ইসলাম ও ইসলাম প্রতিষ্ঠার পদ্ধতি নিয়ে বিভ্রান্তি

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম

ইসলাম ও ইসলাম প্রতিষ্ঠার পদ্ধতি নিয়ে বিভ্রান্তি

-আবু যারীফ

বিতাড়িত শয়তানের প্ররোচনা থেকে আমার মহান রব্বের নিকট আশ্রয় প্রার্থণা করে, দয়াময় পরম দয়ালু আল্লাহ্’র নামে শুরু করছি।

নিশ্চয়ই সকল প্রশংসা মহান আল্লাহ্ তা’য়ালার, যিনি সমস্ত সৃষ্টিকুলের একমাত্র রব্ব। অগণিত দুরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক মরুর আলো, মানবতার মুক্তির দূত, বিশ্বজাহানের কল্যাণকামী নেতা, একমাত্র অনুসরণীয়-অনুকরণীয় আদর্শ মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উপর এবং শান্তি অবিরাম ধারায় বর্ষিত হোক তাঁর পবিত্র বংশধর, সম্মানিত সহচর আর সত্য পথে উনার অনুসরণকারীগণের উপর। অতঃপর বক্তব্য এই যে,

আল্লাহ্ রাব্বুল আ’লামীনের নিকট গ্রহণযোগ্য এবং মনোনীত একমাত্র দ্বীন-জীবন বিধানের নাম ইসলাম। মানুষের বোধগম্যতার তারতম্যের কারণে ইসলামকে বিভিন্ন আঙ্গিকে উপস্থাপন করা যায়। যেমন,

-একমাত্র আল্লাহ্’র হুকুম মতো জীবন-যাপন করার নাম: ইসলাম।

-একমাত্র আল্লাহ্’র আইনের আনুগত্যের অধীনে জীবন যাপনের নাম: ইসলাম।

-আল্লাহকে একমাত্র রব্ব-সার্বভৌম মালিক, মনিব ও প্রভু মেনে নিয়ে তাঁর দাসত্বের অধীনে থেকে তাঁরই দাস-গোলাম হিসেবে নত ও বাধ্যগত জীবন যাপন করার নাম: ইসলাম।

-একমাত্র আল্লাহ্’র নিকট আত্মসমর্পণ করে, তাঁরই নিকট সাহায্য ও আশ্রয় প্রার্থণা করে তাঁরই উপাসনা করার নাম: ইসলাম।

দ্বীন হিসেবে ইসলামকে গ্রহণ করাই হচ্ছে আল্লাহ’র সন্তুষ্টি লাভের একমাত্র পথ। মহান আল্লাহ্ মানুষ সৃষ্টি করেছেন, তিনিই অত্যন্ত মেহেরবানী করে মানুষের জীবন যাপনের সঠিক পথ-দ্বীন দেখিয়ে দিয়েছেন। সে দ্বীনই হলো ইসলাম। এ জন্য দ্বীন-ইসলাম সম্পর্কে আল্লাহ্ তাঁর কিতাবে ফরমান-

“নিঃসন্দেহে আল্লাহ্’র নিকট গ্রহণযোগ্য দ্বীন হচ্ছে একমাত্র ইসলাম।” (সূরা আলে ইমরান ৩:১৯)
মহান আল্লাহ্ আরও ফরমান-

“আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন (জীবন ব্যবস্থা)কে পরিপূর্ণ করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার নিয়ামত সম্পূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন (জীবন ব্যবস্থা) হিসেবে মনোনীত করলাম।” (সূরা মায়িদাহ ৫:৩)

ইসলাম নামক এই জীবন ব্যবস্থাকে মহান আল্লাহ্ তা’য়ালা আল কুরআনে দ্বীনিল হক্ব হিসাবে আখ্যায়িত করেছেন। আবার কুরআনে হক্ব শব্দটি দু’টি অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। একটি হচ্ছে অধিকার বা কর্তব্য আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে সত্য-সঠিক বা নির্ভুল। দ্বীনের ক্ষেত্রে কুরআনে হক্ব শব্দটির দ্বিতীয় অর্থকে অধিক গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। তাহলে দ্বীন-ইসলাম শব্দটির পূর্ণ অর্থ দাঁড়ায়- সত্য, সঠিক ও নির্ভুল জীবন বিধান যাতে দাসত্ব, আইনের আনুগত্য ও উপাসনা একমাত্র আল্লাহ্’র।

পারিভাষিক অর্থে আদ্ দ্বীন বলতে বুঝায়, আল্লাহ প্রদত্ত ও রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রদর্শিত নির্ভুল জীবন বিধান যাতে আল্লাহকে ভয় করে, তাঁর প্রতি ভালবাসা রেখে এবং তাঁর কাছেই আশা ও আকাংখা নিয়ে মানুষের ব্যক্তিগত, সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় জীবনের সকল দিক ও বিভাগগুলোতে পরিপূর্ণভাবে তাঁর আদেশ-নিষেধ মেনে চলতে হয়। আর এই জীবন বিধান যারা গ্রহণ করে ও মেনে চলে তারাই হচ্ছে কুরআনের দৃষ্টিতে মুসলিম বা দ্বীন-ইসলামের অনুসারী।

আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীনের নিকট পছন্দনীয় ও গ্রহণযোগ্য একমাত্র দ্বীন-জীবন ব্যবস্থা হচ্ছে ইসলাম। কিন্তু কেউ ইচ্ছে করলে ইসলাম ব্যতীত ভিন্ন কোন জীবন ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে, তবে তা শয়তানী কর্ম হিসেবে বিবেচিত হবে এবং আল্লাহ’র নিকট তা কোন অবস্থাতেই গ্রহণযোগ্য নয় উপরন্তু মৃত্যু পরবর্তী আখিরাতের অনন্ত অসীম জীবনে সে হবে চরম ক্ষতির সম্মুখীন। এ সম্পর্কে হুশিয়ারী উচ্চারণ করে আল্লাহ ফরমান-

“যে ব্যক্তি ইসলাম ব্যতীত অন্য কোন দ্বীন-জীবন ব্যবস্থা গ্রহণ করতে চায়, তার সে ব্যবস্থা কস্মিণকালেও কবুল করা হবে না এবং আখিরাতে সে হবে ব্যর্থ ও ক্ষতিগ্রস্ত।” (সূরা আলে ইমরান ৩:৮৫)

“হে ঈমানদারগণ! তোমরা পরিপূর্ণভাবে ইসলামের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাও এবং শয়তানের পদাংক অনুসরণ করো না। নিশ্চিতরূপে সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।” (সূরা আল বাকারাহ ২:২০৮)

প্রাকৃতিক নিয়মেই আল্লাহ্’র সার্বভৌমত্ব (Sovereignty) থাকার কথা সর্বোচ্চে প্রতিষ্ঠিত। স্বাভাবিকভাবেই পৃথিবীর শৃংখলা ও শাসনব্যবস্থার মূলনীতি হওয়ার কথা ইসলাম। হযরত রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই ইসলাম প্রতিষ্ঠার কাজটি করার জন্য দুনিয়াতে এসেছিলেন আর দীর্ঘ সংগ্রাম ও সাধনার দ্বারা তিনি তা প্রতিষ্ঠাও করে গিয়েছিলেন। কিন্তু খুলাফায়ে রাশেদার খিলাফতকাল অতিক্রান্ত হওয়ার পর সহস্র বছর ধরে চলে আসা অস্থিরতা আর শত শত বৎসরব্যাপী কঠিন বৈরী বাতাসে মুসলিম জাতি আজ ভীষণভাবে আক্রান্ত ও বিপর্যস্ত। এ অবস্থা মেনে নেয়া বা এর উপর তুষ্ট থাকা কোন মুসলিমের জন্য বৈধ নয়। বৈধ নয় ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও বৈশ্বিক জীবনে গায়রুল্লাহ্’র (আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য কারো) সার্বভৌমত্ব, আইন-বিধান ও কর্তৃত্ব স্বীকার করে নেয়া। বিশ্বব্যবস্থার নেতৃত্বে অনৈসলামিক শক্তিকে বহাল রাখা কিংবা বহাল রেখে এক মুহূর্তও স্বস্তি অনুভব করা মুসলিমদের নীতি-বিরুদ্ধ কাজ। জীবন ও জগতের কোন নীতি-নির্ধারণী অঙ্গনই আল্লাহ্ বিমুখ বা আল্লাহ্ দ্রোহী শ্রেণীগোষ্ঠীর হাতে ছেড়ে রাখা কোন ঈমানদার মানুষের জন্য বৈধ নয়। অতএব, ঈমানদারগণের উপর ফরয হচ্ছে- আল্লাহ্’র জমীনে আল্লাহ্’র দ্বীন-ইসলাম তথা আল্লাহ্’র সার্বভৌমত্ব, আইন-বিধান ও নিরংকুশ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আল্লাহ্’র নির্দেশিত এবং তাঁর রাসূল মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রদর্শিত পদ্ধতিতে মানবজাতিকে ইসলাম-এর দিকে আহবান করা। আল্লাহ্’র যমীনে যাতে আল্লাহ্’র দ্বীন-ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হয় সে লক্ষ্যে দাওয়াত দেওয়া যে কতটা মর্যাদাপূর্ণ কাজ, সে সম্পর্কে আল্লাহ্ তা’আলা ফরমান-

“সেই ব্যক্তির কথা অপেক্ষা উত্তম কথা আর কার হতে পারে, যে আল্লাহ্’র দিকে দাওয়াত দেয়, আ’মালে সালেহ্ (সৎকর্ম) করে এবং ঘোষণা করে- আমি একজন মুসলিম।” (সূরা হা-মীম আস সাজদাহ ৪১:৩৩)

অর্থাৎ, দুনিয়ার মানুষকে গায়রুল্লাহ্’র (আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য কারো) দাসত্ব তথা জাহিলিয়্যাত ত্যাগ করে একমাত্র আল্লাহ্’র দাসত্বের অধীনে ইসলামে ফিরে আসার দাওয়াত দেওয়াই হলো একজন মুসলিমের জন্য সবচেয়ে উত্তম কাজ এবং তার জীবনের সর্বোত্তম মিশন।

আল্লাহ্ পথভ্রষ্ট মানব জাতিকে জাহিলিয়্যাতের অন্ধকার থেকে আলোর পথে নিয়ে আসার জন্যে যুগে যুগে নাবী ও রাসূল পাঠিয়েছেন। এ সম্পর্কে আল্লাহ্ পবিত্র কুরআনে ঘোষণা করেছেন-

“তিনিই সেই সত্ত্বা যিনি তাঁর রাসূলকে প্রেরণ করেছেন সঠিক পথনির্দেশ ও সত্য দ্বীন সহকারে যাতে তিনি এ দ্বীনকে সকল দ্বীনের উপর বিজয়ী করতে পারেন, যদিও মুশরিকরা তা অপছন্দ করে।” (সূরা আত-তাওবাহ ৯:৩৩, আস সাফ্ফ ৬১:৯)

