মুহররম ও আশুরা : ফযিলত ও সুন্নাত

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম।

নিশ্চয়ই যাবতীয় প্রশংসা মহান আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীনের তরে নিবেদিত। তিনি মহাপরাক্রমশালী,প্রজ্ঞাময়,মহাক্ষমাশীল,বিচার দিনের মালিক,আমরা একমাত্র তাঁরই ইবাদাত করি এবং তাঁরই নিকট সাহায্য চাই। আমরা তাঁর সমীপে অনুতপ্ত হয়ে তাওবা করি,তাঁর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করি কুপ্রবৃত্তি ও দুষ্কৃতি থেকে। আমরা ঘোষণা করছি যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন রব্ব-সার্বভৌম মালিক,সার্বভৌম আইনদাতা-বিধানদাতা ও নিরংকুশ কর্তা নেই। আমরা সাক্ষ্য প্রদান করছি যে,আল্লাহ্ ব্যতীত কোন হক্ব ইলাহ্-দাসত্ব,আইনের আনুগত্য ও উপাসনা পাওয়ার সত্তা নেই। তিনি একক,তাঁর কোন শরীক নেই। আমরা আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে,মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহ’র বান্দা ও রাসূল-শর্তহীন আনুগত্য-অনুসরণ ও অনুকরণ পাওয়ার অধিকারী একমাত্র নেতা। আমাদের পক্ষ থেকে অগণিত সালাত ও সালাম মহামহিম হযরত রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, তাঁর পরিবার-পরিজন,সহচর ও তাঁর প্রদর্শিত সত্য পথের অনুসারীগণের প্রতি। অতঃপর বক্তব্য এই যে,

মাটির সৃষ্ট মানুষের প্রতি আল্লাহ্’র দয়া ও অনুগ্রহের সীমা-পরিসীমা নেই। মানুষ তার যাত্রা শুরু করেছিল রূহের জগত থেকে। অতঃপর পৃথিবীর বুকে তার বিচরণ। তারপর অনিবার্য পরিণতি মৃত্যু-যা তাকে আলিঙ্গন করতেই হবে। এরপর সবশেষে অনন্ত-অসীম আখিরাতের জীবন। যে জীবনে অপেক্ষা করছে চির-শান্তি অথবা চির-শাস্তি। আর উক্ত জীবনের শাস্তি বা শান্তির বিষয়টি নির্ধারিত হবে মানুষের পৃথিবীর জীবনের কর্মকান্ডের উপর ভিত্তি করে। তাই সকলকে থাকতে হবে সচেতন, ত্যাগ করতে হবে স্বেচ্ছাচারীতা। অর্জন করতে হবে জ্ঞান। জ্ঞানই মানুষের মুক্তির পথ। আর প্রকৃত বিশুদ্ধ জ্ঞান হচ্ছে ওহীর জ্ঞান। ঈমানদাররা (বিশ্বাসীরা) ওহীর জ্ঞান ধারণ করে বলেই খুঁজে পায় মুক্তির পথ। আর অবিশ্বাসীরা (বেঈমান) ওহীর জ্ঞান ধারণ করে না বলে আমৃত্যু পথভ্রষ্টই থেকে যায়।

মহান আল্লাহ রাব্বূল আলামীনের অসীম করূনা ও দয়া তার বান্দাদের জন্য। তিনি যেমন বিভিন্ন মৌসুমকে বিভিন্ন ফল-ফসলের উৎকৃষ্ট উৎপাদনের জন্য উপযোগী করেছেন ঠিক তদরূপ ইবাদাত-বন্দেগীর জন্যও কিছু কিছু মাস, দিন ও সময়ের মধ্যে খাস রহমত ও বরকত রেখেছেন। যদি কোন মুসলিম সেই বিশেষ সময়ে ইখলাছের সাথে সুন্নাহ মুতাবিক আ’মল করে তবে সে এর বিনিময়ে দুজাহানেই কামিয়াবী লাভ করতে সক্ষম হবে। অর্থাৎ ঐ বরকতময় সময়ে সামান্য চেষ্টা ও মেহনত দ্বারা দুনিয়া ও আখিরাতের অশেষ নেকী অর্জন করা যায়।

মহান আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা তাঁর মুহাব্বতের বান্দাদের জন্য চারটি মাসকে বিশেষ সম্মানীত ও পবিত্র হিসেবে ঘোষণা করেছেন। এর মধ্যে মুহররম একটি মহান বরকতময় মাস। এটি হিজরী সনের প্রথম মাস। এটি আশহুরে হুরুম তথা হারামকৃত মাস চতুষ্টয়ের অন্যতম। আশহুরে হুরুম সম্বদ্ধে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন,

