আল্লাহ্’র পরিবর্তে মানুষের রচিত মনগড়া আইন-বিধান দিয়ে বিচার ফায়সালা করার পরিণাম

শরী‘আহ্ প্রনয়ণ মহান আল্লাহ তা‘আলারই অধিকার। শরী‘আহ্ প্রনয়ণের অর্থ হচ্ছে সে সকল রীতি-নীতি প্রণয়ন যা আল্লাহ তাঁর বান্দাদের জন্য নাযিল করেছেন। এ হচ্ছে সে রীতি-নীতি বান্দাহগণ যা তাদের আকীদাহ, মু‘আমালাত ও অন্যান্য ক্ষেত্রে মেনে চলবে। এর মধ্যে রয়েছে হালাল হারামের বিধান। সুতরাং আল্লাহ যা হালাল করেছেন তা ছাড়া অন্য কিছুকে হালাল করার অধিকার কারো নেই এবং আল্লাহ যা হারাম করেছেন তা ছাড়া অন্য কিছুকে হারাম করার অধিকারও কারো নেই।সার্বভৌম ক্ষমতার নিরংকুশ (Absolute) মালিক মহান রব্ব আল্লাহ্‌ তা‘আলা বলেন,

وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ

“আল্লাহ্‌ যা অবতীর্ণ করেছেন সে অনুযায়ী যারা বিচার ফায়সালা করে না তারাই কাফির।” (সূরা আল মায়িদাহ, ৫:৪৪)

এ আয়াতে সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করা হয়েছে যে, আল্লাহ্‌র নাযিলকৃত আইন ব্যতীত অন্য কোন আইন দ্বারা শাসন পরিচালনা করা সুস্পষ্ট কুফরী। এই কুফরী কখনো হতে পারে বড় কুফরী, যা বান্দাহকে ইসলাম থেকে বের করে দেয়; আবার কখনো তা হয় ছোট কুফরী যা ইসলাম থেকে বের করে না। এ বিষয়টি নির্ভর করে বিচারক ও শাসকের অবস্থার উপর। যদি সে মনে করে যে,

১. ইসলামী শরি‘আহ অনুযায়ী শাসন পরিচালনা করা বাধ্যতামূলক নয়

২. ইসলামী শরি‘আহ মানা বা না মানার ব্যাপারে তার স্বাধীনতা আছে

৩. আল্লাহ্‌র আইনকে যদি সে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে

৪. মানব রচিত আইনকে যদি ইসলামী শরী‘আহ্‌র চেয়ে উত্তম বা সমমানের মনে করে

৫. ইসলামী শরী‘আহকে যদি বর্তমান পৃথিবীবাসীর জন্য অনুপযোগী মনে করে

৬. যদি কাফির ও মুনাফিকদেরকে সন্তুষ্ট রাখার জন্য আল্লাহ্‌র আইন ইসলামী শরী‘আহ ছেড়ে মানবরচিত আইন দ্বারা শাসন ব্যবস্থা পরিচালনা করে।

তাহলে তা বড় কুফুরী হিসেবে গন্য হবে।

তবে যদি কারও অবস্থা এমন হয় যে, সে আল্লাহ্‌র শরী‘আহ অনুযায়ী শাসন পরিচালনাকে বাধ্যতামূলক মনে করে, আল্লাহর আইনকে কার্যকারী ও কল্যাণকর মনে করে, আল্লাহর আইন অনুযায়ী বিচার-ফায়সালা ও শাসন না করার কারণে সে নিজেকে গুনাহগার ও শাস্তির উপযুক্ত বলে স্বীকার করে; তাহলে এমন ব্যক্তি অবশ্যই গুনাহ্‌গার এবং তার এ কাজটি ছোট কুফুরী বলে গণ্য হবে।

পক্ষান্তরে যদি কোন ব্যক্তি আল্লাহ্‌র বিধান জানার ব্যাপারে যথাসাধ্য চেষ্টা করা সত্ত্বেও তা জানতে না পারে এবং ভুল ফায়সালা দিয়ে বসে, তাহলে সে ভুলকারী হিসাবে সাব্যস্ত হবে এবং চেষ্টার বিনিময়ে একটি সাওয়াব পাবে এবং তার ভুল ক্ষমার যোগ্য বলে বিবেচিত হবে। তবে এ নীতিটি কোনো ব্যক্তির ব্যাপারে ফায়সালা দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

