মুশরিকদের মাগফিরাতের জন্য দু’আ করা নিষিদ্ধ

কালামে পাকের অপর এক আয়াতে আল্লাহ্ ফরমান-
“নাবী ও ঈমানদারদের জন্য এটা সংগত নয় যে, তারা র্শিককারীদের জন্য মাগফিরাতের দোয়া করবে, এমনকি যদি তারা তাদের ঘনিষ্ট আত্মীয়-স্বজনও হয়, যখন একথা সুস্পষ্ট হয়ে গেছে যে, তারা জাহান্নামেরই উপযুক্ত।” (সূরা আত তাওবা ৯:১১৩)
অর্থাৎ মুশরিকদের মাগফিরাতের জন্য দু’আ করা ও ক্ষমা প্রার্থনা করা নিষিদ্ধ। যদিও তারা নিজ পরিবারের অর্ন্তভূক্ত এবং নিকট আত্মীয় হয়। এটি নাবী ও ঈমানদারদের প্রতি আল্লাহ্ পাকের সুস্পষ্ট নির্দেশ। এর পরও আবেগতাড়িত হয়ে কয়েকজন নাবী ও রাসূল স্বীয় আত্মীয়দের মাগফিরাতের জন্য দু’আ ও ক্ষমা প্রার্থনা করার অনুমতি চেয়ে মহান রব্ব আল্লাহ্’র নিকট দরখাস্ত করলে তিনি তা মঞ্জুর করেন নি। যেমন,

নূহ (আলাইহিস সালাম) তাঁর ছেলের জন্য অনুমতি পান নি।
ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) তাঁর পিতার জন্য অনুমতি পান নি।
লূত (আলাইহিস সালাম) তাঁর স্ত্রীর জন্য অনুমতি পান নি।
সর্বোপরি, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর মাতা আমেনার মাগফিরাতের জন্য দু’আ করা ও ক্ষমা প্রার্থনা করার অনুমতি পান নি। এমন কি তাঁকে নিষেধ করা হয়েছে।

দলিল দেখুন:
নূহ (আলাইহিস সালাম), ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) ও লূত (আলাইহিস সালাম) এর ঘটনা কুরআনে বর্ণিত হয়েছে।
“আর নূহ (আলাইহিস সালাম) তাঁর রব্বকে ডেকে বললেন- হে রব্ব! আমার পুত্র তো আমার পরিজনদের অন্তর্ভুক্ত; আর আপনার ওয়াদাও নিঃসন্দেহে সত্য। আর আপনিই সর্বাপেক্ষা বড় ও উত্তম ফয়সালাকারী। জবাবে (রব্বের পক্ষ থেকে) বলা হলো: “হে নূহ! নিশ্চয় সে তোমার পরিবারভুক্ত নয়। নিশ্চই সে দুরাচার! সুতরাং আমার কাছে এমন দরখাস্ত করবে না, যার মূল খবর তোমার অজানা। আমি তোমাকে উপদেশ দিচ্ছি যে, তুমি জাহিলদের দলভুক্ত হবে না। নূহ (আলাইহিস সালাম) সঙ্গে সঙ্গে আরয করলেন: “হে আমার রব্ব! যে বিষয় আমার জানা নেই সে বিষয়ে দরখাস্ত করা হতে আমি আপনার নিকট পানাহ্ চাই। আপনি যদি আমাকে ক্ষমা না করেন, দয়া না করেন, তাহলে আমি ধ্বংশ হয়ে যাবো।” (সূরা হূদ ১১:৪৫-৪৭)

“আর ইবরাহীম (আলাইহিস সালাম) তাঁর পিতার জন্য যে মাগফিরাতের দু’আ করেছিল, তা ছিল সে ওয়াদার কারণে যা সে তাঁর পিতার নিকট করেছিল। অতঃপর যখন তাঁর কাছে এ কথা প্রকাশ পেল যে, তাঁর পিতা আল্লাহ্’র দুশমন, তখন সে তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে নিলেন। নিঃসন্দেহে ইব্রাহীম ছিলেন বড় কোমল হৃদয়, পরম ধৈর্যশীল।” (সূরা আত তাওবা ৯:১১৪)
 