নিশ্চয়ই আসমানসমূহ ও যমীন সৃষ্টির দিন হতে আল্লাহর কিতাব ও গণনায় মাস বারোটি। তন্মধ্যে চারটি বিশেষভাবে সম্মানিত আর এটাই সুপ্রতিষ্ঠিত দ্বীন সুতরাং তোমরা এ মাসসমূহে (পাপাচার করে) নিজেদের উপর কোন জুলুম করো না [সূরা আত তাওবা:৩৬]

সাহাবী আবু বাকরাহ (রাযিআল্লাহু আনহু) নাবী কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন,নাবীজী বলেছেন, “বছর হলো বারোটি মাসের সমষ্টি,তার মধ্যে চারটি অতি সম্মানিত। তিনটি পর পর লাগোয়া-জিলক্বদ,জিলহজ্ব ও মুহররম আর (চতুর্থটি হলো) জুমাদাস সানি ও শাবানের মধ্যবর্তী রজব।” [বুখারি:২৯৫৮]

মুহররমকে মুহররম বলে অভিহিত করা হয়েছে কারণ এটি অতি সম্মানিত। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেন- সুতরাং তোমরা এ মাসসমূহে (পাপাচার করে) নিজেদের উপর কোন জুলুম করো না [সূরা আত তাওবা:৩৬]

অর্থাৎ,এই সম্মানিত মাস সমূহে তোমরা কোনো অন্যায় করো না কারণ এ সময়ে সংঘটিত অন্যায় ও অপরাধের পাপ অন্যান্য সময়ের চেয়ে বেশি ও মারাত্মক এই আয়াতের ব্যাখ্যায় তাফসীর ইবনে কাসীর-এ বর্ণিত হয়েছে,মহান আল্লাহ নিজ সৃষ্টি হতে খাঁটি ও উৎকৃষ্টগুলোকে বাছাই করেছেন;ফেরেশতাকুল হতে কতককে রাসূল হিসাবে বাছাই করেছেন অনুরূপ মানুষ থেকেও। কথা হতে বাছাই করেছেন তাঁর জিকিরকে। আর জমিন হতে বাছাই করেছেন মাসজিদ সমূহকে। মাসসমূহ থেকে বাছাই করেছেন রমাদ্বান ও সম্মানিত মাস চতুষ্টয়কে। দিনসমূহ হতে বাছাই করেছেন জুমুআর দিনকে আর রাত্রসমূহ থেকে লাইলাতুল ক্বদরকে। সুতরাং আল্লাহ্ যাদের সম্মানিত করেছেন তোমরা তাদের সম্মান প্রদর্শন কর। আর বুদ্ধিমান লোকদের মতে,প্রতিটি বস্তুকে যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করা হয় মূলতঃ সেসব জিনিসের মাধ্যমেই যেসব দ্বারা আল্লাহ তাদেরকে সম্মানিত করেছেন। [তাফসির ইবনে কাসির,সূরা তাওবা, আয়াত ৩৬}

মুহররম হিজরী বর্ষের প্রথম মাস। অনেক ঘটনা বহুল এবং ঐতিহাসিক দিক দিয়ে এ মাসটি অনেক তাৎপর্যপূর্ণ। এ মাসে আমাদের কিছু করণীয় রয়েছে। যেমন, মুহররমের ৯ ও ১০ অথবা ৯, ১০ ও ১১ তারিখে সিয়াম (রোযা) পালন করা। এ ব্যাপারে পরবর্তীতে আলোচনা করা হবে ইনশা-আল্লাহ্।

আশুরা

আশুরা শব্দটি আরবী‘ আশেরা শব্দ থেকে রূপান্তরিত। আর আশেরা হচ্ছে আশারা’ শব্দের বিশেষণ। যার,সাধারণ বাংলা অর্থ হচ্ছে দশ,দশক,দশজন বা দশটি (১০)। অর্থাৎ আশারা একটি আরবী সংখ্যার নাম যার বাংলা অর্থ দশ। দেখা যাচ্ছে,আরবী সংখ্যা আশারা (১০) থেকে আশেরা (দশম)। আর তা থেকে আশুরা শব্দটি নির্গত হয়েছে যার অর্থ- মুহররম মাসের ১০ তারিখ। [লিসানুল আরব, ৪/৫৬৯]

এই শাব্দিক পরিবর্তনের ফলে অতিরঞ্জন এবং সম্মানের অর্থ পাওয়া যায়। [ফাত্ হুল্ বারী, ৪/৩১১ ]

বছরের কোন দিনটি আশুরার দিন?

