকীর-দরবেশ সাজা, খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী আজমেরীর (রহিমাহুল্লাহ) নামে গান-বাজনার আয়োজন করা প্রভৃতি নাজায়েয কুফ্’রী ও বাতিল আক্বীদার প্রচার ও প্রসার ঘটছে। মূলত এরা পীর বা ওলী নয়, ওলী নামের হাইজ্যাকার। এদের প্রধান কাজই হচ্ছে নগদ নারায়ণীর সঙ্গে সঙ্গে মুসলমানদের ঈমান-আক্বীদাকে ধ্বংস করা। আর এদের শিক্ষা দেওয়া মা’রেফত মু’মিনের জন্য মরার পথ। আল্লাহ্র মনোনীত দ্বীন ইসলাম প্রতিষ্ঠায় নিজের জান-মাল কুরবানী করার পরিবর্তে দ্বীন ইসলামকেই আত্ম-প্রতিষ্ঠায় ব্যবহারের মত ঘৃণ্য কাজে এরা লিপ্ত আছে। এরাই হচ্ছে উলামায়ে ছু’ বা অসৎ আলেম। আল্লাহ্র দ্বীনের ঝাণ্ডার পরিবর্তে নিজস্ব মত-পথের নিশানকে সমুন্নত রাখতেই তাদের যত চাতুর্যপূর্ণ বয়ান। কালের বিবর্তনে মসজিদে জামাতে নামাযের ইমামতি আজ পেশায় রূপ নিয়েছে। এই সুযোগে সমাজের বিত্তবান, সম্পদশালী অথচ অনিয়মিত নামায আদায়কারী, সুদখোর, ঘুষখোর, জুয়াড়ী, যেনাকারী লোকজনও শুধুমাত্র সামাজিক প্রভাবের কারণে মসজিদ পরিচালনা কমিটির সদস্য, ক্ষেত্রবিশেষে সভাপতি পদ পর্যন্ত অধিকার করে বসে আছে। এরাই আলেমদেরকে ইমাম (নেতা) হিসেবে সম্মান করার পরিবর্তে তাদের সাথে কর্মচারীর ন্যায় আচরণ করেন। ইসলামের দাবী ছিল সমাজের সবচেয়ে আল্লাহ্ওয়ালা লোক ইমাম হবেন; কিন্তু যেহেতু ইমামতিকে পেশা বা চাকরির পদ ভাবা হয়, সেহেতু আল্লাহ্ওয়ালার পরিবর্তে মসজিদ কমিটির পায়রবি করা আলেমকে (প্রয়োজনে দূর শহর-গ্রাম হতে সংগ্রহ করে) ইমাম হিসেবে নিয়োগ দান করা হয়। এই আলেমরাই সামান্য রুটি-রুজীর মায়ায় আল্লাহ্’র হুকুমের পরিবর্তে মসজিদ কমিটির হুকুমের পায়রবি করছে। আল্লাহ্’র কাছে হিসাব দেয়ার ভয় তাদের মধ্যে অতটা কাজ করে না, যতটা কাজ করে চাকরী চলে যাওয়ার ভয়। অতএব, শুধু সমালোচনা নয়; দেশে শান্তি চাইলে, আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) রেজামন্দি হাসিল করতে চাইলে আমাদের এ অমূল্য জিন্দেগীকে নশ্বর দুনিয়ার পদতলে সঁপে না দিয়ে আল্লাহ্ প্রেরিত মহামানব, উম্মতের কাণ্ডারী, হিদায়াতের ঝাণ্ডাধারী, বিশ্বশান্তির প্রবর্তক, তাগুতী শক্তির মূল্যেৎপাটনকারী, মূর্তি ধ্বংসকারী, সূদ-ঘুষ, মদ-জুয়া,,যেনা- শরীয়ত এবং প্রদর্শিত পথে পরিচালিত করতে হবে। কারণ, মুসলমানদের ঈমানে আজ যে ভাইরাস আক্রমণ করেছে তার জন্য কার্যকর একমাত্র এন্টিবায়োটিক হচ্ছে আল-কুরআন ও রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সুন্নাহ্। তাই আল্লাহ্ আমাদের সবাইকে কুরআন এবং সুন্নাহ্ মোতাবেক চলার তাওফিক দিন। আর নিজ নিজ ঈমানী ভাইরাস দূর করে সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ্ কর্তৃক মনোনীত সর্বশেষ নাবী ও রাসূল মানবতার মুক্তির দূত হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রচারিত মহাসত্য “মানুষের নয়, সার্বভৌমত্ব, আইন-বিধান ও নিরংকুশ কর্তৃত্ব একমাত্র আল্লাহ্’র” গ্রহণের মাধ্যমে ঐক্য গঠন এবং তাঁর আদর্শ অনুসরণে মানব জাতির জন্য কল্যানকর একমাত্র জীবন ব্যবস্থা ‘ইসলাম’ সমাজ ও রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নিজের সময় ও অর্থ কুরবানী করার মাধ্যমে তাঁর ক্ষমাপ্রাপ্তদের দলে কবুল করে নিন। আমীন! ইয়া রাব্বাল আ’লামীন।

সংগৃহীত, সংকলিত, সম্পাদিত।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s