“আল্লাহ্ কাফিরদের ব্যাপারে নূহ ও লূত (আলাইহিস সালাম)-এর স্ত্রীদেরকে দৃষ্টান্তরূপে পেশ করেছেন। তারা ছিল আমার দু’জন নেক বান্দাহ্’র গৃহে।কিন্তু তারা তাদের স্বামীদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল। ফলে নূহ ও লূত তাদেরকে আল্লাহ্ তা’আলার কবল থেকে রক্ষা করতে পারল না এবং তাদেরকে বলে দেয়া হয়েছে: যাও জাহান্নামীদের সাথে তোমরাও জাহান্নামে প্রবেশ করো।” (সূরা আত্-তাহ্’রিম ৬৬:১০)
“অতপর আমার প্রেরিত ফিরিশতাগণ যখন লূতের কাছে আগমন করল, তখন তাদের আগমনের কারণে সে খুবই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ল এবং তার মন সংকীর্ণ হয়ে গেল। তারা বলল, ভয় করবেন না এবং দুশ্চিন্তাও করবেন না। আমরা আপনাকে ও আপনার পরিবারবর্গকে রক্ষা করবইÑ আপনার স্ত্রী ব্যতীত, সে পিছনে পরে থাকা লোকদের মধ্যে গণ্য।” (সূরা আল-আনকাবুত ২৯:৩৩)
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মাতার ঘটনা সহিহ মুসলিম শরীফে বর্ণিত হয়েছে। হাদিস সহিহ্।
মাতার জন্য মাগফিরাতের বিষয়ে দলিল: সহিহ মুসলিম, ৩য় খন্ড, কিতাবুস সালাত, হাদিস নং ২১৩০-২১৩১, পৃষ্ঠা ৩৩৯-৩৪০, বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার কর্তৃক প্রকাশিত।
হযরত আবু হুরায়রা (রাযিআল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর মায়ের কবর যিয়ারত করতে গেলেন। তিনি কাঁদলেন এবং আশে-পাশের সবাইকে কাঁদালেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আমি আমার রব্বের নিকট মায়ের জন্য ইস্তিগফারের অনুমতি চাইলাম; কিন্তু আমাকে অনুমতি দেয়া হলো না। আমি তাঁর কবর যিয়ারত করার জন্য তাঁর নিকট অনুমতি চাইলে আমাকে অনুমতি দেয়া হলো। অতএব তোমরা কবর যিয়ারত কর। কেননা কবর যিয়ারত তোমাদেরকে মৃত্যুর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। (২১৩০-২১৩১ নং হাদিস দু’টির বক্তব্য প্রায় একই)
যেখানে সৃষ্টির সেরা মানুষের মাঝে সেরা, সকল নাবী ও রাসূলদের নেতা হয়েও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজ পিতা-মাতা, চাচা আবু তালিবের ঈমানের জিম্মাদার হতে পারেন নাই, তাঁদের মাগফিরাতের জন্য দু’আ করা ও ক্ষমা প্রার্থনা করার অনুমতি পান নি; সুতরাং তাঁর উম্মতের সেক্ষেত্রে কতটুকু অনুমতি আছে তা কি আমরা অনুধাবণ করছি কেউ?
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মহান রব্ব আল্লাহ’র দাসত্ব ও আনুগত্যের জন্য কত বড় ত্যাগ স্বীকার করেছেন তার এক অনন্য উজ্জল দৃষ্টান্ত এ হাদিস দু’টি। মহান আল্লাহ্ বলেছেন, তাঁদের মাগফিরাতের জন্য দু’আ ও ক্ষমা প্রার্থনা করতে পারবেন না, ব্যাস তিনি দু’আ করেন নি। বিনা প্রশ্নে, বিনা যুক্তিতে আল্লাহ্’র আদেশ মেনে নিয়েছেন। আল্লাহু আক্বার। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এই সুন্নাহ্’ই হচ্ছে মু’মিনদের জন্য অনুসরণীয় আদর্শ। আর এই সুন্নাহ্ অনুসরণকারী মু’মিনদের সম্পর্কেই ইরশাদ হয়েছে:
“মু’মিনদের বক্তব্য কেবল এ কথাই, যখন তাদের মধ্যে ফয়সালা করার জন্যে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের দিকে তাদেরকে আহবান করা হয়, তখন তারা বলে: আমরা শুনলাম এবং মেনে নিলাম। আর এ ধরনের লোকেরাই সফলকাম। আর সফলকাম তারাই যারা আল্লাহ্ ও রাসূলের হুকুম মেনে চলে এবং আল্লাহ্কে ভয় করে এবং তাঁর নাফরমানী করা থেকে দূরে থাকে ৷” (সূরা আন নূর ২৪:৫১-৫২)