আর সাধারনভাবে কোনো সিদ্ধান্ত দেওয়ার ক্ষেত্রে এ নীতি হবে ভিন্ন রকম। এ ধরণের বিষয়ে ফায়সালা প্রদানকারীদের ব্যাপারে শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ্‌ (রহিমাহুল্লাহ) বলেন, “শাসক দ্বীনদার হওয়া সত্ত্বেও যদি সে জ্ঞান ছাড়া সিদ্ধান্ত প্রদান করে, তাহলে সে জাহান্নামী। আর জ্ঞানী হয়ে যদি জ্ঞানের বিপরীত সিদ্ধান্ত প্রদান করে, তাহলেও সে জাহান্নামী। আর যদি সে জ্ঞান ও ন্যায়পরায়ণতার তোয়াক্কা না করেই সিদ্ধান্ত দেয়, তাহলে সে জাহান্নামের আরো বেশী উপযুক্ত হবে। এমনটি তখনই হবে, যখন সে কোন ব্যক্তির ব্যাপারে হুকুম দেবে।”

আর যদি সে মুসলমানদের দ্বীন তথা জীবনব্যবস্থার বিষয়ে কোনো বিধিমালা জারী করা হয়, যেখানে সে সত্যকে মিথ্যা এবং মিথ্যাকে সত্যে পরিণত করে, বিদ’আতকে সুন্নাত ও সুন্নাতকে বিদ’আত সাব্যস্ত করে, ন্যায়কে অন্যায় এবং অন্যায়কে ন্যায় অভিহিত করে, আল্লাহ্‌ ও তাঁর রাসূল যে নির্দেশ দিয়েছেন তা পালনে নিষেধাজ্ঞা জারি করে এবং তাঁরা যা থেকে নিষেধ করেছেন তা করার আদেশ দেয়, তাহলে এরা হলো এমন ভয়াবহ, নিকৃষ্ট ও জঘন্যতম পাপিষ্ঠ লোক যাদের সম্পর্কে স্বয়ং রাব্বুল আলামীন ফায়সালা দেবেন, যিনি রাসূলগণের মাবুদ, প্রতিদান দিবসের মালিক, দুনিয়া-আখিরাতের সকল প্রশংসা তাঁর জন্য নিবেদিত। এরশাদ হচ্ছে,

لَهُ الْحُكْمُ وَإِلَيْهِ تُرْجَعُونَ

“বিধান তাঁরই এবং তাঁরই নিকট তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে।” (আল কাসাস, আয়াত ৮৮)

هُوَ الَّذِي أَرْسَلَ رَسُولَهُ بِالْهُدَى وَدِينِ الْحَقِّ لِيُظْهِرَهُ عَلَى الدِّينِ كُلِّهِ وَكَفَى بِاللَّهِ شَهِيداً

“তিনিই তাঁর রাসূলকে হেদায়াত ও সত্য দ্বীনসহ প্রেরণ করেছেন, যাতে অন্য সকল দ্বীনের উপর একে বিজয়ী করেন। আর সাক্ষী হিসাবে আল্লাহ্‌ই যথেষ্ট।” (আল ফাত্‌হ, আয়াত ২৮)

শায়খুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ্‌ (রহিমাহুল্লাহ) আরো বলেন, “এতে কোনো সন্দেহ্‌ নেই যে, ইসলামী শরী‘আহ মোতাবেক শাসন পরিচালনাকে যে ব্যক্তি বাধ্যতামূলক মনে করে না, সে কাফির। যদি কোন ব্যক্তি নিজের কাছে ভালো মনে হওয়ায় আল্লাহর আইন বাদ দিয়ে অন্য কোনো আইন দ্বারা শাসন ও বিচার পরিচালনা করে, সেও কাফির।”

কেননা প্রত্যেক জাতি সাধারণতঃ সেভাবেই বিচার ফায়সালা ও শাসন পরিচালনা করে যেটাকে তারা ন্যায় ও ইনসাফ মনে করে। আর ন্যায় ইনসাফ বলে সেটাকেই গ্রহণ করে যেটাকে তাদের নেতৃস্থানীয় ব্যাক্তিগণ ন্যায় ইনসাফ বলে সাব্যস্ত করে থাকে।