আশুরার দিনটি মুহররম মাসের নবম দিন না দশম দিন? এ বিষয়ে মতভেদ রয়েছে। তবে অধিকাংশ উলামার মতে মুহররম মাসের ১০ তারিখকে আশুরা বলা হয়। কারণ শব্দের নামকরণ ও ব্যুৎপত্তি,দশ তারিখকেই সমর্থন করে। [ফাতহুল বারী, ৪/৩১১]

আল্লামা ইমাম নববী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন,তাসুআ,আশুরা দু’টি মদ্দযুক্ত নাম। অভিধানের গ্রন্থাবলীতে এটিই প্রসিদ্ধ। আমাদের সাথীরা বলেছেন,আশুরা হচ্ছে মুহররম মাসের দশম দিন। আর তাসুআ সে মাসের নবম দিন। জমহুর ওলামারাও তা-ই বলেছেন। হাদিসের আপাতরূপ ও শব্দের প্রায়োগিক ও ব্যবহারিক চাহিদাও তাই। ভাষাবিদদের নিকট এটিই প্রসিদ্ধ। (আল-মজমূ)

ইবনু কুদামাহ হাম্বলী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন,আশুরা মুহররম মাসের দশম দিন। এটি সাঈদ ইবনুল মুসআ’ব ও হাসান বসরি (রহিমাহুল্লাহ)-এর মত। কারণ আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস রাযিআল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আশুরার সিয়াম -মুহররমের দশম দিনে রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।” [তিরমিজি,হাদিসটি হাসান সহিহ]

ইসলাম পূর্বে আশুরার সিয়াম (রোযা):

উম্মুল মু’মিনীন আয়েশা (রাযিআল্লাহু আনহা) হতে বর্ণিত,তিনি বলেন: কুরাইশ গোত্র জাহেলী যুগে আশুরার সিয়াম পালন করতো। কিন্তু ইসলাম আসার পর যে ব্যক্তি ইচ্ছা সিয়াম পালন করতো আর যে ব্যক্তি ইচ্ছা সিয়াম পালন করতো না। [মুসলিম,হা/২৫০৫, বা.ই.সে]

আব্দুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস (রাযিআল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত,তিনি বলেন: নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন মদীনায় হিজরত করলেন,তখন ঈহুদী সম্প্রদায়কে আশুরার দিনে সিয়াম পালন করতে দেখলেন। তাই তিনি তাদের জিজ্ঞাসা করলেন: “এটা এমন কোন্ দিন,যে দিনে তোমরা সিয়াম পালন করছো? তারা বললোঃ এটি একটি মহান দিন,আল্লাহ তাআ’লা এই দিনে মুসা (আলাইহিস সালাম) এবং তাঁর অনুসারী লোকজনকে নাজাত দিয়েছিলেন এবং ফিরাউন ও তার অনুসারী লোকজনকে ডুবিয়ে দিয়েছিলেন। তাই মুসা (আলাইহিস সালাম) কৃতজ্ঞতা স্বরূপ সিয়াম পালন করেন। অতএব আমরাও সিয়াম পালন করি। [মুসলিম, হা/২৫২৪, বা.ই.সে]

ইসলামে আশুরার সিয়াম (রোযা):

আব্দুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস (রাযিআল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত,তিনি বলেন: নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন মদীনায় হিজরত করলেন,তখন ঈহুদী সম্প্রদায়কে আশুরার দিনে সিয়াম পালন করতে দেখলেন। তাই তিনি তাদের জিজ্ঞাসা করলেন:

“এটা এমন কোন্ দিন,যে দিনে তোমরা সিয়াম পালন করছো? তারা বললোঃ এটি একটি মহান দিন,আল্লাহ তাআ’লা এই দিনে মুসা (আলাইহিস সালাম) এবং তাঁর অনুসারী লোকজনকে নাজাত দিয়েছিলেন এবং ফিরাউন ও তার অনুসারী লোকজনকে ডুবিয়ে দিয়েছিলেন। তাই মুসা (আলাইহিস সালাম) কৃতজ্ঞতা স্বরূপ সিয়াম পালন করেন। অতএব আমরাও সিয়াম পালন করি। তারপর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: তাহলে তো মুসা (আলাইহিস সালাম)-এর ব্যাপারে তোমাদের তুলনায় আমরা বেশি হক্বদার। অতঃপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সিয়াম পালন করেন এবং সিয়াম পালন করার আদেশ দেন।[মুসলিম, হা/২৫২৪, বা.ই.সে ]

আব্দুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস (রাযিআল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত,তিনি বলেন,নাবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনায় আগমন করে দেখতে পেলেন ইহুদিরা আশুরার দিন রোযা পালন করছে। নাবীজী বললেন,এটি কি? তারা বলল,এটি একটি ভাল দিন। এ দিনে আল্লাহ তাআলা বনি ইসরাইলকে তাদের দুশমনের কবল থেকে বাঁচিয়েছেন। তাই মুসা আলাইহিস সালাম রোযা পালন করেছেন। রাসূলুল্লাহ বললেন,মুসাকে অনুসরণের ব্যাপারে আমি তোমাদের চেয়ে অধিক হক্বদার। অতঃপর তিনি রোযা রেখেছেন এবং রোযা রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।[মুসলিম, হা/২৫২২, বা.ই.সে]