মূলতঃ কোন ব্যক্তির জন্য ক্ষমার আবেদন জানানোর অনিবার্য অর্থ হচ্ছে- আমরা তার প্রতি সহানুভূমিশীল এবং তাকে ভালবাসি। আমরা তার অপরাধকে মাগফিরাতযোগ্য মনে করি। যারা ঈমানদারদের অন্তর্ভুক্ত, কোনরূপ র্শিকে লিপ্ত হয়নি এবং শুধুমাত্র আমলী গোনাহগার তাদের ক্ষেত্রে এ দু’টি কথাই ঠিক । কিন্তু যে ব্যক্তি কথা কিংবা কর্ম দ্বারা প্রকাশ্যে র্শিক করেছে তার প্রতি সহানুভুতিশীল হওয়া, তাকে ভালবাসা এবং তার এ মহা-অপরাধকে ক্ষমাযোগ্য মনে করা যে শুধু নীতিগতভাবে ভুল তাই নয় বরং এর ফলে আমাদের নিজেদের ঈমানও সন্দেহযুক্ত হয়ে পড়ে। আর যদি শুধুমাত্র আমাদের আত্মীয়-স্বজন বলে আমরা তাকে মাফ করে দিতে চাই তাহলে এর অর্থ দাঁড়ায়, আমাদের কাছে আত্মীয়তার সম্পর্ক আল্লাহ্’র প্রতি ঈমানের দাবীর তুলনায় অনেক বেশী মূল্যবান এবং আল্লাহ ও তাঁর দ্বীনের প্রতি আমাদের ভালবাসা র্শিক মুক্ত, নির্ভেজাল ও শর্তহীন নয়। এছাড়াও আল্লাহ্’র সাথে র্শিককারী বিদ্রোহীদের সাথে আমরা যে মায়া-মহব্বতের সম্পর্ক জুড়ে রেখেছি তার ফলে আমরা চাচ্ছি, আল্লাহ নিজেও যেন এ সম্পর্ক গ্রহণ করেন এবং আমাদের এ আত্মীয়কে অবশ্যই ক্ষমা করে দেন, যদিও এ একই অপরাধ করার কারণে অন্যান্য অপরাধীদেরকে তিনি জাহান্নামের শাস্তি দিয়ে থাকেন। বস্তুত এ সমস্ত চিন্তা-চেতনা একনিষ্ঠ ঈমানদারের জন্য শোভনীয় নয় কেননা এক্ষেত্রে ঈমানের দাবী ছিলো- আল্লাহ্ ও তাঁর দ্বীনের প্রতি আমাদের ভালবাসা হবে র্শিক মুক্ত, নির্ভেজাল হবে, আল্লাহ্’র বন্ধু হবে আমাদের বন্ধু এবং তাঁর শত্রু হবে আমাদের শত্রু। এখানে আরো এতটুকু বুঝে নিতে হবে যে, আল্লাহদ্রোহী র্শিককারীদের প্রতি যে সহানুভূতি নিষিদ্ধ করা হয়েছে তা কেবলমাত্র এমন পর্যায়ের সহানুভূতি যা দ্বীনের ব্যাপারে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়। অন্যদিকে মানবিক সহানুভূতি এবং পার্থিব সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে আত্মীয়তা ও রক্ত সম্পর্ক এবং স্নেহ-সম্প্রীতিপূর্ণ ব্যবহার এসব নিষিদ্ধ নয় বরং প্রশংসনীয়। আত্মীয় কাফির হোক বা মু’মিন, তার সামাজিক অধিকার অবশ্যই প্রদান করতে হবে। বিপদগ্রস্ত মানুষকে সকল অবস্থায় সাহায্য দিতে হবে। অভাবীকে যে কোন সময় সহায়তা দান করতে হবে। রুগ্নের সেবা ও অসহায়ের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শনের ব্যাপারে কোন ত্রুটি দেখানো যাবে না। ইয়াতীমের মাথায় অবশ্যি স্নেহের হাত বুলাতে হবে। এসব ব্যাপারে তারা আল্লাহ্’র সৃষ্টি এ কথা বিবেচনায় রেখে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে।
মূলতঃ বান্দাহর হৃদয়ে যখন তাওহীদ পূর্ণতা লাভ করে তখন আল্লাহ্ তা’য়ালা বান্দাহর অন্তরে ঈমানের প্রতি ভালোবাসা দান করেন এবং তার অন্তরে তাওহীদকে সুসজ্জিত করেন। র্শিক, কুফর ও নাফরমানিকে তার জন্য ঘৃণার বস্তু বানিয়ে দেন। সাথে সাথে তাকে হিদায়াত প্রাপ্ত লোকদের অন্তর্ভুক্ত করেন।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s