খিলাফাহ্, হুকুমাতে ইলাহিয়া কিংবা আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার দাওয়াত দেয়াই কি ঈমানদারের মূল লক্ষ্য?

মহান আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন বলেন-
“তোমাদের মধ্যে যারা (আল্লাহ তায়ালার উপর) ঈমান আনে এবং (সে অনুযায়ী) আ’মালে সালেহ্ (নেক কাজ) করে, তাদের সাথে আল্লাহ তায়ালা ওয়াদা করেছেন, তিনি যমীনে (পৃথিবীতে) তাদেরকে অবশ্যই খিলাফাহ (শাসনকর্তৃত্ব) দান করবেন যেমনিভাবে তিনি তাদের পূর্ববর্তী লোকদের খিলাফত দান করেছিলেন, (সর্বোপরি) যে জীবন বিধান তিনি তাদের জন্যে পছন্দ করেছেন তাও তাদের জন্যে (সমাজে ও রাষ্ট্রে) সুদৃঢ় করে দেবেন, তাদের ভীতিজনক অবস্থার পর তিনি তাদের অবস্থাকে (নিরাপত্তা ও) শান্তিতে বদলে দিবেন, (তবে এর জন্য শর্ত হচ্ছে) তারা শুধু আমারই গোলামী করবে, আমার সাথে কাউকে শরীক করবে না, এরপরও যে (এবং যারা) তাঁর নিয়ামতের নাফরমানী করবে তারাই অবাধ্য (বলে পরিগণিত হবে)।” (সূরা আন নূর ২৪:৫৫)

যারা ঈমান আনবে ও নেক কাজ করবে আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে খিলাফাহ দান করবেন! অর্থাৎ খিলাফাহ অর্জনের লক্ষ্যে মানুষকে দাওয়াত প্রদান নয় বরং সর্বপ্রথম তাগুত চেনার মাধ্যমে তাগুত পরিত্যাগ করা অতঃপর আল্লাহ পাকের তাওহীদ জানা ও আল্লাহর প্রতি ঈমান আনা এবং সহীহ সুন্নাহ অনুযায়ী মানুষকে আমালে সালেহ্ (একমাত্র আল্লাহর দাসত্ব, আইনের আনুগত্য ও উপাসনা) করার দিকে মানুষকে দাওয়াত দিতে হবে। এভাবে যদি আমরা আল্লাহর কাঙ্খিত যোগ্যতা অর্জন করতে পারি তবেই আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে পৃথিবীতে শাসনকর্তৃত্ব দান করবেন, বিজয়ী দ্বীন ইসলামকে সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করবেন এবং আমাদের যাবতীয় দুর্বলতাকে বদলে সক্ষমতা দান করবেন, যদিও কাফিররা তা অপছন্দ করে।

এখন যদি কোন ব্যক্তি দল বা গোষ্ঠী মানুষকে তাওহীদের দিকে, ঈমান ও ইসলামের দিকে দাওয়াত না দিয়ে যদি বলে, আমাদের ভোট দিন বা আমাদের সাথে তাগুতের বিরুদ্ধে ক্বিতালে যোগ দিন আমরা বিজয়ী হলে যমীনে আল্লাহর দ্বীন কায়েম করব, ইসলামী শাসন ব্যবস্থা চালু করব। তাহলে এটা নিশ্চিত আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দাওয়াতের পথ ও পদ্ধতি অনুযায়ী হল না! মানুষ তাগুত পরিত্যাগ করেনি, শির্কে লিপ্ত, বিদআতে লিপ্ত; এমতাবস্থায় তাদেরকে তাগুত পরিত্যাগ করিয়ে, শির্ক, বিদআতমুক্ত না করে, একমাত্র আল্লাহর জন্যই দ্বীনকে খালেস না করে, সহীহ সুন্নাহ’র অনুসারী হওয়ার আহবান না জানিয়ে ইসলামী হুকুমাত প্রতিষ্ঠার দাওয়াত কিংবা খিলাফাহ প্রতিষ্ঠার জন্যে সংগ্রাম শুরু করলে তার সবই নিস্ফল ব্যর্থতায় পর্যবেসিত হবে।