উম্মুল মু’মিনীন আয়েশা (রাযিআল্লাহু আনহা) হতে বর্ণিত,তিনি বলেন: কুরাইশ গোত্রের লোকেরা জাহেলী যুগে আশুরার সিয়াম পালন করতো এবং নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামও এ দিন সিয়াম পালন করতেন। অতঃপর তিনি যখন মদীনায় হিজরত করলেন,তখন নিজেও সিয়াম পালন করলেন এবং অন্যদেরকেও সিয়াম পালনের নির্দেশ দিলেন। কিন্তু যখন রমাদ্বান মাসের সিয়াম ফরয করা হলো,তখন তিনি বললেন: “ইচ্ছা হলে এ দিন সিয়াম পালন করো না হলে করো না”। [মুসলিম, হা/২৫০৩, বা.ই.সে]

আশুরার সিয়ামের (রোযার) হুকুম:

ক্বুরাইশরা আশুরার রোযা প্রসঙ্গে সম্ভবত বিগত শরীয়ত যেমন ইবরাহীম আলাইহিস সালাম-এর উপর নির্ভর করতো। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে,রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনায় হিজরাত করার পূর্বেই মক্কাতে আশুরার রোযা রাখতেন। হিজরতের পর দেখতে পেলেন মদিনার ইহুদিরা এ দিনকে ঈদ হিসেবে উদযাপন করছে। তিনি কারণ সম্বন্ধে তাদের জিজ্ঞেস করলে তারা উত্তর দিলো- এ দিনে আল্লাহ তাআলা বনি ইসরাইলকে তাদের দুশমনের কবল থেকে বাঁচিয়েছেন আর ফিরাউন ও তার অনুসারী লোকজনকে নীল নদের পনিতে ডুবিয়ে মেরেছেন। তখন নবীজী সাহাবাদেরকে ঈদ-উৎসব উদযাপন প্রসঙ্গে ইহুদিদের বিরোধিতা করার নির্দেশ দিলেন। যেমন আবু মুসা রাযিআল্লাহু আনহু কর্তৃক বর্ণিত হাদিসে এসেছে,তিনি বলেন,

{ كَانَ يَوْمُ عَاشُورَاءَ تَعُدُّهُ الْيَهُودُ عِيدًا }

অর্থাৎ,আশুরার দিনকে ইহুদিরা ঈদ হিসাবে গ্রহণ করেছিল।

মুসলিমের রেওয়ায়াতে এসেছে,

{ كان يوم عاشوراء تعظمه اليهود تتخذه عيدا }

আশুরার দিনকে ইহুদিরা বড় করে দেখত (সম্মান করত),একে তারা ঈদ হিসাবে গ্রহণ করেছিল।

মুসলিমের অন্য বর্ণনায় এসেছে,

{ كان أهل خيبر ( اليهود ) يتخذونه عيدا، ويلبسون نساءهم فيه حليهم وشارتهم }.

খায়বর অধিবাসীরা (ইহুদিরা) আশুরার দিনকে ঈদ হিসাবে গ্রহণ করেছিল। তারা এদিন নিজ স্ত্রীদেরকে নিজস্ব অলঙ্কারাদি ও উত্তম পোষাক-পরিচ্ছদ পরিধান করাতো।

তখন নাবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াল্লাম বললেন,

{ فَصُومُوهُ أَنْتُمْ }তাহলে তোমরাও রোযা রাখ। [বুখারী]

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবাদেরকে এদিনে রোযা রাখার নির্দেশ দানের আপাত কারণ হচ্ছে,ইহুদিদের বিরোধিতা করা। যেদিন তারা ঈদ উদযাপন করে ইফতার করবে সেদিন মুসলমানগণ রোযা রাখবে। কারণ মুসলিমদের ঈদের দিন রোযা রাখা হয় না। [সার-সংক্ষেপ,ফাতহুল বারি শারহুল বুখারি, আল্লামা ইবন হাজার আসকালানি]

আব্দুল্লাহ ইব্‌ন উমার (রাযিআল্লাহু আনহু) বর্ণনা করেন,জাহেলী যুগের লোকেরা আশুরার দিন রোযা রাখতো। রমাদ্বানের রোযা ফরয হওয়ার পূর্বে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং মুসলিমগণও এ দিন রোযা রাখতেন। অতঃপর যখন রমাদ্বানের রোযা ফরয হলো, তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, আল্লাহ তাআলার দিন সমূহের মধ্যে আশুরাও একটি দিন কাজেই যার ইচ্ছা সে এ দিন রোযা রাখতে পারে আর যার ইচ্ছা নাও রাখতে পারে। (সহীহ মুসলিম হা/২৫০৮, বা.ই.সে)