অর্থাৎ আল্লাহ্ রাব্বুল আ’লামীন সঠিক পথনির্দেশ (কুরআন) ও সত্য দ্বীন সহকারে যুগে যুগে নাবী ও রাসূল পাঠিয়েছেন তাঁর মনোনীত দ্বীন-ইসলামকে সকল বাতিল দ্বীনের উপর বিজয়ী ও প্রতিষ্ঠিত করার জন্য; কিন্তু বাতিলপন্থীরা, শির্ককারীরা তা পছন্দ করেনি। অনুরূপভাবে নাবী ও রাসূলগণের অনুপস্থিতিতে তাঁদের দাওয়াতের ধারাবাহিকতায় আজকে যখন আল্লাহ্’র সার্বভৌমত্বের প্রতিনিধিত্বকারী আমীর আল্লাহ্’র মনোনীত একমাত্র দ্বীন-ইসলামকে কুরআন ও সুন্নাহ্’র আলোকে একটি রাজনৈতিক তথা সমাজ ও রাস্ট্র পরিচালনার ব্যবস্থা হিসেবে উম্মাহ্’র সম্মুখে উপস্থাপন করবেন এবং আল্লাহকেই একমাত্র রব্ব মেনে সেই রব্বের সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার কথা বলবেন তখনও একটি বিশেষ শ্রেণী-গোষ্ঠী তাঁর বিরোধীতা সহ তাঁর মামুরগণের উপর দমন-নিপীড়ন-নির্যাতন শুরু করে দিবে।

এই বিশেষ শ্রেণী-গোষ্ঠীর লোক কারা? এবং কেন, কিভাবে তারা এক আল্লাহ্’র সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে? তা কুরআন স্পষ্টভাবে আমাদেরকে জানিয়ে দিয়েছে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ ফরমান-

“যখনই আমরা কোন জনপদে একজন সতর্ককারী পাঠিয়েছি (তখনই) সেই জনপদের বিত্তশালী লোকেরা বলেছে যে, তোমরা যে বিষয়ের দাওয়াত নিয়ে এসেছো আমরা তা মানি না (প্রত্যাখ্যান করছি)।” (সূরা সাবা ৩৪:৩৪)

(বিস্তারিত জানতে সূরা আরাফ ৭:৬০, ৬৬, ৭৫, ৮৮, ৯০, সূরা বনি-ইসরাইল ১৭:১৬, সূরা আল-মু’মিনুন ২৩:২৪, ৩৩-৩৮, ৪৬, ৪৭, সূরা যুখরুফ ৪৩:২৩, সূরা হুদ ১১:২৫-৩৪ ইত্যাদি)

মূলতঃ আল্লাহ্’র দ্বীন-ইসলাম প্রতিষ্ঠায় মানুষকে উদ্বুদ্ধ করা, শির্ক-কুফর সম্পর্কে নসিহত করা, আল্লাহ্’র পথে সাহায্য করা, মানুষকে কল্যাণের পথে ডাকা, সৎ কাজের আদেশ দেয়া, অসৎ কাজের নিষেধ করা প্রভৃতি সকল কাজই আল্লাহ পাকের নিকট আ’মালে সালেহ্। আর ঈমানদারগণ এই আ’মালে সালেহ্ করবে ঐক্যবদ্ধ থেকে, কারণ এ ক্ষেত্রে পরস্পর বিবাদ, মতভেদ, দলাদলি-বিচ্ছিন্নতা করাকে আল্লাহ হারাম (নিষিদ্ধ) করে দিয়েছেন। আল্লাহ্ পাক ফরমান-

“আর আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করো এবং নিজেরা পরস্পর বিবাদে লিপ্ত হয়ো না। যদি তা কর, তবে তোমদের মধ্যে দুর্বলতা দেখা দিবে এবং তোমাদের প্রতিপত্তির দিন শেষ হয়ে যাবে। আর তোমরা ধৈর্য্যধারণ কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ ধৈর্য্যশীলদের সাথে রয়েছেন।” (সূরা আনফাল ৮:৬৪)

“সবাই তাঁর অভিমুখী হও এবং তাঁকে ভয় করো, সালাত কায়েম করো এবং এমন মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না, যারা নিজেদের দ্বীনে বিভেদ সৃষ্টি করেছে আর বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। প্রত্যেক দলই নিজ নিজ মতবাদ নিয়ে মশগুল হয়ে আছে।” (সূরা রুম ৩০:৩১-৩২)

কিন্তু আফসোস! নিজ নিজ মতবাদ, দলীয় স্বার্থ, ব্যক্তি স্বার্থ, গোষ্ঠী স্বার্থ এসব প্রধান্য পাওয়ায় যে মুসলিমরা ইসলাম কায়েমে ভূমিকা রাখবেন তারা নিজেরাই ইসলাম নিয়ে তৈরী করেছেন নানা রকম বিভ্রান্তি। আর খৃষ্টান ও ইয়াহুদীদের পথভ্রষ্ট ও অভিশপ্ত হওয়ার মূলে যে বিভ্রান্তিকর আক্বীদাহ ছিলো, তা আজ মুসলিম উম্মাহ্’র প্রায় প্রত্যেকটি ব্যক্তির মন-মগজে অনুপ্রবেশ করেছে। খৃষ্টান ও ইয়াহুদীদের সেই ধ্বংশাত্মক আক্বীদাহ্ হলো- মানুষের জীবন দু’টি অংশে বিভক্ত:

১) ধর্মীয় বা দ্বীনদারী অংশ

২) দুনিয়াদারী (সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনা) অংশ

মুসলিমদের ক্ষেত্রে এই ভ্রান্ত আক্বীদাহ’র স্বয়ংক্রিয় (Automatic) কর্মফল যা দাড়াচ্ছে তা হলো-

মানুষের জীবন দুই দ্বীনের অধীনে পরিচালিত হচ্ছে:

১. দ্বীনদারী তথা ব্যক্তিগত সলাত, সিয়াম, হজ্জ, যাকাত প্রভৃতি আমলের অংশ পরিচালিত হচ্ছে আল্লাহকে রব্ব মেনে আল্লাহ্’র দ্বীন-ইসলামের অধীনে। আর

২. দুনিয়াদারী তথা পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনের অংশ পরিচালিত হচ্ছে রাষ্ট্রপ্রধান/শাসককে রব্ব (সার্বভৌমত্ব, আইন-বিধান ও কর্তৃত্বের মালিক) মেনে গায়রুল্লাহর দ্বীন তথা দ্বীনে বাতিলের অধীনে।

দ্বীন-ইসলাম সম্পর্কে এই গোমরাহীপূর্ণ বিশ্বাস মুসলিমদের মধ্যে বদ্ধমূল করে দেয়ার উদ্দেশ্যে ইয়াহুদী ও খৃষ্টানরা তাদের পরিকল্পনা যথাযথভাবেই বাস্তবায়িত করে গেছে। আর আমাদের অজ্ঞতার কারণে নিজের অজান্তেই আমরা ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের ভ্রান্ত আক্বীদাহ্’র উপর প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছি। বর্তমান বিশ্বের মুসলিম নামধারীরা যে ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের সূক্ষ্ণ চক্রান্তের অদৃশ্য জালে আটকা পড়ে ঈমান ও ইসলামের পরিবর্তে শির্ক ও কুফর নিয়ে দিনাতিপাত করছে তা আর প্রমাণের অপেক্ষায় বসে নেই। যেমন আমরা দেখতে পাই, কোন দেশের মোট জনগণের সিংহভাগ মুসলিম দাবীদার; তারা কম-বেশী সবাই সলাত, সিয়াম, হজ্জ, যাকাতের আমল করলেও পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় ইসলামের আইন-বিধানের পরিবর্তে মানব রচিত আইন-বিধান প্রয়োগ করছে ও মেনে চলছে। এর কারণ মূলতঃ ইসলাম নিয়ে তাদের মধ্যে বিভ্রান্তি। মানার ক্ষেত্রে বিভ্রান্তিটা হচ্ছে, ঐ সকল মুসলিম নামধারীদের অধিকাংশই ইসলামকে সলাত, সিয়াম, হজ্জ, যাকাত সহ তথাকথিত প্রচলিত আচার-অনুষ্ঠান সর্বস্ব একটি ধর্ম হিসেবেই মানে। আর জানার ক্ষেত্রে বিভ্রান্তি এতটাই প্রকট যে, মুসলিম দাবীদারদের অধিকাংশ জানেই না ইসলাম আল্লাহ্ রাব্বুল আ’লামীন প্রদত্ত একটি পরিপূর্ণ প্রয়োজনীয় ও কল্যাণকর আইন-বিধান সম্বলিত জীবন ব্যবস্থা (System), যেখানে একজন ব্যক্তির সলাত, সিয়াম, হজ্জ, যাকাত ব্যক্তিগত আমলের পাশাপাশি তার পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবন পরিচালনার পদ্ধতিও অন্তর্ভূক্ত আছে!

উদাহরণসরূপ আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশের কথাই বলছি- যেখানে আদম শুমারীর হিসেব-নিকেষ বলছে এই দেশ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্টদের দেশ অর্থাৎ দেশের অধিকাংশ মানুষ মুসলিম (১০০জনে প্রায় ৯০জন)। আমাদের স্রষ্টা প্রদত্ত আকল বা জ্ঞান বলছে কোন দেশ যদি মুসলিম প্রধান দেশ হয় তবে স্বাভাবিকভাবেই সে দেশে আল্লাহ্’র সার্বভৌমত্ব এবং দ্বীন রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে পরিপূর্ণভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকার কথা। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আমাদের দেশের মুসলিম নামধারী শাসক আর শাসিতদের দ্বীনের অবস্থা এতটাই নাজুক যে, মুসলিম দাবী করার পরও সমাজ বা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সালাত কায়েম নেই, যাকাত আদায় হচ্ছে না আর সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় পারিবারিক ও উত্তরাধিকার সম্পর্কিত মুসলিম আইনের আংশিক প্রয়োগ ব্যতীত সকল ক্ষেত্রে ইসলামী আইন-বিধান অনুপস্থিত। প্রকৃতপক্ষে নামধারী ৯০% মুসলিমের মধ্যে অধিকাংশই ব্যক্তিগত সালাত, সিয়াম, হজ্জ, যাকাত প্রভৃতি ইবাদাতের বাইরেও ইসলাম যে কিয়ামত পর্যন্ত সমগ্র মানব জাতির জন্য ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে একটি চির আধুনিক যুক্তিগ্রাহ্য কল্যাণকর ও পরিপূর্ণ আইন-বিধান সম্বলিত দ্বীন-জীবন ব্যবস্থা সে সম্পর্কে ন্যূনতম ধারণাই রাখেন না।