ভিন্নমত পোষণকারী অনেকেই যুক্তি প্রদান করে থাকেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মাক্কী জীবনে তো বায়তুল্লাহয় (কা’বা ঘরে) মূর্তি রেখেই দাওয়াত দিয়েছেন, আর ইসলামী হুকুমাত কায়েম হওয়ার পরই এই মূর্তিগুলো অপসারণ করেছেন। এই যুক্তির ক্ষেত্রে বলতে হয়- যাদেরকে ইসলামী খিলাফাহ আল্লাহ দান করেছিলেন তারা নিজেরা কি শির্কে লিপ্ত ছিল? কুফরে লিপ্ত ছিল? তারা কি ব্যক্তিগত ইবাদাত (সালাত ইত্যাদি) করতো না? তারা কি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কর্মপদ্ধতী বাদ দিয়ে নিজস্ব পন্থায় ইবাদাত করতো? তারা কি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আদেশ-নিষেধ মুলতবি রেখে বলতো- আগে ইসলামী হুকুমাত চাই পরে আপনার কথা শুনবো?

আল্লাহু আকবার, না, সাহাবায়ে কেরামগণের ক্ষেত্রে কখনই এমনটি ঘটে নি!

আল্লাহর যমীনে তাঁর আইন-বিধান অনুযায়ী জীবন যাপন করাটাই আল্লাহর ইবাদাত। আপনার যেসকল ইবাদাত পালনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্র ক্ষমতা পূর্বশর্ত নয়, তা আপনি অবহেলা করা বা পরিত্যাগ করার ইখতিয়ার রাখেন না। এই কথাটি মুসলিম মাত্র সবারই বোধগম্য হওয়া চাই। সব ফরজের বড় ফরজ খিলাফাহ প্রতিষ্ঠা নয়, বরং আল্লাহর ইবাদাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ খিলাফাহ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা।

কারণ আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالإنْسَ إِلا لِيَعْبُدُونِ
অর্থঃ আমি জ্বিন ও মানব জাতিকে আমার ইবাদাত করা ব্যতীত অন্য কোন উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করিনি। (সূরা যারিয়াত ৫১:৫৬)

এজন্য সকল নাবী ও রাসূল আলাইহিসসালামগণ দাওয়াত দিতেন,
“হে আমার কওম, হে আমার জাতি! তোমরা আল্লাহকেই একমাত্র রব্ব মেনে নাও, এবং একমাত্র সেই রব্বেরই ইবাদাত কর, তিনি ছাড়া তোমাদের আর কোন রব্ব ও ইলাহ নেই।”

আর এটিই আল-কুরআনের ভাষায়-
“নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার রব্ব এবং তোমাদেরও রব্ব; কাজেই তোমরা তাঁর ইবাদাত করো। এটিই সরল-সঠিক পথ (সিরাতুল মুস্তাক্বীম)।” (সূরা আলে ইমরান ৩:৫১, সূরা মারিয়াম ১৯:৩৬, সূরা যুখরুফ ৪৩:৬৪)