জাবির বিন সামুরা (রাযিআল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে আশুরার দিন রোযা রাখতে আদেশ করতেন,উৎসাহিত করতেন এমনকি রোযা রাখার ব্যাপারে খোঁজ-খবর নিতেন। অতঃপর রামাযানের রোযা ফরয হলে তিনি এ রোযার ব্যাপারে আদেশ করতেন না,নিষেধও করতেন না এবং এ ব্যাপারে খোঁজ-খবরও নিতেন না। (সহীহ মুসলিম ২৫১৮, বা.ই.সে)

হুমাইদ বিন আব্দুর রহমান হতে বর্ণিত,তিনি বলেন,আমি মুআবিয়া (রাযিআল্লাহু আনহু) কে হজ্জের বছর আশুরার দিন মিম্বরের উঠে বক্তব্য দিতে শুনেছি। তিনি বলছেন,হে মদীনাবাসী,তোমাদের আলেমগণ কোথায়? আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি,আজ আশুরার দিন। আল্লাহ এ দিন রোযা রাখা ফরয করেন নি। কিন্তু আমি রোযা রেখেছি। অতঃএব,তোমাদের কেউ চাইলে রোযা রাখতে পারে,নাও রাখতে পারে। (বুখারী ও মুসলিম ২৫১৯, বা.ই.সে)

একাধিক সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে,নাবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রমাদ্বান মাসের রোযা ফরয হওয়ার পর এই রোযার সম্পর্কে বলেছেন: “যার ইচ্ছা রোযা রাখবে আর যার ইচ্ছা রাখবে না “। এ মন্তব্যের উপর ভিত্তি করে বলা যায়- আশুরার রোযা মুসলিমদের জন্য ঐচ্ছিক, এটি ফরজ বা ওয়াজিব নয়।

ইমাম নবভী রহিমাহুল্লাহ বলেন: “উলামাগণ এ বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ করেছেন যে, আশুরার রোযা সুন্নাত। ওয়াজিব (আবশ্যক) নয় “। [শারহ মুসলিম,৭-৮/২৪৫]

আশুরার সিয়াম (রোযা) কয়টি ?

এতে কোন সন্দেহ নেই যে,নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুহররম মাসের দশম তারিখে (আশুরার দিনে) সিয়াম পালন করতেন,যেমন পূর্বে বর্ণিত হাদীসগুলিতে এবং অন্যান্য একাধিক হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। তবে আল্লাহ’র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওফাতের পূর্বে নবম তারিখেও সিয়াম পালন করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। আর তিনি যা করার ইচ্ছা করেন তাও সুন্নাত।

আব্দুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস (রাযিআল্লাহু আনহু) বলেন: যখন নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আশুরার রোযা রাখেন এবং অন্যদের রাখার আদেশ করেন,তখন সাহাবাগণ বললেন: এটি এমন একটি দিন যাকে ইহুদী ও খৃষ্টানরা সম্মান করে থাকে। অতঃপর নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “আগামী বছর আসলে ইনশা-আল্লাহ নবম তারিখেও রোযা রাখবো।” অন্য বর্ণনায় রয়েছে, আগামী বছর বেঁচে থাকলে নয় তারিখে রোযা রাখব। হাদীস বর্ণনাকারী বলেন: আগামী বছর আসার পূর্বে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওফাত বরণ করেন। [মুসলিম,হা/২৫৩৩, অনুরূপ হা/২৫৩০,৩১,৩২]

দশ তারিখের সাথে নয় তারিখেও রোযা রাখার কারণ সম্পর্কে কিছু আলেম বলেন: শুধু দশ তারিখে রোযা রাখলে ইহুদীদের সাদৃশ্য হয়। তাই তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এমন করার ইচ্ছা করেছিলেন। [শারহু মুসলিম,নবভী,৭-৮/২৫৪]

আব্দুল্লাহ্ ইব্‌ন আব্বাস (রাযিআল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “আশুরার দিন রোযা রাখ এবং এ ক্ষেত্রে ইহুদীদের বিরোধীতা করে এর আগের দিন বা পরের দিন রোযা রাখ।” (মুসনাদ আহমাদ,সহীহ ইব্‌ন খুযায়মা ইত্যাদি)

অতএব বুঝা গেল,আশুরার রোযা হবে দুটি: নবম এবং দশম তারিখ । আর এটিই হচ্ছে আশুরার রোযার উৎকৃষ্ট স্তর। কারণ এর সমর্থনে সহীহ হাদীস বিদ্যমান। অনুরূপ শুধু দশম তারিখে একটি রোযাও রাখা যেতে পারে। কারণ এটিই ছিল নবীজীর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আ’মল। তবে উলামাগণ এটিকে আশুরার রোযার সাধারণ স্তর বলেছেন।

উল্লেখ থাকে যে,অনেকে আশুরার (১০ মুহররমের) রোযার পূর্বে ও পরে আরও দু’টি অর্থাৎ মোট তিনটি রোযা রাখাকে সর্ব্বোত্তম স্তর বলেছেন। [ফতহুল্ বারী,৪/৩১১-১২, নায়লুল আউতার,৩-৪/৭৩৩]