অপ্রিয় হলেও সত্য যে, কাগজে কলমে বাংলাদেশ এখন একটি সেক্যুলার দেশ (গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, বাঙালী জাতীয়তাবাদ এই রাষ্ট্রের মৌলনীতি)। আবার এ কথাও বলা হয়ে থাকে যে এটি প্রায় ৯০% মুসলমানের দেশ, এ দেশের মানুষ ধর্মপ্রাণ। এই সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী দুই উপাধির মাঝে সমন্বয় সাধন করতে গেলে যে চিত্রটি ফুটে উঠে, তাই আসলে আমাদের দেশের বাস্তব অবস্থা। নামধারী ৯০% মুসলমানের দেশকে সেক্যুলার করা সম্ভব হয়েছে সুদীর্ঘ সময় ধরে বিশুদ্ধ ইসলামিক জ্ঞানের চর্চা থেকে দেশের মানুষকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বিচ্ছিন্ন রাখার সুচিন্তিত পরিকল্পনা সফল হওয়ায়। অন্যদিকে, একইসাথে দেশের মানুষ তথাকথিত ধর্মভীরু হওয়ায় যে কোন ব্যবসা বা মতবাদ, তা ইসলামের সাথে যতটা সাংঘর্ষিকই হোক না কেন ইসলামিকভাবে প্যাকেট করে বাজারজাত করা হলে তাতে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হওয়া যায় নিশ্চিতভাবে। ফলশ্রুতিতে এখন শূন্য (ক্ষেত্রবিশেষে মাইনাস) জ্ঞান নিয়েও যে টপিক নিয়ে উদ্দাম আলোচনায় মত্ত হওয়া যায় তা হল ইসলাম। জেনে, বুঝে, দল নিরপেক্ষ দৃষ্টিকোণ থেকে ইসলাম পালন করার চেষ্টা এখন নিতান্তই ক্ষুদ্র, ব্যক্তিগত উদ্যোগের মাঝে সীমাবদ্ধ। আর সেই সাথে যে কোন ধরণের বিভ্রান্ত মতবাদ প্রচার করার জন্য বাংলাদেশ এখন উত্তম Fishing Ground-এ পরিণত।

আমাদের বাংলাদেশের মানুষের নিকট ইসলামের ব্যাখ্যা আর আরবদের নিকট ইসলামের ব্যাখ্যা এক না। ইসলামের রাজনৈতিক জন্ম ও বিকাশ আরব ভুখন্ডে। এর কারণ আরবীয়রা সবসময়ই ইসলামকে দুনিয়া এবং আখিরাত এই দুই স্বার্থের অনুকূল দ্বীন হিসাবেই গন্য করেছে। রাজনীতি যেহেতু পার্থিব স্বার্থের বিষয় তাই তাদের ব্যাখ্যাতে রাজনীতি ইসলাম-এর জরুরী অঙ্গ। দুনিয়াবী (পার্থিব) স্বার্থে ইসলাম-এর ব্যবহার আরবীয়দের কাছে বক ধার্মিকতা না, কিন্তু আমাদের কাছে বক ধার্মিকতা। এর কারণ আমাদের ‘ধর্ম শব্দটা সম্পর্কে ধারণা। আমাদের প্রায় সকলের ধর্ম চর্চার প্রধান উদ্দেশ্যই হচ্ছে পার্থিব স্বার্থ ত্যাগ করে নির্মোহ হয়ে উঠা। আমাদের প্রায় সকলের কাছে ইসলাম মানে মাসজিদ, দরগাহ আর খানকার চার দেয়ালের মাঝে সীমাবদ্ধ ইবাদাত-বন্দেগী সমৃদ্ধ একটা ধর্ম। যে কারণে আমরা নাবী-রাসূলগণকে উপস্থাপন করি পার্থিব স্বার্থহীণ আধ্যাত্মিক ধর্মগুরু হিসাবে। আরবদের কাছে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আধ্যাত্মিকতার পাশাপাশি একজন রাজনৈতিক নেতা, আদর্শ সফল রাষ্ট্রনায়ক, অন্যদিকে আমাদের কাছে তিনি হেরা গুহায় ধ্যানমগ্ন অপার্থিব জ্ঞানসম্পন্ন মহাপুরুষ। আমাদের বাংলাদেশের ইসলামে কি তাইলে রাজনীতি নাই? আলবৎ আছে। তবে সেই রাজনীতি এই অঞ্চলের দীর্ঘদিনের সেক্যুলার, সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী রাজনীতির সাথে একাকার হয়ে গেছে, তার ধারাবাহিক বিকাশ হয়ে গেছে। একটা উদাহরণ দিলেই বাংলার মুসলমানদের রাজনীতির ধরনটা বুঝতে পারবেন: ফকির মজনু শাহ, মুসা শাহ কিংবা করিম শাহ এর রাজনীতি হলো বাংলার মুসলমানদের রাজনীতি যেটিকে পলিটিক্যাল ইসলাম বলার উপায় নাই। কারণ মজনু শাহ ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে হিন্দু মুসলিম ঐক্যের চেষ্টায় রানী ভবানির কাছে যেই চিঠি লিখছিলেন তাতে স্পষ্ট দেখা যায় যে, তিনি হিন্দু রানীকে নিজের শাসক মেনে নিয়েছেন। আবার করিম শাহ এবং তার ছেলে টিপু শাহ যেই পাগলা তরিকা এবং রাজনীতি করেছে ব্রিটিশ রাজ ও জমিদারদের বিরুদ্ধে তাতে দেখবেন যে, হিন্দু, মুসলিম, আদিবাসী একাকার হয়ে গেছে এবং এদের ধর্ম বিশ্বাসও মিলে মিশে একাকার হয়ে গেছে। অন্যদিকে আবার মীর নিসার আলী তিতুমীর ছিলেন পলিটিকাল ইসলামিস্ট, তিনি আরব থেকে এটা শিখে এসেছিলেন। মজনু শাহ কিংবা করিম শাহ ব্রিটিশরা বিধর্মী খ্রিষ্টান, তাগুত বলে তাদের বিরোধীতা করেন নি, করেছেন তাদের শোষন-বঞ্চনার কারণে। কিন্তু তিতুমীর ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে রাজনীতি করতে গিয়ে তাদের শাসনকে তাগুতী-কুফরী শাসন ব্যবস্থা বলে চিহ্নিত করেছেন এবং সেই সুবাদে এর বিরোধীতা করেছেন।

আমাদের দেশের নামধারী মুসলমানদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হচ্ছে- পশ্চিমের কাছে তাদের মানসিক দাসত্ব। তারা ইসলাম শিখতে চায় পশ্চিম থেকে, গণতন্ত্রও পশ্চিম থেকে শিখতে চায়, আবার প্রগতিশীলতাও। তাদের মতে ইসলাম থাকে মদিনায়, মদনগঞ্জে ইসলাম নাই। সুতরাং মদনগঞ্জের নাম পরিবর্তন করে মাদনীনগর অথবা রসূলপুর রাখলে সেখানে ইসলাম চলে আসবে। তাই একাত্তুরের মুক্তিযুদ্ধের পরে সংখ্যাগরিষ্ট মুসলমানের দেশে আল্লাহ প্রদত্ত কুরআন সংবিধানের পরিবর্তে মানব রচিত সংবিধানই জাতির মানুষ মেনে নিয়েছিলো। ফলাফল একাত্তুরের আগে উপনিবেশ, পরে নয়া উপনিবেশ। উপনিবেশ আমাদের তাবৎ গোজামিল, অবক্ষয়, নোঙরামি আর সুবিধাবাদী সমঝোতা এবং ঐক্যমতের মূল ভিত্তি। উপনিবেশের কারণে আমাদের ইসলাম মদিনায় থাকে আর প্রগতিশীলতা থাকে ইংল্যান্ড, জার্মানি, ফ্রান্স বা সোভিয়েত রাশিয়ায় এবং কারো কারো জন্যে আমেরিকায়।

বাংলাদেশে কি কখনও ইসলামকে রাজনৈতিক ভিত্তিতে প্রতিষ্টিত করা হয়েছে? -পুরোপুরি উপনিবেশিক ব্যবস্থার উপরে বসে আছে পুরো সমাজ – সেখানে ইসলামকে রাজনীতির অনুসংগ হিসাবে দেখার কি কোন সুযোগ আছে? কার্যত এখনও বাংলাদেশের রাজনৈতিক, সামাজিক আর সংস্কৃতিক নেতৃত্বে আছে উপনিবেশের দাসরা – যারা তাদের মগজের ভিতরে দাসত্বকে ধারণ করে আছে। তাই ইসলাম যে মানুষের পার্থিব এবং পরলৌকিক বিষয়গুলোকে সমান গুরুত্ব দিয়েছে তা যিকির, ওরশ, মিলাদ আর জানাযা নির্ভর ইসলাম চর্চার কারণে আমাদের জানার সুযোগটুকু পর্যন্ত হচ্ছে না।

আমাদের দেশে লক্ষ লক্ষ আলেম-উলামা, হাজার হাজার মসজিদ-মাদরাসা থাকার পরও মানুষ আমল সম্পর্কে যতটা সচেতন, চিন্তাশীল, যতটা আবেগপ্রবণ, ঈমান ও ইসলাম সম্পর্কে তার এক শতাংশও দেখা যায় না। আমাদের দেশে তাগুতী শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত থাকার পরও ইসলামের দরদী ভক্তদের কেউ কেউ প্রচলিত জাহিলিয়্যাত তথা তাগুতী রাষ্ট্র ব্যবস্থার কিছু কিছু আইন, পদক্ষেপ ও কথাবার্তা সম্পর্কে মাঝে মধ্যে খুঁত ধরেন যে, সরকারের অমুক কাজ ইসলাম বিরোধী। কোথাও কোথাও কিছু ইসলাম বিরোধী আইন বা বিধি ব্যবস্থা দেখে তারা রেগে যান। তাদের ভাব দেখে মনে হয়, ইসলাম যেন পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়েই আছে, তাই অমুক অমুক ত্রুটি তার পূর্ণতার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে আছে। মূলতঃ তাগুতকে অস্বীকার করে তাওহীদ গ্রহণ করার মাধ্যমে ঈমানদার হতে হয়। তাগুতকে অস্বীকার/বর্জন করার ধরণ হলো: আল্লাহ ছাড়া অন্য সবকিছুর সার্বভৌমত্ব, আইন-বিধান ও কর্তৃত্ব অস্বীকার করা, আল্লাহ ছাড়া অন্য সবকিছুর দাসত্ব, আইনের আনুগত্য ও উপাসনা (ইবাদাত) বাতিল বলে বিশ্বাস করা, তা ত্যাগ করা, ঘৃণা ও অপছন্দ করা, এবং যারা তা করবে তাদের অস্বীকার করা, তাদের সাথে আল্লাহ’র বিধানের ভিত্তিতে শত্রুতা পোষণ করা। সুতরাং একজন মানুষকে আল্লাহ’র নিকট ঈমানদার মুসলিম হিসেবে পরিগণিত হতে হলে তার তাওহীদ, র্শিক ও তাগুত সম্পর্কে প্রকৃত জ্ঞান ও উপলব্ধি থাকতে হবে। আল্লাহ’র রুবুবিয়্যাতে তাওহীদ, উলুহিয়্যাতে তাওহীদ সম্পর্কে না জানলে যেমন ঈমান গ্রহণ করা যায় না তদরূপ র্শিক ও তাগুত না চিনলে ঈমান আনার পূর্বশর্ত পূরণ করা যায় না।

