“ধর্মনিরপেক্ষতা” বা “Seculaism” -সংক্ষিপ্ত উপলব্ধি

“ধর্মনিরপেক্ষতা” বা “Seculaism” শব্দটি ১৮৫১ সালে ব্রিটিশ লেখক জর্জ জ্যাকব প্রথম ব্যবহার করেন।
“নিরপেক্ষ” শব্দের অর্থ- কোনও পক্ষে নয় ৷“ধর্ম-নিরপেক্ষ” শব্দের অর্থ- কোন ধর্মের পক্ষে নয়। অর্থাৎ সকল ধর্মের সাথে সম্পর্কহীন ৷“ধর্মনিরপেক্ষতা” বা “Seculaism” শব্দের আভিধানিক অর্থ – একটি মতবাদ, যা মনে করে রাষ্ট্রনীতি, শিক্ষা প্রভৃতি ধর্মীয় শাসন থেকে মুক্ত থাকা উচিত।
ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ (Secularism) বলতে কিছু নির্দিষ্ট প্রথা বা প্রতিষ্ঠানকে ধর্ম বা ধর্মীয় রীতিনীতির বাইরে থেকে পরিচালনা করাকে বোঝানো হয়। এই অর্থে ধর্মনিরপেক্ষতা ধর্মীয় স্বাধীনতাকে প্রকাশ করে। এই মতবাদ অনুযায়ী, সরকার কোনরূপ ধর্মীয় হস্তক্ষেপ করবে না, কোন ধর্মীয় বিশ্বাসে বিশ্বাসী হবে না এবং কোন ধর্মকে কোন প্রকার অতিরিক্ত সুবিধা প্রদান করবে না। ধর্মনরপেক্ষতাবাদীরা সেই বিশ্বাসকে ধারণ করে যাতে বলা হয় মানুষের কর্মকাণ্ড এবং সিদ্ধান্তগুলো, বিশেষত রাজনীতিক সিদ্ধান্তগুলো, তথ্য এবং প্রমাণের উপর নির্ভর করবে, কোনো ধর্মীয় বিশ্বাসের উপর নয়।
ধর্মনিরপেক্ষতা (Secularism) হচ্ছে পশ্চিমা কুফর আর্দশের (পুঁজিবাদ) বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি (আক্বীদাহ্)। এই সেক্যুলারিজম মতবাদের মূল বক্তব্য হচ্ছে- আইন-আদালত, বিচারকার্য এসব চলবে রাষ্ট্রীয় নীতি ও জনগণের চাহিদা অনুযায়ী। রাষ্ট্র ও জীবনের যাবতীয় বিষয়াবলী তথা শাসন ব্যবস্থা, অর্থনীতি, বিচার ব্যবস্থা, শিক্ষা ব্যবস্থা, পররাষ্ট্র্রনীতি হতে সকল ধর্মের (ইসলামসহ) পৃথকীকরণের কথা বলে। ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ অনুযায়ী সৃষ্টিকর্তার প্রতি বিশ্বাস হচ্ছে একটি ব্যক্তিগত বিষয় এবং সৃষ্টিকর্তাকে রাষ্ট্রের বিষয়াদিতে হস্তক্ষেপের সুযোগ দেয়া যাবে না। রাষ্ট্র যেভাবে আইন করবে জনগণ সেভাবে চলবে। ধর্মের সেখানে কোন প্রবেশাধিকার নেই। এজন্যই ইসলামে ধর্মনিরপেক্ষতা বলতে কিছু নেই। কারণ ইসলামের মূল ভিত্তি হল আল্লাহ্’র কালাম আল-কুরআনুল কারীম। কুরআনুল কারীমে আল্লাহ্ তা’আলা বলেছেন-
“…আর তাদের মাঝে আপনি ফয়সালা করুন ঐ আইন দ্বারা, যা আপনার প্রতি আল্লাহ তাআলা নাযিল করেছেন।” (সূরা আল মায়িদাহ ৫: ৪৯)
সৃষ্টিকর্তা একজন আর আইন-বিধান দিবেন আরেকজন এই চিন্তা-ই ইসলামে প্রত্যাখ্যাত। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা সুস্পষ্ট ফরমান- “জেনে রাখো, সৃষ্টি করা এবং বিধান দান করা শুধুমাত্র তাঁর কাজ” (সূরা আল আরাফ ৭:৫৪)।