ইমাম আহমাদ ইব্‌ন হাম্বল রাহ. বলেন: মাসের শুরু চিনতে অসুবিধা হলে (৯, ১০ ও ১১ এ) তিন দিন রোযা রাখবে। যেন নয় ও দশ তারিখে রোযা নিশ্চিতভাবে সম্পন্ন করা যায়। [মুগনী ৩/১৭৪]

আশুরার সিয়ামের (রোযার) ফযিলত

আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযিআল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত,তিনি বলেন,আমার জানা মতে আমি নাবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আজকের এই (আশুরার) দিন ছাড়া অন্য কোন দিন এবং এই মাস অর্থাৎ রমজান মাস ছাড়া অন্য কোন মাসে রোযা রাখার মাধ্যমে অধিক ফযিলত লাভের চেষ্টা করেন নি। [মুসলিম, হা/২৫২৮, ই.সে.বা]

আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযিআল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত,তিনি বলেন,আমি নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে রোযা রাখার জন্য এত অধিক আগ্রহী হতে দেখিনি যত দেখেছি এই আশুরার দিন এবং এই মাস অর্থাৎ রমজান মাসের রোযার প্রতি। [বুখারি:১৮৬৭]

আবু হুরায়রা রাযিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত,রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, “রমাদ্বানের (রোযার) পর সবচেয়ে বেশি ফজিলতপুর্ণ রোযা হচ্ছে আল্লাহর মাস মুহররম (মাসের রোযা)।” [সহিহ মুসলিম,হা/২৭৪৭, তিরমিযি-৪৩৮, নাসাঈ-১৬১২, আবু দাউদ-২৪২৯, বাইহাক্বি-৮৫০৬, হিব্বান-৩৬৩৬, আহমদ-১০৫৩২]

আবু কাতাদা রাযিআল্লাহু আনহু রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন: প্রতি মাসে তিন দিন এবং এক রমাদ্বান থেকে আরেক রমাদ্বান পর্যন্ত রোযা রাখলে সারা বছর রোযা রাখার সাওয়াব অর্জিত হয়। আরাফার দিন (ওকুফে আরাফা) রোযা রাখলে আল্লাহর নিকট আশা করি যে, তিনি এর বিনিময়ে আগের ও পরের এক বছরের গুনাহ ক্ষমা করে করে দিবেন। আর আশুরার দিন রোযা রাখার ব্যাপারে আল্লাহর নিকট আশা করি যে,তিনি এর বিনিময়ে পূর্বের এক বছরের গুনাহ ক্ষমা করে দিবেন। (সহীহ মুসলিম, হা/১৯৭৬)

নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাদীস অনুযায়ী আশুরার সিয়ামের ফযীলত সম্পর্কে আমরা এটা নিশ্চিতভাবে আশা করতে পারি যে, এই রোযা হবে ঈমানদারগণের বিগত এক বছরের গুনাহের কাফফারা। অর্থাৎ এই একটি মাত্র দিনের রোযার মাধ্যমে বিগত পূর্ণ এক বছরের গুনাহ আল্লাহ্ ক্ষমা করে দিবেন। এটি আমাদের প্রতি মহান আল্লাহ রব্বুল আলামীনের অপার করুণা। সত্যই মহান রব্ব আল্লাহ পরম দাতা।

আশুরার রোযা কোন ধরনের গুনাহের (পাপের) জন্য কাফ্ফারা?

ইমাম নববী রহিমাহুল্লাহ্ বলেন,আশুরার রোযা সকল সগিরা গুনাহের কাফ্ফারা। অর্থাৎ এ রোযার কারণে মহান আল্লাহ কবিরা নয় বরং (পূর্ববর্তী এক বছরের) যাবতীয় সগিরা গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন। হাদিসে বর্ণিত এসব গুনাহ মাফের অর্থ হচ্ছে,ব্যক্তির আমলনামায় যদি সগিরা গুনাহ থেকে থাকে তাহলে এসব আমল তার গুনাহের কাফ্ফারা হবে অর্থাৎ আল্লাহ তার সগিরা গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেবেন। আর যদি সগিরা-কবিরা কোনো গুনাহই না থাকে তাহলে এসব আমলের কারণে তাকে সাওয়াব দান করা হবে,তার দরজাত বুলন্দ করা হবে। আর আমলনামায় যদি শুধু কবিরা গুনাহ থাকে সগিরা নয় তাহলে আমরা আশা করতে পারি,এসব আমলের কারণে তার কবিরা গুনাহসমূহ হালকা করা হবে। [আল-মাজমূ শারহুল মুহাযযাব, ষষ্ঠ খন্ড]