আমাদের দেশের তাগুতের সমর্থক আলিমগণ কর্তৃক মুসলিম জনগণকে বিভ্রান্ত করার প্রচেষ্টা সত্বেও দ্বীনের অপরিহার্য দাবী এই যে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’য়ালাই সার্বভৌম ক্ষমতার একমাত্র মালিক এবং আইন-বিধান প্রণয়নের অধিকার একমাত্র তাঁরই। তিনিই সিদ্ধান্ত দিতে পারেন কোনটি হক্ব (গ্রহণযোগ্য) আর কোনটি বাতিল (পরিত্যাজ্য) এবং মানুষ কিভাবে তাদের জীবন পরিচালনা করবে। আমরা দুনিয়াতে এসেছি একমাত্র আল্লাহ্’র সার্বভৌমত্বের গোলামী করার জন্য এবং আমাদেরকে অবশ্যই তাঁর অধিকার সম্পর্কে বুঝতে হবে অতঃপর একমাত্র তাঁরই আইন বা হুকুম মানার মাধ্যমে আমাদের সকল আনুগত্যকে তাঁর দিকে ফিরিয়ে দিতে হবে।
মহান রব্ব আল্লাহ্ সুস্পষ্ট ভাষায় ফরমান জারী করে দিয়েছেন-

“নিশ্চয়ই আল্লাহ্’র নিকট একমাত্র মনোনীত দ্বীন হচ্ছে ইসলাম।” (সূরা আল ইমরান ৩:১৯)
অর্থাৎ ইসলামকে মহান রব্ব আল্লাহ্ মনোনীত করলেন একমাত্র গ্রহণযোগ্য দ্বীন-জীবন ব্যবস্থা হিসেবে। অর্থাৎ কি ব্যক্তিগত জীবনে, কি সামাজিক জীবনে বা রাষ্ট্রীয় জীবনে সকল ক্ষেত্রেই ব্যবস্থা (SYSTEM) হিসেবে আল্লাহ্’র নিকট গ্রহণযোগ্য হচ্ছে একমাত্র ইসলাম। তাই যদি কেউ নিজস্ব ধ্যান-ধারণাপ্রসূত কোন বিষয়কে ইসলামের বিকল্প বা পরিপূরক হিসেবে ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনে প্রতিষ্ঠিত করতে চায় তবে সে স্পষ্টতঃই পথভ্রষ্টদের দলে শামিল বলে গণ্য হবে। আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের জিম্মাদারী থেকেও সে/তারা সম্পূর্ণ মুক্ত হয়ে যাবে। কারণ, আল্লাহ্ রাব্বুল ইয্যত সুষ্পষ্ট ঘোষণা করেছেন-

“যে লোক ইসলাম ছাড়া অন্য কোন দ্বীন-জীবন ব্যবস্থা তালাশ করে, কস্মিণকালেও তা গ্রহণ করা হবে না এবং আখেরাতে সে হবে ক্ষতিগ্রস্ত।” (আল ইমরান ৩:৮৫)

আমরা দেখতে পাচ্ছি- মুসলিম দাবী করার পরও ইসলামের নামে কিছু দল ব্যস্ত গলাবাজিসমৃদ্ধ সুন্নাহ্ পরিপন্থী ইসলামী আন্দোলন নিয়ে, আর কিছু দল ব্যস্ত হারাম গণতন্ত্রকে ইসলামের মোড়কে জনগণের সম্মুখে উপস্থাপন করে নিজেদের আখের গোছাতে। আজ আমরা এদেশের মুসলমানরা যে ইসলামকে ধারণ করে আছি একে অন্ততঃ মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ইসলাম বলা চলে না কারণ এর সাথে কুরআনী শিক্ষার কোন মিল খুঁজে পাওয়া সত্যিই দুষ্কর। বরং একে বলা চলে রাজতন্ত্রী, ধনিক-বণিক, হারামখোর শাসক, শোষক শ্রেণী ও তাদের দক্ষিণা ভোগীদের কবর জিয়ারত, জন্ম বার্ষিকী, মৃত্যু বাষিকী, খতমে ইউনুস, খতমে খাজেগান, ঝাড়ফুঁক, তাবিজ-কবজ, মাইকে শবীনা খতম, আতর-সুরমা, ফার্সী-আরবী নাম, সুন্নতে খত্’না, চল্লিশা-কুলখানী মার্কা সমাজের পরগাছাদের হালুয়া-রুটির ইসলাম।

আল্লাহ্ তাঁর রাসূল মুহাম্মাদকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদের জন্য রহমত ও মুক্তির দূত হিসেবে প্রেরণ করেছেন। অথচ আমরা কি তাঁর সমুচিত কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করতে পেরেছি? তাঁর আনীত কুরআন যে মৌল-মানবিক ও আর্থ-সামাজিক বিষয়াবলীর ভিত্তিতে একটি সফল বিপ্লব পরিচালনার রূপরেখা আমাদের সম্মুখে রেখে গেছে তার মাধ্যমে একটি সমৃদ্ধ ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থা কি আমরা কায়েমের উদ্যোগ নিয়েছি? -প্রশ্নগুলো স্বগতোক্তি ধরনের শুনালেও এর উত্তর আমাদের সবারই জানা। তাই হয়তো জনৈক মনীষী বলেছিলেন-‘মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আজ আমাদেরকে দেখলে নির্ঘাৎ কাফের বলতেন আর আমরা তাঁকে দেখলে পাগল বলতাম।’

রাসূলুল্লাহ্’র (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আবির্ভাবকালীন আরব জাহানের অবস্থার সাথে আমাদের বর্তমান অবস্থার কি কোন তফাৎ আছে? আমাদের বর্তমান অবস্থাকে যদি খুব বেশী উন্নততর পর্যায় থেকেও বিবেচনা করা হয়, তবে তা হবে রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ভাষায় তৃতীয় শ্রেণীর ঈমানদারের ন্যায়, যারা ইসলাম বিরোধী শাসকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে শহীদ হওয়ার বদলে ঈমান ও জান রক্ষার দোহাই দিয়ে জিহাদের ময়দান থেকে পলায়নী মনোভাব অর্থাৎ বৈরাগ্য গ্রহণ করেন। আজ আমাদের মাঝে যদিওবা কিছুসংখ্যক রাজনৈতিক দল ইসলামকে একমাত্র জীবন বিধানরূপে রাষ্ট্রীয় জীবনে প্রতিষ্ঠা করার সংগ্রামে রত কিন্তু তাদেরও অধিকাংশই বাগদাদী, দামেস্কী, ইরানী, কুয়েতী ও সৌদী তথা রাজতন্ত্রী শাসক ও শোষক শ্রেণীর অর্থানুকূল্যে ও স্বার্থানুকূল্যে নিয়ন্ত্রিত তথাকথিত ইসলামের তল্পিবাহক। এরা একদিকে যেমন ইসলামী খিলাফতের কথা বলছে অপরদিকে তেমনি ঐসব রাজতন্ত্রী শোষকদের কপোলে কপোল ঘষে ধন্য হচ্ছে। এই যখন শতকরা ৯০ ভাগ মুসলিম অধ্যুষিত দেশের জনগণের অবস্থা তখন ঈমান ও মুসলিম জাতির হেফাজতে দেশের হক্বপন্থী আলেম, পীর-মাশায়েখদের এগিয়ে আসা ছিল একান্ত জরুরী। অথচ তারাও সঠিক দায়িত্ব পালনে পুরোপুরি ব্যর্থ হচ্ছেন। যে কারণে দেশে আজ মুসলমানদের জন্য গোদের উপর বিষ ফোঁড়ার মতো অর্ধশতাধিক লক্ববধারী (উপাধিধারী) পীরের আবির্ভাব ঘটছে, কেউবা গ্যারান্টি সহকারে ক্বালব যিন্দা করে দিচ্ছে, জিকির-আয্কারের নামে নেশা-ভাং খেয়ে লম্ফ-ঝম্ফ করা তরিকা পয়দা হচ্ছে, শরীয়ত-মারেফতের নামে কবর পূজা, পীর পূজা, পীরের মাজার পূজা, পীরের কবর তাওয়াফ করা, পীরের নামে মানত করা, সওয়াবের আশায় পশু ছেড়ে দেয়া, পীরের পা চাটা, আঙ্গুল চোষা, পীরকে বিপদে-আপদে স্মরণ করা, পীর গায়েব জানেন বলে বিশ্বাস রাখা, দিলে দিলে নামায পড়া, মেয়েদের মতো লম্বা চুল ও জট রেখে ফকীর-দরবেশ সাজা, খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী আজমেরীর (রহিমাহুল্লাহ) নামে গান-বাজনার আয়োজন করা প্রভৃতি নাজায়েয কুফ্’রী ও বাতিল আক্বীদার প্রচার ও প্রসার ঘটছে। মূলত এরা পীর বা ওলী নয়, ওলী নামের হাইজ্যাকার। এদের প্রধান কাজই হচ্ছে নগদ নারায়ণীর সঙ্গে সঙ্গে মুসলমানদের ঈমান-আক্বীদাকে ধ্বংস করা। আর এদের শিক্ষা দেওয়া মা’রেফত মু’মিনের জন্য মরার পথ। আল্লাহ্র মনোনীত দ্বীন ইসলাম প্রতিষ্ঠায় নিজের জান-মাল কুরবানী করার পরিবর্তে দ্বীন ইসলামকেই আত্ম-প্রতিষ্ঠায় ব্যবহারের মত ঘৃণ্য কাজে এরা লিপ্ত আছে। এরাই হচ্ছে উলামায়ে ছু’ বা অসৎ আলেম। আল্লাহ্র দ্বীনের ঝাণ্ডার পরিবর্তে নিজস্ব মত-পথের নিশানকে সমুন্নত রাখতেই তাদের যত চাতুর্যপূর্ণ বয়ান। কালের বিবর্তনে মসজিদে জামাতে নামাযের ইমামতি আজ পেশায় রূপ নিয়েছে। এই সুযোগে সমাজের বিত্তবান, সম্পদশালী অথচ অনিয়মিত নামায আদায়কারী, সুদখোর, ঘুষখোর, জুয়াড়ী, যেনাকারী লোকজনও শুধুমাত্র সামাজিক প্রভাবের কারণে মসজিদ পরিচালনা কমিটির সদস্য, ক্ষেত্রবিশেষে সভাপতি পদ পর্যন্ত অধিকার করে বসে আছে। এরাই আলেমদেরকে ইমাম (নেতা) হিসেবে সম্মান করার পরিবর্তে তাদের সাথে কর্মচারীর ন্যায় আচরণ করেন। ইসলামের দাবী ছিল সমাজের সবচেয়ে আল্লাহ্ওয়ালা লোক ইমাম হবেন; কিন্তু যেহেতু ইমামতিকে পেশা বা চাকরির পদ ভাবা হয়, সেহেতু আল্লাহ্ওয়ালার পরিবর্তে মসজিদ কমিটির পায়রবি করা আলেমকে (প্রয়োজনে দূর শহর-গ্রাম হতে সংগ্রহ করে) ইমাম হিসেবে নিয়োগ দান করা হয়। এই আলেমরাই সামান্য রুটি-রুজীর মায়ায় আল্লাহ্’র হুকুমের পরিবর্তে মসজিদ কমিটির হুকুমের পায়রবি করছে। আল্লাহ্’র কাছে হিসাব দেয়ার ভয় তাদের মধ্যে অতটা কাজ করে না, যতটা কাজ করে চাকরী চলে যাওয়ার ভয়।