তিনি আরও বলেছেন- “বিধান দেয়ার অধিকার একমাত্র আল্লাহ্’রই।” (সূরা আল ইউসুফ ১২:৪০)
আল কুরআনুল কারীম এর ভাষ্য অনুযায়ী মুসলিমদের বক্তব্য হচ্ছে- “আর আসমান এবং জমিনের যাবতীয় কতৃর্ত্ব শুধু আল্লাহ্’র জন্য” (সূরা আলি- ইমরান : ১৮৯)। কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা বলে যে, “রাজার যা প্রাপ্য রাজাকে দাও এবং ঈশ্বরের যা প্রাপ্য ঈশ্বরকে দাও।” অথচ রাজা, তার সিংহাসন, তার রাজত্ব এবং এর অন্তর্ভুক্ত সবকিছুই আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার নির্দেশের আওতাধীন বিষয়। ইসলাম এটা গ্রহণ করে না যে, শুধুমাত্র মসজিদগুলো আল্লাহ্’র জন্য এবং সমগ্র রাষ্ট্র হচ্ছে শাসকের জন্য। এটাও গ্রহণ করে না যে, শুধুমাত্র সালাত, সাওম, হাজ্ব, যাকাত প্রভৃতি ব্যক্তিগত ইবাদাত সংক্রান্ত বিষয়ে আইন প্রণয়নের ক্ষমতা আল্লাহ্’র আর সরকার, প্রতিষ্ঠান, অর্থনীতি, বিচার ব্যবস্থা ইত্যাদি সংক্রান্ত বিষয়ে আইন প্রণয়নের ক্ষমতা শাসকের। এই ধরনের চিন্তাকে গ্রহণ করা মানেই আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা’র সাথে শরিক গ্রহণ করা। আল্লাহ্ রব্বুল আলামীন এ বিষয়ে ফরমান-
“তাদের কি আল্লাহ্’র সাথে এমন কোনো শরীক (অংশীদার) আছে, যারা তাদের জন্য দ্বীনের এমন বিধান (জীবন ব্যবস্থা) প্রণয়ন করে, যার অনুমতি আল্লাহ্ দেননি? ফায়সালার ঘোষণা না থাকলে তাদের বিষয়ে তো সিদ্ধান্ত হয়েই যেতো। নিশ্চয়ই যালিমদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।” [সূরা আশ-শুরা : ২১]
ধর্মনিরপেক্ষবাদীরা দাবী করে যে, রাষ্ট্র যদি একটি ধর্মের উপর প্রতিষ্ঠিত হয় তবে তা হবে অন্যান্য ধর্মের লোকদের উপর অত্যাচারের কারণ। ইসলামের ক্ষেত্রে সেই দাবী অপ্রযোজ্য ও ভিত্তিহীন। কারণ রাষ্ট্রের জনগণ শুধু রাষ্ট্র পরিচালনায় সৃষ্টকর্তা আল্লাহ্ প্রদত্ত ইসলামের বিধিবিধান মেনে চলতে বাধ্য কিন্তু ব্যক্তি জীবনে ইসলাম কবুল না করা পর্যন্ত ইসলামের ব্যক্তিগত ইবাদাত (সালাত, সাওম, হাজ্ব, যাকাত প্রভৃতি) কারও উপর অবশ্য পালনীয় (ফরয) নয় বরং যে যে ধর্মবিশ্বাসকে ধারণ করে সে নির্বঘ্নে সেই ধর্মের আচার-অনুষ্ঠান পালন করবে।
সুতরাং মুসলিম দাবীদার কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে যদি ইসলাম ব্যতীত ভিন্ন কোন জীবন ব্যবস্থাকে আংশিক বা পূর্নরূপে জীবনের কোন একটি দিক ও বিভাগে গ্রহণ করে, তবে তা শয়তানী কর্ম হিসেবে বিবেচিত হবে এবং সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ রব্বল আ’লামীনের নিকট তা কোন অবস্থাতেই গ্রহণযোগ্য হবে না উপরন্তু মৃত্যু পরবর্তী আখিরাতের অনন্ত অসীম জীবনে সে হবে চূড়ান্ত ক্ষতির সম্মুখীন। এ সম্পর্কে হুশিয়ারী উচ্চারণ করে আল্লাহ ফরমান-