শায়খুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়া রহিমাহুল্লাহ্ বলেন, পবিত্রতা অর্জন, সালাত, রমাদ্বান, আরাফা ও আশুরার রোযা ইত্যাদি কেবল সগিরা গুনাহসমূহের কাফ্ফারা অর্থাৎ এসব আমলের কারণে কেবল সগিরা গুনাহ ক্ষমা করা হয়। [আল-ফাতাওআল কুবরা,৫ম খন্ড]

আশুরার রোযার সাওয়াব দেখে শয়তানের চক্রান্তে পড়া চলবে না

আরাফা কিংবা আশুরার রোযার উপর নির্ভর করে অনেক বিভ্রান্ত লোক শয়তানের ধোঁকায় পড়ে যায়। আত্ম প্রতারিত হয়। এমনকি অনেককে বলতে শোনা যায়,আশুরার রোজার কারণে পূর্ণ এক বছরের পাপ ক্ষমা হয়ে গিয়েছে। বাকি থাকল আরাফার রোজা,তো সেটি সাওয়াবের ভাণ্ডার সমৃদ্ধ করবে।

আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম রহিমাহুল্লাহ বলেন,এ আত্ম প্রবঞ্চিত-বিভ্রান্ত লোকটি বুঝল না যে,রমাদ্বানের ফরয রোযা ও পাঁচ ওয়াক্ত ফরয সলাত আরাফা ও আশুরার রোযার চেয়ে বহু গুণে বড় ও অধিক সাওয়াবযোগ্য ইবাদত। আর এগুলো মধ্যবর্তী গুনাহসমূহের জন্য কাফ্ফারা তখনই হয় যদি কবিরা গুনাহসমূহ থেকে বেঁচে থাকা হয়। সুতরাং এক রমাদ্বান থেকে পরবর্তী রমাদ্বান এবং এক জুমুআ থেকে পরবর্তী জুমুআ,মধ্যবর্তী সময়ে কৃত পাপের জন্য কাফ্ফারা তখনই হবে যখন তাওবার মাধ্যমে কবিরা গুনাহ ত্যাগ করা হবে। উভয়বিধ কার্য সম্পাদনের মাধ্যমেই কেবল সগিরা গুনাহ মাফ হবে। আবার কিছু বিভ্রান্ত লোক আছে,যারা ধারণা করে,তাদের নেক আমল বদ আমল থেকে বেশি। কারণ তারা গুনাহের ভিত্তিতে নিজেদের হিসাব নেয় না। এবং পাপাচার গণনায় আনে না। যদি কখনো কোনো নেক আমল সম্পাদন করে তখন কেবল তাই সংরক্ষণ করে। এরা সেসব লোকদের ন্যায় যারা মুখে মুখে ইস্তেগফার করে অথবা দিনে একশত বার তাসবিহ পাঠ করে অতঃপর মুসলমানদের গিবত ও সম্মান বিনষ্টের কাজে লেগে যায়। সারা দিন আল্লাহর অসন্তুষ্টি মূলক কাজে অতিবাহিত করে। এসব লোক তাসবিহ তাহলিলের ফজিলত সম্বন্ধে খুব ফিকির করে। কিন্তু তার (ব্যক্তির) মাধ্যমে সংঘটিত অন্যায় ও পাপকর্মের প্রতি মোটেই দৃষ্টিপাত করে না। এটিতো কেবলই ধোঁকা ও আত্ম প্রতারণা। [আল-মওসুআতুল ফিকহিয়্যাহ,খন্ড ১৩]

আশুরার বিধানের সাথে কারবালা প্রান্তরে হুসাইন (রাযিআল্লাহু আনহু)-এর শাহাদাতের কোন সম্পর্ক আছে কি ?

আশুরার বিধান বর্তমান এবং পূর্ববর্তী শরীয়াহ্ ও এর অনুসারীদের দ্বারা স্বীকৃত ও প্রতিষ্ঠিত। আর রাসূলুল্লাহ আমাদের জন্য আশুরার বিধান স্পষ্ট করে গেছেন। সুতরাং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওফাতের পর মুহার্‌রম মাসের দশ তারিখ যতো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাই সংঘটিত হোক না কেন তাকে আশুরার সাথে সংশ্লিষ্ট বা সংযুক্ত করা যাবে না। ইতিহাসের ভাষ্য অনুযায়ী ৬১ হিজরীর ১০ মুহররম আশুরার দিন কারবালা প্রান্তরে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন হুসাইন (রাযিআল্লাহু আনহু) কে শাহাদাতের মর্যাদায় ভূষিত করেছিলেন। এই শাহাদাতের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা তাঁর মর্যাদাকে আরো উন্নীত করেছেন। তবে এই দিনে তাঁর শাহাদাতের সাথে আশুরার ফযীলত ও সুন্নাতের দূরতম কোন সম্পর্ক নেই। কারণ নাবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওফাতের পর সমস্ত অহী নাযিল বন্ধ হয়ে গেছে। আর তাঁর ওফাতও হয়েছে ইসলাম পূর্ণতা লাভ করার পরেই। সুতরাং তাঁর ওফাতের পর ইসলামের নামে কোন বিধান আবিষ্কৃত হবে না। কেউ এমন করলে তা বিদআ’ত (দ্বীনের নামে নতুন বিধান) হবে,যা প্রত্যাখ্যাত। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:

مَنْ أَحْدَثَ فِي أمْرِنَا هذا ما ليسَ مِنهُ فَهُوِ ردٌّ ( بخاري و مسلم

“যে ব্যক্তি আমাদের এই দ্বীনে নতুন কিছু আবিষ্কার করলো যা,এর অংশ নয় তা প্রত্যাখ্যাত।”[বুখারী,মুসলিম]

সুতরাং এই আশুরার দিনে হুসাইন (রাযিআল্লাহু আনহু) কারবালায় নির্মমভাবে শহীদ হয়েছিলেন তাই আমরা রোযা রেখেছি এ ধরনের কথা যদি কেউ বলে তবে সেটা হবে দ্বীনের বিষয়ে এক চরম অজ্ঞতা। সাধারণ লোকদের এই ধরনের ভ্রান্ত ধারণার পিছনে আছে শিয়া সম্প্রদায়ের কৃতিত্ব। যেহেতু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর পৌত্র হুসাইন (রাযিআল্লাহু আনহু) এই দিনে ইরাকের কারবালায় মর্মান্তিকভাবে শহীদ হয়েছিলেন তাই শিয়ারা এই দিনটিকে শোক দিবস হিসাবে বিভিন্ন মনগড়া কার্যকলাপের মাধ্যমে উদযাপন করে থাকে। দেশে-বিদেশে তাদের ১০ মুহররমের প্রোগ্রামগুলি রেডিও ও টেলিভিশনের মাধ্যমে সরকারিভাবে প্রচার করা হয়। এমনকি এই দিনে সরকারি ছুটিও থাকে। তাই সাধারণ লোকদের নিকট ১০ মুহররম আশুরার দিন মানেই হচ্ছে, হুসাইন (রাযিআল্লাহু আনহু)-এর শাহাদতে শোকের দিন। আর এ কারণেই হয়তো তারা বলে থাকে যে, হুসাইন (রাযিআল্লাহু আনহু) শহীদ হয়েছিলেন তাই রোযা রেখেছি বা ইবাদাত-বন্দেগী করছি।

১০ মুহররম ও আশুরাকে কেন্দ্র করে প্রচলিত কিছু বিদআত :

ঢোল-বাজনা, লাঠি খেলা, জারীগান প্রভৃতির আয়োজন করা। তাজিয়া তৈরি করা, তাজিয়া নিয়ে মিছিল করা এবং তাজিয়াকে সম্মান করা। কালো জামা পড়ে শোক প্রকাশ করা। মাতম করতে করতে জামা-কাপড় ছিড়ে ফেলা এবং ধারালো অস্ত্র দ্বারা আঘাত করে নিজ শরীরকে ক্ষত-বিক্ষত করা। ইবাদাত মনে করে আশুরার দিন চোঁখে সুরমা লাগানো, গোসল করা, মেহেদি লাগানো, হালুয়া-রুটি খাওয়া, খিচুড়ি বিতরণ, আনন্দ উৎসবসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানাদির আয়োজন করা।

এসব অনুষ্ঠানাদি উদযাপন প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে সহীহ কোনো হাদীস বর্ণিত হয়নি এবং এমনকি সাহাবাদের থেকেও না। প্রসিদ্ধ চার ইমামসহ নির্ভরযোগ্য কোনো আলেমও এসব কাজকে সমর্থন করেননি। কোনো মুহাদ্দিস এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবাদের থেকে কোনো সহিহ হাদিসও বর্ণনা করেননি। তাবিয়ীদের থেকেও কোনো আছর পাওয়া যায়নি। সুতরাং ভিত্তিহীন এসকল কর্মকান্ড হতে আমাদেরকে বেঁচে থাকতে হবে।

পরিশেষে বলতে চাই, ১০ই মুহাররমে সংঘটিত কারবালার ঘটনাকে কেন্দ্র করে নয়,বরং এদিন পূর্ববর্তী যে সকল ঐতিহাসিক ঘটনাবলী রয়েছে তারই পরিপ্রেক্ষিতে আশুরার মর্যাদা ও গুরত্ব। যা পালিত হয়ে এসেছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবাদের মাধ্যমে হাজার বছর ধরে। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদের সবাইকে পবিত্র বরকতময় ও ফযিলতপূর্ণ মুহররম মাসের ও আশুরার পরিপূর্ণ বরকত লাভে ধন্য করুন। আমীন।

 

 

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s