তবে শুধু সমালোচনা নয়; আমাদের প্রয়োজন সমাধান। তাই দুনিয়াতে শান্তি চাইলে, আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) রেজামন্দি হাসিল করতে চাইলে আমাদের এ অমূল্য জিন্দেগীকে নশ্বর দুনিয়ার পদতলে সঁপে না দিয়ে আল্লাহ্ প্রেরিত মহামানব, উম্মতের কাণ্ডারী, হিদায়াতের ঝাণ্ডাধারী, বিশ্বশান্তির প্রবর্তক, তাগুতী শক্তির মূল্যেৎপাটনকারী আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রদর্শিত পথে পরিচালিত করতে হবে। কারণ, মুসলমানদের বিশ্বাস ও চেতনায় ইসলাম সম্পর্কে যে ভাইরাস আক্রমণ করেছে তার কার্যকরী একমাত্র এন্টিবায়োটিক হচ্ছে আল-কুরআন ও রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সহীহ সুন্নাহ্। আর ইসলাম নিয়ে প্রচলিত যাবতীয় বিভ্রান্তি থেকে নিজ সহ জাতিকে মুক্ত করতে হলে সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ্ কর্তৃক মনোনীত সর্বশেষ নাবী ও রাসূল মানবতার মুক্তির দূত হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রচারিত মানুষের নয়, সার্বভৌমত্ব, আইন-বিধান ও নিরংকুশ কর্তৃত্ব একমাত্র আল্লাহ্ এ মহাসত্য গ্রহণের মাধ্যমে ঐক্য গঠন এবং তাঁর আদর্শ অনুসরণে মানব জাতির জন্য কল্যানকর একমাত্র জীবন ব্যবস্থা ‘ইসলাম’ ব্যক্তি জীবনের পাশাপাশি সমাজ ও রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নিজের সময় ও অর্থ কুরবানীর বিকল্প নেই।

আল্লাহ্ আমাদেরকে যাবতীয় বিভ্রান্তি থেকে মুক্ত করে তাঁর ক্ষমাপ্রাপ্তদের দলে কবুল করে নিন। আমীন!

আল্লাহ’র মনোনীত দ্বীন-ইসলাম প্রতিষ্ঠার পদ্ধতি নিয়ে বিভ্রান্তি

সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় আল্লাহর একক সার্বভৌমত্ব এবং ইসলামের আইন-বিধান প্রতিষ্ঠায় ঈমানদারগণের রাষ্ট্রীয় শাসন ক্ষমতা লাভ করা একান্ত প্রয়োজন। আর তাই আল্লাহ তাঁর সর্বশেষ নাবী ও রাসূল হযরত মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে আল্লাহ্’র একক সার্বভৌমত্ব এবং সত্য দ্বীন-ইসলাম প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব দিয়ে প্রেরণ করার পর, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সে দায়িত্ব যেভাবে পালন করেছেন, যে পদ্ধতিতে পালন করেছেন, আজকের যুগের দা‘ঈ-ইলাল্লাহদের সে ভাবেই পালন করতে হবে। তিনি ঈমানের দাওয়াত, ইসলামের দাওয়াত যে ভাবে, যে শব্দ দ্বারা দিয়েছেন আমাদেরকে সে ভাবেই দিতে হবে। তিনি তাঁর উপস্থাপিত দাওয়াতে ঈমান ও ইসলামকে যেভাবে আন্তরিক উপলব্ধি, বিশ্বাস, আক্বীদাহ এবং সালাত, সিয়াম ও হজ্জের ন্যায় আধ্যাত্বিক আমলের সাথে সাথে একটি পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক জীবন ব্যবস্থা হিসেবেও তুলে ধরেছিলেন আমাদের উপস্থাপনায়ও ঈমান ও ইসলামকে তদরূপ তুলে ধরতে হবে। আল্লাহ্’র রাসূল হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর দাওয়াতে কুরাইশদের বলতেন-

“তোমরা আমার একটি কথা যদি মেনে নাও, তাহলে আরব ও আযম (অনারব) তোমাদের করতলগত হবে। আমি তোমাদের সামনে এমন একটি কালিমা পেশ করছি তা যদি তোমরা গ্রহণ করো, তাহলে তোমরা সমগ্র আরব ও আযম জয় করে ফেলবে এবং অনারবরা তোমাদেরকে জিঝিয়া দিবে।” (সিরাতে ইবনে হিশাম, তাফসীর ইবনে কাসীর, আর রাহীকুল মাখতুম পৃ.১৫৬, তাওহীদ পাবলিকেশন্স)

মুসলিমদেরকে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে আল্লাহর একক সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ রাখার জন্য আল্লাহ্ একটি ব্যবস্থা প্রদান করেছেন যার নাম খিলাফত। খিলাফত হচ্ছে ইসলামের রাজনৈতিক ব্যবস্থার নাম, খিলাফতের শাসন ব্যবস্থা বিশ্বের অন্য সকল শাসন ব্যবস্থা সমূহের ভিত্তি, চিন্তা, ধারণা, গঠন, কাঠামো, আইন, সংবিধান সহ সকল দিক ও বিভাগ থেকে পৃথক ও স্বতন্ত্র। ইসলামের খিলাফত ব্যবস্থা আল্লাহ প্রদত্ত একটি স্বতন্ত্র শাসন ব্যবস্থা যা কোন ক্রমেই রাজতান্ত্রিক, সাম্রাজ্যবাদী, ফেডারেল, প্রজাতান্ত্রিক কিংবা গণতান্ত্রিক নয়। খিলাফত প্রসংগে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীন বলেন-

“আর সেই সময়ের কথাও একটু স্মরণ করে দেখ, যখন তোমাদের রব্ব ফেরেশতাদেরকে বলেছিলেন, “আমি পৃথিবীতে একজন খলীফা নিযুক্ত করতে যাচ্ছি।” (সূরা আল বাকারা ২:৩০)

এ আয়াতে খলীফা দ্বারা বুঝানো হচ্ছে- “মহান রব্ব আল্লাহর সার্বভৌম ক্ষমতার প্রতিনিধি হওয়া”। এ অর্থ অনুযায়ী সকল আদম সন্তান খিলাফতের দায়িত্ব প্রাপ্ত।

আল্লাহ পাক অন্যত্র বলেন-

“(আমি তাকে বললাম) হে দাউদ! আমি তোমাকে পৃথিবীতে খলিফা নিযুক্ত করেছি, কাজেই তুমি জনগণের মধ্যে সত্য সহকারে শাসন কর্তৃত্ব পরিচালনা করো এবং প্রবৃত্তির কামনার অনুসরণ করো না, কারণ তা তোমাকে আল্লাহ্’র পথ থেকে বিপথগামী করবে যারা আল্লাহ্’র পথ থেকে বিপথগামী হয় অবশ্যই তাদের জন্য রয়েছে কঠোর শাস্তি, যেহেতু তারা বিচার দিবসকে ভুলে গেছে।” (সূরা সোয়াদ ৩৮:২৬)

আয়াতটিতে খলীফা দ্বারা বুঝানো হচ্ছে এমন এক শাসককে যিনি রাষ্ট্র পরিচালনায় মহান রব্ব আল্লাহর সার্বভৌমত্ব, আইন-বিধান ও নিরংকুশ কর্তৃত্ব মেনে নিয়ে তাঁর প্রদত্ত শরীয়াতের বিধান মোতাবেক তার প্রতিনিধিত্বের যথাযথ হক্ব আদায় করেন।

আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীন তাঁর জমীনে তাঁর মনোনীত একমাত্র দ্বীন-জীবন ব্যবস্থা ইসলাম প্রতিষ্ঠা করা ও প্রতিষ্ঠিত রাখার লক্ষ্যে বান্দাদের মধ্য হতে কাদেরকে খিলাফতের দায়িত্ব প্রদান করবেন সে সম্পর্কে অন্যত্র ফরমান-

‘‘তোমাদের মধ্য থেকে যারা ঈমান আনবে ও সৎ কাজ করবে, আল্লাহ তাদেরকে ওয়াদা দিয়েছেন যে, তাদেরকে অবশ্যই পৃথিবীতে খিলাফত (রাষ্ট্রক্ষমতা বা শাসনকর্তৃত্ব) দান করবেন যেমন তিনি খিলাফত (রাষ্ট্রক্ষমতা বা শাসনকর্তৃত্ব) দান করেছিলেন তাদের পূর্বে অতিক্রান্ত লোকদেরকে এবং তাদের জন্য মজবুত ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত করে দিবেন তাদের দ্বীনকে, যা তিনি তাদের জন্য পছন্দ করেছেন এবং তাদের (বর্তমান) ভয়-ভীতির অবস্থাকে নিরাপত্তায় পরিবর্তিত করে দেবেন। তারা শুধু আমার ইবাদাত করবে এবং আমার সাথে কাউকে শরীক করবে না। আর যারা এরপর কুফরী করবে তারাই ফাসেক।’’ (সূরা আন নূর ২৪:৫৫)

খিলাফত প্রসংগে হযরত হুযায়ফা (রাযিআল্লাহু আনহু) বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

“তোমাদের মধ্যে নবুওয়ত ততক্ষণ পর্যন্ত বর্তমান থাকবে যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ্ চাহেন। এরপর আল্লাহ তার সমাপ্তি ঘটাবেন। তারপর প্রতিষ্ঠিত হবে নবুয়তের আদলে খিলাফত (খিলাফত আলা মিনহাজিন নুবুওওয়াহ) এবং তা ততক্ষণ বর্তমান থাকবে যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ্ চাইবেন। অতঃপর তিনি তারও সমাপ্তি ঘটাবেন। তারপর আসবে যন্ত্রণাদায়ক বংশের শাসন, তা ততক্ষণ পর্যন্ত বর্তমান থাকবে যতক্ষণ আল্লাহ ইচ্ছা করবেন। এক সময় আল্লাহর ইচ্ছায় এরও অবসান ঘটবে। তারপর প্রতষ্ঠিত হবে জবরদস্তিমূলক জুলুমের শাসন এবং তা তোমাদের উপর ততক্ষণ পর্যন্ত বর্তমান থাকবে যতক্ষণ আল্লাহ ইচ্ছা করবেন। অতঃপর তিনি তা অপসারণ করবেন তারপর পুনঃরায় আবার দুনিয়ার যমীনে খিলাফত আলা মিনহাজিন নুবুওওয়াহ (নবুওয়তের আদলে খিলাফত) প্রতিষ্ঠিত হবে।” (মুসনাদে আহমাদ, বায়হাকী, খাছায়েছুল কুবরা ইত্যাদি)