বর্তমান বিশ্বের অবস্থা তো আরও ভয়ঙ্কর। নিজেদের মুসলিম দাবী করে এমন লোকেরাও আল্লাহর বিধান বাদ দিয়ে পুর্ব পুরুষদের মনগড়া আইন অনুযায়ী বিচার ফায়সালা করে। হয়তো পূর্বের সেসব লোকেরা প্রতাপশালী ব্যক্তি ছিলো, যাদের কথা সবাই মেনে নিতো। আর তারা মনে করতো কুরআন ও সুন্নাহ্‌ বাদ দিয়ে এভাবেই শাসন ও বিচারকার্য পরিচালনা করা উচিত; অথচ এটা হল সুস্পষ্ট কুফরী।

অনেক লোক ইসলাম গ্রহণ করেছে বলে দাবী করে, অথচ তারা আল্লাহর আইন অনুযায়ী শাসন পরিচালনা করে না; বরং প্রচলিত প্রথা ও নেতৃস্থানীয় লোকদের প্রণীত বিধান অনুযায়ী বিচার ফায়সালা করে। ইসলামী শরী‘আহ ছাড়া অন্য আইন দ্বারা শাসন পরিচালনা করা যে অবৈধ, তা তাদেরকে জানানো সত্ত্বেও তারা তা মেনে নেয় না; বরং অন্য আইন দ্বারা শাসন পরিচালনাকে তারা বৈধ মনে করে। অতএব তারাও কাফির।

শায়খ মুহাম্মাদ ইবনে ইব্‌রাহীম বলেন, যে কুফুরীকে ছোট কুফুরী বলা হয়েছে, তা হলো আল্লাহর আইনকেই একমাত্র সত্য ও গ্রহণযোগ্য আইন মনে করা সত্ত্বেও কোনো কারণে শরী‘আহ্‌র খেলাফ আইনের কাছে বিচার প্রার্থনা করা এবং একারণে যে সে পাপী হবে তা স্বীকার করা।

এ ধরনের ব্যাপার কোনো কারও থেকে ঘটনাচক্রে দু’একবারই প্রকাশ পেতে পারে। যদি কোনো ব্যক্তি এটাকেই তার সচরাচর নিয়ম বানিয়ে ফেলে এবং শরী‘আহ বিরোধী আইন মেনে চলে, তবে তার এ কাজটিও কুফুরী হিসেবে সাব্যস্ত হবে; যদিও সে ভুল স্বীকার করে এবং বলে যে, আল্লাহর আইনই অধিক ন্যায়সঙ্গত। আর এ কুফুরী সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে ইসলাম থেকে বের করে দেয়।

এখানে শায়খ মুহাম্মদ ইবন ইব্‌রাহীম হঠাৎ ঘটে যাওয়া বিচ্ছিন্ন ঘটনা এবং সব সময় অনুসৃত সাধারণ নিয়মের মধ্যে পার্থক্য রেখা টেনে বলেছেন যে, শেষোক্ত কাজটি এমন কুফুরী যা একজন মানুষকে ইসলাম থেকে সম্পুর্ণ বের করে দেয়। কেননা ইসলামী শরী‘আহর পরিবর্তে মানবরচিত আইনকে গ্রহণ করে নেওয়াটা প্রমাণ করে যে, সে আল্লাহর আইনের চেয়ে মানবরচিত আইনকেই অধিক উপযোগী ও উত্তম মনে করে। নিঃসন্দেহে এটি এমন ধরণের তাওহীদ পরিপন্থী কুফুরী, যা মানুষকে ইসলাম থেকে বের করে দেয়।

যে ব্যক্তি জেনে শুনে আল্লাহর পরিবর্তে শরী‘আহ্ প্রনয়ণকারী এ ব্যক্তির আনুগত্য করবে এবং তার কার্যবলীর সাথে একমত পোষণ করবে সে মূলতঃ তাকে আল্লাহর সাথে শরীক করল। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَإِنۡ أَطَعۡتُمُوهُمۡ إِنَّكُمۡ لَمُشۡرِكُونَ ﴾   

‘‘যদি তোমরা তাদের (আল্লাহর পরিবর্তে শরী‘আহ্ প্রনয়ণকারী) আনুগত্য করো তাহলে নিশ্চয়ই তোমরা মুশরিক হবে।’’ {সূরা আনআম ১২১}

ওয়ামা আলাইনা ইল্লাল বালাগ্ব।

(সহযোগী তথ্যসূত্র- আকীদাতুত তাওহীদঃ শায়েখ সালেহ আল ফাওযান)

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s