আপনি কখনোই এমনটি দেখবেন না যে, কোন নাবী-রাসূল আলাইহিসসালাম তাঁর কওমের নিকট যেয়ে বলেছেন- হে আমার কওম এসো, সবার আগে খিলাফাহ প্রতিষ্ঠা করি কিংবা ইসলামী হুকুমাত কায়েম করি অতঃপর আল্লাহর ইবাদাত করি। সুতরাং খিলাফাহ প্রতিষ্ঠা করাই যদি মূল উদ্দেশ্য হতো তাহলে মক্কায় যখন মুশরিকরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে প্রস্তাব দিয়েছিল তোমাকে আমাদের ক্ষমতার মসনদে বসাবো, অঢেল সম্পত্তি তোমাকে দিব, কোন সুন্দরী নারীকে বিয়ে করতে চাও তাও দিব কিন্তু আমাদের সাথে কিছু ব্যাপারে ছাড় বা সমঝোতা করে নিতে হবে; তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখনই তা মেনে নিয়ে ক্ষমতার মসনদে বসতেন, বর্তমানে প্রচলিত ইসলামের নামধারী রাজনৈতিক দলগুলোর মত চিন্তা করতেন যে, কোন উপায়ে আগে খিলাফাহ প্রতিষ্ঠা করে (রাষ্ট্র ক্ষমতা পেয়ে) নেই তারপর দ্বীন কায়েম! কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তা করেন নি! সর্বপ্রথম আল্লাহর তাওহীদের দিকে মানুষকে দাওয়াত দিয়েছেন। তাগুত ত্যাগ করে ঈমান গ্রহণ করতে বলেছেন, তাদের আকীদাহ সহীহ করতে বলেছেন। এই দাওয়াতের পরিপ্রেক্ষিতে যখন একদল খাঁটি ঈমানদার মানুষ তৈরী হল, তখন আল্লাহ তাআলা তাদের খিলাফত দান করলেন মদীনায়। এই মানুষগুলো যখন অন্য জাতির লোকদের দাওয়াত দিতেন তখনও এই দাওয়াতই দিতেন, কখনোই এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। কখনই এই বলে দাওয়াত দেননি আমাদের ক্ষমতার মসনদে বসতে হবে আগে, আমাদের সাথে যোগ দাও, তোমরা শির্ক কর আর যাই কর তাতে আমাদের আপত্তি নেই শুধু আমাদের ক্ষমতার মসনদে বসার লক্ষ্যে ঐক্যমত হও!

সুতরাং চিন্তাশীল জ্ঞানীরা যাচাই করে দেখুন তো, আজকের জামানার ইসলামের নামে দলগুলো কোন পদ্ধতিতে কিসের দাওয়াত দিচ্ছে?

পরিশেষে দ্বীন-ইসলামের দাঈ (দাওয়াতদাতা) ভাইদের বলছি-
সার্বভৌম মালিক একমাত্র আল্লাহ্ আর নিরংকুশ কর্তৃত্ব একমাত্র আল্লাহর হাতে, একদিন আল্লাহর সামনে আমাদের সবাইকে দাঁড়াতে হবে, সুতরাং আল্লাহকে ভয় করুন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’এর সুন্নাহর অনুসরণ করুন, নিজে ঈমানের উপর দৃঢ় থাকুন, আমালে সালেেহকারী হোন এবং মানুষকে শির্ক ত্যাগ করে তাওহীদ গ্রহনের দাওয়াত দিন, তাগুতের উপাসনা ত্যাগ করে এক আল্লাহর উপাসনার দাওয়াত দিন, সর্বোপরি মানুষের সার্বভৌমত্ব, আইন-বিধান ও কর্তৃত্ব ত্যাগ করে একমাাত্র আল্লাহর সার্বভৌমত্ব, আইন-বিধান ও নিরংকুশ কর্তৃত্ব গ্রহণের দাওয়াত দিন। অতঃপর আল্লাহর ইচ্ছায় একদল যোগ্য ঈমানদার মুসলিম তৈরী হয়ে গেলে আল্লাহ তাঁর কৃত ওয়াদা পূর্বের ন্যায় পালন করবেন, তাদেরকে খিলাফাহ দান করবেেন, শাসনকর্তৃত্বে অধিষ্ঠিত করবেন। সুতরাং যা আল্লাহ্ যোগ্য হলে এমনিতেই দিবেন, সে খিলাফাহ প্রতিষ্ঠা করার জন্য আপনার, আমার আন্দোলন করাটা হবে আল্লাহর দায়ীত্ব মানুষের কাঁধে তুলে নেয়া, যা সুন্নাহর খেলাফ।
আল্লাহ পাকের নির্দেশের সরল সঠিক বুঝ আমরা যেন লাভ করতে পারি সে তাওফিক তিনি দান করুন। আমিন।

নাসরুম মিনাল্লাহি ওয়া ফাতহুন ক্বারীব, ওবাশ্বশিরিল মু’মিনীন।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s