হাদীসটিতে খিলাফত আলা মিনহাজিন নুবুওওয়াহ দু’বার প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে। প্রথম খিলাফত হযরত রসূলে পাক (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ওফাতের পর এবং দ্বিতীয় খিলাফত মুসলমানদের চরম অবনতির পর।

নবুওয়ত, খিলাফতে রাশেদা, যন্ত্রণদায়ক বংশের শাসন সবই শেষ হয়ে গেছে। বর্তমান সময়ে আমরা শাসন ব্যবস্থার যে ধাপে বা কালে (চবৎরড়ফ) অবস্থান করছি তা হল জুলুমের শাসন। খিলাফতে রাশেদা বলতে আমরা প্রথম চার খলিফার সময় কালকে বুঝে থাকি। যন্ত্রণাদায়ক বংশের শাসন বলতে বুঝানো হয় খিলাফতের সেই সময় কাল যখন জোর পূর্বক বাইয়াত গ্রহণ করা হতো এবং উত্তরাধিকার সূত্রে বাইয়াত হস্তান্তর করা হতো। এক কথায় বাইয়াত ব্যবস্থার অপব্যবহার ও শরীয়তের অপব্যবহারকে বুঝানো হয়েছে। জুলুমের শাসন বলতে সেই শাসন কালকে বুঝানো হয়েছে যখন ইসলামী শাসন ব্যবস্থা বিদ্যমান ছিল কিন্তু শাসকগণ শরীয়তের অপপ্রয়োগ করে জনগণের উপর অত্যাচার করতো এবং বর্তমান সময়ের শাসন ব্যবস্থা যেখানে মুসলিম নামধারী শাসকগণ কুফুরী ব্যবস্থা দ্বারা মুসলমানদেরকে শাসন করছে। হাদিসের শেষে মুসলিম উম্মাহকে সুসংবাদ দেয়া হয়েছে এই বলে যে, জুলুমের শাসনের অবসান ঘটবে এবং পুনঃরায় নবুওয়তের আদলে খিলাফত ফিরে আসবে।

আল্লাহ্’র ওয়াদার উপর পরিপূর্ণ আস্থা রেখে ঈমানদারগণের প্রস্তুতি গ্রহণ একান্ত জরুরী। কারণ আজকে আমাদের সম্মুখে আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীনের যে দ্বীন বিদ্যমান তার নাম হচ্ছে ইসলাম। আর আল্লাহ এ দ্বীনকে সকল প্রকার বিধি-বিধান ও নিয়া’মত সহকারে পরিপূর্ণ করে দিয়েছেন। শুধুমাত্র আমাদের অজ্ঞতা ও দায়িত্বহীনতার কারণেই এ দ্বীন প্রতিষ্ঠিত নেই। সুতরাং আজ মুসলিম উম্মাহর সর্ব প্রথম এবং সর্ব প্রধান কাজ হচ্ছে আল্লাহকে একমাত্র রব্ব-সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক, সার্বভৌম আইনদাতা-বিধানদাতা ও নিরংকুশ কর্তা-মেনে নিয়ে রাব্বুনাল্লাহু ঘোষণা দিয়ে পরিপূর্ণ ঈমানদার হয়ে যাওয়া এবং এ ঈমানের উপর দৃঢ়-অটল থাকা। আর এই ঈমানের ভিত্তিতে আমলে সালেহ্ করার মাধ্যমে ব্যক্তি পর্যায়ে নিজ নিজ পরিবারের মধ্যে পরিপূর্ণরূপে দ্বীন প্রতিষ্ঠার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা। অতঃপর ইসলামী শরীয়াহ রাষ্ট্র ব্যবস্থায় প্রতিষ্ঠিত করার তথা খিলাফত ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সকল প্রকার তাগুতের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে আল্লাহ্’র একক সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে জাতির মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার দাওয়াত দেওয়া। কেননা আল্লাহ্ রাব্বুল আ’লামীন সন্তুষ্ট হয়ে তাদের মাঝেই খিলাফত ফিরিয়ে দিবেন যারা ঈমান ও আমলে সালেহ’র গুণে গুণান্বিত হয়ে নিজেদের ব্যক্তি পর্যায়ে দ্বীনকে খালেছভাবে গ্রহণ করবেন।

তবে ব্যক্তিগত বুঝের ভিত্তিতে অনেক মুসলিম ভাই বলে থাকেন,“আগে নিজের দেহে ইসলাম কায়েম করুন, তখন আপনা-আপনি দেশে ইসলাম কায়েম হয়ে যাবে” কিংবা “সারা বাংলাদেশে দ্বীন কায়েম হলেও আমার কোন লাভ হবে না যদি আমার সাড়ে তিন হাত শরীরে (পোষাক-পরিচ্ছদে) দ্বীন কায়েম না হয়, আমার নিজ পরিবারে দ্বীন কায়েম না হয়” কিংবা “যারা সালাতেই সুন্নাহ্’র অনুসরণ করেন না, তারা আবার কিসের ইসলাম কায়েম করবে?” (অর্থাৎ যারা সালাতে তাকবীরে তাহরীমার অতিরিক্ত রফে ইয়াদাইন ও জোরে আমীন ইত্যাদি সুন্নাহ পালন করেন না, তারা আবার কি ইসলাম কায়েম করবে?)। এসব আসলে দ্বীন-ইসলাম প্রতিষ্ঠার পথে কখনোই প্রতিবন্ধক হিসেবে ছিল না; নিজেদের অক্ষমতা তথা পলায়নপর মানসিকতাকে আড়াল করার জন্যই আজ এসব প্রশ্নের আমদানী হয়েছে!

সুতরাং মূলকথা হলো- “আমরা যদি নিজেদের চিন্তা, চেতনা, বিশ্বাস ও ঘোষণায় পরিপূর্ণ ঈমানদার হতে পারি, অতঃপর নিজেদেরকে ভালো, আদর্শ ঈমানদার মুসলিম হিসেবে গড়ে তুলতে পারি, ঈমান ও চরিত্রের বিপ্লবের মাধ্যমে নিজেদেরকে সংশোধন করতে পারি, ঈমানের ভিত্তিতে আমালে সালেহ্কারী হতে পারি, তাহলে আল্লাহ্’র ইচ্ছায় একদিন আমরা খিলাফাহ/শাসন ক্ষমতা লাভ করবো-ই”। যার দলীল (সূরা আন্ নুর ২৪:৫৫) ইতিপূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে। এই আয়াতটি একটি আম (সাধারণ) আয়াত যেখানে ঈমানদার ও আমালে সালেহ্কারীদের জন্য আল্লাহ্’র ওয়াদার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে কোন পদ্ধতিতে খিলাফাহ্ কায়েম করার চেষ্টা করতে হবে কিংবা কোন পদ্ধতিতে দ্বীন বিজয়ী হবে তা স্পষ্ট করে এই আয়াতে উল্লেখ হয়নি। তাছাড়া সঠিকভাবে ঈমান আনা আর আমালে সালেহ করা বলতে কি বুঝনো হয়েছে সেটা অবশ্য বুঝার প্রয়োজন আছে। ঈমান আনা বলতে মূলতঃ র্শিক মুক্ত হয়ে আল্লাহ্’কেই একমাত্র রব্ব- সার্বভৌমত্ব, আইন-বিধান ও কর্তৃত্বের মালিক মেনে আল্লাহ্’র একত্ববাদে ঈমান আনা বুঝায়, ঈমানের দাবী তথা ইসলামের সকল শর্তগুলি পূরণ করা বুঝায়, ঈমান বিনষ্টকারী কাজগুলি থেকে বেঁচে থেকে ঈমানের উপর মৃত্যু বরণ করা বুঝায় যা শুধু খিলাফত লাভের শর্ত নয় বরং সেটা মুসলিম থাকারও শর্ত। আয়াতে উল্লেখিত আমালে সালেহ্-এর মধ্যে জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহও অন্তর্ভুক্ত। নুসরাহ্ অন্বেষণ করাও এর অন্তর্ভুক্ত। এমনকি কলমের মাধ্যমে কিংবা বক্তৃতার মাধ্যমে জিহাদও এই আমালে সালেহ্-এর অন্তর্ভুক্ত হবে। তবে হারাম, শির্ক ও কুফরের ছোঁয়া সম্বলিত মানুষের সার্বভৌমত্বের অধীনে গণতান্ত্রিক নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে জয় লাভের পর সংসদ সদস্য হয়ে, মন্ত্রী হয়ে সূরা মায়েদার ৫:৪৪ নম্বর আয়াতকে ভুলে গিয়ে কুরআন ও সুন্নাহ্’র হুকুমের বিরুদ্ধে গিয়ে স্বচ্ছল ও বিত্তবান হওয়ার পরও রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বেতন-ভাতা নেয়া, দ্বীন কায়েমের কথা বলে শুল্কমুক্ত গাড়ী, সরকারী ফ্ল্যাট, প্লট, বাড়ীর মালিক বনে যাওয়া, তাগুতী আইনে মন্ত্রনালয় পরিচালনা করে ইসলামকে বিজয়ী করার চেষ্টা করা কোনক্রমেই আমালে সালেহ-এর অংশ হিসেবে গণ্য হবে না।

সুতরাং সকল প্রকার ব্যক্তিগত ইখতেলাফকে নিজের মাঝে সীমাবদ্ধ রেখে আমাদের নিজেদের ব্যক্তি জীবনকে র্শিক, কুফর থেকে বাঁচিয়ে, স্বীয় নফ্সের তাড়নাকে প্রাধান্য না দিয়ে সুন্নাহ্ মোতাবিক গঠন করতে উদ্যমী হতে হবে এবং স্ত্রী, পুত্র, কন্যা, বাবা, মা, ভাই, বোন সহ নিজ অধীনস্ত ও নিকটজনের মাঝে মহান রব্বের দাসত্ব, আইনের আনুগত্য ও উপাসনা এবং রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সুন্নাহ’র দাওয়াত পৌঁছানের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ আন্তরিকতার পরিচয় দিতে হবে। কারণ যিনি নিজ পরিবার ও সমাজে আল্লাহ্’র একক সার্বভৌমত্ব, আইন-বিধান ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে উদাসীন তিনি কিভাবে বৃহৎ পরিসরে দ্বীন কায়েমে ভূমিকা রাখবেন?