“আর যে ব্যক্তি ইসলাম ব্যতীত অন্য কোন দ্বীন-জীবন ব্যবস্থা গ্রহণ করতে চায়, তার সে ব্যবস্থা কস্মিণকালেও কবুল করা হবে না বরং আখিরাতে সে হবে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভূক্ত।” (সূরা আলি ইমরান ৩:৮৫)
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা পরিপূর্ণভাবে ইসলামের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাও এবং শয়তানের পদাংক অনুসরণ করো না। নিশ্চিতরূপে সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।” (সূরা আল বাকারাহ ২:২০৮)
ইসলাম আল্লাহ্ প্রদত্ত দ্বীন আর ধর্মনিরপেক্ষতা (Secularism) মানুষের রচিত এক একটি স্বতন্ত্র মতবাদ। আর মানব রচিত সকল মতবাদ-ই মানুষের মনগড়া আইন-বিধান সম্বলিত দ্বীন তথা দ্বীনে বাতিল, এককথায় এসকল মতবাদকে বলা হয় জাহিলিয়্যাত।
হারিছ আল আশআ’রী (রাযিআল্লাহু আনহু) হ’তে বর্ণিত একটি হাদীসে কুদসীর অংশবিশেষে নাবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন- “…আর যে ব্যক্তি মানুষকে জাহেলিয়াতের রীতি-নীতির দিকে আহবান জানালো, সে ব্যক্তি জাহান্নামীদের দলভুক্ত হলো (কিংবা সে তো জাহান্নামের পঁচা-গলা লাশ)।
সাহাবায়ে কেরামগণের মধ্য হতে কেউ একজন প্রশ্ন করলেন: হে আল্লাহ’র রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম! যদি সে সালাত আদায় করে, সাওম পালন করে তবুও?
জবাবে তিনি বললেন: হ্যাঁ, যদিও সে সালাত আদায় করে, সিয়াম পালন করে এবং ধারণা করে যে, সে একজন ‘মুসলিম’।
[আহমাদ হা/১৭২০৯; তিরমিযী হা/২৮৬৩ ইফাবা; মিশকাত হা/৩৬৯৪; সহীহ তারগীব ও তারহীব ১ম খণ্ড হা/৫৫২, সহীহ ইবনে খুজাইমা ১৮৯৫, মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক ৫১৪১]

অতএব, মুসলিম দাবীদার ভাই ও বোনদের প্রতি আবেদন, মুসলিম হিসেব বেঁচে থাকতে হলে এবং মৃত্যুপরবর্তী জীবনে মুসলিম পরিচয়ে উত্থিত হতে চাইলে দ্বীন-ইসলাম কে জানতে হবে…মানতে হবে…। আর দ্বীন হিসেবে একমাত্র ইসলামকে পরিপূর্ণরূপে গ্রহণ করাই হচ্ছে আল্লাহ’র সন্তুষ্টি লাভের একমাত্র পথ। কেননা আল কুরআনুল কারীমে ইরশাদ হয়েছে-
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা পরিপূর্ণভাবে ইসলামের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাও এবং শয়তানের পদাংক অনুসরণ করো না। নিশ্চিতরূপে সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।” (সূরা আল বাকারাহ ২:২০৮)

Advertisements

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / পরিবর্তন )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / পরিবর্তন )

Connecting to %s