ইতিপূর্বেই আমরা উল্লেখ করেছি, আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীনের সন্তুষ্টি অর্জন তথা ক্ষমা ও জান্নাত লাভের লক্ষ্যে নিজেদের অর্থ ও সময় ব্যয়ের মাধ্যমে সকল মানুষের কল্যাণে সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় আল্লাহ্’র একক সার্বভৌমত্ব ও দ্বীন-ইসলাম প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা করাই ঈমানদারগণের ঈমানের সর্বোচ্চ দাবী এবং মূল দায়িত্ব ও কর্তব্য। আর সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় আল্লাহ্’র একক সার্বভৌমত্ব ও দ্বীন তথা ইসলামের আইন-বিধান প্রতিষ্ঠা করতে হলে ঈমানদারগণের রাষ্ট্রীয় শাসন ক্ষমতা (খিলাফত) লাভ একান্ত প্রয়োজন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে- আল্লাহ্র একক সার্বভৌমত্ব ও দ্বীন প্রতিষ্ঠায় ঈমানদারগণের রাষ্ট্রক্ষমতা বা খিলাফত লাভের সঠিক পদ্ধতি কোনটি?

কারণ ইসলামের নামে বিভিন্ন ব্যক্তি ও দল বিভিন্ন পদ্ধতি আবিস্কার করে সে পদ্ধতির মাধ্যমে ঈমানদারগণের রাষ্ট্রীয় শাসন ক্ষমতা লাভ তথা খিলাফত ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে যাচ্ছে। তাই আল্লাহ্’র একক সার্বভৌমত্ব ও দ্বীন প্রতিষ্ঠায় ঈমানদারগণের রাষ্ট্রক্ষমতা বা খিলাফত লাভের সহীহ্ পদ্ধতি সম্পর্কে পাঠকদের অবগত করাটা লেখক হিসেবে ঈমানী দায়িত্ব মনে করছি। কুরআন ও সহীহ্ হাদীস দ্বারা এ কথা প্রমাণীত সত্য যে, বর্তমানে দুনিয়াতে হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আগমনের মধ্য দিয়ে নবুওয়তের দরজা কিয়ামতের পূর্ব পর্যন্ত বন্ধ হয়ে গেছে। তিনিই হচ্ছেন আল্লাহ প্রেরীত সর্বশেষ নাবী ও রাসূল। সুতরাং নাবী ও রাসূলগণের অনুপস্থিতিতে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার এ দাওয়াতের দায়িত্ব এখন উম্মতের উপরই বর্তায় এবং এ উম্মতকেই আল্লাহর একক সার্বভৌমত্ব ও দ্বীন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মহান আল্লাহ’কে রব্ব হিসেবে ভুলে যাওয়া মানুষকে তার প্রকৃত রব্ব আল্লাহ্’র সাথে স¤পর্ক স্থাপন করাতে হবে। অন্ধকার থেকে মানুষকে বের করে আলোর দিকে টেনে আনতে হবে। আল্লাহ্’র একক সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার দাওয়াতের এ কঠিন ও উচ্চ মর্যাদাশীল কর্মকে এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে কিয়ামত অবধি নাবী ও রাসূলগণের শূন্যতা এ উম্মতকেই পূরণ করতে হবে। আর মনে রাখতে হবে, আল্লাহ্’র একক সার্বভৌমত্বের প্রতি দাওয়াতের জন্য একমাত্র আদর্শ ও ইমাম হলো, মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। তিনি যেভাবে মানুষকে আল্লাহ্’র একক সার্বভৌমত্বের প্রতি দাওয়াত দিয়েছিলেন, তার হুবহু অনুসরণই হল দাওয়াতি ময়দানে সফলতার চাবিকাঠি। তিনি মানুষকে মহান রব্ব আল্লাহ্’র সাথে স¤পর্ক স্থাপন, আল্লাহর জমীনে আল্লাহ্’র একক সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা ও দ্বীন কায়েমের লক্ষ্যে যেসব হিকমত, কৌশল, প্রজ্ঞা, মেধা, বুদ্ধি ও পদ্ধতি অবলম্বন করেছেন, তা-ই হল এ উম্মতের দা‘ঈ, আলেম ও জ্ঞানীদের জন্য একমাত্র আদর্শ। কারণ যারা আল্লাহর জমীনে আল্লাহ্’র মনোনীত একমাত্র দ্বীন ইসলাম প্রতিষ্ঠা করা ও প্রতিষ্ঠিত রাখার লক্ষ্যে মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রদর্শিত পথ ও পদ্ধতি অনুসরণ করবে না তারা কখনোই সফলতা অর্জন করতে পারবে না। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ ফরমান-

“তোমাদের জন্য আল্লাহ্’র রাসূলের মধ্যে রয়েছে একটি উত্তম আদর্শ; এমন প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য যে আল্লাহ্ ও আখিরাতের প্রতি বিশ্বাস রাখে এবং আল্লাহ্কে বেশী বেশী করে স্মরণ করে।” (সূরা আল্ আহযাব ৩৩:২১)

“যে ব্যক্তি তার নিকট সত্য-সঠিক পথ প্রকাশিত হওয়ার পর রাসূলের বিরুদ্ধাচারণ করবে এবং ঈমানদানদের অনুসৃত পথ-পদ্ধতির পরিবর্তে ভিন্ন পথ-পদ্ধতির অনুসরণ করে, আমি তাকে ঐ দিকেই পরিচালিত করবো যে দিক সে ধাবিত হয়েছে এবং তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবো। গন্তব্যস্থল হিসেবে যা খুবই নিকৃষ্টতম।” (সূরা আন নিসা ৪:১১৫)

আমরা স্পষ্ট করে বলতে চাচ্ছি, যারা ক্বিতাল বা সশস্ত্র সংগ্রাম, বোমাবাজি কিংবা সেনা ক্যু’র মাধ্যমে খিলাফত প্রতিষ্ঠা করতে চাচ্ছেন, আবার যারা ‘গণতন্ত্র’এর অধীনে নির্বাচন করে রাষ্ট্রীয় শাসন ক্ষমতা লাভের বৃথা চেষ্টা করে যাচ্ছেন তারা স্পষ্টতঃই বিভ্রান্তিতে আছেন। ভুল নেতৃত্ব কিংবা কুরআন ও সুন্নাহ্’র যথাযথ দলিল হাতে না আসার কারণে তারা হয়তো জানেনই না যে, এসবের কোনটিই ঈমানদারগণের রাষ্ট্রীয় শাসন ক্ষমতা লাভের পদ্ধতি নয়।

এসব পদ্ধতি বাতিল হওয়ার কারণসমূহঃ

১) সশস্ত্র সংগ্রাম, বোমাবাজি আল্লাহ্ রাব্বুল আ’লামীন মনোনীত দ্বীন-ইসলাম সমাজ ও রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠার জন্য যেসকল আলেম সশস্ত্র জিহাদ বা ক্বিতালের কথা বলে থাকেন তারা দলিল হিসেবে কিছু সহীহ হাদীসের উদ্ধৃতি দিয়ে থাকেন। যেমন সহীহ বুখারীতে বর্ণিত আবু বছীর (রাযিআল্লাহু আনহু) এর ঘটনা। যেখানে হুদাইবিয়ার সন্ধির পর সন্ধির একটি ধারা অনুযায়ী মক্কা থেকে হিজরত করে আসা মুসলিমদেরকে মদীনা থেকে মক্কায় ফেরত দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। হুদাইবিয়ার সন্ধির পর আবু বছীর (রাযিআল্লাহু আনহু) মদীনাতে হিজরত করেন। এ সংবাদ পেয়ে কাফিরদের পক্ষ থেকে দু’জন দূত তাকে নিতে আসলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে তাদের হাতে তুলে দেন। পথিমধ্যে যুল হুলায়ফা নামক স্থানে তিনি তাদের একজনকে হত্যা করেন এবং আবার মদীনাতে ফিরে আসেন। তাঁকে দেখে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, কি আশ্চর্য! এ তো যুদ্ধ বাধিয়ে দিতে সক্ষম। যদি এর সাথে কেউ থাকতো! এ কথা শুনে আবু বছীর (রাযিআল্লাহু আনহু) বুঝতে পারেন যে, তাকে আবার মুশরিকদের হাতে তুলে দেওয়া হবে। তাই তিনি বের হয়ে পড়েন এবং সিফাল বাহর নামক এলাকাতে অবস্থান নেন। পরবর্তীতে মক্কা থেকে হিজরত করে মুসলিমরা একের পর এক এসে আবু বছীর (রাযিআল্লাহু আনহু) এর সাথে মিলিত হতে থাকেন। মক্কার মুশরিকদের কোনো ব্যবসায়ী কাফেলা ঐ এলাকা দিয়ে ফিরছে এমন সংবাদ পাওয়া মাত্র তারা তাদের উপর হামলা করে তাদের হত্যা করতেন এবং গণীমতের মাল সংগ্রহ করে তদ্বারা জীবনধারণ করতেন। এ সংকট থেকে উদ্ধার পেতে পরবর্তীতে মক্কার কুরাইশরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট পত্র লিখে সন্ধির উক্ত শর্তটি বতিল করার অনুরোধ জানায়। (সহীহ বুখারী)। এই হাদীসটিতে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হয়, যথা- আমীর বা খলীফা অনুপস্থিত থাকলে বা তাঁর সাথে যোগাযোগ সম্ভব না হলে স্থানীয়ভাবে সামর্থানুযায়ী শত্রুদের নির্যাতনের জবাব দেয়া যায়। কেননা আবু বছীর বা অন্য যেসব সাহাবা উক্ত স্থানে একত্রিত হয়েছিলেন তাদের কেউই খলীফা ছিলেন না। আবার তারা মদীনা রাষ্ট্রের অনুগত নাগরিকও ছিলেন না। তারা যা করেছেন সে বিষয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের নির্দেশও দেন নি। এসকল সাহাবাদের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা বা নিয়ন্ত্রিত ভূখন্ডও ছিল না। এসব বিষয় স্পষ্ট প্রমাণ করে যে, কোন মজলুম মু’মিন যদি তার উপর কৃত জুলুমের প্রতিবাদস্বরূপ সামর্থানুযায়ী প্রতিরোধ করতে পারে এজন্য সে ভূখণ্ডে খিলাফত প্রতিষ্ঠিত থাকতে হবে এটা শর্ত নয়। এর দলিল হলো, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট যখন এ খবর পৌঁছেছিল, তখন কিন্তু তিনি এর নিন্দা করেননি। বরং উৎসাহ্ দিয়ে বলেছিলেন, “যদি এর সাথে কেউ থাকতো!”

এ হাদীস দ্বারা আত্মরক্ষার্থে জিহাদ করার অনুমোদন আছে তা প্রমাণীত হলেও দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য সশস্ত্র জিহাদের সম্পর্ক প্রমাণীত হয় না। কারণ সংশ্লিষ্ট সাহাবীরা যা করেছিলেন তা দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য ছিল না; বরং তা অনন্যোপায় হয়ে আত্মরক্ষার্থে ছিল।

অপর এক হাদীসে হযরত উবাদা ইবনে সামিত (রাযিআল্লাহু আনহু) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের নিকট হতে অঙ্গিকার নিয়েছিলেন যে, আমরা ক্ষমতাশীনদের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হবো না, যতক্ষণ না তারা স্পষ্ট কুফরীতে লিপ্ত হয়, যে বিষয়ে আমাদের নিকট আল্লাহ্’র পক্ষ হতে প্রমান বিদ্যমান আছে। (মুত্তাফাকুন আলাইহি)

এই হাদীসের মূল ভাষ্য হলো ক্ষমতাশীন খলীফা বা বাদশাহ্ যদি কুফরীতে লিপ্ত হয় তবে তখনি তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা ওয়জিব হবে। যা ইসলাম প্রতিষ্ঠা হওয়ার পরবর্তী আমল।

সহীহ হাদীস দ্বারা এ কথা প্রমাণিত যে, জিহাদ জারি থাকবে কিয়ামতের পূর্ব পর্যন্ত । তবে পৃথিবীতে কোথাও পূর্ণাঙ্গভাবে আল্লাহ্’র সার্বভৌমত্ব ও দ্বীন-ইসলাম প্রতিষ্ঠিত না থাকা অবস্থায় আল্লাহ্’র সার্বভৌমত্ব ও দ্বীন-ইসলাম প্রতিষ্ঠা করার জন্য সশস্ত্র জিহাদ বা ক্বিতাল করার কোনরূপ নির্দেশ আল্লাহ্’র কিতাব আল-কুরআন এবং রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সহীহ্ হাদীসে নেই সুতরাং এটি সংগত কারণেই বাতিল পদ্ধতি।

২) সেনা ক্যু নূসরাহ্’র নামে সেনাবাহিনীর সদস্যদের দ্বারা ক্যু’র মাধ্যমে জোরপূর্বক ঈমানদারগণের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা লাভের ধারণাটিও নব্য জাহিলিয়্যাত ছাড়া ভিন্ন কিছু নয়। কারণ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দানের ব্যাপারে আল্লাহ্’র চূড়ান্ত ওয়াদা থাকা সত্ত্বেও যারা আল্লাহ্’র ওয়াদার উপর ভরসা না করে কেবলমাত্র মানুষের নূসরাহ্’র মুখাপেক্ষী হয়, আল্লাহ্ তাদের উপর থেকে স্বীয় জিম্মাদারী তুলে নিয়ে তাদেরকে তাদের নিজ শক্তি-সামর্থের উপর ছেড়ে দেন, ফলে আল্লাহ্’র গায়েবী মদদ বা বিশেষ সাহায্য তাদের জন্য বন্ধ হয়ে যায়। পরিণতিতে আপাতদৃষ্টিতে তাদের কর্মকান্ড ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য উপযোগী ও বাস্তবসম্মত মনে হলেও বাস্তবে সংকট ডেকে আনা ব্যতীত ভিন্ন ফল দেয় না। উপরন্তু দ্বীন সম্পর্কে অজ্ঞ জনগণ তাদের আচরণে দিনকে দিন ইসলাম বিরোধী হয়ে পড়ে এবং দ্বীন প্রতিষ্ঠার কর্মীদের সাথে সচেতন ভাবেই শত্রুতা প্রকাশের পাশাপাশি তাদের ঠেকাতে রাষ্ট্রযন্ত্রের সাথে একাট্টা হয়ে সর্বশক্তি নিয়োগ করে।

৩) মানব রচিত ব্যবস্থার অধীনে নির্বাচন- মানব রচিত ব্যবস্থা তথা গণতন্ত্রের অধীনে নির্বাচন, এক্ষেত্রে বলতে চাই, গণতন্ত্র সহ সকল প্রকার মানব রচিত ব্যবস্থার অধীনে কেউ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে চাইলে তাকে আল্লাহ্র সার্বভৌমত্বের পরিবর্তে মানুষের সার্বভৌমত্ব মেনেই অংশগ্রহণ করতে হয়, যা সুস্পষ্ট র্শিক ও কুফ্র বিধায়; এটা কোনভাবেই ঈমানদারগণের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা (খিলাফত) লাভ তথা আল্লাহ্’র একক সার্বভৌমত্ব ও দ্বীন-ইসলাম প্রতিষ্ঠার পথ ও পদ্ধতি নয়। এর বাস্তব দলিল হিসেবে নব্বই দশকের পর মিশর, তিউনিশিয়া, মরক্কো ও তুরস্কে নিজস্ব ইজতেহাদের ভিত্তিতে মানব রচিত ব্যবস্থার অধীনে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী ইসলামী দলসমূহের পরিণতি উল্লেখ করা যায়। উল্লিখিত দেশসমূহে ইসলামী দলগুলো মানব রচিত ব্যবস্থার অধীনে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে জনগণের ভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন লাভ করার মাধ্যমে সরকার গঠন করে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পরও ইসলামের আইন-বিধান সমাজ ও রাষ্ট পরিচালনায় প্রতিষ্ঠা করতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে।

সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় আল্লাহ্র একক সার্বভৌমত্ব এবং দ্বীন-ইসলামপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ঈমানদারগণের রাষ্ট্রীয় শাসন ক্ষমতা লাভের জন্য আল্লাহ্র রাসূল হযরত মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রদর্শিত একমাত্র পদ্ধতি হচ্ছে-

ঈমান ও ইসলাম কবুলকারী ব্যক্তি/ব্যক্তিবর্গ অবশিষ্ট লোকদেরকে দাওয়াত দিবে, প্রথমতঃ “হে লোকসকল! আপনারা ‘সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় সার্বভৌমত্ব, আইন-বিধান ও কর্তৃত্ব মানুষের’ এই মহামিথ্যা ত্যাগ (অস্বীকার ও অমান্য) করুন এবং সমাজ ও রাষ্ট্রসহ জীবনের সকল দিক ও বিভাগে ‘সার্বভৌমত্ব, আইন-বিধান ও নিরংকৃশ কর্তৃত্ব একমাত্র আল্লাহ্’র’ এই মহাসত্য মেনে নিন, গ্রহণ করুন ও রব্বুনাল্লাহু ঘোষণা দিন। দ্বিতীয়তঃ হে লোকসকল! আপনারা এই বিশ্বজোড়া যত মানব রচিত সংবিধান আছে সেসব সংবিধানের আনুগত্য অস্বীকার করুন এবং দাসত্ব, আইনের আনুগত্য ও উপাসনা একমাত্র আল্লাহ্’র করার অঙ্গীকার করুন আর সাক্ষ্য দিন- আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্। তৃতীয়তঃ হে লোকসকল! মানুষের তৈরী সংবিধান ও আইন-বিধানের ভিত্তিতে যারা নেতা-নেতৃ বা সরকার, তাদের আনুগত্য অস্বীকার করুন এবং শর্তহীন আনুগত্য-অনুসরণ ও অনুকরণ একমাত্র আল্লাহ্’র রাসূল হযরত মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর করার অঙ্গীকার করুন আর সাক্ষ্য দিন- আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ্। এই তিনটি বিষয়ের দাওয়াতের পরিপ্রেক্ষিতে মানুষের সার্বভৌমত্ব এবং মানব রচিত ব্যবস্থা ও মানব রচিত ব্যবস্থার ধারক-বাহক নেতৃত্বের আনুগত্যের বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে একমাত্র আল্লাহ্র সার্বভৌমত্বের প্রতি ঈমান গ্রহণ এবং তাঁরই প্রদত্ত ব্যবস্থার আইন-বিধান পালনের অঙ্গীকারের মাধ্যমে যারা দাওয়াত কবুল করবে, তাদেরকে নিয়ে সহীহ্ আমীরের নেতৃত্বে “ইসলামী সমাজ” গঠন আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে। এই দাওয়াতের পরিপ্রেক্ষিতে মানব রচিত ব্যবস্থার ধারক-বাহক বাতিল নেতৃত্বের পক্ষ হতে আগত সকল প্রকার যুলুম-নির্যাতন ও বিরোধিতার মোকাবিলা করার দায়িত্ব মহান আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীনের নিকট ছেড়ে দিয়ে উত্তম ধৈর্য্য ও ক্ষমার নীতিতে অটল থাকতে হবে। উপরন্তু বিরোধীতাকারীদের আচরণে রাগ না করে, পাল্টা গালি না দিয়ে, পাল্টা আঘাত না করে তাদের হিদায়াতের জন্য মহান রব্বের দরবারে বেশী বেশী দু’আ করতে হবে। এরই এক পর্যায়ে ঈমানদারদের জন্য ঈমানের চূড়ান্ত পরীক্ষা আসবে। অর্থাৎ মানব রচিত ব্যবস্থার ধারক-বাহক নেতৃত্ব যখন দেখবে ঈমানদারগণের দাওয়াতের কারণে তাদের জাহিলি সমাজের ঐক্য বিনষ্ট হয়ে ভেঙ্গে যাচ্ছে এবং ইসলামী সমাজ গড়ছে তখন তারা এ দাওয়াত বন্ধের জন্য ঈমানদারদেরকে নিশ্চিহ্ন ও স্তব্ধ করে দেয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। হতে পারে তা জেল-যুলুম থেকে শুরু করে মৃত্যুদন্ড পর্যন্ত। জাহিলিয়্যাতের পক্ষ থেকে আসা ঈমানের এ সর্বোচ্চ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারলে আল্লাহ্ নিজেই তাঁর বিশেষ সাহায্যে মানব রচিত ব্যবস্থার ধারক-বাহক নেতৃত্ব তথা জাহিলিয়্যাতের পতন ঘটিয়ে ঈমানদার সৎকর্মশীলদেরকে রাষ্ট্রীয় শাসন ক্ষমতা দান করবেন। আর তখনি ঈমানদারগণ সমাজ ও রাষ্ট্রে আল্লাহ্’র একক সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা ও দ্বীন-ইসলামের আইন-বিধান চালু করবেন। এ সম্পর্কে মহান আল্লাহ্ রাব্বুল আ’লামীন তাঁর কিতাব আল-কুরআনে সূরা আন্ নূর’এর ৫৫ নং আয়াতে সুস্পষ্ট পথনির্দেশ দিয়েছেন।

সুতরাং সকল ধর্মের লোকদের জন্য যার যার ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালনের সুযোগ রেখে আল্লাহ্র রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রদর্শিত পদ্ধতিতে সমাজ ও রাষ্ট্রে আল্লাহ্’র একক সার্বভৌমত্ব এবং ‘ইসলাম’ প্রতিষ্ঠিত হলেই দুর্নীতি, সন্ত্রাস, উগ্রতা, জঙ্গিতৎপরতা ও নৈরাজসহ সকল অপতৎপরতা নির্মূল হয়ে মানুষের জীবনে শান্তি ও কল্যাণ ফিরে আসবে, সুশাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে এবং সকল মানুষের সকল অধিকার আদায় ও সংরক্ষণ হবে।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s